রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্ক নয়

বিষধর সাপ রাসেলস ভাইপার। দেশের বিভিন্ন জেলায় এই সাপ যেন এক নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। ফেসবুকে এ সাপ নিয়ে অনেকে নানাভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, দিচ্ছে নানান তথ্য, যার অধিকাংশ সঠিক নয়। 

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এই সাপ মেরে ফেলার প্রচারণাও চালানো হচ্ছে ফেসবুকে। এমনকি সাপ মারতে পারলে প্রতিটির জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন ফরিদপুরের এক রাজনৈতিক নেতা। মূলত সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি জেলায় রাসেলস ভাইপারের কামড়ে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনা আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। মানুষজন ভাবছে এই সাপে কামড়ালে নিশ্চিত মৃত্যু। এর যে চিকিৎসা আছে এবং চিকিৎসা নিলে সুস্থ হওয়া যায় সেটা অনেকেই জানেন না বলেই আতঙ্ক মাত্রা ছাড়িয়েছে।

স্থানীয়ভাবে ‘চন্দ্রবোড়া’ বা ‘উলুবোড়া’ নামে পরিচিত সাপটিই মূলত রাসেলস ভাইপার। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পদ্মা তীরবর্তী কয়েকটি জেলা ও চরাঞ্চলে এর দেখা মিলছে। যদিও বহু বছর ধরে ধারণা করা হচ্ছিল এই সাপ বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে এই সাপ দেশের ২৮টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের প্রধান তিনটি বিষাক্ত সাপ হলো গোখরা, কেউটে এবং রাসেলস ভাইপার। সাধারণত গোখরা সাপ কামড়ালে চিকিৎসা না নিলে গড়ে ৮ ঘণ্টা পর, কেউটে সাপের ক্ষেত্রে ১৮ ঘণ্টা পর ও চন্দ্রবোড়ার ক্ষেত্রে ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন পর রোগীর মৃত্যু হতে পারে। বাংলাদেশে এই সাপের কামড়ের পর ১৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকার রেকর্ড আছে। 

সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করা হচ্ছে, রাসেলস ভাইপার সাপ মানুষ দেখলে দূর থেকে তেড়ে এসে কামড় দেয়। এই সাপের কোনো অ্যান্টিভেনম নেই বাংলাদেশে এবং মৃত্যুর হার ৮০ শতাংশের বেশি। এসব তথ্য ভিত্তিহীন দাবি করে বেসরকারি সংস্থা ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর ইফতেখার মাহমুদ বলেন, ‘রাসেলস ভাইপার তেড়ে এসে কামড় দেয় না। এই সাপ খুবই ধীরগতির এবং একটানা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে না। শরীর ভারী হওয়ায় তারা তেড়ে এসে কামড় দেয় এই তথ্য সঠিক নয়।’ সাপে কামড়ানোর পর প্রথম ১০০ মিনিট খুব গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময়ের মধ্যে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। একজন চিকিৎসক তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমি নিজে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে ইন্টার্ন করার সময়ে কম করে হলেও চারজন চন্দ্রবোড়া কামড়ের রোগীকে সুস্থ করেছি।’

এই প্রজাতির সাপের কামড়ের কিছুক্ষণ পরই ওই স্থানে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। ব্যথার পাশাপাশি সেখানে দ্রুত ফুলে যায় এবং ঘণ্টা খানেকের মধ্যে দংশিত স্থানের কাছে শরীরের আরও কয়েকটি অংশ আলাদাভাবে ফুলে যায়। দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে নিম্ন রক্তচাপ, কিডনি অকার্যকর হওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। এই সাপের বিষে নানা ধরনের উপাদান বেশি। ফলে চিকিৎসায় বিলম্ব হলে বহুমাত্রিক জটিলতা তৈরি করে শরীরে। সেজন্য তখন আর অ্যান্টিভেনম দিয়ে কাজ হয় না।

রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। সাপ কামড়ালে করণীয় সম্পর্কে বলা হয়, দংশিত অঙ্গ নড়াচড়া করা যাবে না; পায়ে দংশনে বসে পড়তে হবে, হাঁটা যাবে না; হাতে দংশনে হাত নাড়াচাড়া করা যাবে না, হাত-পায়ের গিঁট নাড়াচাড়ায় মাংসপেশির সংকোচনের ফলে বিষ দ্রুত রক্তের মাধ্যমে শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে বিষক্রিয়া ঘটতে পারে; আক্রান্ত স্থান সাবান দিয়ে আলতোভাবে ধুতে অথবা ভেজা কাপড় দিয়ে আলতোভাবে মুছতে হবে; ঘড়ি, অলঙ্কার বা তাবিজ থাকলে খুলে ফেলতে হবে; দংশিত স্থানে কাঁটা, সুই ফোটানো কিংবা কোনোরকম প্রলেপ লাগানো যাবে না; সাপে কাটলে ওঝার কাছে গিয়ে অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না; যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যেতে হবে; আতঙ্কিত না হয়ে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে গিয়ে অ্যান্টিভেনম নিতে হবে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //