দ্রুত কমছে রিজার্ভ

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে নতুন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আবারও মন্দার কবলে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই শঙ্কার মধ্যে রয়েছে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোও।

বৈদেশিক মুদ্রা, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের বিনিময় হারের টালমাটালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ অঞ্চলের ৮টি উদিয়মান দেশের মধ্যে ৬টি দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে। রিজার্ভ কমার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রিজার্ভ দ্রুত কমে যাচ্ছে। এদিকে রিজার্ভ কমানো ঠেকাতে আমদানি কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও খুব বেশি ইতিবাচক ফল আসছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানির তুলনায় রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে।

এশিয়া মহাদেশের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ। এ অঞ্চল সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ‘ফিচ’ তাদের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করেছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫৯০ বিলিয়ন ডলার কমেছে। চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত সময়ে এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি চীন, সিঙ্গাপুর ও জাপানের রিজার্ভ সবচেয়ে বেশি সংকুচিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রিজার্ভ কমেছে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ডেরও। 

বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে রিজার্ভ পরিস্থিতি জানা গেছে। চলতি বছরের আগস্ট শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের আগস্ট শেষে রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের রিজার্ভ কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। প্রতিযোগী অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি হারে রিজার্ভ কমছে বাংলাদেশের। ২০২১ সালের আগস্টে রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে রিজার্ভের পতন হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যে উৎপাদনমুখী কারখানা বন্ধ থাকায় আমদানি ব্যয় অনেক কম ছিল। সেই সময় রেমিট্যান্স দ্রুত বাড়ে। এজন্য রিজার্ভও বাড়তে থাকে। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কম থাকায় বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের দুয়ার আবার খুলে যায়। তখন প্রতিবন্ধকতা আসে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে। এই যুদ্ধের কারণে নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞায় বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রভাব পড়ে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের সবধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। জ্বালানি তেল, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয় ব্যাপকহারে বেড়েছে। এর প্রভাবে কমেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। 

বাংলাদেশের রিজার্ভ এ অঞ্চলের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ হাজার ৫৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশের রিজার্ভ মাত্র ৩৯ বিলিয়ন ডলার। 

ইন্টারনেটে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২১ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত চীনের রিজার্ভ কমেছে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ২৩২ বিলিয়ন ডলার, চলতি বছরের আগস্টে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৫ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ভারতের রিজার্ভ ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ কমেছে। ভারতের রিজার্ভ ৫৭৮ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে হয়েছে ৫৬১ বিলিয়ন ডলার। এশিয়া অঞ্চলের উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডের রিজার্ভ ২৩১ ডলার থেকে প্রায় ৭ শতাংশ কমে হয়েছে ২১৫ বিলিয়ন ডলার। ভিয়েতনামের রিজার্ভ প্রায় ৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১০১ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের আগস্টে দেশটির রিজার্ভ ছিল ১০৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় ফিরেছে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া। ইন্দোনেশিয়ার রিজার্ভ দেড় শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৩২ বিলিয়ন ডলার। মালয়েশিয়ার রিজার্ভ ১০৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০৮ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার রিজার্ভ ৪৩৯ থেকে সামান্য কমে হয়েছে ৪৩৬ বিলিয়ন ডলার। 

রিজার্ভ কমার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, স্থিতিশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার দিক থেকে অনেক বেশি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এ কারণে বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের সময়ে ওইসব দেশের জনগণকে চড়া মূল্য দিতে হয়নি। কিন্তু সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলো গত কয়েক বছর উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতি রেখে ডলারের দাম সমন্বয় করার দরকার ছিল। কিন্তু সেটি না করে টাকার শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখা হয়েছে। এ কারণে গত ছয় মাসেই টাকার ২৩ শতাংশের বেশি অবমূল্যায়ন হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এত বড় অভিঘাত নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে রিজার্ভ চাপে পড়েছে। প্রতিনিয়ত রিজার্ভ কমছে। রিজার্ভ ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে কিন্তু সংকট উত্তরণে কাজ করছে না। আমদানির উপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। বিলাসী পণ্য আমদানি করাই যাবে না। তা না হলে রিজার্ভ সংকট উত্তরণ সম্ভব নয়।

গত এক বছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ধারাবাহিকভাবে ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুধু গত অর্থবছরেই (২০২১-২২) রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা হয় ৭৪০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরেও এখন পর্যন্ত রিজার্ভ থেকে ২৮০ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়েছে। অব্যাহতভাবে ডলার বিক্রি করায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অন্তত ১১ বিলিয়ন ডলার কমে গিয়েছে। এ অবস্থায় রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির নীতি থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলারের বিনিময় হার বাজার পরিস্থিতির উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

ডলারের বিনিময় হার বাজারের উপর ছেড়ে দেওয়ায় একদিনেই ইতিহাসের সর্বোচ্চ দরপতন দেখেছে বাংলাদেশি মুদ্রা। একদিনের ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে ১০ টাকা। ২০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের রেট ছিল ৯৬ টাকা। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমাদানি মূল্য পরিশোধে গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি ডলারের মূল্য নিচ্ছে ১০০ টাকা ৮৭ পয়সা। অন্যদিকে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের বিপরীতে প্রতি ডলার কিনছে ৯৯ টাকা ৮৭ পয়সা। তবে ব্যাংকভেদে এই দাম কমবেশি হচ্ছে। আবার খোলা বাজারে নগদ ডলার বিক্রি হচ্ছে ১১৩ টাকা থেকে ১১৪ টাকায়। 

রিজার্ভের পরিমাণ কমে এলেও দেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েই চলছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিদেশি উৎস থেকে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৪১ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ১১৭ কোটি ডলার। চলতি বছরের মার্চ শেষে বিদেশি এ ঋণের পরিমাণ ৯৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় বিদেশি ঋণের পরিমাণ ৯ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিদেশি এ ঋণ দেশের মোট জিডিপির প্রায় ২১ শতাংশ। বিপুল অঙ্কের এ ঋণের ৭৩ শতাংশই সরকারের। বাকি ২৭ শতাংশ ঋণ নিয়েছে দেশের বেসরকারি খাত।

এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্বাভাবিক করতে গত এক বছর ধরেই বিভিন্নমুখী উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন পর্যন্ত এসব উদ্যোগের সুফলও পাওয়া গিয়েছে। এ কারণে রিজার্ভের উপর চাপও কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিনিময় হার বাজারের উপর ছেড়ে দিয়েছে। রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির নীতিও কঠোর করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি ডলারের চাপ কমিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে বলেও মনে করছেন তিনি।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //