জানুয়ারিতে নতুন শিক্ষাক্রম পরীক্ষামূলক শুরু

এখনো নতুনভাবে বই লেখার কাজ শুরু হয়নি

আগামী বছর থেকে প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) নতুন শিক্ষাক্রম চালুর সিদ্ধান্ত হলেও, এখন পর্যন্ত এসব শ্রেণির বই লেখার কাজ শেষ করতে পারেনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে, সেগুলোও ঠিক করা হয়নি। অথচ আর মাত্র দেড় মাস পরেই নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হবে। এত কম সময়ে নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখা চূড়ান্ত করে তার আলোকে নতুন বই লেখা হলে তা মানসম্মত না হওয়ার আশঙ্কা আছে। এতে নতুন শিক্ষাক্রম ‘ভালো’ হলেও শুরুতেই তা বাস্তবায়নে গতি পাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, প্রথমে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল চলতি বছর থেকে কয়েকটি শ্রেণির শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাক্রমে বই পাবে; কিন্তু করোনার কারণে তা এক বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ঘোষণা দেওয়া হয়, আগামী বছর থেকে তা বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে আগামী বছরের জানুয়ারিতে প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি; মাধ্যমিকের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী বই পাবে। আর ২০২৩ সালে অষ্টম শ্রেণি ও ২০২৪ সালে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নতুন শিক্ষাক্রমের বই দেওয়ার কথা ছিল। এরপরে উচ্চ মাধ্যমিকের বই দেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু বছরের আর দেড় মাস বাকি থাকলেও এখনো শিক্ষাক্রমের রূপরেখাই অনুমোদন করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সবশেষ দুই মাস আগে নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও রূপরেখাটি এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুই মন্ত্রণালয়ের জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) যৌথ সভায় রূপরেখাটির চূড়ান্ত অনুমোদন হওয়ার কথা ছিল। অভিযোগ উঠেছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং এনসিটিবির মাধ্যমিক ও প্রাথমিক অধিশাখার কর্মকর্তাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান বলেন, পাঠ্য বই প্রণয়নের কাজ চলছে। তারা আশা করছেন, তাড়াতাড়িই বই লেখার কাজ শেষ হবে। আর পরীক্ষামূলকভাবে চালুর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণের কাজও চলছে।

নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হলেও প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য পূর্ণাঙ্গভাবেই পাঠ্যবই লিখতে হবে; কিন্তু প্রথম শ্রেণির জন্য এখনো বই লেখার কাজ শুরুই হয়নি। নির্দেশিকা ঠিক হলেও ষষ্ঠ শ্রেণির বই লেখার কাজ শুরু হয়নি।  বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আগামী বছর যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে যে শ্রেণিতে পরীক্ষামূলকভাবে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে, সেগুলোতে একসঙ্গে পুরো বই না দিয়ে অংশবিশেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এনসিটিবি। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষাক্রমের আলোকে যোগ্যতা অর্জন ও শিখনঘণ্টা হিসাব করে তিন বা চার মাসের জন্য ভাগ ভাগ করে বই দেওয়া হতে পারে। নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিদ্যমান পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (শিখনকালীন) বেশি হবে। আর এসএসসির আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষার কথা নেই নতুন শিক্ষাক্রমে। তাও শুধু দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে হবে এসএসসি পরীক্ষা। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটি পাবলিক পরীক্ষা হবে এবং এই দুই পরীক্ষার ফলের সমন্বয়ে এইচএসসির চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে। নতুন এই শিক্ষাক্রমকে শিক্ষাবিদরা ভালো বললেও, তা বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করেন তারা।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষাক্রমের রূপরেখাটি অনুমোদনের পর বিস্তারিত শিক্ষাক্রম প্রণয়ন শেষে পাঠ্য বই লিখতে হবে। পরে বই ছাপতে হবে। এসব কাজ করে ২০২২ সালে পরীক্ষামূলকভাবে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হলেও প্রথম ও ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য মানসম্মত বই লেখা যাবে কি-না, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৩ সেপ্টেম্বর নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখার বিষয়ে সম্মতি দেন। নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষাক্রমের রূপরেখা অনুমোদনের পর তার ভিত্তিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করার কথা। তার আলোকে হবে পাঠ্যবই। আগে প্রাথমিকের শিক্ষাক্রমের অনুমোদন দিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি)। আর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষাক্রমের অনুমোদন দিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এনসিসিসি; কিন্তু এবার যেহেতু প্রাক্-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত একসঙ্গে শিক্ষাক্রম হচ্ছে, তাই সিদ্ধান্ত হয়েছে দুই মন্ত্রণালয়ের এনসিসিসির যৌথ সভায় শিক্ষাক্রমের রূপরেখার অনুমোদন দেওয়া হবে; কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই কাজ করতে পারেনি দুই মন্ত্রণালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের (ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি) শিক্ষাক্রমের বিষয়ে ২১ অক্টোবর এনসিসিসি পুনর্গঠন করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে এই এনসিসিসির মোট সদস্য সংখ্যা ২১ জন। প্রাথমিকের এনসিসিসিও পুনর্গঠন করা হতে পারে। এরপর নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখার চূড়ান্ত অনুমোদন হতে পারে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জন্য সমন্বিতভাবে শিক্ষাক্রম তৈরির কাজ শুরু হলেও প্রাথমিকের প্রশাসন মনে করেছে, এতে তাদের মতামতকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের কর্তৃত্বও থাকছে না। এখানে বাইরের কিছু লোকের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যেভাবে শিক্ষাক্রমের খসড়া রূপরেখাটি তৈরি করা হয়েছে, তা বর্তমান বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ে প্রাথমিকের জন্য বাস্তবায়ন করাও কঠিন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এগুলো নিয়ে প্রাথমিকের প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে না বললেও ভেতরে ভেতরে নতুন শিক্ষাক্রমের বিপক্ষে কাজ করছেন। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও কাজটি ঠিকভাবে সমন্বয় করতে পারেনি। সর্বশেষ ২০১২ সালে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকের শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করা হয়েছিল। সাধারণত পাঁচ বছর পর পর শিক্ষাক্রম পরিমার্জন করা হয়।

২০২১ সাল থেকে ধাপে ধাপে নতুন শিক্ষাক্রমের বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে শ্রেণিকক্ষে পরীক্ষা নির্ভরতা কমাতে পাঠ্যসূচি যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয় সরকার; কিন্তু করোনার কারণে এক বছর পিছিয়ে আগামী ২০২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিকে ১ম, ২য় এবং মাধ্যমিকে ৬ষ্ঠ, ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নতুন শিক্ষাক্রমের বই তুলে দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়; কিন্তু নতুন পাঠ্যসূচি তৈরি করতে গিয়ে বিদেশি সংস্থা ও এনজিওকে বেশি প্রাধান্য, অতিমাত্রায় লার্নিং এডুকেশন (অভিজ্ঞতাভিত্তিক) করায় পাঠ্যসূচি কমিটির ওপর ক্ষুব্ধ হয় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিরা। এ নিয়ে এনসিটিবির ভেতরে চলে চরম দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব কাজের পুরো প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে বলে জানা গেছে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //