ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার বিতর্কে টিএসসি

টিএসসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষককেন্দ্র। টিএসসি বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতিচর্চার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। 

তবে সম্প্রতি টিএসসির বর্তমান স্থাপনা ভেঙে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। তারপর থেকেই এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা হচ্ছে। 

টিএসসির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সৈয়দ আলী আকবর বলেন, ‘ষাটের দশকে নির্মিত টিএসসির দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাটির নতুন রূপ কেমন হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’ তবে পরিবেশবিদ ও শিক্ষাবিদরা টিএসসির নতুন নকশার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষের কাছে।

টিএসসির নকশা করেছিলেন গ্রিক স্থপতি কনস্ট্যান্টিন ডক্সিয়াডেস। ষাটের দশকের শুরুতে তিনি নান্দনিক এই স্থাপনার নকশা করেন। ভবনটি নির্মিত হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ূব খানের সময়ে ১৯৬৪ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সুন্দর কয়েকটি স্থাপনার মধ্যে রয়েছে কার্জন হল, টিএসসি ও সলিমুল্লাহ হল। তবে দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে টিএসসিই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তো বটেই, এমনকি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও এখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত রয়েছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও অন্যান্য দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নানা উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুও এই টিএসসি।

সম্প্রতি দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান লিখেছেন, ‘এ রকম একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সৌন্দর্য নষ্টের প্রথম ধাক্কাটি আসে এর পাশ দিয়ে মেগা প্রজেক্ট মেট্রোরেল স্থাপনা যাওয়ার মাধ্যমে। দ্বিতীয় ধাক্কাটি আসে, যখন শুনতে পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ভবনটিকে ভেঙে তার স্থলে একটি আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হবে। এ রকম একটি সংবাদে বর্তমান ও সাবেক ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক শঙ্কা তৈরি হয়।’ 

লেখার আরেকটি অংশে তিনি বলেন, ‘টিএসসি ভেঙে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ একদমই উচিত হবে না। আমাদের যদি খরচ করার মতো টাকা থাকে, তাহলে এর চেয়ে আরো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমাদের রয়ে গেছে। এমনিতেই মেট্রোরেলের কারণে এর সৌন্দর্য অনেকটা ঢাকা পড়বে। এবার সুউচ্চ বা বহুতল ভবন তৈরি করলে এর নান্দনিকতা ও ঐতিহ্য কোনোটিই থাকবে না।’

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘টিএসসি একটি আবেগের জায়গা। এখানে দেশের মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতিচর্চার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। শুধু আইয়ুব সরকারের আমলে তৈরি হয়েছিল বলে এটিকে নতুন রূপে গড়ে তুলতে হবে, তা মোটেও সমীচীন নয়। ঐতিহাসিক আবেদনটি হারিয়ে যাবে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করব পুনঃনকশা করার আগে বিষয়টি আরেকবার ভাববার জন্য।’

পরিবেশবাদী আইনজীবীদের সংগঠন বেলার নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘টিএসসির সামাজিক-রাজনৈতিক ঐতিহ্য আছে। এটি ভেঙে না-কি এখন বহুতল ভবন বানানো হবে! রাজধানীর এই নাগরিকজীবনে একটু খোলা মাঠে বসে প্রাণখোলা আড্ডা দেয়ার মতো তেমন কোনো পরিচ্ছন্ন জায়গা নেই। এদিক থেকে টিএসসিকে অনেকেই আড্ডার জন্য নিরাপদ মনে করেন। সবুজ মাঠ আর গাছগুলো, লম্বা করিডর সবকিছু মিলিয়ে এখানে আসলে স্বস্তি লাগে সবার। এই ভবনটি এখন ভেঙে ফেলার প্রস্তাব এসেছে। এমনিতেই মেট্রোরেল দিয়ে টিএসসির সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি চোখে ভাসছে, আর এখন বহুতল ভবন গড়ে তুলে টিএসসিকে নতুন অবয়ব দিলে সবুজ মাঠ আর গাছ গাছালি অর্থাৎ নাগরিক পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, “নানা কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রটি (টিএসসি) আমার চিরকালের প্রিয়। স্থাপত্যকলার নান্দনিক এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এই দুইয়ে মিলে টিএসসির সৌন্দর্যকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে, ভেতরে সবুজ ঘাসে ঢাকা টিএসসির যে মাঠটি রয়েছে, তার সম্মোহনী শক্তি প্রবল। টিএসসিকে ঘিরে আমাদের যে কত স্মৃতি! মাঠের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে রয়েছে গ্রিক? আর্কিটেকচারাল ডিজাইনের একটি সমাধি। ওই সমাধিতে যিনি চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন, তিনি কি গ্রিক, রোমান, পর্তুগিজ, না হুন? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ আমাকে দিতে পারেনি। সমাধিতে যে হরফে এপিটাফ লেখা সেটি কোন হরফ? গ্রিক না রোমান? সেটি কেউ সঠিক জানে না। সবুজ ঘাস পেরিয়ে যে ক্যাফেটেরিয়াটি রয়েছে, তার সৌন্দর্যেরও জুড়ি মেলা ভার। আর সুইমিংপুল, ফোয়ারা, গেমস রুম, অডিটোরিয়াম ইত্যাদি স্থাপত্যের নান্দনিক সৌন্দর্য। নতুন সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করার অনুরোধ করা হলো। ‘হেরিটেজ’ বলে যে একটি শব্দ আছে এবং তা যে সযত্নে বুক দিয়ে আগলে রাখতে হয়, তা কি আমাদের অজানা?”

তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বের সব বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়কে ছবি দেখেই চেনা যায় কিছু ঐতিহ্য ধারণ করা স্থাপনার মাধ্যমে। শত শত বছরের পুরনো হয়ে গেলেও এগুলো সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন স্থাপনার মধ্যে আছে কার্জন হল, এসএম হল ও টিএসসি। এর মধ্যে টিএসসি ষাটের দশকে নির্মিত অপেক্ষাকৃত আধুনিক স্থাপত্যের একটি সুন্দর নিদর্শন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্ববর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের ঐতিহ্য ধারণ করে এই টিএসসি। রক্ষণাবেক্ষণের বদলে এটিকে ভেঙে এখন বহুতল ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা চলছে। এখন যে সূত্র ধরে এটি ভাঙার কথা বলা হচ্ছে, সে সূত্র ধরে আমাদের দৃষ্টিনন্দন সংসদ ভবন, কমলাপুর রেলস্টেশন, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, মিন্টো রোডের সরকারি অতিথি ভবনগুলোও ভেঙে ফেলতে হবে।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh