দিনভর চেরাই হওয়ার আগে

অগাধ ঐশ্বর্যময় অথচ বিপন্ন ভুবন

‘আমি বুঝতে পারছি খুন করা/হয়েছে আমাকে।/তারা ক্যাফে, কবরখানা আর/গির্জাগুলো তন্ন তন্ন/করে খুঁজেছে।/তারা সমস্ত পিপে আর/কাভার্ডগুলো তছনছ/করছে।/তিনটে কঙ্কাল লুট করে/খুলে নিয়ে গেছে/সোনার দাঁত।/আমাকে তারা খুঁজে পায়নি।/কখনো কি পায়নি?’
- গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া লোরকা


কেন গোড়াতেই লোরকার শরণাপন্ন হলাম? সেটা পরিষ্কার হবে, যদি আমি এবার আরশাদ সিদ্দিকীর কয়েকটা পঙক্তি উদ্ধৃত করি! আরশাদ সিদ্দিকী হচ্ছেন- সেই প্রজাতিরই লেখক, যিনি তার নিজেরই রক্ত-মাখানো ছুরি দিয়ে- এঁকে দিতে পারেন যুদ্ধ বিরতির ইশতেহার। শাশ্বত এবং চিরায়ত ইশতেহার! এবার তবে ‘দিনভর চেরাই হওয়ার আগে’ থেকে পড়ে নেওয়া যেতে পারে আরশাদ সিদ্দিকীর দু-একটি কবিতা। তাহলে অন্তত আমরা আমাদের ভবঘুরে চিত্তকে দিতে পারব একটুখানি থিতু হবার আকুলতা!

অবিরাম দগ্ধ হতে থাকা ভেতর-বাহিরকে দিতে পারব একটুখানি ত্রাণ! দহনের বেদনা থেকে নিজেদের নিষ্কৃতি দেওয়াও তাহলে সম্ভব হবে। বিষ-চকচক ছোরার আঘাতে নিজেদের ক্ষতবিক্ষত হতে দেখেও, সহজেই সবকিছু সহ্য করা যাবে। উফ শব্দটিও বেরুবে না- আমাদের ভেতর থেকে! এবং পাঠক, ওই কাব্য পঙক্তির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আমরা দেখতে পাব, বিষাদ-বিধ্বস্ত, খরা-চৌচির আমাদের বুকে পলি জমে উঠবে! নব জল স্পর্শে আমরা আবার দুলে উঠব আশায় ও বিশ্বাসে! এবার আরশাদ সিদ্দিকীর কিছু পঙক্তি পড়ে নেওয়া যেতে পারে। ‘পথ ফুরালে অনন্ত ক্লান্তি নিয়ে গন্তব্য থাকে অপেক্ষায়।/ হিসেবের অঙ্কে থাকে গরমিলের অজানা আশঙ্কা।/ প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায় লুকায়ে থাকে না-পাওয়ার গোপন কষ্ট।’ (উচাটন)

জন গে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, মানুষের জীবন কত সংক্ষিপ্ত, কত ভঙ্গুর! আর আমাদের তারাশঙ্কর বলেছিলেন, ‘জীবন এত ছোট ক্যান’? এই এক জীবনের দাহ্য সময়েই আমাদের মনে উঁকি দেয় কত বিতৃষ্ণার কালো রাত! কত ভ্রমর আমাদের দিনাতিপাত নাশ করে চলে। তবুও বয়ে যাওয়া ক্ষীণ রাতে, হয়তো তারপরেও থাকে তারার উৎসব মোড়ানো স্বপ্ন। স্বপ্নই কী মনুষ্যজীবনের সার কথা নয়? আর এই স্বপ্নের জন্যই এত মন উচাটন করাকরিকে বরদাস্ত করি আমরা! এত যে লড়াই এত যে ক্রন্দন এত যে হেরে গিয়ে ফের উঠে দাঁড়াতে চাওয়া-সে তো স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই বলেই!

তাহলে কেমন হবে-যদি একটি জীবন- তার স্বপ্নকেই খুইয়ে বসে? স্বপ্ন দেখার স্পর্ধাকেই হারিয়ে ফেলে? এখানে টমাস মুর আমাদের বলেন, বেগবান জীবনে দ্বন্দ্ব আছে, তাই জীবন বৈচিত্র্যময়। স্বপ্নকে মুঠোয় রাখতে-চাওয়া কবি আরশাদ সিদ্দিকী কী বলেন? ‘অসংবৃত’ কবিতায় তার উচ্চারণ ‘এমন দুর্বিপাকে এর আগে পড়িনি। কী এক অচেনা টান। চিনচিনে কষ্ট। ব্যথা নয় অন্য কিছু। শর যন্ত্রণার তীব্র অনুভূতিগুলো। শ্বাসরুদ্ধ ধারালো।’ এমন সব মর্মস্পন্দিত করে দেওয়া পঙক্তি বড় অনায়াসে উচ্চারণ করে চলেন কবি! শরাহত-ডানা এক ঈগল যেন তিনি-আমাদের বিশীর্ণ আকাশে আকাশে, উঠে যাচ্ছেন ওই উঁচুতে! নীল থেকে আরও গহন নীলের ঠিকানার সন্ধানে!

আমাদের সংস্কৃতির ভুবনে, শিল্পের ভুবনে বিরাজ করছে এক অসহ, ভয়াল খরা। আরশাদ সিদ্দিকী এইখানে, নিজস্ব বিষাদকে পুঁজি করে ছড়াতে চেয়েছেন অমৃতের-নির্যাস। তার কবিতা কান্তি, এবং বিস্ময়কর এই যে, তিনি সৃজন করেন এক নব মধুরিমা! কবিতায় তিনি গড়ে তুলেছেন নতুন কাব্যভাষা। সেই কাব্যভাষা শুধু আমাদের চিন্তার পৃথিবীকে নতুন করে জাগিয়েই তোলে না, আমাদের ভেতরে নবতারুণ্য জন্ম দেয়! নতুন করে আকুলতা বোধ করার সামর্থ্যকে ফিরে পাই আমরা! অই অনুভূতি অতুল্য! এখানে আমরা ‘অনুরতি’ শিরোনামের কবিতাটিকে স্মরণ করতে পারি! ‘একটি সরোদ সুরের মতো সম্পর্ক/একটা মিহি সুতোর মতো সুর/না হয় দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস হয়েই রইল/এক মুহূর্তে শত শত বছরের জীবন/কে আর করেছে যাপন/এক নদীতে কে আর করেছে স্নান সহস্রবার/ জীবন জয়ের পর ছুঁয়েছে প্রতিদিন মৃত্যুর প্রহর।’ আমরা বলতে পারি, আমাদের দেহের চিকিৎসার আগে, প্রয়োজন আমাদের আত্মার সুস্থতা। আরশাদ সিদ্দিকী আকাশে আকাশে আমাদের জন্য সৃজন করে দেন সুস্থতার রঙধনু!

প্রতিষ্ঠানবিরোধী কবি আরশাদ সিদ্দিকী, সভ্যতা বলতে বোঝেন ক্ষয়ে যাওয়া কার্তুজ। দেশভাগের ভয়াল যন্ত্রণা তাকে নিত্যনিয়ত ছিন্নভিন্ন করে চলেছে! এই কবি চির নিঃসঙ্গ ও চির একাকী! তিনি একাকী বলেই মনোভূমিতে অমন নিবিড় মনোযোগ ঢেলে দিয়ে ফলাতে পেরেছেন অপরূপ কাব্যশস্য! ক্রিস্টোফার মর্লির একটি কথা আছে। নতুনকে জানার যেমন যন্ত্রণা আছে, তেমনি আনন্দও আছে। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেন, সংসারে জ্বালা-যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে, মনের ভেতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভেতর ডুব দেওয়া। যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, যন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তারই তত বেশি হয়।

আমাদের সৌভাগ্য, আরশাদ সিদ্দিকীও কাব্যে কাব্যে আমাদের জন্য গড়ে তুলেছেন এক মোহন ভুবন। সে ভুবন আবার জনজীবন বিচ্ছিন্ন এক মেঘের মিনার মাত্র নয়! সেই ভুবন বাস্তবলগ্ন, বিবিধ ক্লিন্নতায় দীর্ণবিদীর্ণ! আমাদের ধুকন্ত প্রাত্যহিকেরই সম্প্রসারণ বলে ডাকতে পারি তাকে! ‘নির্বেদ’ কবিতায় এই যে সেই ভুবনখানির এমন পরিচয় আমরা পাই, ‘রোজ আপিস ঘরের কেবিনে। হা-হুতাশে। আসমানে-জমিনে। ছুটেছ ঊর্ধ্বশ্বাসে। কখনে হয়নি বেঁচে থাকা দীর্ঘশ্বাসে।/জুড়ে থেকে। দূরে থেকে। পুড়ে গিয়ে। কান্না হয়ে। জেদ চেপে। রোখ মেপে। রুদ্ধশ্বাসে। কখনো হয়নি বেঁচে থাকা দীর্ঘশ্বাসে।’

আরশাদ সিদ্দিকীর কবিতায় স্মৃতির পৃথিবীকে আমরা বারেবারে পাই! হারিয়ে ফেলা সেই কোনো দূরের কিশোরবেলা বারবার এসে ডাক দেয় আমাদের! বারবার ফিরে আসে সোনালি শৈশব, কৈশোরের দামাল উড্ডীনতার দিন। তার কবিতা আমাদের নিয়ে যায় সেই ধুলোর উঠানে, যেইখানে বিছিয়ে আছে আমাদের মার্বেল খেলার মৌসুম। আছে অবাধ আনন্দ নিমগ্নতার বিকেল অথবা রাতগুলো! কবির সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও মনে পড়ে যায়, ‘আমি যে খুঁজছি সেই হারিয়ে যাওয়া মার্বেলটা। স্বচ্ছ। স্ফটিক কাচের ভিতরে ছিল যার কমলা রঙের হৃদপিণ্ড! আহা কমলা হৃদপিণ্ডের মার্বেল!’ (কমলা হৃদপিণ্ডের মার্বেল)

‘দিনভর চেরাই হওয়ার আগে’ আরশাদ সিদ্দিকীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এমন দুর্দিন-দুর্বিপাকের সময়, এ করোনা আক্রান্ত ন্যুব্জ পৃথিবীতে বইটিকে প্রকাশ করেছে খড়িমাটি। চমৎকার এক প্রচ্ছদে বইটিকে দৃষ্টিনন্দন করেছেন শিল্পী কিংশুক দাশ চৌধুরী। ষাটটিরও অধিক কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে, শব্দে শব্দে জেগে থাকা আরশাদ সিদ্দিকীর জীবনবীক্ষণের চারু অভিজ্ঞানলদ্ধ পুস্তকটি সংগ্রহ করা যাবে একশত ষাট টাকার বিনিময়ে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //