মাদ্রাসার শূন্য পদে নিয়োগে ৩০ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা সদরের হিফজুল উলুম আলীয়া মাদ্রাসার ৬টি শূন্য পদে লোক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিসহ স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। 

এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যালয়ে পৃথকভাবে চারটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এলাকার ভুক্তভোগীরা। 

এলাকাবাসী ও ভূক্তভোগীদের দাখিলকৃত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়- জেলার তাহিরপুর উপজেলা সদরে অবস্থিত তাহিরপুর হিফযুল উলুম আলীম মাদ্রাসার ৬টি শূন্য পদে গত ২৭ অক্টোবর লোক নিয়োগ করা হয়েছে। তাতে সংশ্লিস্ট মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলামের স্ত্রী মাহমুদা আক্তারকে হিসাব রক্ষক পদে, তার চাচাত ভাই সংশ্লিস্ট মাদ্রাসার কমিটির সদস্য তাজিমুল ইসলাম দুলালের আপন ভাই শরিফুল ইসলামকে উপাধ্যক্ষ পদে, ভগ্নিপতি মহিবুর রহমানকে অধ্যক্ষ পদে, মুনতাছির বিল্লাহকে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার পদে, শাপলা আক্তারকে আয়া পদে ও আবু আলী সানীকে নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ করা হয়। 

এ ঘটনা এলাকাবাসীর মাঝে জানাজানি হওয়ার পর স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে গত ১৪ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়,মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যালয় ও জেলা প্রশাসকের নিকট পৃথকভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তাহিরপুর হিফজুল উলুম আলীম মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য বাচ্চু মিয়া। 

এর আগে গত ৪ নভেম্বর মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে আলাদাভাবে আরো একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ভুক্তভোগী। একই তারিখে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট বিভিন্ন পদের চারজন প্রার্থী স্বাক্ষরিত আরো একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীরা হলেন- সাইদুর রহমান অপু মিয়া, শবনম আক্তার, রুবিনা আক্তার রুবি ও জাহাঙ্গীর আলম। 

তাদের অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে- সকাল ১০টায় লিখিত পরীক্ষা নির্ধারিত করার পর সেই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে সাড়ে ১১টায়। এবং মাদ্রাসা কমিটির সভাপতির স্ত্রী, ভগ্নিপতি ও ছোট ভাইকে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ করাসহ বাকি তিনজন লোক নিয়োগ দেওয়ার জন্য নেওয়া হয়েছে ত্রিশ লাখ টাকা উৎকোচ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, তাহিরপুর হিফযুল উলুম আলীম মাদ্রাসার লোক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ দুর্নীতি নিয়ে গত ৪ নভেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট লিখিত অভিযোগ দেওয়া পর অভিযোগ কারীদের বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে মাদ্রাসার সভাপতি আমিনুল ইসলাম। তিনি উপজেলা আ,লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে চার আবেদনকারী মধ্যে  তিন প্রার্থীকে বাধ্য করে অভিযোগ দায়ের ও স্বাক্ষর তাদের নয় বলে নিজের মতকরে লিখে কমপিটারে লিখিত প্রিন্ট কাগজে স্বাক্ষর করে নিজেই অভিযোগ তুলেছেন নিজেকে আড়াল রাখতে। এবং আরেক অভিযোগকারী জাহাঙ্গীর আলম কোন ভাবে ম্যানেজ করতে না পেরেই স্বাক্ষর জালিয়াতি অভিযোগ তুলে নিজেকে বাঁচাতে তার নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেট নিয়ে দৌড় ঝাপ শুরু করেছে বলে জানান মাদ্রাসা ও মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকাবাসী ও সচেতন মহল। এই বিষয়ের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সুদৃষ্ট কামনা করেন উপজেলার সর্বস্তরের জনগণ।                                        

এ ব্যাপারে তাহিরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের লাইব্রেরিয়ান সাজিদুর রহমান সাজু বলেন- রুবিনা আক্তার রুবি আমার ছোট বোন আর শবনম আক্তার আমার স্ত্রী। তারা দুজন দুইটি পদের প্রার্থী ছিল। কিন্তু তাদের স্বাক্ষর কে বা কারা নকল করে অভিযোগ দিয়েছে জানি না। এই নিয়োগের বিষয়ে আমার স্ত্রী ও বোনের কোন অভিযোগ নেই। 

তাহিরপুর হিফজুল উলুম আলীম মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য বাচ্চু মিয়া বলেন- আমি ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হওয়ার পরও মাদ্রাসার লোক নিয়োগের বিষয়ে কিছুই জানি না। তাছাড়া বেশির ভাগ আবেদনকারী প্রার্থীদেরকে দেওয়া হয়নি ইন্টাভিউ কার্ড। এবং তাহিরপুর রেখে সিলেট আলীয় মাদ্রাসায় গিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার কারণে সঠিক সময়ে সঠিকভাবে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। আমাদের মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম সবাইকে ম্যানেজ করে তার লোকজনকে নিয়ে গোপনে মিটিং করে নিজের স্ত্রী, ভাই ও ভগ্নিপতিকে নিয়োগ দিয়েছে। আর অন্যদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়েছে জানতে পেরেছি। তাই জরুরিভিত্তিতে এ ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উপরস্থ কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। 

এ বিষয়ে অভিযোগকারী ও একেই অভিযোগ প্রত্যাহার করা প্রার্থী সাইদুর রহমান অপু জানায়, আমি অভিযোগ করেছি পরে আমাকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করায় আমার ইচ্ছার বাহিরে বাধ্য হয়ে মাদ্রাসা সভাপতি আমিনুল ইসলামের লিখিত অভিযোগ প্রত্যাহারের কাগজে মাদ্রাসা সংলগ্ন উনার অফিসে বসে স্বাক্ষর করি এর পর দিন ইউএনও অফিসে কে বা কারা জমা দেয় জানি না।  

 এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাহিরপুর হিফজুল উলুম আলীম মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন- আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সঠিক নয়, যারা পরীক্ষা দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে তাদেরকেই চাকরি দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোন প্রকার অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি। কিছু সংখ্যক লোক তাদের স্বার্থ হাসিল করতে না পেরে অহেতুক হয়রানির চেষ্টা করছে। 

তবে দায়েরকৃত একাধিক অভিযোগের ব্যাপারে জানতে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পদ্মাসন সিংহ জানান- এই বিষয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ বলেন- তাহিরপুর হিফজুল উলুম আলীম মাদ্রাসার লোক নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি হওয়ার বিষয় নিয়ে একাধিক লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh