পরিবেশ দূষণে বছরে বাংলাদেশের ক্ষতি ৬৫০ কোটি ডলার

পরিবেশ দূষণে বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন রাজধানীবাসী। বছরে বাংলাদেশের ৬৫০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয় দূষণের কারণে, যা মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ। নানা ধরনের দূষণ ও নেতিবাচক ইনডেক্সের কারণে বসবাসের অনুপযোগী অথবা নিকৃষ্টতম শহরের তালিকায় স্থান পেয়েছে ঢাকা শহর। 

বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট বলছে, দেশে প্রতিবছর যত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এর ২৮ শতাংশেরই মৃত্যু হয়ে থাকে পরিবেশ দূষণের কারণে। পরিবেশ দূষণে বাংলাদেশে মৃত্যুর হারের তুলনায় বৈশ্বিক মৃত্যুর হার ১৬ শতাংশ। গ্রামের দিকে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক কম হলেও, শহরাঞ্চল অতি উচ্চ মাত্রার দূষণের শিকার। 

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে পরিবেশ দূষণের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৮০ হাজার মানুষের। দূষণের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুরা। বাংলাদেশের মানুষ বায়ু, পানি, খাদ্য ইত্যাদি দূষণেরও শিকার। 

বায়ুদূষণে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছেন মানুষ। ফলে ফুসফুসে নানা ধরনের রোগ হয়ে থাকে তাদের। সিসা দূষণে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশ বাধাগ্রস্ত এবং স্নায়বিক ক্ষতি হয়ে থাকে। 

বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ সিসা দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এদের বেশির ভাগেরই শহরের দরিদ্র এলাকায় বসবাস। শুধু সিসা দূষণ নয়, অন্যান্য দূষণের শিকার হচ্ছেন তারা।

বায়ুদূষণে চোখ, শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হয়ে থাকে। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান লরেন্স বের্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি বলছে, বায়ুতে রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ আছে এমন এলাকার মানুষের চোখ, নাক বা গলায় নানা ধরনের অসংক্রামক রোগ হয়ে থাকে। ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়া, মাথাব্যথা, অ্যাজমা এবং নানাবিধ অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে। বায়ুদূষণের সাথে ডায়াবেটিসের সম্পর্কও দেখতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের মধ্যে থাকলে বা এ রকম পরিবেশে কাজ করলে ফুসফুসের ক্যান্সার এবং হৃদরোগ হতে পারে। এমনকি মস্তিষ্ক, লিভার, কিডনির দীর্ঘমেয়াদি রোগ হতে পারে।

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের জন্য ইটভাটা অনেকাংশে দায়ী। ইটভাটায় পোড়ানো হয় নিম্নমানের কয়লা, কাঠ, টায়ার ইত্যাদি। এই তিনটি জ্বালানি পোড়ালেই ক্ষতিকর গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো- কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড। ইটভাটা বাংলাদেশের জিডিপিতে অবদান রাখছে এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে; কিন্তু বর্তমানে যেভাবে ইটভাটায় ইট পোড়ানো হয়, তা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। পরিবেশসম্মত ইট বানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশেই এমন কিছু কারখানা রয়েছে, যেখানে বায়ুদূষণ হয় না।

উল্লেখ্য, ইট উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। দেশে ৭ হাজারের বেশি ইটভাটা রয়েছে। বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়নের বেশি ইট বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়। জিডিপিতে ইটশিল্প প্রায় ১ শতাংশ অবদান রাখছে। বছরে প্রায় ২০৫ বিলিয়ন টাকা ইট উৎপাদনকারী কারখানাগুলো থেকে জিডিপিতে যোগ হচ্ছে। ১০ লাখেরও বেশি মানুষ দেশের ইটখোলাগুলোয় কর্মরত; কিন্তু এই ইটভাটা থেকেই বায়ুদূষণ হচ্ছে।

তাছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর বায়ুদূষণের ১০.৪০ শতাংশের জন্য দায়ী যানবাহনের কালো ধোঁয়া। ২০০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর বেবিট্যাক্সিসহ পুরনো যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিলে একদিনেই ঢাকার বায়ুতে দূষণের মাত্রা কমে যায় প্রায় ৩০ শতাংশ। ২০১৩ সাল থেকে তা আবারো বাড়তে থাকে। সম্প্রতি তা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। 

গাড়ির রঙে ব্যবহৃত ‘থিনার’ এবং পুডিং তৈরিতে ব্যবহৃত ‘হার্ভেনার’ নামক দুটি রাসায়নিক পদার্থের গন্ধ খুবই প্রকট। এই গন্ধ দীর্ঘক্ষণ কেউ গ্রহণ করলে চোখ জ্বালাপোড়া করে, মাথা ধরে। সর্দিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই রাসায়নিকের গন্ধে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারেন। গাড়ি রঙ করতে বেশির ভাগই তরুণদের কাজে লাগানো হয়। এরা জানেও না এর ক্ষতিকর প্রভাব।

এছাড়া পথচারীরা গাড়ির গ্যারেজের সামনে দিয়ে গেলে তাদের নাকে এই রাসায়নিকের তীব্র গন্ধ ‘হিট’ করে। তারাও নিজেদের অজান্তেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এই গন্ধ শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা রকম পেটের অসুখে আক্রান্ত হতে পারে ভুক্তভোগী। নিঃশ্বাসের সাথে পাকস্থলীতে প্রবেশ করলে আক্রান্ত ব্যক্তির খাবারে অরুচি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ঠিকমতো খেতে না পারার কারণে অপুষ্টির শিকার হতে পারেন আক্রান্ত ব্যক্তি। সে কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, যত্রতত্র গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ স্থাপনের অনুমতি দেওয়া যাবে না।

পানির দূষণের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি রয়েছে মানুষের দেহে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দূষিত পানিতে বেড়ে ওঠা মাছ, সবজি ও ভেষজে বিষক্রিয়া প্রবেশ করে। সে ধরনের মাছ ও ভেষজ ক্যান্সারের কারণে হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, পানিতে রাসায়নিক পদার্থ অথবা ভারী ধাতু মানুষের দেহে প্রবেশ করলে ত্রুটিপূর্ণ শিশুর জন্ম হতে পারে। এমনকি প্লাস্টিক কণা খেয়ে ফেললে তা হজম হয় না। সেই অক্ষত প্লাস্টিক কণা মানব শরীরে ঢুকলে মানুষের ক্যান্সার হতে পারে। খাদ্যদূষণে গ্যাস্ট্রিক, আলসারসহ নানা সমস্যার তৈরি হচ্ছে। এসব দূষিত খাবার শিশুকাল থেকে খেয়ে আসলে এক সময় দেহে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এমনকি শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে থাকে।

পানিদূষণে নানা ধরনের সংক্রামক রোগ যেমন- ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা, জন্ডিস, হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হলে দীর্ঘ দিন ভুগে ভুগে অনেকেই লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। খাদ্য দূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে মানুষের কিডনি। গর্ভবতী নারীরা পরিবেশ দূষণের কারণে নানা ধরনের শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়ে থাকে। দূষিত এলাকায় বসবাসে গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হয়ে যেতে পারে এবং নারীর মৃত শিশু জন্মদানের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যেতে পারে। 

পরিবেশ দূষণের আরেকটি নাম হচ্ছে শব্দদূষণ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব নয়েজ কন্ট্রোল বলছে, অতিরিক্ত শব্দদূষণে একজনের হাইপার টেনশন (উচ্চ রক্তচাপ), হৃদরোগ, মাথাব্যথা বা স্নায়বিক সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত শব্দযুক্ত পরিবেশে বড় হলে নারীর অনাগত সন্তান অঙ্গত্রুটি নিয়েই জন্মাতে পারে। গ্যাস্ট্রোএন্টেরলজির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, শব্দদূষণে হজমের সমস্যাও হতে পারে। রাজধানী ঢাকায় সিগন্যালগুলোতে একসাথে কয়েকশ গাড়ির হর্ন বাজানোকে শব্দদূষণের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০ থেকে ৫০ ডেসিবল। 

পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপে দেখা গেছে, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মানমাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে। এত শব্দদূষণে একজন স্বাভাবিক সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যেতে পারে। 

পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে। শব্দদূষণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে ২০০৬ সালে শব্দদূষণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও, তা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। বিধিমালা অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়ের সামনে এবং আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজানো, মাইকিং করা, সেই সাথে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে জোরে শব্দ সৃষ্টি করা আইনত দণ্ডনীয়। তবে সেই আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। 

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, বাংলাদেশের সর্বত্র সব ধরনের দূষণ সাংঘাতিকভাবে বেড়েছে। দূষণের মাত্রা শহরাঞ্চল থেকে গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। বায়ু, পানি ও শব্দসহ সব ধরনের দূষণ দেশবাসীর স্বার্থেই বন্ধ করার বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ দূষণে আমরা সবাই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। পার্থক্যটা হচ্ছে, বিত্তশালীরা দূষণের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুততার সাথে উন্নতমানের চিকিৎসা করিয়ে ফেলতে পারে, নিম্নবিত্তরা পারেন না; কিন্তু ক্ষতির হাত থেকে কারোরই রেহাই নেই। অতএব দূষণ নামক এই ভয়ঙ্কর দৈত্যকে রোধ করতে হবে। এ জন্য খুব বেশি অর্থ খরচের প্রয়োজন হয় না, শুধু মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে পারলেই হবে। ইউরোপের অনেক দেশে দূষণ সহনীয় মাত্রায় রাখা হয়। তারা নাগরিকদের সচেতন করে দূষণ রোধ করেন। আমাদের নাগরিকদের সচেতনতা বাড়াতে পারলেও আমরা দূষণ সহনীয় মাত্রায় রাখতে পারব। সচেতনতার বিকল্প নেই।  

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //