সয়াবিনকে টেক্কা দিচ্ছে সরিষার তেল

সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারে সরিষার তেলের চাহিদা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অনেকে রান্নায় এখন এই তেল ব্যবহার শুরু করায় বাজারে সরিষা তেল সয়াবিনকে টেক্কা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন অনেকেই।

সম্প্রতি রাজধানীর কাওরানবাজার, হাতিরপুল বাজার, গাবতলি, উত্তরা, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ও ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে এই তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, বিদেশ নির্ভর সয়াবিনের তেলের বাজার প্রায় সবসময়ই নানা কারণে অস্থির থেকেছে। কখনো বিদেশি যুদ্ধ, কখনো দেশের ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে ঘটেছে এসব ঘটনা। এর সবশেষ ঘটনা ঘটেছে গত কয়েকদিনে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের জেরে হঠাৎ করেই বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। আর এই সময়েই দেশের মানুষ ফের নজর ফিরিয়েছে ঐতিহ্যবাহী সরিষা তেলের দিকে।

ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে বর্তমানে দেশীয় সরিষার তেল পাওয়া যাচ্ছে ২৪০ টাকা লিটারে। আর বোতলজাত সরিষা তেল বিক্রি হচ্ছে রাঁধুনি লিটারে ৩৫০ টাকা।

কৃষি অধিদপ্তর জানায়, ২০১৮-১৯ মৌসুমে দেশে পাঁচ লাখ সাত হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদিত সরিষার পরিমাণ ছিল সাত লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭৩৭ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। হেক্টরে ১.৩৬ টন গড় ফলন হিসাবে প্রায় আট লাখ টন সরিষা উৎপাদিত হয়েছে। প্রতিবছর ৩.৫ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে ২০৩০ সালে দেশে মোট সরিষা উৎপাদিত হবে প্রায় ৪৬ লাখ ৬৩ হাজার মেট্রিক টন, যা থেকে প্রায় ১৬ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন তেল পাওয়া যাবে।

কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, একেতো সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে। আরেকদিকে যোগান নেই। এখন মানুষেরা সরিষা তেল কিনে নিচ্ছেন। আমি নিজেও বাসায় এই তেল খাওয়া শুরু করেছি। এভাবে চলতে থাকলে সয়াবিনকে টেক্কা দেবে সরিষার তেল।

সাভারের নামা বাজারের তেল ব্যবসায়ী হোসেন আলী বলেন, আমরা এখানে খাটি তেল উৎপাদন করি। আগের তুলনায় দ্বিগুণ তেল বিক্রি করতে পারছি। অগ্রিম অর্ডারও পাচ্ছি।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের উপপ্রকল্প সমন্বয়ক ড. রেজা মোহাম্মদ ইমনের দাবি, দেশের ২২ লাখ হেক্টর পতিত (দুই ফসলের মাঝের) জমিতে যদি বিনাসরিষা-৪ ও বিনাসরিষা-৯ আবাদ করা যায়, তাহলে বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানি সাশ্রয় করা সম্ভব।

এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশে ২২ লাখ হেক্টর জমি পতিত আছে (দুই ফসলি জমির মাঝের সময়ের)। আমন আর বোরোর মাঝে যদি আমরা এই পতিত জমি চাষের আওতায় আনতে পারি, তাহলে বছরে তেলের উৎপাদন আট থেকে ১০ লাখ টন বাড়বে। এতে এখন যে ১৭ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানি করতে হয়, সেটা আর আমদানি করতে হবে না। এখন থেকে ধারাবাহিক উদ্যোগ নিলে সেটি বাস্তবায়ন সম্ভব। ’

ভোজ্য তেল চাহিদার যেহেতু ৮০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর, তাই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে উৎপাদন না বাড়ালে বিপদে পড়তে হবে। এই পরিস্থিতিতে ভোজ্য তেলের আমদানিনির্ভরতা কমানোর কৃষি বিভাগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। 

মন্ত্রী বলেন, ‘সরিষার আবাদ বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোজ্য তেলের আমদানির্ভরতা কমাতে কাজ চলছে। আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ভোজ্য তেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হবে।’

বাংলাদেশে ভোজ্য তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এই তেলের মধ্যে রয়েছে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, সরিষার তেল, সানফ্লাওয়ার অয়েল এবং রাইসব্রান তেল। এর মধ্যে সয়াবিন তেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি, যার মধ্যে দেশে উৎপাদন শুধু ২০ শতাংশের মতো।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //