উপাচার্যদের দুর্নীতির কি প্রতিকার নেই!

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

উপাচার্য শব্দটা সামনে এলেই প্রথমে মনে পড়ে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের কথা, যাকে আমরা পিসি চন্দ্র হিসেবে চিনি। আচার্য একটা শক্তিশালী পদ। অত্যন্ত শক্তিশালী ও মর্যাদাসম্পন্ন। সেই মর্যাদাসম্পন্ন পদটির এবং উপাচার্য অর্থাৎ আচার্যের ঠিক পরের সম্মানটির দফারফা হয়ে গেছে বাংলাদেশে।

রাজনৈতিক বশ্যতা মানার সম্মতিজনিত নিয়োগ, সরকারের তোষণগিরি আর ব্যক্তিগত লাভালাভির ন্যক্কারজনক খেয়োখেয়িতে এই সম্মানজনক পদটি কেবল টিকে আছে, সম্মান উবে গেছে। আজকের বাংলাদেশে এই সত্যটি আর কাউকে পাত পড়িয়ে বোঝাতে হয় না। পত্র-পত্রিকায় হরহামেশা এ নিয়ে রিপোর্ট হতে হতে এই পদটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে রীতিমতো ঘৃণা জন্মেছে। কেন এমন হলো?

কারণ আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা। জগতের প্রত্যেকটি মানুষ ভুল করতে পারে। করেও। সেই ভুল শোধরানোর জন্য তার ওপর আইন প্রয়োগ করা হয়। আইনত অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হবে- এটা গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান বিষয়, অথচ বাংলাদেশের উপাচার্যরা কোনো এক জাদুমন্ত্র বলে দেশের প্রচলিত আইনের আওতার বাইরে! এটা কি আইনই তাদেরকে ‘সম্মান’ দেখিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখেছে? না। তারা দেখে দেখে শিখেছেন। বাংলাদেশের আমলাদের শত শত অপরাধ ও দুর্নীতির কোনো বিচার হয় না। 

এখন কোনোভাবে কি উপাচার্য মহাশয়রা সেই ধনন্তরী ফর্মুলা রপ্ত করতে পেরেছেন? হয়তো পেরেছেন। তা না হলে একজন উপাচার্য আর ১০টা সাধারণ ক্রিমিনালের মতো অপরাধ করেও পার পেয়ে যান কীভাবে? উপাচার্য মহাশয়রা কী কী অপরাধ করেন?

প্রথমত, অযোগ্যতা, যিনি তার যোগ্যতা, বিদ্যা-বুদ্ধি আর সার্টিফিকেট দিয়ে বড় জোর একজন প্রভাষক হতে পারতেন; কিন্তু তাকেই উপাচার্য পদে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার দেখে নেওয়া যাক এসব আলোচিত উপাচার্যগণের আমলনামা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব দেন উপাচার্য। উপাচার্যকে হতে হয় একাডেমিক ‘আইকন’ এবং প্রশাসনিকভাবে দক্ষ ও যোগ্য; কিন্তু এ দিকটিতে নজর না দিয়ে রাজনৈতিকভাবে তদবিরের ওপর ভিত্তি করে দলীয় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ায় অধিকাংশ উপাচার্য নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে একাডেমিকভাবে এগিয়ে নিতে পারেন না। প্রশাসনিক ও একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে খুব কমসংখ্যক উপাচার্যই নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

দলীয় স্বার্থে ভূমিকা পালন করতে গিয়ে অধিকাংশ উপাচার্য শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিতে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। এ অবস্থায় শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি পেশাদারি প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় তার মূল জায়গা থেকে (জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা, জ্ঞান বিতরণ এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি) অনেকটাই বিচ্যুত হয়ে পড়বে- এটাই স্বাভাবিক। ২০১০ সালের দিকে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নির্দেশে বেশ কয়েকজন উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত করা হলে, ওইসব উপাচার্যের দুর্নীতির সত্যতা প্রমাণিত হয়; কিন্তু সরকার তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেন। অনেকটা পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে লাইনে প্রত্যাহার করার মতো।

একই অবস্থা হয়েছিল চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-০৬)। তখন আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে এবং দুর্নীতির সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায়, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাদের অপসারণ করা হয়। আবার বর্তমান সরকারের আমলে উপাচার্য হিসেবে দুর্নীতির তকমাধারী শিক্ষককে পরবর্তী সময়ে বড় পদে নিয়োগ দেওয়ারও ভুরি ভুরি নজির আছে। 

সম্প্রতি ইউজিসি ২১ জন উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত শুরু করে। এর মধ্যে ১৩ জন উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হয়েছে। বাকি ৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। শেষোক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে : খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

যে ২১ জন উপাচার্যের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে ইউজিসি, গণমাধ্যম বলছে, বেশিরভাগের বিরুদ্ধেই মূল অভিযোগ নিয়োগে দুর্নীতি। শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে দুর্নীতি যত সহজে চোখে পড়ে, উপাচার্য নিয়োগে ‘অন্য’ বিবেচনা কি ততটা আলোচনায় আসে? 

সাম্প্রতিককালের দুটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়- প্রথমটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের। ২০১২ সালের ঘটনা। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির। ৯ জানুয়ারি ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদ খুন হন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে। ছাত্রলীগের এই নেতা-কর্মীরা তখন ‘উপাচার্যপন্থি’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। 

এরপর থেকেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একটি অংশ আন্দোলন শুরু করেন উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে। অন্য একটি অংশ অবস্থান নেন উপাচার্যের পক্ষে। ঘটনা এতটাই তিক্ত হয়ে ওঠে যে, সাংস্কৃতিক জোটের আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলাতেই কেবল ঘটনা থেমে থাকেনি, হামলা হয়েছে শিক্ষকদের ওপরও। এমনকি শিক্ষকদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। 

তখনই আন্দোলনের এক পর্যায়ে উপাচার্যের বাসভবনের একটি গেটে অবস্থান নিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করেন আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা, অন্য গেটে তাকে মুক্ত চলাচলের ব্যবস্থা করে দিতে অবস্থান নেন তার পক্ষের শিক্ষকেরা। সংবাদ সংগ্রহে গেলেও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার সুবাদে অনেক পরিচিত মুখই দুই পক্ষেই ছিলেন।

রাবির এম আব্দুস সোবহানের কাণ্ড তো ধনন্তরী বিদ্যার মতো! প্রথম মেয়াদে নিয়োগ পেয়ে করেছিলেন স্বজনপ্রীতি। মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে চাকরি দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ কর্মদিবসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদে ১৪১ জনকে অস্থায়ী নিয়োগ দিয়ে যান রাবির এই উপাচার্য। এই নিয়োগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞাও উপেক্ষা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে ৫০ লাখ টাকা নিয়েছেন নিয়োগ দিতে।

এরপর জাহাঙ্গীরনগর। এখানে অন্তত আরও দুইবার উপাচার্যবিরোধী আন্দোলন হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। শরীফ এনামুল কবিরের জায়গায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে। মাত্র দুই বছর পরই তাকে আন্দোলনের মুখে সে দায়িত্ব ছাড়তে হয়। দেশের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধেও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এমনকি খোদ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ জাহাঙ্গীরনগরের উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব, উপাচার্যের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়টিও তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং গণমাধ্যমেও উঠে এসেছিল।

এবার অবশ্য উপাচার্যের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল। তাকে তো পদত্যাগ করতে হয়ইনি, বরং দ্বিতীয়বার তার মেয়াদ বাড়ানো হয়। উল্টো তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগেরও অনেকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ধস নামে।

এর পরের ঘটনা গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিনের। তার দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক ফাতেমা তুজ জিনিয়াকে বহিষ্কার করে প্রশাসন। এরপর থেকে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বশেমুরবিপ্রবি ছাড়াও দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগে বিপুল অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল এবং তার প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল। তিনি কীভাবে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক বিবেচনা ইত্যাদি কারণে নানা শর্ত শিথিল করে দেড়শ’র বেশি নিয়োগ দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। 

এর আগে আলোচনায় আসেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নমূলক কাজে অনিয়মের একটি অভিযোগের তদন্ত করে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে ইউজিসির তদন্ত কমিটি। তিনি ৩৬৫ দিনের মধ্যে হয়ত ৬৫ দিন কর্মস্থলে থেকেছেন। বাকি ৩শ’ দিনই থাকতেন ঢাকায়। বিভিন্ন চ্যানেলে টকশো করে বেড়াতেন। এ ছাড়া আরও কিছু অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে; কিন্তু তিনি আছেন বহাল তবিয়তে। উল্টো তদন্তের জন্য তিনি শিক্ষামন্ত্রীর ‘উস্কানিকে’ দায়ী করেছেন।

বেরোবির উপচার্য কোনো অনুমোদন ছাড়াই ৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার উন্নয়নমূলক কাজের খরচ বাড়িয়ে করেছেন ২১৩ কোটি টাকা। তার বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যসহ আরও ৪৫ ধরনের অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে। অন্যান্য যেসব অপরাধ তা দেখার আগে তার কৃত অপরাধের পাহাড়ই তো হিমালয়সম! তার আরও কিছু খতিয়ান দেখা যাক। বেরোবিকে বাঁচাতে উপাচার্যের দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশ- সংবাদ সম্মেলনে বেরোবির ‘অধিকার সুরক্ষা পরিষদ।’

এর প্রতিকার হিসেবে কি দেখা যাচ্ছে? সেই গতানুগতিক তদন্ত কমিটি গঠন, সরেজমিনে তদন্ত করার নামে মাসের পর মাস অতিক্রমন, সেই ‘গভীরভাবে বিশ্লেষণ’, এবং সেই পুরনো অথচ ধনন্তরী উপায়- জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড পলিসি।

তার পরও এইসব ভানুমতির খেল দেখে যাওয়া ছাড়া আমাদের হাতে আর তো কোনো বিকল্পও নেই।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh