আগারগাঁওয়ের রাস্তায় ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়ি

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ সড়কের ঠিক মাঝখানে একটি বাড়ি। সুন্দর ও সুপ্রশস্ত রাস্তার মাঝে কেন এই বাড়ি? কারণ আগারগাঁও থেকে শিশুমেলা যেতে সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ সড়কের মধ্যে এই ব্যক্তিমালিকানাধীন বাড়িটি রেখেই ছয় লেনের রাস্তা তৈরি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।

সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ রোডে আর্কাইভস ও লাইব্রেরি অধিদপ্তরের সামনে এক টুকরা জমির ওপর এই একতলা ভবনের মালিক নূরজাহান বেগম। তিনি ১৯৬৪ সালে এই জমি কিনেছিলেন। ঢাকায় এটি তার মালিকানাধীন একমাত্র জমি। নূরজাহান বেগম ও তার ছেলে রহমত উল্লা জমি রক্ষার জন্য আইনি লড়াই করেছেন। রায় এসেছে তাদের পক্ষেই। উচ্চ আদালতের রায়ে তাদের সম্পত্তি আপাতত অক্ষত রাখার পক্ষে এসেছে। এই জমি তাদের পরিবারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি বিক্রি করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। যদিও অনেকের ধারণা, ন্যায্যমূল্য পেলে হয়তো জমি বিক্রি করতেও পারেন।

সারাবিশ্বে এমন কয়েকটি ঘটনা জানা গেলেও বাংলাদেশে শুধু আগারগাঁওয়েই প্রস্তুত সড়কের মাঝে এমন বাড়ি আছে। চীনের গুয়াংঝুতে এমন একটি রাস্তার কথা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। যাকে বলা হয় ‘নেইল হাউস’। প্রচুর মানুষ এটি নিয়ে কথা বলেছে। 

চীনের শেনজেনে একটি সাততলা ভবনের মালিক ভবনটি বিক্রি করার জন্য ৩.২ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ভবনটির সামনে রেলস্টেশন আছে। একই রকমভাবে চীনের চাংশায় একটি বাড়ির চারপাশে তৈরি করা হয়েছে শপিং মল। আধুনিক শপিং মলের মাঝখানে পুরনো বাড়ি থাকাটা বেশ অদ্ভুত। এসব বাড়ির অনেকেই উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পেলে বাড়ি ছেড়ে দেন। কেউ আবার নিজের অধিকারে ছাড় দিতে চান না।

যেমন চীনের চংকিং-এ, ‘উ পরিবার’। দুই বছরের জন্য তাদের বাড়ি খালি করতে বলা হয়েছিল। তারা রাজি হননি। তাদের বাড়ির চারপাশে গভীর করে খনন করে ডেভেলপার কোম্পানি। তাদের বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারটি শেষমেশ ডেভেলপারদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। ক্ষতিপূরণের সঙ্গে পায় একটি নতুন অ্যাপার্টমেন্ট। অন্যদিকে চীনের ওয়েনলিংয়ে এক বৃদ্ধ দম্পতি ২০০১ সাল থেকে তাদের বাড়ি বিক্রি করতে অস্বীকার করছিলেন। তাদের বাড়ির চারপাশে একটি মহাসড়ক এবং একটি রেলস্টেশন তৈরি করা হয়েছিল। পরে মালিকেরা ক্ষতিপূরণ নিতে রাজি হন। অবশেষে বাড়িটিও ভেঙে ফেলা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৫০ ফুট প্রস্থের ছয় লেনে উন্নীত এ রাস্তাটির মধ্যেই ৬ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত একটি একতলা ভবনের মালিক নূরজাহান বেগম। তিনি ১৯৬৪ সালে জমিটি কিনে রাখেন এবং এখন রাস্তার মধ্যে তার জমির অংশ পড়লেও তিনি জমিটি ছাড়তে রাজি নন। ফলে বাড়িটি অক্ষত রেখেই রাস্তার উন্নয়ন কাজ করতে হয়েছে। আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ বেতারের পাশে অবস্থিত আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের গেটের সামনে রাস্তার অনেকখানি জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি টিনশেডের স্থাপনা। একপাশ টিনঘেরা আর আরেক পাশ অর্থাৎ শ্যামলীমুখী রয়েছে একটি গাড়ি সার্ভিসিংয়ের ওয়ার্কশপ। স্থাপনার গায়ে লাগানো চারটি সাইনবোর্ড। এর একটিতে প্রথমেই বড় করে লেখা আছে ‘ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি’। পরের লাইনে লেখা : ‘ক্রয় সূত্রে এই জমির মালিক মোসাম্মাৎ নুরজাহান বেগম, স্বামী-মো. আব্দুল মতিন।’ আরেকটি সাইনবোর্ডে লেখা: ‘ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের স্থিতি অবস্থা বজায় রাখার আদেশ রহিয়াছে।’

এই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী একাধিক চালক ও পথচারী বলছেন, কাজ শুরুর আগেই এই সমস্যা সমাধান করা উচিত ছিল। এখন দ্রুত এই স্থাপনা না সরালে যে কোনো দিন বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

এ রাস্তা দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারী একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক জাহিদ হাসান বলেন, ‘রাস্তার মধ্যে বাড়ি-এমন ঘটনা দেশে প্রথম দেখলাম। এই বাড়ির কারণে গাড়ি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকিও রয়েছে। গাড়ির চাপ বেশি থাকলে এ অংশে যানজট লেগে যায়। গাড়ি চলাচল বেড়ে গেলে শুনবেন প্রতিদিনই এখানে দুর্ঘটনা ঘটছে।

বাড়ির মালিকের ছেলে রহমত উল্লা বলেন, সিটি করপোরেশন রাস্তা প্রশস্ত করছে, কিন্তু আমাদের সঙ্গে জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে কোনো আলোচনা করেনি। এই জমি অবৈধ বলে তারা আদালতে মামলা করেছিল। সেই মামলার রায় আমাদের পক্ষে এসেছে। তিনি বলেন, এখন জমিটি ছেড়ে দিতে চাচ্ছি না। শিগগির এখনে বড় ভবন তৈরির পরিকল্পনা আছে। তবে সিটি করপোরেশন এ মানের জমি বদল দিলে ভেবে দেখব। 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে রাস্তাটি প্রশস্তের জন্য পিডব্লিউডি থেকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তখন ব্যক্তিমালিকানাধীন এ জমির বিষয়ে জানানো হয়নি। রাস্তাটির কাজ শুরু করতে গিয়ে দেখা যায় রাস্তার মধ্যে ৬ শতাংশ জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন। রাস্তার কাজ শুরু করার সময় জমিটি নিয়ে মামলা থাকায় তখন অধিগ্রহণ সম্ভব হয়নি। এখনো এ জমি অধিগ্রহণের চেষ্টা করছে সরকার। ইতোমধ্যে অধিগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে পেলেই অধিগ্রহণের বিষয়ে বাকি কাজ করা হবে। তবে অধিগ্রহণ করা সম্ভব না হলে ভবনটি যেভাবে আছে ওভাবেই থাকবে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //