অবন্তিকার আত্মহত্যা: মুখ খুললেন অভিযুক্ত শিক্ষক দ্বীন ইসলাম

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মহত্যা ঘিরে নিজের ব্যাখ্যা দিয়েছেন অভিযুক্ত সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম।

আজ শনিবার (১৬ মার্চ) একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।

দ্বীন ইসলাম বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে অবন্তিকার ব্যাচমেটরা কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে, সেখানে অবন্তিকাও উপস্থিত ছিল। জিডিতে উল্লেখ করা হয় যে, কেউ একজন ফেসবুকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে তাদের হয়রানি করে। পুলিশ তখন বলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আইডিটা কে চালায় সেটা বের করে দেব। এ কথা শুনে অবন্তিকা থানা থেকে বের হয়ে ক্যাম্পাসে আসার পথেই তার বন্ধুদের কাছে স্বীকার করে যে, ফেক আইডিগুলো সে নিজেই চালায়। তখন তার বন্ধুরা প্রক্টর অফিসে অবন্তিকার বিরুদ্ধে গত ৮ আগস্ট ২০২২ তারিখে একটা লিখিত অভিযোগ দেয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রক্টর মোস্তফা কামাল স্যার আমাকে ও সহকারী প্রক্টর গৌতম কুমার সাহা (গণিত বিভাগ) স্যারকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেন।

পরবর্তীতে গত ১৬ আগস্ট ২০২২ তারিখে প্রক্টর স্যারের উপস্থিতিতে আমি ও সহকারী প্রক্টর গৌতম কুমার সাহা অবন্তিকা ও তার অভিভাবকদের প্রক্টর অফিসে আসার জন্য আহ্বান করি। পরে অবন্তিকার মা মিটিংয়ে আসে এবং এখানে অবন্তিকার ক্লাসমেটসহ (অভিযোগকারীরা) সবাই উপস্থিত ছিল। তখন অবন্তিকার মা তার ব্যাচমেট (যারা অভিযোগ করেছে) তাদের কাছে ঘটনার সত্যতা শুনে বলে যে আমার মেয়ে যা করেছে ভুল করেছে। ঘটনার জন্য তিনি অভিযোগকারী সবার কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে তার মেয়ে আর এ ধরনের কাজ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, আমার মেয়ে ভালো শিক্ষার্থী কিন্তু সে কয়েক দিন ধরে মানসিকভাবে অসুস্থ ও ওষুধ খাচ্ছে।

‘তখন তার ব্যাচমেটরা বিষয়টা মানবিক ও ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন। এভাবে বিষয়টা প্রাথমিকভাবে মীমাংসা করা হয়। মীমাংসার পর অবন্তিকার মা জিডিটা তুলে নেওয়ার জন্য অভিযোগকারীদের বারবার অনুরোধ করেন। কিন্তু অভিযোগকারীরা জিডি তুলে নিতে অসম্মতি জানায়, কারণ তাদের ধারণা অবন্তিকা ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ আবারও করতে পারে।

অভিযোগকারীরা বলেন, আমরা তাকে আগামী ৩ মাস পর্যবেক্ষণ করব এবং যদি অবন্তিকা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে তাহলে আমরা ৩ মাস পরে জিডিটা তুলে নেব। ঝামেলা এখানেই প্রাথমিকভাবে নিষ্পত্তি করা হয়। এর কিছুদিন পরে অবন্তিকা ও তার মা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন এবং আমাকে প্রক্টর অফিসে না পেয়ে আমার বিভাগে আসেন। ওইদিন অবন্তিকার মা আমাকে জানান, অবন্তিকার হলের বন্ধুরা ওর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে না। এতে অবন্তিকা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। তখন আমি তাদের প্রক্টর অফিসে লিখিতভাবে অভিযোগ করার পরামর্শ দিই। তখন অবন্তিকার মা বলেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে এখন আর এ বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাইছি না এবং বলেন, আমি আমার মেয়েকে হলে রাখব না। এতে করে তার পড়াশোনা খারাপ হয়ে যাবে এবং সে মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়বে। তখন আমি তাকে বলি, আপনি অভিভাবক যা ভালো মনে করেন সেটাই করেন। যেকোনো প্রয়োজনে আমার সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে’ বলেন সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম।

তিনি বলেন, অভিযোগ নিষ্পত্তির ৩ মাসেরও কিছুদিন পরে অবন্তিকা এবং তার বাবা-মা প্রক্টর অফিসে জিডি তোলার জন্য আসেন। কিন্তু তার ব্যাচমেটরা জিডি তুলতে অসম্মতি জানান। তখন অবন্তিকার মা-বাবা এবং অবন্তিকা আবার আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। তারা জিডি তোলার বিষয়ে আমাকে অনুরোধ করেন। আমি তখন তাদের বিষয়টা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি যে বিষয়টা আমার হাতে নেই। আমাদের কাজ তদন্ত করে রিপোর্ট প্রদান করা এবং আমরা তাই করি। জিডির বিষয়ে প্রক্টর স্যার ও অভিযোগকারীদের সাথে আলাপ করে নিষ্পত্তি করার পরামর্শ দিই।

তৎক্ষণাৎ অবন্তিকার মা কিছুটা হতাশার ভাষায় বলেন, আমি দুজন (অবন্তিকা ও তার বাবা) ডিপ্রেশনের রোগীকে নিয়ে এত বছর সংসার করে আসছি। আমি নিজেও অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আমার মেয়েটা মারাত্মক ডিপ্রেশনে পড়ে গেছে। এরপর অবন্তিকা ও তার পরিবারের কারো সঙ্গে এ বিষয়ে আজ পর্যন্ত আমার কোনো যোগাযোগ হয়নি।

এর আগে, জবির সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান সিদ্দিকী আম্মানকে (আম্মান সিদ্দিকী) দায়ী করে শুক্রবার (১৫ মার্চ) রাতে ফেসবুকে পোস্ট দেন ফাইরুজ অবন্তিকা। এরপর ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের এই শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নির্দেশে অভিযুক্ত শিক্ষককে প্রক্টরিয়াল বডি থেকে অব্যাহতি এবং অভিযুক্ত শিক্ষার্থী আম্মান সিদ্দিকীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //