সুবিধায় খেলাপিরা, চ্যালেঞ্জে ব্যাংক

সদ্যবিদায়ী ২০২০ সালে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তারা বছরজুড়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় নতুন বছরেও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারছে না অর্থনীতি। 

তবে ভয়াবহ সংকটেও বরাবরের মতো সুবিধায় রয়েছেন ঋণ খেলাপিরা। বরং নতুন বছরেও তাদের সুবিধা আরো বাড়ছে। এতে ব্যাংকগুলোর বিপদ বাড়তে পারে নতুন বছরজুড়ে। ইতিমধ্যে খেলাপিদের ছাড় দিতে গিয়ে গত বছর মুনাফায় ব্যাপক পতন হয়েছে অধিকাংশ ব্যাংকের। শিথিল নীতিমালা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হলে নতুন বছরে ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

বিদায়ী ২০২০ সাল শুরু হয় নয়-ছয় সুদহার হার বাস্তবায়ন বিতর্ক দিয়ে। ব্যাংকগুলোকে ঋণ ও আমানতের বিপরীতে সুদহার বেঁধে দিয়ে তা কার্যকর করতে বাধ্য করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট জমা দিয়ে ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ নবায়ন করার আগের বছরের ‘গণছাড়’ সুবিধা গত বছরেও বহাল থাকে। 

মার্চ থেকে কভিড-১৯ সংক্রমণের কবলে পড়ে দেশ। এর মধ্যে কিস্তিু ফেরত না দিলেও খেলাপি না করার সুযোগ দেয়া হয়। একই সময়ে ক্ষতি পোষাতে এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। প্রণোদনা বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলোর অব্যবস্থাপনা বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। গত বছর সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল টাকা আদায় না করেও ব্যাংকগুলোর উচ্চ মুনাফা কাগজে-কলমে দেখানো সুযোগ। তবে শেষ দিকে এসে ১ শতাংশ অতিরিক্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখার নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার বছরের শেষদিকে ঋণ খেলাপিদের ছাড় দিতে আরেকটি নির্দেশনা জারি করা হয়। 

এভাবে নানা ঘটনার মধ্যে ২০২০ সাল পার করে চরম সংকটে থাকা দেশের ব্যাংক খাত। নতুন বছর যাত্রা শুরু করলেও নতুন কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি ব্যাংকগুলোর জন্য। বরং পুরাতন বছরের খেলাপিদের দাপুটে মনোভাব ব্যাংকগুলোকে আরো বেকায়দায় ফেলতে পারে ২০২১ সালে। 

এ বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরফান আলী বলেন, ‘বছরের প্রথম দিকে সুদহার নিয়ে বড় চাপে ছিল ব্যাংক খাত। আর করোনাভাইরাসের কারণে সেবা দেয়াটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। এরই মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব এসে পড়ে। নতুন করে খেলাপি না হওয়ায় ব্যাংকগুলো একরকম স্বস্তিতে আছে, তবে অনাদায়ী ঋণের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।’

কভিড-১৯ সংক্রমণের বছর ব্যাংকগুলো নিজেদের গুটিয়ে নেয়। মার্চের পর প্রতি মাসেই ঋণ বিতরণ কমিয়েছে ব্যাংকগুলো। নভেম্বরে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ বেড়েছে মাত্র ৮.২ শতাংশ হারে। এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি। স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে না থেকে অলস টাকার পাহাড় জমিয়েছে ব্যাংকগুলো। এর প্রভাব ইতিমধ্যে পড়েছে ব্যাংকগুলোর মুনাফায়। গত বছরের ২৯টি ব্যাংকের সাময়িক পরিচালন মুনাফার তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেখা গেছে, মাত্র পাঁচটি ব্যাংকের মুনাফা উল্লেখ করার মতো বেড়েছে। অতি সামান্য বেড়েছে চারটি ব্যাংকের। আর আগের বছরের তুলনায় মুনাফা ব্যাপকহারে কমেছে ১৪টি ব্যাংকের। আর বাকি ছয় ব্যাংকের মুনাফাও আগের বছরের তুলনায় কমেছে। সবচেয়ে বেশি ২৪ শতাংশ মুনাফা বেড়েছে সোনালী ব্যাংকের। আর সবচেয়ে বেশি মুনাফা কমেছে আইএফআইসি ব্যাংকের। ব্যাংকটির মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৪১ শতাংশ কমেছে।

মহামারির প্রভাবে ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ঋণের টাকা আদায় করা। শেষ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ঋণের টাকা আদায় করতে পারেনি। তবে আদায় করতে না পারলেও ঋণের বিপরীতে কাগুজে আদায় দেখানোর সুযোগ পেয়েছে। কারণ কিস্তি ফেরত না দিলেও ঋণ খেলাপি না দেখানোর সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলো ব্যাপকহারে আয় দেখানো শুরু করে। তবে শেষ সময়ে এসে অনাদায়ী ঋণের কিস্তি আদায় দেখানোর ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ ও নতুন নিয়মনীতি জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে কাগুজে আয় দেখানোর পথ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।

নতুন বছরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর বিপদ আরো বাড়বে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতি ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। ব্যাংক খাত নানা সংকটকাল অতিক্রম করছে। নতুন বছরে ব্যাংকগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ ঋণ আদায় করা। ঋণ আদায় করা সম্ভব না হলে খেলাপি ঋণ বাড়বে। খেলাপি ঋণের কারণে অন্যান্য সংকট প্রকট হতে শুরু করবে।’

এদিকে ব্যাংকের অবস্থা যা-ই হোক, খেলাপির দাপট অব্যাহত থাকবে। বছরের শেষ দিনও তারা সুবিধা পেয়েছেন। সংকট তীব্র হলেও তাদের সুবিধা বহালই থাকবে। সর্বশেষ নীতিমালা অনুসারে, দুই শতাংশ অর্থ আগাম পরিশোধ করে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ যারা নিয়েছিলেন, তারাও করোনাকালের বিশেষ সুবিধার আওতায় থাকবে। ২০১৯ সালে যারা ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরে খেলাপি ঋণ পরিশোধের সুযোগ নিয়েছিলেন, তারাও ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে কিস্তি না দিলে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হবেন না।

গণছাড় সুবিধা নিতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে ২০ হাজার ৭০৩টি আবেদন করেন খেলাপিরা। ১৩ হাজার ৩০৭ জন খেলাপি গ্রাহককে এই সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর আওতায় ১৯ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল বা নিয়মিত করা হয়েছে।

এর বাইরে নতুন বছরে ব্যাংকগুলোর অন্যতম চ্যালেঞ্জ আইটি-নির্ভর গুণগত সেবা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সাইবার হামলা ও ডিজিটাল সিস্টেমে অর্থ চুরি প্রতিরোধ করা। ব্যাংকিং সেবা পরিসীমার মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলা করাও ব্যাংকগুলোর জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া আগের সংকট, যেমন- সুশাসনের অভাব, ঋণ শৃঙ্খলায় দুর্বলতা, অর্থ পাচার ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ইত্যাদি প্রকট হতে পারে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh