পুঁজিবাজার উত্থানেও শঙ্কা

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

২০১০ সালের ভয়াবহ ধসের পর পুঁজিবাজার আবার চাঙ্গা হয়েছে। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। তারল্য সংকট নেই। ছোট-বড় বিনিয়োগকারীরা বাজারে ভিড় করছেন। কালো টাকা ঢুকেছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বেড়েছে। কাজেই পুঁজিবাজার বাড়ছে, সূচক আর লেনদেনে হচ্ছে নতুন নতুন রেকর্ড। এমন বাজারই দীর্ঘদিন ধরে সবাই প্রত্যাশা করে আসছেন। 

দেশের পুঁজিবাজারের আচরণটাই এমন, যখন সূচক ও শেয়ারের দাম বাড়তে থাকে, তখন বিনিয়োগকারীরাও বাজারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী থাকে, তখন লেনদেনও ক্রমাগত বাড়তে থাকে। লেনদেন বৃদ্ধি বাজারসংশ্লিষ্টদের আনন্দিত করলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য শঙ্কা বা ভয়ের কারণও রয়েছে। উল্লম্ফনের সুযোগে কারসাজিকারীরা কিছু কিছু খাত ও কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি ঘটাচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, কারসাজি বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা স্টক এক্সচেঞ্জগুলো কী করছে? 

গত বছরের ৯ জুন বীমা খাতের একটি কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল ১৯ টাকা ৪০ পয়সা। এক বছরের ব্যবধানে তা ১০ গুণ বেড়ে হয়েছে ১৯১ টাকা। গত মার্চেও এই শেয়ারের দাম ছিল ৭০ টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে সেটি এখন ২০০ টাকার ঘরে।

এক বছরে ১০ গুণ দাম বাড়লেও গত এপ্রিলে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে ‘রুটিন চিঠি’ দেওয়া হয়। জবাবে কোম্পানিটি অন্য সবার মতো জানিয়েছে ‘মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানা নেই’। তবে এ মূল্যবৃদ্ধিতে লাভবান হয়েছেন কোম্পানির মালিকরাও। কারণ, তাদের শেয়ারের দামও এক বছরে ১০ গুণ বেড়েছে।

বিএসইসি দাবি করে, তাদের নজরদারি ব্যবস্থা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। তবে প্রশ্ন হল তাদের সার্ভিল্যান্স বিভাগ কোনো কারসাজি ধরতে পারছে কি-না। ধরতে পারলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে কমিশন যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে কি-না। 

কোন সিকিউরিটিজের ভবিষ্যতে দর বাড়বে বা কমবে ইত্যাদি বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য ছড়ানো ব্যক্তি বা দলকে এ জাতীয় কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছিল বিএসইসি। পুঁজিবাজার নিয়ে গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও বিভিন্ন ফেসবুক পেজে শেয়ারের দাম নিয়ে বেনামে গুজব ছড়াচ্ছে একাধিক চক্র। এ বিষয়ে তদারকির কাজটি যথাযথভাবে হচ্ছে না। 

এক বছরে শেয়ারের দাম ১০ গুণ কিংবা ছয় মাসে ৭ গুণ বেড়ে যাওয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। একমাত্র ‘কারসাজি’র মাধ্যমেই এটি সম্ভব। বাজার যখন চাঙা থাকে, তখন কারসাজি বেশি হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর পুঁজিবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার করেছেন বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, কিছু পদক্ষেপও নিয়েছেন। উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার ধারণ করা নিয়ে কড়াকড়ি আরোপের সুফল মিলেছে। বাজারে নতুন নতুন কোম্পানি নিয়ে আসার চেষ্টা আছে, যদিও আইপিওর মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি এখন পর্যন্ত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। 

দেশের পুঁজিবাজারে কলঙ্কিত দুটি অধ্যায়ের কথা সবার জানা। একটি ১৯৯৬ সাল অপরটি ২০১০। ওই সময়ের বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তখন বিনিয়োগ করে অল্পদিনে অধিক মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা ছিল। ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ছিল বাজারেরও। এ কারণে শেয়ারবাজারে ছুটে আসে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। উদ্দেশ্য সামান্য বিনিয়োগ করে অধিক লাভ; কিন্তু এ ধারা বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেনি। পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। যে ঘায়ের দাগ সমাজ থেকে এখনো মুছে যায়নি। 

পুঁজিবাজারে সুশাসনের ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে অনেকদিন ধরে। এখানে বারবার কারসাজির ঘটনা ঘটেছে; কিন্তু কারসাজির হোতাদের খুঁজে বিচার করা হচ্ছে না। ২০১০ সালের পর প্রাথমিক তদন্তে কারসাজির সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে কয়েকজনের; কিন্তু তারপর? আমরা দেখেছি নানা কায়দায় বিচার প্রক্রিয়াকে আটকে রাখা হয়েছে। রাঘববোয়ালরা বেরিয়ে গেছে জাল থেকে। এ ধারা চলতে থাকলে শেয়ারবাজার নাজুক হয়ে পড়বে। তখন সেকেন্ডারি বাজার নয়, প্লেসমেন্ট ও আইপিওতেও বিনিয়োগকারীদের দেখা মিলবে না। 

অবশ্য পৃথিবীর কোনো বাজারই কারসাজিমুক্ত নয়। সেখানে আমাদের মতো অগভীর ও ছোট বাজারে কারসাজির সুযোগ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। দুর্বল কোম্পানির আধিপত্য কমাতে বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো দরকার। কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথাযথ আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত ও নিরীক্ষা। শুধু তালিকাভুক্ত কোম্পানির বেলায় যথাযথ আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা করলে চলবে না, সব ধরনের কোম্পানির বেলায় এটি বাধ্যতামূলক করা দরকার। সরকারি কিছু কোম্পানির বাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে সরকারের দিক থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা ছিল। সেটি কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সরকারের মালিকানায় ছয় থেকে সাতটি ভালো কোম্পানি রয়েছে, যেগুলো বাজারে এলে বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পেত। 

পুঁজিবাজার তথা আর্থিক খাতের অনিয়ম রোধ করতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই বড় বিষয়। আশার কথা, বিএসইসি পুনর্গঠন হয়েছে, যদিও সেটা করতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। এখন তারা আস্থার সঙ্গে কাজ করছে। পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি যদি ঠিকঠাক কাজ না করে, তাহলে মানুষ আস্থা ফিরে পাবে না। বাজারের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষ যথাযথভাবে আইনকানুন মেনে চলছে কি না সেটা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। বাজার যেন হরিলুটের আড্ডাখানায় পরিণত না হয় সে বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। 

যেখানে দ্রুত লাভ করার সুযোগ থাকে, সেখানে দ্রুত লস করারও ঝুঁকি থাকে। কাজেই এ বাজারে লেনদেনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে। বিনিয়োগ করার আগে নির্দিষ্ট কোম্পানির পারফরমেন্স পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পরামর্শ হচ্ছে, শুধু তারাই বাজারে আসতে পারেন যাদের উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে। 

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ অনেকটা নেশার মতো। এই নেশায় পড়া যাবে না। বাজারে দুই ধরনের আবেগ কাজ করে। ভয় ও লোভ। এ নিয়ে বিনিয়োগ গুরু ওয়ারেন বাফেটের একটি মজার মন্তব্য রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আপনি ভয় করুন যখন অন্যরা লোভ করে, আর লোভ করুন যখন অন্যরা ভয় করে। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //