বঞ্চিত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষক

কভিড-১৯ মহামারির সংকটকালেও ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড়। আবার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকার দিচ্ছে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ; কিন্তু এসব ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষক। 

নানা তদারকির পরও তাদের ঋণ দিতে অনাগ্রহী ব্যাংকগুলো। ব্যাংকারদের দাবি, ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জন্য অত্যাবশ্যকীয় যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন, তা নেই গ্রামের কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের। এজন্য ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর অনেক সময় লাগছে। 

বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা দেবে সরকার। এর মধ্যে প্রায় লাখ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হবে। গত এপ্রিলে এসব প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়েছে। বড় শিল্পপতিদের জন্য গঠিত দুটি তহবিলের ঋণ বিতরণ শেষ হয়েছে। একটি তহবিলের আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে; কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষকদের তহবিলের অর্ধেকই শুধু বিতরণ করতে পেরেছে ব্যাংকগুলো। 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্পের ভেতরে ক্ষুদ্র শিল্প, সেটি যদি কুটির পর্যায়ের হয়, মাইক্রো পর্যায়ের হয় অথবা ছোট বা মাঝারি হয়- করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে অন্যদের চেয়ে তাদের ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। তাদের আগামী দিনের চিন্তা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিও অন্যদের চেয়ে তুলনামূলকভাবে নেতিবাচক। তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় ও শঙ্কা দেখছে। ঝুঁকির মধ্যে আছে। এই বিষয়টি খুব পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। তারা সরকারি সহায়তা আশানুরূপভাবে পাচ্ছে না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষক ও ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর আগ্রহের কিছুটা ঘাটতি আমরাও দেখতে পেয়েছি। ফলে শুরুতে ঋণ বিতরণ কম হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা তৎপরতার ফলে এখন তা বাড়ছে। আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যে শতভাগ না হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ বিতরণ সম্পন্ন হবে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘বড় গ্রাহকদের নিয়ম মেনে কাগজপত্র দাখিল করে ঋণ নিতে হচ্ছে। ছোটদের বেলায় ছাড় দেয়া হয়েছে। ঋণ পেতে ন্যূনতম কিছু কাগজপত্র তো জমা দিতেই হবে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, নানা ছাড়, প্রচারণা ও সময় বেঁধে দিয়েও কুটির, ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণে গতি আনা যাচ্ছে না। নানা অজুহাতে এখনো অনেক ব্যাংক এ খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে নীতিমালা জারির আট মাস পার হলেও এই তহবিলের ঋণ বিতরণ পরিস্থিতি তলানিতে রয়েছে। ২০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিল থেকে গত ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে মাত্র সাত হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। এটি মোট বরাদ্দের মাত্র ৩৭.৩৯ শতাংশ। 

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত দেশি-বিদেশি পাঁচটি ব্যাংক এক টাকাও ঋণ বিতরণ করেনি। এছাড়া আরো পাঁচটি ব্যাংকের ঋণ বিতরণের হার ১০ শতাংশের নিচে। আর ১০ শতাংশের বেশি ও ২০ শতাংশের নিচে আছে আরো ৯টি ব্যাংক। আর ২০ শতাংশের বেশি ও ৩০ শতাংশের কম বিতরণ করেছে, এমন ব্যাংকের সংখ্যা ১৫টি। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এই তহবিলের ঋণ বিতরণ শতভাগ সম্পন্নের নির্দেশনা রয়েছে।

উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সিএমএসএমই উদ্যোক্তারা। অথচ সরকারঘোষিত প্রণোদনার প্যাকেজের ঋণ পেতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ঋণ পাচ্ছে না এমন উদাহরণও আছে। তবে ব্যাংকগুলোর দাবি, ঋণ নিতে উদ্যোক্তারাই আসছে না। আবার যারা আসছে, তারাও ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিতে পারছে না। তাই ঋণ বিতরণ কম হচ্ছে।

করোনাকালীন অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় প্রথমে প্রণোদনার ২০ হাজার কোটি টাকাই ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করতে বলা হয়েছিল; কিন্তু ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটের কথা ভেবে পরবর্তী সময়ে তহবিলের ১০ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পুনঃঅর্থায়ন করার ঘোষণা দেয়া হয়। নানা ছাড়, প্রচারণা ও বারবার সময় বেঁধে দিয়েও এই তহবিলের ঋণ বিতরণে গতি আনা যাচ্ছে না। এই তহবিলের ঋণ বিতরণের সময়সীমা প্রথমে অক্টোবর পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় দফায় ৩০ নভেম্বর এবং সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এই তহবিল ঘোষণার পর থেকে বারবার কঠোর নির্দেশনা, সতর্কবার্তা, নোটিস ও তদারকি বাড়ানোর পরও ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে গতি আসেনি। ফলে ঋণ বিতরণে গতি আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে গত মাসে উদ্যোক্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর তিনটি জাতীয় ও ২৫টি স্থানীয় দৈনিকে ওই গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তির প্রায় দেড় মাস পার হতে চললেও ঋণ বিতরণে খুব একটা উন্নতি হয়েছে তা নয়। গত অক্টোবর পর্যন্ত এই প্যাকেজের আওতায় ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ২৮৭ কোটি টাকা। গত ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত নতুন করে এক হাজার কোটি টাকার মতো ঋণ বিতরণ হয়েছে। গত ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকে এই তহবিলের আওতায় ৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা ঋণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যা মোট বরাদ্দের ৪৭.৬৩ শতাংশ। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে সাত হাজার ৪২৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এটি মোট বরাদ্দের ৩৭.৩৯ শতাংশ। এ পর্যন্ত ৪৯ হাজার ৪৩৪ জন উদ্যোক্তা এই তহবিলের ঋণসুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তা মাত্র দুই হাজার ৯৬১ জন।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে বলে দিতে পারে সিএসএমই খাতের জন্য জামানত লাগবে না। এটি করা গেলে সিএসএমই খাতে তারল্যের প্রবাহ বাড়তে পারে বলে আমি মনে করি। এটি না করলে ব্যাংকগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঋণ বিতরণ করবে না।’

এদিকে কৃষকদের সহায়তার জন্য একাধিক তহবিল করেছে সরকার। করোনাভাইরাসের কারণে দুটি ও এর আগেও কয়েকটি তহবিল করে কৃষকদের ঋণ দেয়া হচ্ছে। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সাথে যুক্ত। সংখ্যার হিসেবে তাদের যে বরাদ্দ দেয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অতিসামান্য। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক একটি তহবিলের ওপর মাঠ জরিপ করেছে। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা জানান, সরকারের সুদ ভর্তুকির আওতায় আমদানি বিকল্প ফসল চাষে ৪ শতাংশ সুদে একর প্রতি বিদ্যমান ঋণ অপর্যাপ্ত। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৭৫ শতাংশ কৃষক ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। অবশ্য এ ধরনের ফসল চাষে ভালো মুনাফা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি বিকল্প ফসল চাষে তুলনামূলক বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে এমন ২৩টি জেলা নির্বাচন করে। এরপর এসব জেলার বিভিন্ন ব্যাংকের ৫৬টি শাখার মোট ৫৩৫ জন ঋণগ্রহীতা কৃষকের ওপর জরিপ পরিচালিত হয়েছে। গভর্নর সচিবালয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধানে মাঠ পর্যায়ে তিনটি টিমে নয়জন কর্মকর্তা জরিপ পরিচালনা করেন। 

ডাল, তৈলবীজ, মসলা জাতীয় ফসল ও ভুট্টা চাষে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে সরকারের সুদ ভর্তুকির আওতায় ঋণ দিয়ে আসছে ব্যাংকগুলো। শুরুর কয়েক বছর এ ঋণের সুদহার ছিল ২ শতাংশ। পরে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করা হয়। এতদিন অন্য কৃষি ঋণের সুদহার গ্রাহক পর্যায়ে ৯ শতাংশ ছিল। করোনাভাইরাসের কারণে আগামী জুন পর্যন্ত সব ধরনের শস্য ও ফসল চাষে ঋণের সুদহার ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ নীতিমালায় একরপ্রতি ঋণ বিতরণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়। চলতি অর্থবছরের জন্য ঘোষিত নীতিমালার আলোকে মসলা জাতীয় ফসল ভেদে একরপ্রতি ২৯ হাজার থেকে এক লাখ ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক। মসলা জাতীয় ফসল হলো- আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, হলুদ ও জিরা। ডাল জাতীয় ফসলে একরপ্রতি ১৭ হাজার থেকে ২১ হাজার টাকা ঋণ দেয়া যায়। এর আওতায় রয়েছে- মুগ, মসুর, খেসারি, ছোলা, মটর, মাসকলাই ও অড়হর। তৈলবীজ তথা- সরিষা, তিল, তিসি, চীনাবাদাম, সূর্যমুখী ও সয়াবিন চাষে ২৩ হাজার থেকে সাড়ে ২৬ হাজার টাকা ঋণ দেয়া যায়। এছাড়া ভুট্টা চাষে একরপ্রতি ৩৫ হাজার ২৫০ টাকা ঋণ দিতে পারে ব্যাংক। তবে বর্তমানে মজুরি, সেচ, সার, ঘরে তোলাসহ অন্যান্য খরচ বিবেচনায় এ খরচ যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন বেশিরভাগ কৃষক। 

ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ‘বড় শিল্পপতিরা ব্যাংকের টাকা নিয়ে আগেই নয়-ছয় করেছেন। এখন প্রণোদনার টাকাও নিচ্ছেন। তাদের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে; কিন্তু গ্রামের কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে অতিসামান্য। যেটুকু দেয়া হয়েছে তাও বিতরণ করছে না ব্যাংকগুলো। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের ঋণ সরবরাহ বাড়ানো জরুরি। এতে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে দ্রুতগতিতে।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh