বরিশালের ১৮টি আ.লীগ ও ৩টিতে স্বতন্ত্র বিজয়ী

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বেশিরভাগ আসনেই আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। সেই সাথে বিজয়ী হয়েছেন মহাজোট মনোনীত প্রার্থীরাও। তবে জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ ৩টি আসনে বিজয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। নির্বাচনের মাঠে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে যেসব প্রার্থীরা আলোচনায় ছিলেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ হেরেছেন ভোটের বড় ব্যবধানে। দিনভর ভোট গ্রহণ এবং গণনা শেষে রবিবার রাতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ঘোষিত ফলাফল থেকে এমন তথ্যই মিলেছে।

জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলার ২১টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন দলীয় এবং স্বতন্ত্রসহ মোট ১২০ জন প্রার্থী। এর অনুকূলে ভোটার সংখ্যা ছিল ৭৪ লাখ ২৩ হাজার ৫২২ জন। তবে ভোটের দিন সকাল থেকে বেশিরভাগ কেন্দ্রেই ভোটারদের উপস্থিতি ছিল কম। তাই সল্প ভোটের ব্যবধানেই নিশ্চিত হয়েছে জয়-পরাজয়।

কম সংখ্যক ভোট পড়ায় সন্ধ্যার পর পরই কেন্দ্রে কেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণা শুরু হয়। এসময় ভোট কেন্দ্রের বাইরে বিজয়ী প্রার্থীদের সমর্থকরা আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন। তাদের দলীয় এবং জয় বাংলার স্লোগানে মুখোরিত হয় ভোটকেন্দ্র এলাকা। এছাড়া নির্বাচিত প্রার্থীদের নির্বাচনী কার্যালয়ে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত ভোটের ফলাফল ঘোষণার পাশাপাশি আনন্দ উল্ল্যাস করেন। এমনকি রাতে নির্বাচনী এলাকায় বিজয়ী প্রার্থীদের আতশবাজীর ঝলকানিতে আলোকিত হয় রাতের আকাশ।

রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বরিশাল জেলায় ছয়টি সংসদীয় আসনেই বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটের মনোনীত প্রার্থীরা। এর মধ্যে বরিশাল-১ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন আসনটির বর্তমান সংসদ সদস্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির আহবায়ক (মন্ত্রী), আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। বরিশাল-১ আসনে এটি তার টানা তৃতীয় বিজয়। নৌকা প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন এক লাখ ৭৬ হাজার ৭৭৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী ছেরনিয়াবাত সেকান্দার আলী পেয়েছেন মাত্র ৪ হাজার ১২২ ভোট। এক লক্ষ ৪০ হাজার ৮৯৯ রেকর্ড ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন তিনি।

বরিশাল-২ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আসনটিতে। উজিরপুর-বানারীপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে তিনি পেয়েছেন এক লাখ ২২ হাজার ১৭৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী একে ফাইয়াজুল হক রাজু পেয়েছেন ৩১ হাজার ৩৯৭ ভোট। ৯০ হাজার ৭৭৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন মেনন।

বরিশাল-৩ আসনে টানা দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন মহাজোট সমর্থিত জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপু। তিনি লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫১ হাজার ৫৮২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আতিকুর রহমান পেয়েছেন ২৪ হাজার ৬২৪ ভোট। এছাড়া ১৫ হাজার ৬৭৩ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য শেখ মো. টিপু সুলতান।

বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) আসনে তৃতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত বর্তমান সংসদ সদস্য পংকজ নাথ। তিনি ঈগল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন এক লাখ ৬১ হাজার ৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী মিজানুর রহমানের ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে পেয়েছেন ৭ হাজার ৬৪৫ ভোট।

মর্যাদার আসন বরিশাল-৫ (সদর ও সিটি করপোরেশন) আসনে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম। তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৭০৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন রিপন ‘ট্রাক’ প্রতীকে পেয়েছেন মাত্র ৩৫ হাজার ৩৭০ ভোট। ৬২ হাজার ৩৩৬ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন তিনি।

বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনেও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ মল্লিক বিপুল ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। রাত ১১টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি ১১৩টি মধ্যে ৯১টি কেন্দ্রে ৪৭ হাজার ৯৯২ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম চুন্নু ওইকটি কেন্দ্রে পেয়েছেন ৩২ হাজার ৪৫৯ ভোট। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আসনটিতে ভোট গণনা চলছিল।

বরিশালের ছয়টি আসন ছাড়াও বিভাগের বিভাগের বাকি পাঁচটি জেলায় আওয়ামী লীগ এবং মহাজোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে ভোলার চারটি আসনেই নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা। যারা আসনগুলোর বর্তমান সংসদ সদস্য।

এর মধ্যে ভোলা-১ আসনে তোফায়েল আহম্মেদ এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৯ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির শাহজাহান মিয়া পেয়েছেন ৫ হাজার ৯৮০, ভোলা-২ আসনে আলী আজম মুকুল এক লক্ষ ৫৯ হাজার ৩২৬ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জেপির গজনবী পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ১৯১ ভোট, ভোলা-৩ আসনে নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন এক লাখ ৭১ হাজার ৯২৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী জসিম উদ্দিন ঈগল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১৭ হাজার ৮৮৬ ভোট। ভোলা-৪ আসনে আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৪৪ হাজার ৩৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির মিজানুর রহমান পেয়েছেন ৫৯ হাজার ১৮ ভোট।

পটুয়াখালী জেলার ৪টি আসনে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটের প্রার্থীরা। এর মধ্যে পটুয়াখালী-১ আসনে জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী এবং মহাজোট সমর্থিত জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৮১ হাজার ৫০৮ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ কংগ্রেসের নাসির উদ্দিন তালুকদার পেয়েছেন ২৬ হাজার ৮৭৪ ভোট। সে হিসেবে ৫৪ হাজার ৬৩৪ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন রুহুল আমিন। পটুয়াখালী-২ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন আ.স.ম ফিরোজ। পটুয়াখালী-৩ আসনে এসএম শাহজাদা ৯৪ হাজার ৪১৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। পটুয়াখালী-৪ আসনে মাহিবুর রহমান মহিব পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

পিরোজপুরের তিনটি আসনে আওয়ামী লীগ এবং বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। এদের মধ্যে পিরোজপুর-১ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য ও প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী শ.ম রেজাউল করিম নির্বাচিত হয়েছেন। পিরোজপুর-২ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পরাজিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন মহারাজের কাছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মঞ্জুর এটিই প্রথম পরাজয়। মহারাজ ৯৪ হাজার ৫৪৪ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পেয়েছেন ৬১ হাজার ৯৯৬ ভোট। পিরোজপুর-৩ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী শামীম শাহনেওয়াজ।

বরগুনা-১ আসনের পাঁচ বারের সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ শম্ভুকে হারিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম সরোয়ার টুকু। তিনি ঈগল প্রতীক নিয়ে ৬১ হাজার ৭৪১ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম সরোয়ার ফোরকান পেয়েছেন ৫৮ হাজার ১৪৭ ভোট। তৃতীয় অবস্থানে থাকা বর্তমান সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ শম্ভু পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৯৮ ভোট। বরগুনা-২ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী সুলতানা নাদিরা ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।

এছাড়া ঝালকাঠি জেলার দুটি আসনেই আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। এরা হলেন- ঝালকাঠি-১ আসনে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর এবং ঝালকাঠি-২ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন ১৪ দলের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু।

এদিকে ভোটের ফলাফলে বিজয়ী প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরা সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও অভিযোগ তুলেছেন অনেক পরাজিত প্রার্থী। তাঁরা ভোটের পরিবেশ নিরপেক্ষ ছিল না বলে অভিযোগ তুলেছেন। তবে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও ভোটের পরিস্থিতি সার্বিকভাবে সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ ছিল বলে জানিয়েছেন স্ব স্ব জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

উল্লেখ্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ সংগ্রেস, জাসদ, সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট, এনপিপিসহ বিভিন্ন দলীয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। ৭৪ লাখ ২৩ হাজার ৫২২ জন ভোটারের জন্য ৮ হাজার ১১৬ জন পুরুষ ও নারীদের জন্য ৯ হাজার ১৮০টিসহ মোট ১৭ হাজার ২৯৬টি কক্ষ ছিল। অস্থায়ী ভোট কক্ষ ছিল আরও ১ হাজার ৩২০টি।

নির্বাচন সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে শুধুমাত্র বরিশাল জেলায় মোট ৪৭ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ১৩ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, র‌্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ সদস্য নিয়োজিত রয়েছে।

যার মধ্যে প্রতি আসনে র‌্যাবের ২টি করে ১২টি টহল টিম, মেট্রোপলিটন এলাকায় বিএমপি পুলিশের ১ হাজার ২৮০ জন সদস্য এবং জেলা পর্যায়ে জেলা পুলিশের ২ হাজার ১৭৩ জন সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। এর বাইরে সেনাবাহিনীর ৬০৮ জন, বিজিবির ১৭ প্লাটুন, কোস্টগার্ডের ১৫৯ জন নিয়োজিত রয়েছে। নদীবেষ্টিত হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে কাজ করছে কোস্টগার্ড সদস্যরা। তাছাড়া ১০ হাজার ৯২ জন আনসার সদস্যের মধ্যে ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করে ৯ হাজার ৯২৪ জন সদস্য।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //