রাজধানীর জলাবদ্ধতা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি কবে?

বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। ছবিটি শুক্রবার রাজধানীর বংশাল এলাকা থেকে তোলা। -স্টার মেইল

বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। ছবিটি শুক্রবার রাজধানীর বংশাল এলাকা থেকে তোলা। -স্টার মেইল

বর্ষা মৌসুম চলছে। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে দোকানপাট, ঘর-বাড়ি। জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। 

রাজধানীতে জলাবদ্ধতার সমস্যাটি বেশ পুরনো। এর সমাধানে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাস্তবতা হলো- এখনো কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিপাতে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে বরাবরই উদাসীন। দুই সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সেবা প্রদানকারী সংস্থার উন্নয়ন কাজে কেবল সমন্বয়হীনতা নয়, পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাব প্রকট। 

গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে দেখা গেছে, বৃষ্টিতে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক তো বটেই, বিভিন্ন সংযোগ সড়কেও পানি জমেছে। অনেকেই বৃষ্টিতে ভিজে, পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে ছুটেছেন। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে যানবাহন বিকল হয়েছে। রাস্তায় পানি জমে যাওয়ায় শহরের অনেক স্থানেই ছিল যানজট। আবার অনেক রাস্তায় নৌকা চলতেও দেখা গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, মীর হাজারীবাগ, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, ফরিদাবাদ, মুগদা ও বাসাবোতে জলাবদ্ধতার কারণে চলাফেরা করা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সামান্য বৃষ্টিতেই গুলশান, বনানী, কুড়িল, শাহজাদপুর, নতুনবাজার, বাড্ডা, রামপুরা, মহাখালী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, খিলক্ষেত, উত্তরা, পল্ল­বীর কালশী, রূপনগর, মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, পীরেরবাগ, কল্যাণপুর, কাফরুল এর বিভিন্ন জায়গাতে বৃষ্টির পানি জমে যায়। 

এসব এলাকায় ড্রেনেজ লাইন পরিষ্কারে পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকায়, সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় রাস্তা। একবার কোথাও পানি জমলে, তা আর সরতে চায় না। এ ছাড়া পানিতে ডুবে থাকায় রাস্তাগুলোও ভেঙে একাকার হয়ে যায়। আবার কিছু এলাকা যেমন- পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়া, সূত্রাপুর, মীর হাজারীবাগে গ্যাসের পাইপ বসানো কাজের জন্য রাস্তা কাটা হচ্ছে। মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে। ফলে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। 

মিরহাজীরবাগ বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, দশ-পনেরো মিনিট বৃষ্টি হলেই বাজারে হাঁটু পানি জমে যায়। ফলে ক্রেতারা বাজারে আসেন না। আর পানির কারণে ওই সময় ব্যবসা খুব খারাপ হয়।

সোহেল মিয়া নামে গেণ্ডারিয়ার এক বাসিন্দা বলেন, বৃষ্টি হলেই এ এলাকার সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে; কিন্তু এই জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। আমাদের এখানে পুরো এলাকাতেই রাস্তা কাটা। এতবার বলা হচ্ছে, এই বিষয়টি নিয়ে তারপরও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ কেন নেওয়া হচ্ছে না বুঝতে পারছি না। 

‘রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প’ নামে ২০০১ সালে ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। পরে দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধির ফলে এ প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়ায় ২০৩ কোটি টাকায়। ২০১১ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়; কিন্তু কাজ শেষে বর্ষা মৌসুমে নগরীর জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

২০১৩ সালে ২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প-২ বাস্তবায়ন করা হয়। শুধু এ দুটি প্রকল্পই নয়, গত এক দশকে আরও চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ঢাকা ওয়াসা। এ ছাড়া পাইপড্রেন ও বক্স-কালভার্ট পরিষ্কারের নামেও প্রতি বছর খরচ করা হয়েছে গড়ে ২০ কোটি টাকা। এ হিসাবে গত ১০ বছরের ব্যবধানে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় করেছে অন্তত দুই হাজার ২৩ কোটি টাকা। পাশাপাশি ঢাকার সিটি করপোরেশনও প্রতি বছর এ খাতে ব্যয় করেছে গড়ে ১৫০ কোটি টাকা। এরপরও বর্ষা এলেই রাজধানীতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। 

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, শহরে যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রয়েছে, তা দিয়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ আট মিলিমিটার বৃষ্টি হলে পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব। এর বেশি হলেই প্রধান সড়ক থেকে পাড়া-মহল্লা সবখানে পানি আটকে যায়। রাস্তার পানি নিষ্কাশনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের রয়েছে দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি সারফেস ড্রেন এবং প্রায়এক১ হাজার কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইন। বৃষ্টির পানি এসব ড্রেন লাইন হয়ে ওয়াসার ড্রেনেজ লাইন এবং খালে গিয়ে পড়ে। অন্যদিকে ঢাকা ওয়াসার রয়েছে প্রায় ১০ কিলোমিটার কালভার্ট, প্রায় ৩০০ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইন এবং ৬৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ২৬টি প্রাকৃতিক খাল। নগরীর ভেতরের পানি দ্রুত নিষ্কাশন করতে কল্যাণপুর ও ধোলাইখালে দুটি স্থায়ী পাম্পিং স্টেশন এবং রামপুরা ও গোপীবাগের জনপথে রয়েছে দুটি অস্থায়ী পাম্পিং স্টেশন।

অভিযোগ রয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে এসব সারফেস ড্রেন, ভূগর্ভস্থ পাইপ কিংবা বক্সকালভার্টগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয় না। তবে বছরে একবার রুটিনওয়ার্ক হিসেবে যাচ্ছেতাইভাবে পরিষ্কারের কাজসম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই ড্রেনগুলো ধারণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। গত বছর জলাবদ্ধতা নিরসনে দুই সিটি করপোরেশন প্রায় ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি অত্যাধুনিক ‘জেট অ্যান্ড সাকার মেশিন’ কিনেছিল। এই যন্ত্রটি প্রতিদিন ২২ ঘণ্টা কাজ করতে পারে বলে দাবি করা হয়েছিল করপোরেশনের পক্ষ থেকে। এমনকি প্রতি ১০ মিনিটের মধ্যে ১২০ মিটার দীর্ঘ ড্রেন সম্পূর্ণ পরিষ্কার করতে সক্ষম; কিন্তু বাস্তবে এর কোনো ফল দেখা যাচ্ছে না।

নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, ঢাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, পানির পাম্প, খাল ও নদীগুলো মোট সাতটি সরকারি সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা জেলা প্রশাসন, ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ঢাকা ওয়াসা), ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রতিটি সংস্থা পৃথকভাবে কাজ করে; কিন্তু কারও সঙ্গে কারও সমন্বয়, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও সহযোগিতার লেশমাত্র নেই।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা শহরজুড়ে ৬৫টি প্রাকৃতিক খাল ছিল, কিন্তু বর্তমানে এ সংখ্যা মাত্র ২৬, কারণ তাদের বেশির ভাগই আবর্জনায় ভরপুর ও অবৈধ দখলদারদের দখলে। কিছু খাল পুনরুদ্ধার করা হয়েছে; কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। ঢাকায় ১২ শতাংশ জলাধার থাকার কথা ছিল, যা এখন মাত্র তিন শতাংশ। সমস্ত পুকুর এবং জলাশয় ভরাট করা হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণও সমস্যা সৃষ্টি করেছে, কারণ ঢাকার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ৩৩০ বর্গকিলোমিটার ইতিমধ্যে ঘরবাড়ি, জলের প্রবাহের পথে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব  প্ল্যানার্সের (বিআইপি) একটি গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে মূল ঢাকা শহরের মোট ভূমির প্রায় ১৪ শতাংশ ছিল জলাভূমি। ওই সময় কংক্রিটে আচ্ছাদিত এলাকা ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ। ২০ বছর পর ২০১৯ সালে জলাভূমি কমে হয়েছে চার দশমিক ৩৮ শতাংশ, আর কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা বেড়ে হয়েছে ৮১ দশমিক ৮২ শতাংশ।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, গত এক দশকে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ছয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এগুলোর একটি হলো, ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে শেরেবাংলা নগর এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প। পরে এ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের পেছনে ব্যয় ধরা হয় আরও ২৪৮ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় রোকেয়া সরণির আগারগাঁও থেকে মিরপুর ১০ নম্বর পর্যন্ত সড়ক ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের কথা বলা হয়। এরপর নেওয়া হয় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি খাল আধুনিকায়ন প্রকল্প। এ খালগুলোর মধ্যে ছিল হাজারীবাগ খাল, মুগদা-বাসাবোর মাণ্ডা খাল, মিরপুরের বাইশটেকি খাল ও সাংবাদিক কলোনি খাল। সব প্রকল্পই নেওয়া হয় সরকারের অর্থায়নে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কার্যত কোনো ফল আসেনি।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, অতীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে কী হয়েছে, কী না হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। তবে এবার আমরা এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। ওয়াসার কাছ থেকে খালগুলো বুঝে পাওয়ার পর থেকেই কাজ শুরু করেছি। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, নর্দমার পানি সরাসরি খালে নিয়ে যেতে নকশা প্রণয়ন করে সে অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় নর্দমাগুলোর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো হবে। নর্দমাগুলোর নকশা যেভাবে করা হয়েছে, তাতে ঢাকায় যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তার তার ধারণ ক্ষমতা সেগুলোর নেই। সুতরাং আমাদের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম হাতে নিতে হবে, বন্দোবস্ত করতে হবে এবং মূল নর্দমা, নালা, প্রশাখাগুলো- সব নতুনভাবে নকশা করতে হবে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //