২৫ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে ১১ ব্যাংক

লাগামহীন বাড়ছে খেলাপি ঋণ। ফলে মন্দ ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে গিয়ে বড় আকারে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে সরকারি-বেসরকারি ১১টি ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহকের আমানতের অর্থ থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়। সেই ঋণ খারাপ হয়ে পড়লে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়। আবার খারাপ ঋণের ওপর অতিরিক্ত মূলধন রাখার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। কাঙ্ক্ষিত মুনাফা করতে না পারা ও লাগামহীন খেলাপি ঋণের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বেশকিছু ব্যাংক মূলধন সংরক্ষণ করতে পারছে না। ফলে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং রীতি ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী, ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বর্তমান নিয়মে ব্যাংকগুলোকে ৪০০ কোটি টাকা অথবা ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশের মধ্যে যা বেশি সেই পরিমাণ অর্থ ন্যূনতম মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। এর বাইরে আপৎকালীন সুরক্ষা সঞ্চয় হিসেবে ব্যাংকগুলোকে ২০১৬ সাল থেকে অতিরিক্ত মূলধন রাখতে হচ্ছে।

যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যত বেশি, ওই ব্যাংককে তত বেশি মূলধন রাখতে হয়। চলতি বছরের ছয় মাসে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা বেড়ে ৯৯ হাজার ২০৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এতে মূলধনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুন প্রান্তিক শেষে মোট ১১টি ব্যাংক মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের পাঁচটি, বিশেষায়িত খাতের দুইটি ও বেসরকারি খাতের চারটি ব্যাংক রয়েছে। এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকা।

মূলধন ঘাটতি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, যতদিন স্থায়ী সমাধান না হবে, ততদিন এ অবস্থা চলতেই থাকতে। সরকারি সব ব্যাংকেরই একই অবস্থা। মূলধন ঘাটতি পূরণে আমরা সরকারের কাছে একটি স্থায়ী সমাধান চেয়েছি। এর মানে আমাদের অর্থ দিতে হবে তা নয়। সরকারি বন্ড দিয়েও এ ঘাটতি মেটানো যায়।

তিনি বলেন, আমরা যতটুকু সম্ভব ঘাটতি মেটাতে কাজ করছি। ঋণ আদায়ে জোর দিয়েছি। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১০০ দিনের একটি প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছে। খেলাপি গ্রাহকদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান আলোচনা করে ঋণ আদায়ে ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিভিন্ন সুবিধার পরও রাষ্ট্রীয় মালিকানার ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটি এখন মূলধন সংকটে আছে। জুন মাস শেষে এসব ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪৫৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে মূলধন ঘাটতি সবচেয়ে বেশি রয়েছে সোনালী ব্যাংকের। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এছাড়া অগ্রণীর এক হাজার ৯৬০ কোটি ২৩ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংকের এক হাজার ৯২৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা, রূপালীর ব্যাংকের ৬৬৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং জনতা ব্যাংকের ৩৪৫ কোটি টাকা।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি ১১ হাজার ৮৪৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ঘাটতি এক হাজার ৫০৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

বেসরকারি খাতের চারটি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি রয়েছে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের এক হাজার ৬৪২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ১১৪৬ কোটি ২১ লাখ টাকা, পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স) ৪৬১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং এবি ব্যাংক ৩২৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। নিয়ম অনুযায়ী খেলাপির বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে মূলধন ঘাটতি হয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোতে এ হার বেশি। এর মূল কারণ এসব ব্যাংকে সুশাসনের অভাব রয়েছে। তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই।



মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //