তলানীতে পুঁজিবাজার

অর্থনীতির উন্নয়নে বিশ্বে রোল মডেল বাংলাদেশ। অথচ ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের মধ্যে ধুঁকছে পুঁজিবাজার। ‘ব্ল্যাকবক্সে’র ইশারায় যেন চলে লেনদেন কার্যক্রম। হঠাৎ বন্ধ শেয়ার কোম্পানির মূল্য বাড়ে আবার কমে সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানির। 

দেশের পুঁজিবাজারের এই অবস্থার জন্য দায়ী মূলত বাজারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপে গড়ে তুলতে না পারার ব্যর্থতা। অর্থনীতির অন্যান্য খাতের তুলনায় পুঁজিবাজারের আকার অতিসামান্য। এমনকি প্রতিযোগী ও অনেক ছোট দেশের তুলনায়ও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অনেক ছোট। আকারে ছোট হওয়ায় এই বাজার নিয়ে কারসাজির করার সুযোগ পাচ্ছে অবৈধ কারবারীরা। 

বাজারকে শক্তিশালী করার কথা প্রতিনিয়ত বলা হলেও কার্যকর সুফল মিলছে না। 

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার (মোট জিডিপি) প্রায় ৩২ লাখ কোটি টাকা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যে গত অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। জাাতিসংঘের সুপারিশের ভিত্তিতে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়ন দেশের কাতারে উঠে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু আয়, বেসরকারি বিনিয়োগ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, নতুন নতুন শিল্প স্থাপন সবকিছুই বাড়ছে। অথচ শুধুই তলানীতে পুঁজিবাজারের লেনদেন। 

এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২০২০ সালে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সবচেয়ে বেশি গড় মুনাফা দিয়েছে। প্রতিযোগী ৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে মুনাফা হয়েছে ২১ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা সবার চেয়ে বেশি। গত বছর থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগে ৮ শতাংশ পর্যন্ত লোকসান হয়েছে। ভারতের বাজারে মুনাফা হয়েছে সাড়ে ১৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার হয়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ আর পাকিস্তানের বিনিয়োগকারীদের মুনাফা হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ; কিন্তু এরপরও গত এক দশক ধরে সব তুলনায় সবচেয়ে ছোট বাংলাদেশের পুঁজি বাজার। 

গত ২০১৯ সালের ভিত্তিতে তৈরি করা এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের আকার মাত্র ১১ শতাংশ। যেখানে পাকিস্তানের বাজার ৩৩ শতাংশ, জার্মানির ৫৪ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৫৭ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ৬৪ শতাংশ ও ভারতের পুঁজিবাজারের আকার জিডিপির তুলনায় ৭৬ শতাংশ। উন্নতদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগের মোট জিডিপির তুলনায়ও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজার জিডিপির অনুপাতে ১৪৮ শতাংশ ও  কানাডার বাজার ১১৩ শতাংশ। 

কেন বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এত ছোট এ প্রসঙ্গে আইডিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান বলেন, বিশ্বের যেসব দেশের বন্ড মার্কেট যত শক্তিশালী ওই সব দেশের  পুঁজিবাজার তত বড় এবং শক্তিশালী। পৃথিবীর সবদেশেই বন্ড মার্কেট ইক্যুইটি মার্কেটের তুলনায় ছোট; কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো চিত্র। এখানে ইক্যুইটি মার্কেট বড়। মাত্র দুটি করপোরেট বন্ড আছে, যার মূল্য মাত্র ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

জানা যায়, জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের বন্ড মার্কেটের আকার মাত্র আড়াই শতাংশ, যেখানে ভারতের ১১ ও ভিয়েতনামের ২১ শতাংশ বন্ড মার্কেটের আকার। জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশের বন্ড মার্কেট ক্রমেই ছোট হচ্ছে। ২০১৬ সালে জিডিপির অনুপাতে বন্ড মার্কেটের বিনিয়োগ ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলাম বলেন, সবসময় সেকেন্ডারি মার্কেট নিয়ে আলোচনা হয়; কিন্তু সেকেন্ডারি মার্কেট বা ইক্যুইটি বিনিয়োগ পুঁজিবাজারের প্রধান কাজ নয়। দেশের অর্থনীতির জন্য বিনিয়োগে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেয়া মূল কাজ। বর্তমানে সাড়ে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির জন্য এত স্বল্প বাজার থেকে অর্থের জোগান দেয়া সম্ভব নয়। 

তিনি আরো বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে অনেক বড় পরিবর্তন হতে পারে। তখনই আমরা ‘শ্যালো ক্যাপিটাল মার্কেট’ থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। আমরা মিউচুয়াল ফান্ড নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি, এখানে বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ আসবে।  মিউচুয়াল ফান্ডগুলো ভালো করছে। তারা এরই মধ্যে ডিভিডেন্ড দিতে শুরু করেছে। আশা করছি, বিনিয়োগকারীরা ডিভিডেন্ড পেলে তাদের বিশ্বাস এবং আস্থা আসবে। এতে এ সেক্টর ঘুরে দাঁড়াবে। আমরা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন মার্কেটের আকার ছিল সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকা, এটি এখন ৫ লাখ কোটি টাকার আশপাশে আছে। এ আকার আরো বাড়বে।

পুঁজিবাজারের আকার ছোট হওয়ায় বিদেশিরা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বাজারের বিনিয়োগ অতি সামান্য। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের মোট বিনিয়োগের মধ্যে বিদেশিদের বিনিয়োগ মাত্র ৬ শতাংশ, যা প্রতিবেশী সবদেশের তুলনায় কম। শ্রীলঙ্কার বাজারের বিদেশিদের বিনিয়োগ তাদের মোট বিনিয়োগের সাড়ে ৭ শতাংশ। ভারতের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ ২১ শতাংশ, ভিয়েতনামে ২৩ ও মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ ২৬ শতাংশ। 

পুঁজিবাজারের আরেকটি বড় সংকট হলো- যোগ্যবিনিয়োগকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ অনেক কম। বাংলাদেশে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ। অথচ মালয়েশিয়ায় ৪২ শতাংশ, থাইলান্ডে ৩১ শতাংশ এবং ভারতের বাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ ১৬ শতাংশ। 

ডিএসইর চেয়ারম্যান মো. ইউনুসুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সামাজিক উন্নয়নে বিশ্বের রোল মডেল অথচ পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাতে উল্টো চিত্র। আর্থিকখাতে যেটুকু উন্নতি করেছে তাও প্রান্তিক জনগণের দ্বারা হয়েছে। এখানে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কোনো অবদান নেই বললেই চলে। নতুন কমিশন আসার পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। তবে এতে দীর্ঘ মেয়াদে তেমন আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই। আর এ মেয়াদে উন্নতি করতে হলে সুশাসন জরুরি। টেকসই পুঁজিবাজার করতে হলে এখানে স্বচ্ছতা দরকার। 

বাংলাদেশে বাজার শক্তিশালী নয় কারণ এখানে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ কম। লোকসংখ্যার তুলনায় অ্যাকাউন্ট অনেক কম। বিনিয়োগের জন্য অ্যাকাউন্ট রয়েছে ২৮ লাখ। প্রতি ১০ হাজারের মানুষের জন্য বিও অ্যাকাউন্ট মাত্র ১৬৯টি। যেখানে শ্রীলঙ্কার প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ৩৮৫টি, ভারতে ২৬০টি ও ভিয়েতনামে ২০৯টি বিও অ্যাকাউন্ট রয়েছে। 

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি ছায়েদুর রহমান বলেন, আমরা যদি থাইল্যান্ড, ভারত ও সিঙ্গাপুরের কথা চিন্তা করি, সেই তুলনায় আমাদের মার্কেট মূল্য-আয় অনুপাত (পিই) অনেক কম। সেই তুলনায় আমাদের মার্কেট অনেক দূর যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। 

তিনি আরো বলেন, ভালো শেয়ারের সরবরাহ নিয়ে অনেক সময় আলোচনা করা হয়। এখানে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানগুলো তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। এর কারণ বিবেচনা করা দরকার। আগে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ব্যবধান ১০ শতাংশ ছিল। তবে সেটি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। আমাদেরকে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে চাইলে ট্যাক্সসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। না হলে ওইসব প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে পাব না।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh