কালোত্তীর্ণ স্মরণীয়-বরণীয়রা

বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহ আহমদ রফিকের। চিন্তার বৈচিত্র্যের প্রকাশ ঘটান বহুমুখী মৌলিক রচনায়, সমৃদ্ধ গ্রন্থ প্রণয়নে। যখন যে বিষয়ে লেখার মনস্থির করেন, তখন সে-বিষয়েই সেরা চিন্তক হয়ে ওঠেন। অভিজ্ঞতা ও পাণ্ডিত্যের মেলবন্ধন ঘটলেই কেবল একজন লেখক খুব সহজেই তাঁর পরিকল্পিত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারেন অভাবনীয় সাবলীলতায়। সম্প্রতি প্রকাশিত আহমদ রফিকের স্মরণীয় বরণীয়: আপন বৈশিষ্ট্য তেমনই একটি গ্রন্থ। গ্রন্থটির নাম দিয়ে যতটুকু চেনা যায়, আদতে তা তার চেয়েও অনন্য এক গদ্যগ্রন্থ। যে-কারও মনে হতে পারে, এটি স্মৃতিগদ্যসমষ্টির একটি বই; কিন্তু সেই পাঠশেষে পাঠকের সেই ভ্রান্তি হিসেবে দূর হবে। সেই সঙ্গে লাভ করবে তৃপ্তির এক অনাবিল আনন্দ। কারণ, এ-গ্রন্থের প্রতিটি রচনায় অমূল্য স্মৃতির পাশাপাশি ধরা পড়েছে ব্যক্তি-মানস এবং তার সৃষ্টির অপূর্ব মূল্যায়ন। যে-কোনো গ্রন্থ আলোচনার আগে সেই লেখকের মনোভূমির সন্ধান অপরিহার্য, তা-ই তুলে এনেছেন আহমদ রফিক। তাঁর পক্ষে এ ব্যতিক্রমী কর্ম সম্পাদন সহজ হয়েছে ব্যক্তিকে দেখার সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। যাঁদের ব্যক্তিমানস ও লেখকসত্তার বিশ্লেষণ তিনি করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকের সঙ্গে আহমদ রফিকের সম্পর্ক ছিল নৈর্ব্যক্তিক ও নির্মোহ এবং শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার।

স্মরণীয় বরণীয় আপন বৈশিষ্ট্যে

লেখক: আহমদ রফিক

প্রকাশক: কথাপ্রকাশ

প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল

মূল্য: ২৫০ টাকা

সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনের অধিকারী ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আহমদ রফিক সময়ের বিভিন্ন বাঁকে সম্পৃক্ত ছিলেন সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং বহুমুখী প্রগতিশীল তৎপরতায়। চিকিৎসাবিজ্ঞান তাঁর অধিত বিদ্যা হলেও পেশা হিসেবে তিনি গ্রহণ করেছেন সৃজনশীল মাধ্যমকে। এর মধ্যে মননশীল সাহিত্য রচনা তাঁকে অন্যদের চেয়ে স্বতন্ত্র স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ লেখক, শ্রেষ্ঠ শিল্পী, শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিশীল মানুষ, যাঁরা নিজেদের কর্ম ও দর্শন দিয়ে সমাজকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন তিনি। লেখালেখি ও সংগ্রামী চেতনা, ব্যক্তিচেতনা ও সৃজনশীন সত্তা যেন অভিন্ন রূপে স্থান পেয়েছে স্মরণীয় বরণীয়: আপন বৈশিষ্ট্যে গ্রন্থে। সেই সময়ের সমাজ-রাজনীতি এবং তা নিয়ে তাঁদের ভবিষ্যৎ-ভাবনা, জীবন থেকে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা ইত্যাদি সম্পর্কে নৈর্ব্যক্তিক পর্যবেক্ষণ স্থান পেয়েছে আলোচ্য এ গ্রন্থে। 

শুরুতেই তিনি লিখেছেন শওকত ওসমান এবং তাঁর শিল্পীসত্তা নিয়ে। ‘জীবনবাদী’ এই কথাশিল্পীর অসাম্প্রদায়িক চেতনা কতটা গভীর ও লড়াকু মনোভাবনা স্থান পেয়েছে তাঁর সাহিত্যকর্মে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় আহমদ রফিকের পর্যবেক্ষণে। তিনি কথা বলেছেন শওকত রাজনৈতিক দর্শন এবং পাকিস্তান আমলে তাঁর অবস্থান নিয়ে। কারণ শওকত ওসমান ‘একজন দক্ষ শৈল্পিক শল্যবিদের মতো তিনি তার সৃষ্ট সাহিত্যকর্মে সমাজ, ধর্মাচরণ, রক্ষণশীলতা, সম্প্রদায়বাদিতাসহ সমাজভুক্ত জীবন নির্মোহ নির্মমতায় ব্যবচ্ছেদ ও বিচার-বিশ্লেষণ করতে সক্ষম।’ যেহেতু শওকত ওসমান সক্রিয় কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না, তাই তিনি চিন্তা চেতনায় যে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন, তা খুব কম লোকেরই জানা; কিন্তু স্পষ্ট করে বলেছেন আহমদ রফিক, ‘সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়েও শওকত ওসমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আবেগের স্রোতে অবগাহন করেছেন।’ এর কারণ, ‘জাতিসত্তার ক্রান্তিকালে তাকে এদিকটাতে মনোযোগী হতে হয়েছে একাধিক জাতীয়তবাদী প্রগতিশীল লেখকের মতো। এটা কারো কারো চোখে তাদের স্ববিরোধিতা মনে হতে পারে; কিন্তু পাকিস্তানি শাসনামলে বাংলা-বাঙালি এমনই এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছিল যে প্রতীকী অর্থেও ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ ভিন্ন প্রগতিবাদীদের জন্যও বিকল্প পথ ছিল না।’ শওকত ওসমান একজন জ্যেষ্ঠ লেখক হওয়া সত্ত্বেও কনিষ্ঠদের সঙ্গেও তাঁর ছিল উদারতার বন্ধন। তাই আহমদ রফিক অনায়াসেই বলেছেন, ‘অসম্ভব স্বচ্ছ মনের মানুষ ছিলেন শওকত ভাই।’ কারণ হিসেবে তিনি একটা বিরল গুণের কথা উল্লেখ করেছেন, ‘ষাটের দশকে প্রকাশিত আমার ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘নাগরিক’-এ নিয়মিত লিখেছেন গল্প।... কোনো গল্প জুতসই মনে না হলে ফেরত নিয়ে দ্বিতীয়বার লিখে দিয়েছেন, কিছু মনে করেননি। এমন লেখক দ্বিতীয় কাউকে দেখিনি, সম্পাদক হিসেবে দেখতে পাইনি, ব্যক্তিজীবনে তো নয়ই।’

গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ অমর কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্কে নিয়ে। প্রবন্ধটিতে আহমদ রফিক অত্যন্ত মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন লেখার দৃঢ়তা ও বাক্যের সুসংহত বিন্যাসের মধ্য দিয়ে। কারণ মাত্র চৌদ্দ পৃষ্ঠার স্বল্পায়তনের এই প্রবন্ধে তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্্র মানস, দর্শন এবং তাঁর সাহিত্যের বিশ্লেষণ সুনিপুণভাবে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশের সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ নতুন বিষয় ও অভিনব ধাঁচের গল্প বলায় যে স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা পরবর্তী সময়ে অনেকেই অনুসরণ করেছেন। আধুনিক সাহিত্য দর্শনতত্ত্বের যে প্রকাশ ওয়ালীউল্লাহ ঘটিয়েছেন, সে সম্পর্কে আহমদ রফিক যা বলেছেন, তা বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর গভীরতার সমান, ‘রচনাশৈলী ও বাক্যবিন্যাসে যেমন পাশ্চাত্য আধুনিকতার প্রকাশ, তেমনি একই সঙ্গে শব্দচিত্র নির্মাণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর দক্ষতা একই মাত্রায় স্বদেশি ও লৌকিক, বিশেষভাবে গ্রামীণ প্রাকৃতরূপের চিত্রণে। সেখানে আবেগ-উচ্ছ্বাস অনপুস্থিত।’

এই কৃতিত্ব গ্রন্থভুক্ত তাঁর অন্যান্য প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও সত্য। এভাবেই তিনি লিখেছেন আহসান হাবীব: ‘নিঃসঙ্গ এক কবি-ব্যক্তিত্ব’, ‘মননের বিচিত্র ছায়াপথে এ কে এন আহমেদ’, ‘অগতির গতি সর্বজনমান্য কবীর ভাই’, ‘ব্যতিক্রমী মার্কসবাদী চিন্তক-লেখক রণেশ দাশগুপ্ত’, ‘সত্যেন সেন: তার স্বপ্নের বৈষম্যহীন সমাজ’, ‘মৃত্যু নেই শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের’, ‘সুফিয়া কামাল: নারীমুক্তি ও সমাজ পরিবর্তনের ব্রতযাত্রায়’, ‘মত ও পথের দ্বন্দ্বে বিষণ্ন রাজনীতিক আতাউর রহমান,’ ‘ইলিয়াস: তার জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাস’ শীর্ষক প্রবন্ধসমূহ। পাশাপাশি নির্মোহভাবে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দিয়েছেন ‘নানা দ্বন্দ্বের রাজনীতিতে মিসফিট বন্ধু আফসার সিদ্দিকী’, ‘একাত্তরে শহিদ বন্ধু ডা. আলীম চৌধুরী’, ‘উগ্র মতাদর্শের ভাষাসংগ্রামী বন্ধু আলী আজমল’, ‘স্বাস্থ্যসেবা ব্রতে অগ্রণী ব্যক্তিত্ব ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম’ নামের প্রবন্ধে। উল্লেখিত প্রবন্ধের সমষ্টি নিয়ে গ্রন্থটি প্রণীত হলেও আহমদ রফিক এখানে তুলনামূলক অনালোচিত সৃজনশীল ব্যক্তিদের তুলে এনে যে সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তা অতুলনীয়। যেহেতু সমকালে তাঁদের প্রত্যেকেই বিভিন্নভাবে সমাজে-সংস্কৃতিতে নিজ নিজ গুণে অবদান রেখেছিলেন, তাই নানা বৈচিত্র্যের আলোয় গ্রন্থটিতে এক অভিন্ন মেলবন্ধনও লক্ষ করা যায়। ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার ক্যানভাসে পরিকল্পিত হলেও গ্রন্থটি ব্যক্তিসম্পর্কের চেয়ে ঢের উঁচুতে আসীন লাভ করেছে। বিশেষত চল্লিশের দশকের অন্যতম সেরা লেখক, চিন্তক, বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে ধারণা পেতে নতুন প্রজন্মের পাঠকের জন্য গ্রন্থটির পাঠ অত্যন্ত জরুরি। কারণ, বাংলাদেশের সতেরোজন কৃতীর ব্যক্তিজীবন ও সৃজনশীল জীবনকে নিয়ে প্রণীত এ-গ্রন্থের প্রতিটি প্রবন্ধই তাঁদের ব্যক্তিসত্তা ও লেখকসত্তার পাশাপাশি এক অস্থির সময়ের সমাজচিত্রকেও উন্মোচিত করেছে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //