আমাকে বলা হতো ‘ডার্লিং অব দ্য ফেস্টিভ্যাল’: ববিতা

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা। সম্প্রতি অনলাইনভিত্তিক উইকিপিডিয়ায় সাত ভাষায় হালনাগাদ করা হয়েছে তার সম্পর্কিত তথ্য। সমকালীন নানা বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি...

সম্প্রতি উইকিপিডিয়ায় সাত ভাষায় আপনার তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

আমি খুবই আনন্দিত। পুরস্কারের চেয়ে এ বিষয়টি কোনো অংশে কম নয়। তারা আমাকে নিয়ে গবেষণা করেছে। আমি অনেক ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গিয়েছি। আমাকে বলা হতো ‘ডার্লিং অব দ্য ফেস্টিভ্যাল’। ফেস্টিভ্যালের ওপেনিং ও ক্লোজিং করানো হতো আমাকে দিয়ে। বাংলাদেশের একজন শিল্পী হবার পরও আমাকে বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আমন্ত্রণ জানানো হতো। মস্কো, তাসখন্দে আমি জুরি বোর্ডের মেম্বারও ছিলাম। বরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় কাজ করার কারণে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে ‘ববিতা’ নামটি পরিচিত হয়ে ওঠে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড ইত্যাদি দেশের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে আমাকে নিয়ে স্টোরি হয়েছে। এ ছাড়া আমি ডিসট্রেসড চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছি। এত পুরস্কার পেয়েছি, এত ছবি করেছি এই বিষয়গুলো নিশ্চয়ই তারা দেখেছে। আমার আরও ভালো লাগছে যে, সামনে আরও বেশি ভাষায় তারা আমার তথ্য সংযুক্ত করতে পারে। সাধারণত বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তারকাদের তথ্য থাকে। তার বাইরে আরবি, কোরীয়, তামিল, ওড়ীয় ও পাঞ্জাবি ভাষার মানুষ আমাকে জানতে পারছে এটা খুবই সুখের বিষয়। আমার বিশ্বাস আমাদের যেসব ছেলেমেয়ে এখন চলচ্চিত্রে আছে, তারা এতে উৎসাহ পাবে।

বর্তমান চলচ্চিত্রের মান কেমন দেখছেন?

কিছু ভালো ছবি কেউ কেউ বানাতে চেষ্টা করছেন; কিন্তু সে ছবিগুলো হলে চলছে না। হয়তো ফেস্টিভ্যালে যাচ্ছে, কিছু পুরস্কার পাচ্ছে; কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে টাকা লগ্নি করা হয়েছে, সেটি তো ফেরত আসতে হবে। তাই সংশ্লিষ্টরা যেভাবে ছবি বানালে টাকা ফেরত আসবে, সেভাবে ছবি বানাচ্ছে। একজন নারীকে অর্ধনগ্ন দেখতে কি ভালো লাগে? আধুনিক ছবি আমরাও করেছি, তবে শালীনতা বজায় রেখে। আধুনিক পোশাক পরেছি কিন্তু কেউ বলতে পারবে না সেগুলো অশ্লীল ছিল। এখন তো দেখতে লজ্জা লাগে। গল্প, চিত্রনাট্য, নির্মাণ সবকিছু মিলিয়ে মান মোটেও ভালো হচ্ছে না। আমি আশাবাদী যারা এসব নিয়ে ভাবেন তাদের সম্মিলিত প্রয়াসে সুদিন ফিরবে।

সম্প্রতি ওয়েবের জন্য ছবি নির্মাণ করা হচ্ছে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

আগের দিনে মানুষ বন্ধু-বান্ধব, পরিবার নিয়ে ছবি দেখতে হলে যেত। পপকর্ন, বাদাম খেতে খেতে ছবি দেখত। এই মজাটা আর থাকছে না। এই চর্চা হারিয়ে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। পরিবেশ ও নিরাপত্তার ব্যাপার আছে। আবার এখনকার কিছু ছবি মা-বোনদের নিয়ে বসে দেখাও যায় না। আগেকার ছবি হল থেকে নামানো যেত না। ছবি দেখে দর্শক ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদত। সেগুলো তো এখন নেই। কিছু করার নেই আসলে। সময়ের সঙ্গে এসব পরিবর্তন হচ্ছে।

দর্শক আপনাকে পর্দায় দেখতে চায়। অভিনয়ে ফেরার কোনো সম্ভাবনা আছে?

অভিনয় করতে আমার আপত্তি নেই। অভিনয় করব না এমন কথা শিল্পী কখনোই বলতে পারে না। আমার সৌভাগ্য আমি গুণী পরিচালক পেয়েছি, ভালো গল্প পেয়েছি, সমাজের জন্য বক্তব্যধর্মী ছবি পেয়েছি। এখন বলা হয়, সাধারণ একজন ভাবি কিংবা মায়ের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। সেখানে আমার দেখানোর কিছু নেই। সেজন্য আমি এমন ছবিতে কাজ করতে চাই না। আমার চরিত্রকে কেন্দ্র করে গল্প হলে করা যায়। আরেকটি ব্যাপার হলো আমরা সারাজীবন ৩৫ মিলিমিটারে কাজ করেছি। আমি বড়পর্দার মানুষ। তিনশ’র উপরে ছবি করেছি। সত্তর থেকে পঁচাত্তরটি পুরস্কার পেয়েছি। কাজের জন্য অনেক ত্যাগ করেছি। ভালো ছবির জন্য পারিশ্রমিকও নেইনি। এখনকার ডিজিটাল ক্যামেরায় কাজ করলে আমার মনে হয় টেলিফিল্ম বা নাটকে অভিনয় করছি। তখন মনে হয় অভিনয় করতে পারব না। তবে এখন কয়েকটা ছবি আসছে। গল্প পছন্দ হয়ে গেলেও করোনার জন্য কীভাবে কাজ করব জানি না।

প্রযোজনা নিয়ে কিছু ভাবছেন?

আমি যেসব ছবি বানিয়েছি সবগুলোই প্রশংসিত হয়েছে। সর্বশেষ সেলিনা হোসেনের ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’ ছবিটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছি। সেলিনা হোসেনের এত চমৎকার একটি গল্প নিয়ে কাজ করেছি। ছবিটি পুরস্কৃত হয়েছে, প্রশংসা কুড়িয়েছে; কিন্তু হলে চলেনি। এত অর্থ ব্যয় করার পর ছবি না চলায় ভাবলাম এরকম ছবি নির্মাণ করে আর লাভ নেই। অথচ একসময় ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নয়নমনি’ প্রভৃতি ছবি হল থেকে নামানোই যেত না। মাসের পর মাস চলেছে। আগে সব বয়সের দর্শক ছবি দেখেছে। এখন শুধু এক ধরনের মানুষ হলে যায়। নতুন যারা কাজ করছে তারা ভালো অভিনয় জানে; কিন্তু তারা আমাদের মতো ভালো পরিচালকের হাতে পড়েনি। এখন আগের মতো ভালো পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক নেই। শিল্পী বা পরিচালকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। তাদের বলে দেওয়া হয় ফর্মুলা ছবি বানানোর জন্য।

বিএফডিসির দুটি ফ্লোর ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেখানে নিশ্চয়ই অনেক স্মৃতি আছে?

অত্যন্ত দুঃখজনক, বিভিন্ন মাধ্যমে ছবিগুলো দেখে চোখে পানি চলে এসেছে। এই ২ ও ৩ নম্বর ফ্লোরে কত স্মৃতি। সারাদিন ওখানে কাজ করতাম। আমাদের দ্বিতীয় বাড়ি ছিল বিএফডিসি। এখন এসব দেখলে কান্না ছাড়া আর কিছু করার নেই।

বিএফডিসির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কী মন্তব্য করবেন?

মোটেও ভালো হচ্ছে না। এগুলো কী হচ্ছে? সবদিক দিয়েই বাজে অবস্থা। এ জন্যই বলি বিএফডিসিতে না যেতে পারলেই ভালো।

করোনাকালে কী উপলব্ধি এসেছে?

প্রত্যেককে সাবধানে চলতে হবে। আমার মনে হয় করোনাকালের আগে স্বপ্নের জীবন ছিল। কবে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব জানি না। হয়তো ঠিক হবে। কবে হবে দেখা যাক।

সাক্ষাৎকার: মোহাম্মদ তারেক

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh