ই-কমার্সে ভ্যাট নিয়ে শুভঙ্করের ফাঁকি

বিভিন্ন দোকান ঘুরে, যাচাই করে কেনাকাটার চল এখনো আছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে ইন্টারনেটভিত্তিক ই-শপিং বা অনলাইনে কেনাকাটা। বই, পোশাক, চাল-ডাল-সবজি থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিকস পণ্য- সবই মিলে খুব সহজে। ব্যস্ততার কারণে অনেকেরই দোকানে গিয়ে কেনাকাটার খুব একটা সময় হয়ে ওঠে না। যানজট আর ভিড় ঠেলে মার্কেটে যেতেও ইচ্ছা করে না কারও কারও। তাদের কাছে ভরসার নাম অনলাইন শপিং। বেশ কয়েক বছর ধরেই বিকিকিনির এ ধারাটি আমাদের দেশে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রথমে এটি রাজধানীকেন্দ্রিক থাকলেও চাহিদা বাড়ায় এখন সারাদেশেই ছড়িয়ে গেছে। নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য চলে আসছে নিজের ঠিকানায়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে করা যায় মূল্য পরিশোধ। ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতিতে বা গ্রাহক পণ্য হাতে পাওয়ার পরও দাম মেটানোর সুযোগ রয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে, ইন্টারনেটের কল্যাণে পুরো বাজারটাই যেন হাতের মুঠোয়! তার ওপর ভর করে দেশের উন্নয়নে বড় ধরনের অবদান রাখছে ‘ডিজিটাল অর্থনীতি’। 

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গত বছরের তথ্যানুযায়ী, অনলাইন শ্রমশক্তির সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী হচ্ছে ভারত, যাদের প্রায় ২৪ শতাংশ গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সার ওয়ার্কার। এর পরের অবস্থানটিই বাংলাদেশের। করোনাকালে দেশের সীমানা বন্ধ থাকলেও অনলাইনে তারা কাজ করেছেন বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। আউটসোর্সিং ছাড়াও শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানেও ইন্টারনেটভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং ও ব্যবসা অবদান রাখছে এ সময়ে; কিন্তু বছরের মধ্যমণি জুন এলেই চারদিকে বিরাজ করে চাপা উত্তেজনা। নানা রকমের চুলচেরা বিশ্লেষণ, হিসাব-নিকাশ, আলোচনা আর সমালোচনা। এ মাসেই যে পেশ এবং পাস হয় জাতীয় বাজেট! দাম বাড়ে-কমে নানা পণ্যের। যদিও করোনাভাইরাস তাণ্ডবে এ বছরের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। বাজেটকে ঘিরে নেই আগের বছরগুলোর মতো সেই উত্তেজনা। ভিন্ন মাত্রায়, নতুন আঙ্গিকে কিছু আলোচনা হচ্ছে কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই। অবশ্য শুল্কের খড়গ নামছে সেখানেও, দাম বাড়ছে এর চালিকাশক্তি ইন্টারনেটের। 

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে মোবাইল ফোনে সিমের মাধ্যমে দেওয়া সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এর ফলে বাড়তি শুল্কে মোবাইল গ্রাহককে কথা বলায় ও ইন্টারনেট ডাটায় বেশি টাকা খরচ করতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তথ্য-প্রযুক্তি খাতের লোডেড পিসিবি (প্রিন্টার সার্কিট বোর্ড), আনলোডেড পিসিবি এবং রাউটারের ওপর ৫ শতাংশ মূসক আরোপ করা হয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়বে। সেই সঙ্গে অনলাইন স্পেস ব্যবহারকারীর মাধ্যমে শেয়ারড ইকোনমি থেকে আয়কারীদের করদাতা শনাক্তকারী নম্বর (টিআইএন) গ্রহণে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে নতুন বাজেটে। দেশের অধস্তন আদালতগুলোকে আইসিটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনার লক্ষ্যে ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিটি আদালতকে ই-কোর্ট রুমে পরিণত করা হবে। এ ছাড়াও প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করে বাজেট বক্তব্যে মুস্তফা কামাল বলেন, অচিরেই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুটি করে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরসহ ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া হবে। অথচ সবকিছুর মূলে যে ইন্টারনেট, সেটার দামই বেড়ে যাবে সংশ্লিষ্ট পণ্যে শুল্ক আরোপে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, প্রতি ১০ শতাংশ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ১.৩৮ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি ঘটে। আর প্রতি ১ হাজার ব্রডব্যান্ড সংযোগের মাধ্যমে প্রায় ১০ কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থান হয়; কিন্তু বিষয়টি বাজেটে উপেক্ষিত থেকেছে। 

ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন আইএসপিএবি মহাসচিব ইমদাদুল হক বলেন, ‘বাজেটের আগে আমরা সরকারের কাছে তিনটি দাবি জানিয়েছিলাম, ইন্টারনেট সেবাকে আইটিইএস সেবার অন্তর্ভুক্তি; আইটিসি, আইআইজি, এনটিটিএন ও আইএসপির প্রতিটি স্তরেই ভ্যাট সমান ৫ শতাংশ করার পাশাপাশি যে ইক্যুইপমেন্ট দিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে সেবা দেই, সেই ওএনইউ বা ওএলটির ক্ষেত্রেও ভ্যাট ৫ শতাংশ করা; কিন্তু এর একটি দাবিও পূরণ হয়নি। তাই এ অবস্থায় আমাদের কারোরই ইন্টারনেট মূল্য বাড়ানো ছাড়া কোনো গতি নেই।’

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব মহাসচিব অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ফরহাদ বলেন, ‘করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সময় মোবাইল ও ইন্টারনেটই যোগাযোগের মূল মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এ রকম সময় করের বোঝা অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘জিডিপিতে এ খাতের অবদান ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে দুই অংকের ঘরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল আমাদের; কিন্তু সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোয় দেশকে ডিজিটাল ইকোনমির দিকে নিয়ে যাওয়ার মূল চালিকা শক্তি হিসেবে এ খাতটি আরো ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে মোবাইল কোম্পানিগুলোর ব্যবসাও।’

এ বিষয়ে ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের সংগঠন ই-ক্যাব সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, ‘করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে এখন বাসায় বসেই মানুষ অনলানইনে কেনাকাটা করছেন। অফিসও করছেন ঘরে বসে। ব্যবসা করছেন অনলাইনে। শিক্ষাও দেয়া হচ্ছে অনলাইনে। তাই ইন্টারনেটের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জনজীবনে স্বাভাবিকভাবে একটা প্রভাব পড়বে। যেহেতু মানুষের আয়-ক্ষমতা করোনাকালে কমে গেছে। তাই অনলাইন ডেলিভারিতে খরচ না কমালে এবং ইন্টারনেট ব্যয় বাড়লে ই-কমার্স খাতও বাধাগ্রস্ত হবে।’

দেশে বর্তমানে অনলাইন কেনাকাটায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে ‘দারাজ ডটকম’। সম্প্রতি ইভ্যালিও নিজেদের জানান দিচ্ছে বেশ। আছে বিক্রয় ডটকম, চাল-ডাল ডটকম, অথবা ডটকম, প্রিয় শপ, আজকের ডিল, স্বপ্ন, মীনা ক্লিক, বাগডুম, পিকাবো, রকমারিসহ আরো অনেক সাইট। প্রতিদিন কয়েক লাখ ক্রেতা এসব সাইটে বিভিন্ন পণ্যের খোঁজ করেন। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের দেয়া হিসাব মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ই-কমার্স খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৫ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লেনদেন ছিল প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে এটির আকার ছিল এক হাজার ৬০০ কোটি। আর সে কারণেই বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতে নজর পড়েছে বৈশ্বিক জায়ান্টদের। আলিবাবা, আমাজনসহ আরো কয়েকটি খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এখানে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগ্রহ দেখাচ্ছে ভারতীয় ফ্লিপকার্টসহ আরো কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে দারাজ ডটকম কিনে নিয়েছে আলিবাবা। আরো কিছু ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানও অধিগ্রহণ করতে পারে চীনের প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশেরও সিংহভাগ মালিকানা কিনেছে আলিবাবা, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটা বড় সুখবর; কিন্তু ইন্টারনেট খরচ বেড়ে যাওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এ খাতে।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আজকের ডিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘সা¤প্রতিক একটি জরিপ অনুযায়ী, দেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর মাত্র ১১ ভাগ অনলাইনে কেনাকাটা করেন। যেখানে ভারতে এ হার ৪০, ইন্দোনেশিয়ায় ৩০ আর চীনে ৮০ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশে ই-কমার্সের মাঠ প্রায় খালি পড়ে আছে। আগামী তিন থেকে চার বছরে লেনদেন ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা সম্ভব। এ জন্য অবশ্য ইন্টারনেট ও ডেলিভারি সিস্টেমের সমস্যা সমাধান করতে হবে।’

ই-কমার্স খাতে গত কয়েক বছরে প্রায় ২০ হাজার দেশীয় উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। কেউ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিক্রি করছে। কেউ ফেসবুকের মাধ্যমে বিক্রি করছে। এই উদ্যোক্তারা প্রচুর কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে। ই-ক্যাব সাধারণ সম্পাদক তমাল জানান, দেশে প্রায় দুই হাজার ই-কমার্স সাইট এবং ৫০ হাজার ফেসবুকভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন দেশের মধ্যে ডেলিভারি হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার পণ্য। অনলাইনে বিক্রি হওয়া পণ্যের ৮০ শতাংশ যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরে। এ খাতকে নিয়মের মধ্যে আনতে সরকার ২০১৮ সালে জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা করেছে। একটি আলাদা সেবা কোডে অনলাইন কেনাকাটাকে অন্তর্ভুক্ত করে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখা হয়েছিল। এখন সেখানে অন্য একটি সেবা ঢুকে পড়েছে।

এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব) বিজ্ঞাপনের ওপর উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন দিলে খরচ বাড়বে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে এসব প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপনের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে এ ধরনের বিজ্ঞাপনের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর আরোপ করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধের সময় ব্যাংককে ভ্যাট ও উৎসে কর কেটে রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আর ফেসবুক ও ইউটিউবের বিজ্ঞাপন-ব্যবসায় করারোপে নতুন যে আলাদা খাত সংজ্ঞায়িত হলো, সেখানে ই-কমার্সও ঢুকে গেছে। যদিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনলাইন কেনাকাটায় এবরো ভ্যাট আরোপ করা হয়নি।

আবার করোনাভাইরাসের এ সময়ে মানুষ বেশিরভাগ সময়ে ঘরে থাকায় অনলাইনভিত্তিক অনেক কাজের সঙ্গেই জড়িয়েছেন। যারা রান্না-বান্নায় পারদর্শী, তারা বিভিন্ন রেসিপির ভিডিও তৈরি করে টাকা কামাচ্ছেন অনলাইন থেকে। হাতে তৈরি অবজেক্ট, বই রিভিউ, মন্তব্য, ভিডিও গেম, ফটোগ্রাফি, চিত্রকলা, থ্রিডি প্রিন্টার ডিজাইন, সংগীত, আবৃত্তি এবং আরও অনেক ধরনের কনটেন্ট বানিয়েও ইউটিউব কিংবা ফেসবুক থেকে আয় করছেন কেউ কেউ; কিন্তু ইন্টারনেট ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হয়েছেন অনেকেই। 

মিরপুরের বাসিন্দা নাঈমা ফেরদৌস বলেন, ‘করোনাভাইরাসের এই সময়ে ছেলে-মেয়েদের স্কুল বন্ধ। তাই আমার সময় কাটানোর অন্যতম প্রধান কাজ ছিল ইউটিউবে ভিডিও দেখে নতুন নতুন রেসিপি রান্না করা; কিন্তু ইন্টারনেট খরচ বেড়ে গেলে তো আর সেটা সম্ভব নয়। তা ছাড়া এবারের ঈদে সবার কেনাকাটাও করেছি অনলাইনে। এখন শুনলাম নতুন বাজেটে অনলাইন কেনাকাটায় খরচ বাড়ছে। তাহলে তো মহাবিপদ। কেননা সরকার একদিকে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করছে, অন্যদিকে ইন্টারনেটের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটা বাস্তবতার সঙ্গেও সম্পূর্ণ বিপরীত। স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //