তিন যুগেও সফলতা দেখাতে পারেনি বিএসটিআই

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর আইন থাকলেও, বাংলাদেশে সে ধরনের কোনো আইন নেই। এ কারণেই বাজারে বিক্রেতার কাছে ক্রেতা সাধারণ জিম্মি হয়ে থাকেন। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকারও একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস ইনস্টিটিউশন) প্রতিষ্ঠা করে।

সাধারণ মানুষ কোনো পণ্য কিনতে বাজারে গেলে, সেই পণ্যের প্যাকেটে বিএসটিআই লোগো দেখে মান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়; কিন্তু সর্বত্র ভেজালের ছড়াছড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় সংস্থাটির প্রতি আস্থা হারিয়েছে ভোক্তারা। প্রতিষ্ঠার তিন যুগেও সংস্থাটি সফলতার মুখ দেখতে পারেনি। 

অভিযোগ রয়েছে, সারাদেশে পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে সাড়ে ১৬ হাজারের বেশি লাইসেন্স দিলেও এগুলোর কোনো তদারকি করছে না সংস্থাটি। পণ্যের অনুমোদন (লাইসেন্স) দিয়ে শুধু দায়িত্ব পালন করছে বিএসটিআই; কিন্তু পরবর্তীতে অনুমোদিত ৯৫ শতাংশ পণ্যের মান তদারকি করে না। এমনকি নামমাত্র দুই-একটি অভিযান পরিচালনা করেই কাগজে কলমে দায়িত্ব পালন করেছেন কর্তৃপক্ষ। এছাড়া যথাযথ বাজার ও কারখানা মনিটরিং না থাকায় বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে, নকল-ভেজাল খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য।

তবে বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ বলছেন, সাধ্যানুযায়ী মান তদারকি করছে তারা; কিন্তু জনবল সংকট ও শক্তিশালী প্রযুক্তির ব্যবহার না থাকায় আশানুরূপ সফল হতে পারছে না। 

১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের জারিকৃত অধ্যাদেশের মাধ্যমে সেন্ট্রাল টেস্টিং ল্যাবরেটরি এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস ইনস্টিটিউশনকে একীভূত করা হয়। সংস্থাটিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি পণ্য বিপণন ও শ্রেণিবিন্যাস পরিদপ্তরটিও বিএসটিআইর সঙ্গে একীভূত হয়; কিন্তু প্রতিষ্ঠার সেই আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা ক্ষয়ে এখন তলানিতে নিয়ে গিয়েছে স্বায়ত্তশাসিত এ প্রতিষ্ঠানটি। যে সংস্থাটি মানুষের জীবন রক্ষার খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে, সেই প্রতিষ্ঠানটির মান নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি ঘরের কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী, বেশকিছু প্রসাধনী, কাপড়, জুতা, স্বর্ণ, ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিকস এবং নির্মাণকাজে ব্যবহৃত পণ্যগুলোর জন্য বিএসটিআইর মান সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

বিএসটিআইর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য মতে, বর্তমানে বাধ্যতামূলক তালিকায় রয়েছে মোট ২২৯টি পণ্য। এসব পণ্য এখন বাজারজাতকরণে বাধ্যতামূলকভাবে বিএসটিআইর লাইসেন্স নিতে হয়। পাশাপাশি পণ্যগুলোর মান সার্ভিলেন্স করার দায়িত্ব সংস্থাটির। 

বিএসটিআইর অনুমোদিত সর্বমোট জনবলের সংখ্যা ৬৬৪ জন, যার মধ্যে ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব (১ম শ্রেণি) কর্মকর্তা রয়েছেন ১৮৬ জন; ১০ম ও ১১তম গ্রেড (২য় শ্রেণি) কর্মকর্তা ২২৭ জন; ১২তম গ্রেড হতে ১৬তম গ্রেডে (৩য় শ্রেণি) রয়েছেন ১৬৭ জন এবং ১৭তম হতে ২০তম গ্রেডে (৪র্থ শ্রেণি) রয়েছেন ৮৪ জন। 

বিএসটিআইর ওয়েব সাইটে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এখানে বড় মানের পেশাদার কোনো গবেষক নেই। সংস্থাটির মহাপরিচালক ছাড়া দেশ-বিদেশে পিএইচডি ডিগ্রিধারী কোনো কর্মকর্তার নাম পাওয়া যায়নি। অনেক পদ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও, সেই পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা কীভাবে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হয়, সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। 

যদিও বিশ্বের বহু দেশের পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকরা পণ্যের মান পরীক্ষা করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশের বিএসটিআই। যদিও সংস্থাটি দাবি করছে, তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে। 

এ দিকে করোনা মহামরি মধ্যে তেমন বড় করে অভিযান পরিচালনা করতে পারেনি বিএসটিআই। তবে এখতিয়ারভুক্ত পণ্যগুলোর সার্ভিলেন্স করছে সংস্থাটি। ২০২০-২১ অর্থবছরে এক হাজার ২৯৬টি সার্ভিলেন্স কার্যক্রম চালিয়েছে তারা। এ কার্যক্রমে ২২৬টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করা হয়। এসব মামলায় সাজা হয়েছে ৪৩ জনের এবং ৫১টি কারখানা স্থায়ীভাবে সিলগালা করা হয়েছে গত অর্থবছরে। 

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বিএসটিআই খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের সার্টিফিকেশন মার্কস (সিএম) লাইসেন্স দিয়ে থাকে। যেসব প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হয়, সেগুলোতে ৬ মাস অথবা ১২ মাস অন্তর পরিদর্শন করা হয়। লাইসেন্স নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে মান বজায় রেখে পণ্য উৎপাদন করছে কি-না, সেখানে রসায়নবিদ কিংবা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আছে কি-না, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পণ্য উৎপাদন হচ্ছে কি-না, তা তদারকির দায়িত্ব বিএসটিআইর; কিন্তু বিএসটিআইর সার্বিক গতিবিধি দেখে মনে হয় অনুমোদিত পণ্যের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের মান যাচাই করতে পারে বিএসটিআই। বাকি ৯৫ শতাংশ তদারকির বাইরে রয়ে যায়। খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও শক্তিশালী করার পরার্মশ দেন তিনি। 

এ বিষয়ে বিএসটিআইর সাবেক মহাপরিচালক দেওয়ান আফছার উদ্দিন বলেন, বিএসটিআইর জনবল সংকট রয়েছে। এত অল্প জনবল দিয়ে সব পণ্যের মান তদরাকি সম্ভব না। যে জনবল আছে তা দিয়ে সর্বোচ্চ ৫-৭ শতাংশ পণ্যের মান তদারকি সম্ভব। তবে এর মধ্যেও পণ্যের মান ঠিক রাখতে তাদের কাজ করে যেতে হবে। যারা মানহীন খাবার উৎপাদন ও বাজারজাত করছে, তাদের শক্ত হাতে দমন করতে হবে। 

বিএসটিআইর পরিচালক (প্রশাসন) তাহের জামিল বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলো স্ট্যান্ডার্ড ফর্মুলেশনের জন্য আমাদের ৭৬টি কমিটি রয়েছে। তারাই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বাধ্যতামূলক করতে সুপারিশ করে। পাশাপাশি বিএসটিআই বাজারের পরিস্থিতি বুঝে বিভিন্ন নতুন পণ্য বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করে। 

তিনি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স নেওয়ার সময় শর্তগুলো যথাযথভাবে পালন করে ঠিকই; কিন্তু পরে পরিদর্শনে গিয়ে ৩০-৪০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেই এর গরমিল পাওয়া যায়। বিশেষ করে দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব দেখা যায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সুপেয় পানির ক্ষেত্রে ১০-১২টি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক থাকে; কিন্তু পরিদর্শনে গিয়ে এসব চোখে পড়ে না। 

বিএসটিআইর পরিচালক (মান) নিলুফা হক বলেন, সার্ভিল্যান্স দল রুটিনমাফিক দায়িত্ব পালন করে থাকে। কতগুলো প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন করা হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তার তালিকা করা হয়। তবে পরিদর্শনের পর যেসব প্রতিষ্ঠানে ত্রুটি পাওয়া যায়, তাদের সংশোধনের জন্য সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়। এরপরও সতর্ক না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হয়। 

যখন বিদেশে কোথাও খেতে যাই নিশ্চিন্তে খাই উল্লেখ করে বিএসটিআই মহাপরিচালক ড. নজরুল আনোয়ার বলেছেন, দেশের কোথাও খেতে গেলে দুশ্চিন্তা কাজ করে। এটা আমাদের জাতিগত দুর্ভাগ্য। আমরা সব কিছুর মধ্যেই লাভ লোকসানের হিসাব করি। আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে কোনো সিস্টেম ডেভেলপ করতে পারিনি। তবে আশা করি, ভবিষ্যতে আমরাও সিস্টেমের মধ্যে আসতে পারবো।

পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, বিএসটিআই শুধু কাজ করে ফিনিশড প্রোডাক্ট নিয়ে। কৃষকরা যেখানে উৎপাদন করে, সেখানে কিন্তু আমরা কাজ করতে পারি না। কৃষকদের চাষ থেকে ফাইনাল যে প্রোডাক্ট হয়, সেটা নিয়ে আমরা কাজ করি।

অনেকেই আমাদের বলেন, সব কিছু দেখার দায়িত্ব বিএসটিআইর, এটা ঠিক না। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে আমাদের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর আছে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আছে, সবার কিন্তু দায়িত্ব ভাগ করে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। আমাদের দায়িত্ব ২২৯টি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। হয়তো বলতে পারেন সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন হচ্ছে না। সেটা হতেও পারে। কারণ আমরা মাত্র ৮টি বিভাগে কমসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়ে কাজ করি। এই স্বল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে সারাদেশে কাজ করা অনেক কঠিন। তবে আমরা বিএসটিআইর জনবল বৃদ্ধিতে কাজ করছি।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //