বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা

দায় কি শুধু ভাড়াটিয়ার?

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

করোনাকালে উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতিতে মহাসংকটে পড়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। দফায় দফায় লকডাউনের পর যখন সবাই একটু ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখনই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসভাড়া বৃদ্ধির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে বাড়িভাড়া বাড়ার আতঙ্ক। যদিও এটি বছর শেষে নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই বর্ধিত বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। 

এমনকি অনেকে অভিযোগ করেছেন, করোনাকালীন অনেক বাড়িওয়ালা বাড়িভাড়া বাড়িয়েছেন। অনেক বাড়িওয়ালা আবার বাড়িভাড়া বৃদ্ধির নোটিসও দিয়েছেন ভাড়াটিয়াদের। রাজধানীসহ সারাদেশের নগরবাসীদের বাড়িভাড়া নিয়ে একটাই প্রশ্ন। বাড়িভাড়া বৃদ্ধি কবে শেষ হবে? তাহলে ভাড়া শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

রাজধানীর মণিপুরি পাড়ায় থাকেন নাজমা আক্তার। তিনি ১০ বছর ধরে একই বাসায় আছেন। ১৬ হাজার টাকায় বাসা ভাড়া নেন। এখন এই বাসার ভাড়া দিতে হচ্ছে ২৬ হাজার টাকা। প্রতি বছরই তার বাসা ভাড়া এক হাজার টাকা করে বেড়েছে। 

তিনি অভিযোগ করে বলেন, কোভিডের কারণে যখন চাকরির অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম, তখনো বাড়িওয়ালা এক হাজার টাকা বাসা ভাড়া বাড়িয়েছেন। জানুয়ারিতে দুই হাজার টাকা বাসা ভাড়া বাড়ানোর নোটিস পেয়েছেন তিনি। 

রাজধানীর ওয়ারিতে ২০১৯ সাল থেকে দুই বেডরুম ও ড্রয়িং-ডাইনিং মিলে মাসিক ভাড়া ১৫ হাজার টাকায় ওঠেন নাজমুস সাকিব। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল আলাদা। এক বছর যেতে না যেতেই তার বাসাভাড়া বেড়েছিল দুই হাজার টাকা। এখন নতুন বছর আসতে না আসতেই চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বাড়ির মালিক ১৫০০ টাকা বাসাভাড়া বাড়ানোর নোটিস দিয়েছেন। বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলেও লাভ হয়নি। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ভাড়া বাড়বেই, না পোষালে বাসা ছেড়ে দেন।

এ চিত্র শুধু মণিপুরিপাড়া কিংবা ওয়ারিতে এই দুই ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রেই নয়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাড়িওয়ালারা নতুন বছরকে সামনে রেখে বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামেন। তাদের কাছে দুর্যোগও কোনও বিষয় না। এমন কি বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও তার কোনো তোয়াক্কা তারা করে না। নতুন বছরে বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর নোটিস দুই মাস আগে থেকেই জানাচ্ছেন বাড়িওয়ালারা। কিছু বাড়িওয়ালা ভাড়া বাড়ানোর নোটিস দেবেন ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। 

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, আইন ভঙ্গ করে কোনও বাড়ির মালিক ভাড়া বাড়ালে ভুক্তভোগী ভাড়াটিয়ার আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে আইন ভঙ্গের প্রমাণ মিললে বাড়ির মালিকের অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি ও সর্বশেষ পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিতে এমনিতেই চিড়েচ্যাপ্টা সাধারণ মানুষ। এ অবস্থায় আবার বাড়ি ভাড়া বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। বাড়িওয়ালারা যেন নতুন করে বাড়ি ভাড়া না বাড়ান, সে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। 

‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’-এ বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত সমস্যা ও সমাধানের কথা বলা হয়েছে। আইনে সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু বিষয় রয়েছে বাড়িভাড়া দেওয়া ও নেওয়ার ক্ষেত্রে। বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে একটি লিখিত চুক্তিনামা থাকতে হবে, যেখানে উভয়পক্ষের স্বাক্ষর থাকবে। এতে উল্লেখ থাকবে ভাড়ার মেয়াদ, বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, ভাড়ার পরিমাণ, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস বিলসহ আরও নানা প্রয়োজনীয় বিষয়। বাড়ির অবস্থান ও সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করে কত টাকা জামানত হবে, তা চুক্তিনামায় উল্লেখ থাকতে হবে।

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৬ ধারায় স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানসম্মত ভাড়া কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে দু’বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। দু’বছর পর মানসম্মত ভাড়ার পরিবর্তন করা যাবে। এই আইনের ৮ ধারা ও ৯ ধারায় বর্ণিত রয়েছে, মানসম্মত ভাড়া অপেক্ষা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বেশি বাড়ি ভাড়া আদায় করলে সেক্ষেত্রে প্রথমবারের অপরাধের জন্য মানসম্মত ভাড়ার অতিরিক্ত যে অর্থ আদায় করা হয়েছে, তার দ্বিগুণ অর্থদণ্ডে বাড়ির মালিক দণ্ডিত হবেন এবং পরবর্তী প্রত্যেক অপরাধের জন্য এক মাসের অতিরিক্ত যে ভাড়া গ্রহণ করা হয়েছে তার তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে বাড়ির মালিক দণ্ডিত হবেন। 

অথচ বাড়ির মালিকরা এই আইনের কোনও তোয়াক্কা করেন না। বাড়ির মালিকরা বাড়ি ভাড়া বাড়ান প্রতিবছর এবং সেটি ইচ্ছামাফিক। আইনে অগ্রিম হিসেবে এক মাসের ভাড়া নেওয়ার বিধান থাকলেও নেওয়া হয় সর্বনিম্ন দুই মাস থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত। ঢাকার এলাকাভেদে সর্বনিম্ন এক হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। বর্ধিত ভাড়া না মেনে কোনো ভাড়াটিয়া প্রতিবাদ করলে বাড়ির মালিকের স্পষ্ট হুমকি, ‘না পোষালে বাড়ি ছেড়ে দিন।’

বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার সব এলাকাতেই বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর নোটিস দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে এক হাজার থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত। মোহাম্মদপুর, মগবাজার, মালিবাগ, বাসাবোর মতো এলাকায় ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে সর্বনিম্ন দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। ওয়ারী, লালবাগ, আজিমপুরসহ পুরান ঢাকায় বাড়ানো হচ্ছে সর্বনিম্ন দেড় হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। এসব এলাকার অনেক বাড়ির মালিক অগ্রিম হিসেবে ছয় মাসের ভাড়া নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। 

এছাড়া ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী ও উত্তরা এলাকায় বাড়ানো হচ্ছে দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। 

ক্যাবের এক জরিপে, ঢাকার ৮৩ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকে আর বাড়ির মালিক ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৮৩ শতাংশ মানুষ ১৭ শতাংশ বাড়ির মালিকের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। তাদের আরও একটি জরিপ অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২১ সাল- এই ১০ বছরের মধ্যে ঢাকায় দুই রুমের পাকা বাসার ভাড়া ১১৮ শতাংশ, আধাপাকা (টিনশেডের) বাসাভাড়া ৯৫ শতাংশ, মেস বাড়ির ভাড়া ১০২ শতাংশ ও বস্তিতে ভাড়া ১৭৪ শতাংশ বেড়েছে। সুতরাং গত ১০ বছরে প্রায় ২০০ শতাংশ ভাড়া বেড়েছে।

বাড়ি ভাড়া আইনের জটিলতা কমাতে ২০১২ সালে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন করা হয় হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিচ ফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। পিটিশনটি করেন সংস্থাটির সভাপতি আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ; কিন্তু দীর্ঘ ৯ বছর হয়ে গেলেও এ বিষয়টি এখনো ঝুলে রয়েছে। 

এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, জনস্বার্থে আমরা হাইকোর্টে রিটটি করেছিলাম; কিন্তু কখনও সংশ্লিষ্ট বিচারকের মৃত্যু বা কখনো অন্য কোনও কারণে বিষয়টি আজ পর্যন্ত ফয়সালা হয়নি। সর্বশেষ গত বছর করোনার আগে পুনরায় বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনা হয়। আমরা এখন হাইকোর্টের রায়ের অপেক্ষায় আছি। বাড়ি ভাড়া আইন-১৯১৯-এ অনেক দুর্বলতা আছে। আমরা চাই এটিকে যুগোপযোগী করা হোক।

তিনি আরও বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে অধিকাংশ ভাড়াটিয়া বাড়ি ভাড়া আইন সম্পর্কে জানেন না। আবার ৯৫ ভাগ ভাড়াটিয়া ঝামেলা মনে করে আইনের আশ্রয় নিতে যান না। 

এদিকে অনৈতিকভাবে ভাড়া বাড়ানোর প্রতিবাদে রাজপথে নামার হুমকি দিয়েছেন বাংলাদেশ ভাড়াটিয়া পরিষদের নেতারা। ভাড়াটিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জান্নাত ফাতেমা বলেন, বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। অনেক এলাকার বাড়ির মালিক বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর নোটিস দিচ্ছেন। আমাদের সুস্পষ্ট দাবি, করোনা মহামারির কারণে মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এ অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে যেন বাড়ি ভাড়া বাড়ানো না হয়। তবুও বাড়ানো হলে আমরা আন্দোলনের জন্য রাজপথে নামব।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //