শেরপুরের সাত নৃগোষ্ঠী: চারটি মাতৃভাষা হারিয়ে গেছে

ভারতের মেঘালয় রাজ্য সীমান্ত ঘেঁষা শেরপুর জেলায় গারো, বর্মণ, কোচ, হাজং, হদি, বানাই, ডালুসহ সাতটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। এদের রয়েছে নিজস্ব মাতৃভাষা। তবে বর্তমানে চর্চা কমে যাওয়ায় এবং নিজস্ব ভাষায় লেখাপড়ার সুযোগ না থাকায় অনেকেই তাদের মাতৃভাষা ভুলতে বসেছে। ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, পাঠ্যবই এবং শিক্ষক প্রয়োজন বলে দাবি জানিয়েছেন তারা। 

শেরপুরে গারো, হাজং ও কোচ ভাষা কোনোমতে টিকে থাকলেও অন্য ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে। ইতোমধ্যে সাতটি জনগোষ্ঠীর চার সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন তাদের ভাষা বলতে পারে। কিন্তু তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এ ভাষা শেখেনি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামীতে ওইসব সম্প্রদায়ের মানুষের ভাষা একেবারেই হারিয়ে যাবে। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় নিজস্ব বর্ণপরিচয়, চর্চা ও লেখাপড়ার সুযোগ না থাকায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। 

জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিশাল এলাকাজুড়ে গারো পাহাড় অবস্থিত। এখানেই বসবাস উল্লেখিত সাতটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের। এ ছাড়া শেরপুর সদর এবং নকলা উপজেলাতেও বেশ কিছু গারো-কোচসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। শেরপুরের বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস ফোরামের (এইচআরডি) সর্বশেষ তথ্য মতে, জেলায় গারো ২৬ হাজার, বর্মণ ২২ হাজার, কোচ ৪ হাজার, হাজং ৩ হাজার, হদি ৩ হাজার ৫০০, ডালু ১ হাজার ৫০০ এবং বানাই সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে মাত্র ১৫০ জন। তবে জেলার সরকারি হিসাবে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য নিজস্ব ভাষায় বই প্রকাশে ২০১০ সালে আইন প্রণীত হয়। সে মোতাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকের জন্য ছয়টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাষায় বই প্রণয়ন করে। সেগুলো হলো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল ও সাদ্রি ভাষা। তবে এসব ভাষার বই পড়ানোর জন্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি বিদ্যালয়গুলোতে। তবে আজ পর্যন্ত গারো ভাষার বই শেরপুরে পৌঁছায়নি। 

ঝিনাইগাতী উপজেলার শিক্ষার্থী অনুসৎ হাজং বলেন, ‘আমরা স্কুলে বাংলা ও ইংরেজি পড়ি। বাড়িতে গিয়েও বাংলা ভাষায় কথা বলি। আমাগো ভাষা বলবার পাই না।’ নালিতাবাড়ী উপজেলার সুকেন্দ্র চন্দ্র ডালু বলেন, ‘আমাদের ডালু গোষ্ঠী তো এহন হারিয়ে গেছে। আমরা কয়েকটা পরিবার আছি, কিন্তু ভাষাও হারিয়ে গেছে। কেউ এহন ডালু ভাষা পারি না।’ আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সংস্থার ভলান্টিয়ার শিক্ষক হদি সম্প্রদায়ের স্মৃতি রানী বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের চেহারায় আদিবাসীদের ছাপ থাকলেও আমাদের কোনো ভাষা নেই। আমাদের ভাষা হারিয়ে গেছে। আমরা এখন জানি না আমাদের ভাষা কী ছিল, কীভাবে বলত।’

হদি সম্প্রদায়ের নেতা তাপস চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘শেরপুর অঞ্চলের সাতটি নৃগোষ্ঠীর মধ্যে চারটির ভাষা হারিয়ে গেছে। কেবল গারো, কোচ ও হজংয়ের ভাষা কোনো রকমের টিকে আছে। হদি ভাষাটি ভারতের কিছু অঞ্চলের বোরো বা কাচারি ভাষা নামে পরিচিতি রয়েছে। আমি চেষ্টা চালাচ্ছি ওই ভাষার বর্ণমালা উদ্ধারের।’

ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (টিডব্লিউএ) কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আদিবাসী নেতা প্রাঞ্জল এম সাংমা বলেন, ‘আমাদের ভাষার বই সরকার থেকে দেওয়ার কথা থাকলেও অদ্যাবধি তা শিশুদের হাতে পৌঁছায়নি। এ ছাড়া পাঠদানের জন্য কোনো শিক্ষকও নেই। আমরা চাই আমাদের ভাষা টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হোক।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //