কার্ল সাগানের কসমস বিজ্ঞান অন্ধকারের প্রদীপ

আজ আমরা বিশ্বকে বোঝার জন্য একটি শক্তিশালী এবং চমৎকার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছি। এই পথ বা পদ্ধতিকে বিজ্ঞান বলে। এই পথ বিশ্বকে আমাদের কাছে এত প্রাচীন আর বিশাল হিসেবে প্রকাশ করেছে যে, মানবীয় বিষয়গুলোকে খুব ছোট মাপের মনে হয়। মহাবিশ্বের ধারণাকে দূরে রেখেই আমরা বেড়ে উঠেছি। প্রাত্যহিক ভাবনা থেকে মহাজাগতিক ভাবনা সম্পূর্ণ পৃথক বা অপ্রাসঙ্গিক এবং অতিদূরের বলে মনে হয়। কিন্তু বিজ্ঞান শুধু এটিই আবিষ্কার করেনি যে, বিশ্বের শুধু বিকাশ উন্মুখ সৌন্দর্য রয়েছে।

এখন এটি মানুষের পক্ষে শুধু অনুধাবন করাই সম্ভব নয় বরং এটিও দেখিয়েছে যে, অত্যন্ত বাস্তব ও নিগুড়ার্থে আমরা মহাবিশ্বের একটি অংশ। আমরা জন্মেছি এটি থেকে, আমাদের নিয়তি বা ভাগ্য এটির সঙ্গে জড়িত। মানবেতিহাসের সবচেয়ে মৌলিক ঘটনা এবং পেছনের তাৎপর্যহীন অতি সাধারণ ঘটনা, এসব কিছুই এই মহাবিশ্ব এবং তার উৎপত্তির সঙ্গে জড়িত। কার্ল সাগান তাঁর বিখ্যাত কসমস (Cosmos) গ্রন্থের ভূমিকাতে উপরোক্ত কথাগুলো বলেছেন এবং গ্রন্থটিকে ওই মহাজাগতিক প্রেক্ষাপট উন্মোচনের উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছে।

আয়োনীয়রা যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছিল এই বিশ্ব প্রাকৃতিক কিছু নিয়ম-শৃংখলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিশ্বের এই শৃঙ্খলাপূর্ণ বিস্ময়কর ও মুগ্ধকর চরিত্রকে বলা হয় কসমস বা মহাবিশ্ব। পিথাগোরাসই প্রথম কসমস শব্দটি ব্যবহার করেন একটি সুশৃঙ্খল ও সমন্বয়পূর্ণ বিশ্ব নির্দেশ করার জন্য- মানববোধগোম্যতার কাছে বশীভূত এক জগৎ। বিংশশতাব্দীর শেষার্ধে এসে জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী কার্ল সাগান যেন কসমস শব্দটি বোঝানোর উদ্দেশ্যেই বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ, মানুষের সঙ্গে মহাবিশ্বের সম্পর্ক, সামাজিক ঘটনাবলি ও বিজ্ঞানের ক্রমাগ্রগতি কীভাবে পরস্পরকে প্রভাবিত করে, মানবেতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকসহ বিস্ময়কর নাটকীয়তায় আবৃত্ত গ্রন্থ ‘কসমস’ রচনা করেন।


সাগান গ্রন্থটিতে প্রতি পদে সমাজের সাধারণ ঘটনাবলির সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্কগুলো তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি এগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে এমন এক আবেগ অনুভব করেছিলেন যে, আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিজ্ঞানের বর্ণনাকে তিনি কাব্যের পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলেন। সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছিলেন বিজ্ঞান কোনো বিরক্তিকর কঠিন বিষয় নয়। দেখতে জানলে এর সৌন্দর্য যে কোনো কিছু থেকেই বেশি।

১৯৮০ সালে ‘কসমস’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। কসমস বইটি ইংরেজি ভাষায় রচিত সবচেয়ে পঠিত বিজ্ঞান বইগুলোর একটি। এই বইটির প্রায় ৫০ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল। বইটি এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, কসমসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ১৩ পর্বের টিভি সিরিজটি ৬০টি দেশের প্রায় ৫০ কোটি দর্শক মোহিত হয়ে দেখেছিলেন। এই সিরিজটি ১৯৮৫ সালের দিকে বাংলাদেশের টেলিভিশনেও দেখানো হয়েছিলো। তবে এই নিয়ে আলোচনা সমালোচনা কখনো চোখে পড়েনি। আমি নিজেও কসমস ও কার্ল সাগানের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম এই টিভি সিরিজের মাধ্যমে।

কসমসের এই হার্ডকভার সংস্করণের ২৫০টির অধিক রঙ্গিন ছবি থাকলেও শুধু অল্প কয়েকটি ছবি সুলভ সংস্করণে স্থান পেয়েছে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সমস্ত অন্তর্ভুক্ত ছবিগুলোই টেক্সট বোঝার জন্য প্রয়োজনীয়। 

কসমস গ্রন্থের ভূমিকাতে খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ বছর পূর্বের একটি কবিতার উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, প্রাচীনকালে প্রাত্যহিক কথাবার্তা ও রীতি-নীতির ভেতরে সবচেয়ে পার্থিব ঘটনা প্রবাহও মহাজাগতিক ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রাচীন পূর্বপুরুষদের কল্পনায় ওই ধরনের বিশ্বে মানুষরা কেন্দ্রীয় না হলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। আমরা প্রকৃতির বাকি অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কসমস গ্রন্থটিতে ভূমিকা ছাড়াও ১৩টি অধ্যায় আছে, প্রতিটি অর্ধ্যায়ের আছে কাব্যময় শিরোনাম এবং অধ্যায়গুলো পরস্পরের সঙ্গে একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক তৈরি করেছে আবার এগুলোকে স্বতন্ত্র হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি, মহাজাগতিক ঐক্যতানে এক অনুপম সুর, জগতের শৃংখলা, স্বর্গ ও নরক, একটি লাল গ্রহের জন্য নীল, পথিকের গল্প, রাত্রির মেরুদণ্ড, স্থান ও সময়ের ভিতর পরিভ্রমণ, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, চিরকালের প্রান্ত, স্মৃতির আঁধার, এনসাইক্লোপেডিয়া গ্যালাক্টিকা, কারা পৃথিবীর জন্য কথা বলবে?

মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি

কসমসের প্রথম অধ্যায়, মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি বা দ্য শোর অব কসমিক ওশান এ বলা হয়েছে যে, মানব-প্রজাতি বিবর্তিত হয়েছে বিস্মিত হওয়ার জন্য, সে বিস্ময়-নিবৃত্তি হচ্ছে ‘আনন্দ’ আর বেঁচে থাকার পূর্ব শর্ত হচ্ছে ‘জ্ঞান’। সাগান এখানে বিশালতায় ভরা বিশ্বকে আমাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, বিশ্বের সংজ্ঞায় বলেছেন যা কিছু আছে, যা কিছু ছিল আর যা কিছু থাকবে, তার সবটা মিলেই হচ্ছে এ মহাবিশ্ব। গ্যালাক্সি, গ্রহ নক্ষত্রের বর্ণনাসহ তাদের অপরূপ সৌন্দর্যের কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। সেই সঙ্গে এই অপরিমেয় বিশালতার ভরা মহাবিশ্ব সম্পর্কে কতটা জানি সে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, এই জানার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের টিকে থাকা।

কসমসে পৃথিবীকে মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখান থেকেই মানবজাতির দীর্ঘভ্রমণ আরম্ভ হয়েছে। এই বেলাভূমি থেকে বিশ্বকে জানার জন্য কেবল আমরা সমুদ্রে পায়ের গোড়ালি ডুবিয়েছি। এই বেলাভূমি থেকে মহাশূন্যের মহাজাগতিক সাগরে সাঁতার কাটার প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে ভূমিকা নিয়েছে মিসরের কসমোপলিটন শহর আলেক্সান্দ্রিয়া, বর্ণনা করেছেন সেখানকার অসাধারণ প্রতিভাবানদের কথা। ভূমধ্যসাগরের তীরে এই শহর পরিণত হয়েছিল আন্তঃসভ্যতার মিলন মেলায়। যেখানে বিশ্বের তাবৎ জ্ঞানীরা একত্রিত হয়েছিল। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গবেষণার জন্য তাদের ছিল ১০টি বিশাল গবেষণাকক্ষ।

আধুনিক সভ্যতার মূল বিষয়গুলো- গণিতশাস্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ভূগোল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদি সবকিছুরই গোড়াপত্তন হয়েছিল এই গ্রন্থাগারে। এক অর্থে পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ও বলা যায়। এর উদ্যোক্তারা সারা পৃথিবীর ভাষা সংস্কৃতি চষে বেড়িয়েছিল তাদের সংগ্রহের আকাক্সক্ষা পূর্ণ করতে, তাদের লোকেরা টাকার থলে নিয়ে দেশে দেশে যেত বই কেনার জন্য। আলেক্সান্দ্রিয়া বিশাল সমুদ্র-বন্দর হওয়ার কারণে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত জাতির লোক এখানে আসতো ব্যবসা, বসবাস ও জ্ঞান অর্জন করতে।

এই নগরীতে গ্রিক, আরবীয়, মিসরীয়, হিব্রু, পারসিক, নুবিয়ান, সিরিয়ান, আইবেরিয়ান, ফিনিসীয়, ইতালীয়, গল এমনকি ভারত থেকেও লোক আসতো এবং ভাবের আদান-প্রদান হত, বিভিন্ন জাতির সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হতো। সম্ভবত এই নগরীতেই কসমোপলিটন শব্দটি প্রকৃত অর্থ খুঁজে পেয়েছিল- যেন তারা একটি জাতি বা দেশের নাগরিক নয় বরং মহাবিশ্বের নাগরিক।

গ্রন্থাগারের সেলফগুলোতে স্যামসের জ্যোতির্বিদ অ্যারিস্টোকার্সের লেখা একটি বই ছিল, সে যুক্তি-প্রমাণ দ্বারা বলেছিল পৃথিবী হলো গ্রহগুলোর একটি, যা অন্যান্যগুলোর মতোই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে এবং নক্ষত্রগুলো বিশাল দূরত্বে অবস্থিত। এই সিদ্ধান্তগুলোর প্রত্যেকটি সম্পূর্ণভাবে সঠিক হওয়ার পরও আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় দু’হাজার বছর এগুলো পুন আবিষ্কারে। এই ধরনের রচনা হারানোর মতো লক্ষাধিক ক্ষতিকে বিবেচনায় ধরলে ধ্রুপদ ও প্রাচীন সভ্যতার কীর্তির বিশালতা এবং এর ধ্বংসের ভয়াবহতার আমরা মর্ম উপলব্ধি করতে পারবো। যদিও হাতে লেখা পেপিরাসের স্ক্রলের সংখ্যা অনুমান করা দুঃসাধ্য; তবু মনে করা হয় সম্ভবত পুস্তকের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লক্ষ।

ধ্রুপদী বা প্রাচীন সভ্যতায় এমন কিছু ঘটেছিল যা তাদেরকে নানাভাগে বিভক্ত করে ফেলে এবং ফলশ্রুতিতে গ্রন্থাগার আপনি ধ্বংস হয়ে যায়। গুটিকয়েক রচনাশৈলীর বিচ্ছিন্ন টুকরোসহ কর্মকা-ের খুবই অল্পই অংশ টিকেছিল। কী প্রচণ্ড কৌতূহলপূর্ণ কিন্তু নাগালের বাইরে ওই অংশ ও টুকরোগুলো! সাগান গ্রন্থের সর্বত্র প্রশ্ন করেছেন, কী এমন ঘটে যাতে একটি উন্নত সভ্যতা নির্দিষ্ট স্তরে এসে ধ্বংস হয়ে যায়? নিজের আগুনে নিজে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় কেন? ধারণা করা হয় গ্রন্থাগারে ব্যাবিলনের এক যাজক বেরোসাসের লিখিত তিনখণ্ডে সমাপ্ত প্রাচীন পৃথিবীর ইতিহাস ছিল যা আমাদের কাছে আর পৌঁছয়নি। এর প্রথম খন্ডে সৃষ্টিপর্ব থেকে নূহের প্লাবন পর্যন্ত সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যে সময়কে তিনি ৪ লাখ ৩২ হাজার বছর বলেছেন অথবা ওল্ড টেষ্টামেন্টে উল্লিখিত সময়পঞ্জির চেয়ে তা শতগুণ বেশি। অতীত ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানের অপূরণীয় ফাঁক থাকার এটিও একটি কারণ।

মহাজগতিক ঐক্যতানে এক অনুপম সুর

গ্রন্থটির এ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, পৃথিবী ছাড়া যে অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র আছে সেখানে কী প্রাণ নেই। যদি থাকে সেই প্রাণ কেমন হবে? কিসের দ্বারা তৈরি হবে? পৃথিবী জীবকুল যেমন কার্বন অনুর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাণ উৎপত্তির পূর্বে একটা সময় ছিল, যখন পৃথিবীটা অনুর্বর এবং সম্পূর্ণ বিরান ভূমি ছিল। কেমন করে প্রাণের অনুপস্থিতিতে কার্বনভিত্তিক জৈব অণুগুলো তৈরি হয়েছিল? প্রথম জীবন্ত বস্তুগুলোর উদ্ভব কীভাবে ঘটেছিল? কেমন করে প্রাণ মানুষের মতো জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোয় পৌঁছলো, যারা মহাজাগতিক রহস্যের উন্মোচনে বিরামহীনভাবে কাজ করে চলেছে? বহিঃর্জাগতিক প্রাণের অস্তিত্ব যদি থাকে তবে তা কি দেখতে পৃথিবীর মতো হবে? নাকি হতবুদ্ধিকরভাবে ভিন্ন পরিবেশের কাছে অন্য ধরনের অভিযোজন। আর কী কী সম্ভব? কার্ল সাগানের গুরুত্ব অনুধাবন করাতে গিয়ে একটি দার্শনিক উক্তি করেছেন, পৃথিবীতে প্রাণের প্রকৃতি এবং আর কোনো জায়গায় প্রাণ আছে কিনা তার অনুসন্ধান করা হলো একই প্রশ্নের দুটো দিক - তাহলো আমরা কে তার অনুসন্ধান।

গ্রহ-নক্ষত্র ও এদের মধ্যবর্তী শুন্যস্থান পরীক্ষা করে জৈব অণুর প্রাচুর্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, বোঝা যায় প্রাণের উপাদান সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। পর্যাপ্ত সময় দেওয়া গেলে প্রাণের উৎপত্তি ও বিবর্তন হলো মহাজাগতিক অবশ্যম্ভাবিতা (cosmic inevitability)। কিন্তু জগতের স্বল্প অংশেই বুদ্ধিমত্তা ও সভ্যতার বিকাশ ঘটে থাকতে পারে, যারা হয়তো আমাদের থেকে এগিয়ে আছে। এ সব বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে পৃথিবীতে জীবনের বিকাশ, বুদ্ধিমত্তার উন্নতি, প্রাণ রসায়নের কথা, বিবর্তনের কথা নিয়ে আসা হয়েছে, আনা হয়েছে চার্লস ডারউইন ও রাসেল ওয়ালেসের প্রাকৃতিক নির্বাচনের কথা।

পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তনকে প্রাঞ্জলভাবে বর্ণনা করেছেন ডারউইন ও ওয়ালেসের তত্ত্বকে সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরবার জন্য। উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন জাপানের অভ্যন্তরীণ সাগর দানো-উরাতে হেইকি কাকড়াকে। এই কাকড়া কীভাবে ৯ শত বছরের মধ্যে জাপানী সামুরাইদের মুখচ্ছবির ছাপসহ কৃত্রিম নির্বাচনের অবতারণা করেছেন। বিবর্তনবিদ্যাকে অনুধাবন না করার কারণ হিসেবে বলেছেন, বিবর্তনের মূলমন্ত্রই হলো মৃত্যু ও সময়- এটি হলো অসংখ্য প্রাণরূপের, সেই মৃত্যু যারা পরিবেশের সঙ্গে অসম্পূর্ণরূপে অভিযোজিত হয়েছিল; আর এটি হলো সেই সময় যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিব্যাক্তির (মিউটশনে) দীর্ঘ পর্যায়ক্রমের জন্য ব্যয়িত হয়েছে, যেগুলো ঘটনাক্রমে অভিযোজিত হয়েছিল। ইয়নের চেয়ে অনেক ছোট যে সহস্রাব্দ তাঁকে বোঝার ক্ষেত্রেও আমরা দূর্বোধ্যতার সম্মুখীন হই। এর ফলেই ডারউইন ও ওয়ালেসের মতবাদ অনুধাবন করতে অসুবিধা হয়, এক ধরনের বিরোধিতা গড়ে ওঠে।


জ্যোতিবিজ্ঞানী সাগান কসমস গ্রন্থে ডিএনএর কথাও বলেছেন। এই ডিএনএ বা ডি-অক্সি রাইবো নিউক্লিক এসিড, প্রাণীদেহে কীভাবে কাজ করে তার সামান্য পরিবর্তনে কতটুকু পরিবর্তন হতে পারে তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। মানুষের ডিএনএ হলো শতকোটি নিউক্লিওটাইডের সমান লম্বা একটি মই। নিউক্লিওটাইডের সম্ভাব্য সমাবেশগুলোর বেশিরভাগই অর্থহীন: তারা যে-সমস্ত প্রোটিন সংশ্লেষণ ঘটায় তা কোনো উপযোগী কার্যক্রম সম্পন্নই করতে পারে না। নিউক্লিক এসিডগুলোকে একত্রে রাখার উপযোগী সংখ্যাও হতবুদ্ধিকরভাবে বিপুল- সম্ভবত বিশ্বে ইলেক্ট্রন প্রোটনের সর্বমোট সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। সেই মতানুসারে এ পর্যন্ত যত মানুষ বাস করে গেছেন তার চেয়েও ব্যাপক সংখ্যক স্বতন্ত্র মানুষ সম্ভব।

অতএব, মানব প্রজাতির নতুন অস্তিত্বের সম্ভাবনার বিস্তৃতি হলো অপরিমেয়। মানুষের কালো ও সাদা রঙের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন, ইউরোপের মানুষের রক্তের লোহিত কণিকা স্থুলভাবে বর্তুলাকার দেখায়, আর আফ্রিকার মানুষের রক্তের লেহিত কণিকা সিকল বা অর্ধচন্দ্রের মতো দেখায়। সিকল কোষ অপেক্ষাকৃত কম অক্সিজেন বহন করে এবং এক প্রকারের রক্তস্বল্পতা ঘটায়। ফলে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধ তৈরি করা সম্ভব হয়। বলা বাহুল্য মৃত্যুর চেয়ে রক্তস্বল্পতা অধিক ভাল। মানুষের সাধারণ কোষে ডিএনএ-তে এক হাজার কোটির বাইরে একটি একক নিউক্লিটাইডের পরিবর্তনেই এটা ঘটে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো আমরা এখনো অন্যান্য বেশিরভাগ নিউক্লিটাইডের পরিবর্তনের ফলাফল সম্পর্কে অজ্ঞ।

পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী দুটো প্রাণও প্রাণরাসায়নিকভাবে বহির্জাগতিক প্রাণের চেয়ে অনেক ঘনিষ্ট। এ প্রসঙ্গে উক্ত প্রবন্ধে কার্ল সাগান বলেছেন, ‘জীববিজ্ঞানের শুধু একটি প্রকার নিয়ে, প্রাণসংগীতের একটি নিঃসঙ্গ সূর নিয়ে কাজ করে। হাজার হাজার আলোকবর্ষ বিস্তৃত এই বেণু বাশের ক্ষীণ রেশটি কি একমাত্র পরিপূর্ণ সূর? কিংবা এমন কি হতে পারে না যে শতকোটি কন্ঠ অজস্র রাগ-রাগিনী ও সুরময় গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে কখনো সুরে কখনো বেসুর ঐক্যতানে জীবন সংগীত গেয়ে যাচ্ছে গ্যালক্সি থেকে গ্যালাক্সিতে?’

পদার্থবিজ্ঞানের চেয়ে ইতিহাসের সাথেই জীববিজ্ঞানের বেশি মিল। বর্তমানকে বোঝার জন্য আমাদেরকে জানতে হবে অতীতকে এবং জানতে হবে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিস্তৃতির মধ্যদিয়ে। জীববিজ্ঞানে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক তত্ত্ব ((predictive theory) নেই, যেমন নেই ইতিহাসে। আমরা আমাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানি অন্যক্ষেত্রগুলোকে বোঝার দ্বারা। তারা কি পর্যায়ের প্রাণ, বর্হিজাগতিক প্রাণের একটি ঘটনা জীববিজ্ঞানের বিস্তৃতিকে বৃদ্ধি করবে। প্রথমবারের মতো জীববিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবে আর কী কী ধরনের প্রাণ কাঠামো সম্ভব। যখন আমরা বলি বহির্জাগতিক প্রাণের অনুসন্ধান খুবই গুরুত্বপূর্ণ তখন এ কথা বোঝাই না, যে আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি বহির্জাগতিক প্রাণের ব্যাপারে- আমরা শুধু একথা বলতে চাচ্ছি যে, এই অনুসন্ধান মূল্যবান।

মহাজগতের ঐক্য

মহাজগতের শৃঙ্খলা পর্বে সাগান আরম্ভ করেছেন, বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও প্রথমদিককার কল্পকাহিনীর লেখক জোহানস কেপালারের একটি উক্তি দিয়ে, ‘আমরা জিজ্ঞেস করি না কী উপকারের উদ্দেশ্যে পাখীরা গান গায়? কারণ গান হলো তাদের আনন্দ, যেহেতু তাদের সৃষ্টি হয়েছিল গান গাওয়ার জন্য। অনুরূপভাবে, আমাদের জিজ্ঞাসা করা ঠিক হবে না কেন মানব মন অস্থির বা বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে মহাকাশের রহস্য উম্মোচনে বা অনুধাবনে। চারপাশের ঘটনাবলী যদি খুব বেশি অপরিবর্তীত থাকলে তার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা যেত না, আবার বেশি বিশৃঙ্খলাপূর্ণ থাকলে সেখানেও কিছু করা যেত না, সৃষ্টি হতো না বিজ্ঞানের জন্য আবেগ।

কিন্তু আমরা এই দুইয়ের মাঝামাঝি এমন একটি জগতে বসবাস করি, যেখানে বস্তুর পরিবর্তন ঘটে, তবে নিয়মানুসারে। শৃঙ্খলাকে প্রকৃতির নিয়ম বলে ডাকি। কোনো লাঠিকে ওপর দিকে বাতাসের মধ্যে নিক্ষেপ করলে, এটা সর্বদা নিচের দিকে পড়বে। যদি সূর্য পশ্চিমদিকে অস্ত যায়, এটা সর্বদা আবার পরবর্তী সকালে পূর্ব দিকে উদিত হবে। সূতরাং এর বৈশিষ্ট্য বা নিয়মকানুনকে বের করা সম্ভব হবে। আমরা বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে আমাদের জীবন-যাপনকে উন্নত করতে পারি। বর্তমানের কোনো প্রাযুক্তিক সুবিধাই ছাড়াই মানব অস্তিত্বের বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত হয়েছিল। ক্যাম্পফায়ারের নিভন্ত আগুন আর চন্দ্রহীন রাত্রির মধ্যদিয়ে, আমরা তখন নক্ষত্রকে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম।’

নির্দিষ্ট কিছু নক্ষত্রগুলো ওঠে ঠিক সূর্য ওঠার পূর্বে এবং অস্ত যায় সূর্য ডোবার পরে। যুগের প্রবাহে, মানুষেরা শিক্ষা নিয়েছিলো তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। আরও সঠিকভাবে আমরা জেনেছিলাম সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রের অবস্থান সম্পর্কে, আরও নির্ভরযোগ্যভাবে আমরা ভবিষ্যদ্বানি করতে পেরেছিলাম শিকারের সময়কে, বীজ বপনের এবং ফসল কাটার সময়, আদিবাসিদের একত্র করার সময়। মানুষ সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্রের দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিলেন জীবনের প্রয়োজনে। এভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞানকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল।

টলেমি থেকে আরম্ভ করে টাইকোব্রাহে, কোপার্নিকাস, কেপলার হয়ে নিউটন পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের উন্নতি তুলে ধরেছেন। অন্ধকারযুগে টলেমির প্রতিরূপগুলো চার্চের সহযোগিতায় এক সহস্রাব্দ ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতি বাঁধা সৃষ্টি করেছিল। অবশেষে ১৫৪৩ সালে, নিকোলাস কোপার্নিকাস নামের একজন পোলিশ ক্যাথলিক গ্রহগুলোর আপাত গতিকে একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকল্পের ব্যাখ্যা করেন। এর সবচেয়ে মারাত্মক প্রবন্ধটি ছিল ওই প্রস্তাবনাটি যে, পৃথিবী নয় সূর্যই, ছিল বিশ্বের কেন্দ্রে।

জোহানস কেপলারের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সাগান বলেন, তার জন্ম এমন এক সময় যখন ভূ-কেন্দ্রিক ও সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব ধারণার দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেকার টানাপোড়েনের দ্বন্দ্বে পৃথিবী আলোড়িত হয়েছিল। যুগ সন্ধিক্ষণের এই সময়টা ছিল ষষ্টদশ ও সপ্তদশ শতাব্দী। কেপলারের ব্যক্তিত্বের মধ্যে ছিল টলেমির মতো জ্যোতিষবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যার দ্বৈত অবস্থান। তার সময়ে মানবীয় উদ্দীপনাগুলো ছিল পায়ের বেড়িতে বাধা এবং মানসিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ। সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের চেয়ে দেড় সহস্রাব্দ পূর্বের গির্জার মতটিকে চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করা হয়েছিলো।

কিন্তু মহাবিশ্বের সৃজনশীল ক্ষমতাই কেপলারের ঈশ্বর ছিলেন। তিনি বালক বয়সে অদম্য কৌতুহলো দিয়ে সেই সময়কার ধর্মীয়বিশ্বাস বা প্রচলিত সামাজিক অনুশাষন বা ভয়কে জয় করেছিলেন। তিনি জগতের পরিণতি জানতে চেয়েছিলেন, মানবজাতির শেষ গন্তব্য অনুধাবনে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন, ঈশ্বরের মনকে বুঝতে সাহসি হয়েছিলেন। কেপলারের গাণিতিক জীবনের আনন্দ, ইউক্লিডীয় জ্যামিতির প্রভাব, জ্যামিতির সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক কেপলারের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একটি সৌরকেন্দ্রিক বিশ্ব মিলে গিয়েছিল, তাই তিনি এই ধারণাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন পরম আবেগে। সূর্য হলো একটি ঈশ্বরের রূপক, যার চারিদিকে বাকী সবকিছু আবর্তন করে।

আমরা প্রকৃতির নিয়মানুসারে ছুটে চলি যা কেপলার প্রথম আবিষ্কার করেছিল। যখন আমরা গ্রহের উদ্দেশ্যে মহাকাশযান পাঠাই, পর্যবেক্ষণ করি যুগ্ম নক্ষত্র, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি দূরবর্তী গ্যালাক্সির গতি, তখন আমরা বিশ্বের সর্বত্র কেপলারের নিয়মকে মেনে চলাকেই অবলোকন করি। কেপলারের গ্রহগতি সংক্রান্ত তিনটি নীতিমালা শৃংখলা, সৌন্দর্য, গতিকে ব্যাখ্যায় এমন এক গাণিতিক সূত্রের দিকে নিয়ে যায় - যা আমাদের পিথাগোরাসের অনুভবের কাছে পৌঁছে দেয়। ঘড়ির নিয়মকানুনে চলা জগৎকে তিনি ডেকেছিলেন দ্য হারমনি অব দ্য ওয়ার্ল্ড বলে।

কেপলার বলেছিলেন ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান হলো পদার্থবিজ্ঞানের অংশ।’ কার্ল সাগান বলেছিলেন কেপলার দাঁড়িয়েছিলেন ইতিহাসের চূড়ায়; তাকে বলা যায় শেষ বৈজ্ঞানিক জ্যোতিষী এবং প্রথম জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী। তিনি বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য, তার তত্ত্বকে প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য সায়েন্স ফিকশন লিখেছিলেন। নাম Somnium, The Dream চন্দ্রপৃষ্ঠে দাঁড়ানো অভিযাত্রীর ঘূর্ণনরত পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করা।

সাগান বলেছেন, যিনি একই সঙ্গে সায়েন্স ফিকশনের স্রষ্টা আবার কোপার্নিকাস গ্যালিলিও সারির বিজ্ঞানী ছিলেন। আজ অভিযাত্রীরা কম্পিউটার, রোবট ব্যবহার করে মহাশূন্যের বিশালতায় অনুসন্ধান পরিচালনা করে চলেছে এবং পথ চলছে গ্রহগতির তিনটি সূত্রের নির্দেশনায় যা কেপলার তার জীবনব্যাপী কঠোর পরিশ্রমে উন্মোচন করেছিলেন। 

কার্ল সাগান খেদের সঙ্গে বলেছেন- এত সংগ্রাম, এত কষ্ট, ত্যাগের মধ্যে এসেও সমসাময়িক পশ্চিমা সমাজে, পত্রিকাগুলোতে জ্যোতিষশাস্ত্রের ওপর প্রতিদিন একটি কলাম বের হয়; সেখানে সপ্তাহে জ্যোতির্বিদ্যার ওপর একটি কলাম প্রকাশ এখনো দুর্লভ ব্যাপার। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্যোতির্বিদ থেকে দশগুণ বেশি জ্যোতিষবিদ আছে। আর বাংলাদেশ বিজ্ঞানচর্চা থেকে বহু দূরে। সাগান এই গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আমেরিকার দক্ষিণ পশ্চিমের গভীর গিরিখাতের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের আর্তনাদ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা ৪০ হাজার প্রজন্মের নারী-পুরুষের পৃথিবীতে সংগ্রামের কথা, বর্তমানে আমরা ছাড়া আর কেউ নেই তা শোনার জন্য, যাদের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না। যাদের ওপর ভিত্তি করে আমাদের সভ্যতা দাড়িয়ে আছে।

স্বর্গ ও নরক 

স্বর্গ ও নরক বা হেভেন অ্যান্ড হেলো অধ্যায়ে সাগান দেখিয়েছেন- পৃথিবী একটি মনোরোম জায়গা, অন্তত আমাদের মতো প্রাণের জন্য। অথচ আমরা ক্রমাগত বিপরীতভাবে গ্রহের ক্ষতি করে চলেছি। একদিকে জীবাশ্মজ্বালানি ব্যবহার করে গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীকে শুক্র গ্রহের ভয়াবহ পরিবেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছি আরেকদিকে বন-জঙ্গল, গাছ ও তৃণভূমিকে কেটে ‘অ্যালবেডো’ প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গলের প্রাণহীন অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছি। এছাড়াও ধুমকেতু, উল্কাপিন্ডের আঘাতে নির্দিষ্ট সময় পরপর পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশ ভালো রকমের আছে। তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলো তাঙ্গুসকার সেই ১৯০৮ সালের সেই বিস্ফোরণ যা ধমকেতুর আঘাতে বিস্ফোরিত হয়েছিল।

বিস্ফোরণের ফলে লন্ডনের রাস্তায় গভীর রাতে পত্রিকা পড়া গিয়েছিল। আমাদের মনোরম নীল গ্রহ হলো পৃথিবী, এটা হলো আমাদের বাড়ি। শুক্র হলো খুবই উত্তপ্ত, মঙ্গল হলো খুবই ঠান্ডা। কিন্তু পৃথিবী সঠিক অবস্থায় আছে। ওই গ্রহগুলোর তুলনায় পৃথিবী হলো মানবপ্রজাতির জন্য একটি স্বর্গ। মোটের ওপর আমাদের উদ্ভব এখানে ঘটেছে। কিন্তু এই উপযোগী স্থানীয় জলবায়ু অস্থায়ী হতে পারে। আমরা ক্রমাগতভাবে আমাদের গ্রহকে মারাত্বক এবং বিপরীত উপায়ে ক্ষতি করে চলেছি। আমরা কি মারাত্মক পরিণতির কোনো প্রক্রিয়াকে জাগিয়ে তুলছি, যা শুক্র গ্রহের নারকীয় পরিবেশ অথবা মঙ্গলের বৈশ্বিক বরফযুগের পরিবেশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? এর সহজ উত্তর হলো কেউ জানে না।

প্রায় ৩০-৪০ লাখ বছর আগে মানুষের আগমন ঘটেছিল পৃথিবীতে। ৪৫০ কোটি বছরের ইতিহাসে নানারকম ভূতাত্ত্বিক ও জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবী এ পর্যায়ে এসেছে। বর্তমানে আমরাই বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রাযুক্তিক উৎকর্ষের মাধ্যমে এমন একটি পর্যায়ে এসেছি, যাতে এর জলবায়ুকে আমরা প্রভাবিত করতে পারি। কীভাবে আমরা এই শক্তি ব্যবহার করবো তার ওপর নির্ভর করছে এই পৃথিবীর ভবিষ্যত। পৃথিবীর সম্পদের ওপর স্বল্পমেয়াদি সুবিধার মূল্য দেব না দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার মুল্য দেব। যার ভিত্তিতে পরবর্তী প্রজন্মের শিশুরা নিরাপদ থাকে। দীর্ঘ সময়ের ভিত্তিতে চিন্তা করলে আমাদের শিশু অথবা গ্রান্ড শিশুদের জন্য উদ্বিগ্ন হওয়াই এখন স্বাভাবিক। এই শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যত এবং আমাদের গ্রহে জটিল জীবন কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে হলে এই গ্রহকে ভালোবাসা জরুরি। 

তাই বিজ্ঞান সম্পর্কে আমাদের ধারণা আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। মাথায় রাখতে হবে বিজ্ঞান হলো- সংশোধনযোগ্য উদ্যোগ। গ্রহণযোগ্য হতে গেলে, সব ধরনের শক্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে টিকে থাকতে হয়। মুক্তচিন্তার দ্বারা বিজ্ঞান সৃষ্ট এবং মুক্ত চিন্তার প্রতি তা নিবেদিত : কোনো প্রকল্প যত অদ্ভুতই হোক না কেন ধারণাটি, যে গুণগত মান অনুসারে বিবেচনার দাবী রাখে। ধর্ম ও রাজনীতির বা ভাবধারার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যত অস্বস্তিকরই হোক, যুক্তি ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ক্ষেত্রে শক্তিশালী হলে তাকে বিবেচনায় নিতে হবে।

লালগ্রহের জন্য নীল

একটি লালগ্রহের জন্য নীল বা দ্য ব্লু ফর রেড প্ল্যানেট এ সাগান পুরোটাই মঙ্গল গ্রহ নিয়ে লিখেছেন। তিনি প্রশ্ন করেছেন, মঙ্গল নিয়ে কেন মানুষের এত আগ্রহ, এত মাথা ব্যাথা? কেন শনি গ্রহ নয়, কেন প্লুটো নয় কেন অন্যগ্রহ নয়। তার কারণ হিসেবে প্রথম দৃষ্টিতে মঙ্গল দেখতে অনেকটা পৃথিবীর মতো। এটা সবচেয়ে কাছের গ্রহ যার পৃষ্ঠ আমরা দেখতে পাই। যার দুই মেরুতে আছে বরফের টুপি, বয়ে যাওয়া সাদা মেঘের ভেলা, প্রচণ্ড ধূলিকণার ঝড়, ঋতু অনুযায়ী পরিবর্তন ঘটে মঙ্গলের লাল পৃষ্ঠে, এমন কি ২৪ ঘণ্টায় দিনরাত্রি হয়।

এইগুলো আমাদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছিল মঙ্গল গ্রহকে প্রাণী অধ্যুষিত জগত হিসেবে। এইভাবে মঙ্গল পরিণত হয় এক ধরনের উপকথার জগতে। যার ওপর আমরা মেলে ধরেছিলাম পৃথিবীর আশা-নিরাশার ছায়া। মঙ্গলকে ঘিরে অবশ্য পৌরাণিক কাহিনী বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ববিষয়ক প্রথম গ্রন্থ জেনেসিসের মতোই প্রাচীন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল প্রকৌশলিক বিস্ময়, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল বিশাল বিশাল সব খাল কাটার কাহিনী: সুয়েজ খাল সম্পূর্ণ হলো ১৮৬৯ সালে; করিন্থ খাল হলো ১৮৯৩-এ; পানামা খাল তৈরি হলো ১৯১৪ সালে; এবং গ্রেট লেক লক, আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সেচ খালগুলো। যদি ইউরোপ আমেরিকার লোক এই ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে পারে, কেন তাহলে মঙ্গলবাসীরা পারবে না? সেখানে কি এমন হতে পারে না প্রাচীন ও জ্ঞানী প্রজাতিরা লাল গ্রহের শুষ্কতার বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত চেষ্টা ও সাহসী সংগ্রামে লিপ্ত? এসব ঘটনা সত্যি হিসেবে প্রমাণিত না হলেও আমাদেরকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছে।

মঙ্গলকে নিয়ে এই আবেগ লয়েল মানমন্দিরের মতো একটা ভালো মানমন্দির উপহার দিয়েছে, তারা-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে এবং অন্য গ্রহের প্রাণ অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছে; পৃথিবীর চিন্তাভাবনাকে বহুদূর এগিয়ে দিয়েছে। লয়েলের বক্তৃতা শুনে কনস্তানতিন তসিওলকোভস্কি ও রবার্ট গর্ডাডের মতো মানুষ তরুণ বয়সে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন প্রথমজন রকেটকে মহাশূন্যে অর্থাৎ গ্রহ অভিযানের বাহন হিসেবে চিন্তা করেছিলেন এবং দ্বিতীয়জন প্রথম অনেক উঁচু দিয়ে চলার জন্য তরল জ্বালানি ব্যবহার করে তা সম্ভব করে তুলেছিলেন। তারা কক্ষপথে প্রদিক্ষণরত একটি বিজ্ঞান পরীক্ষাগারের এবং প্রাণ অনুসন্ধানী গ্রহের মঙ্গলে যাত্রা নিয়ে কল্পনায় বিভোর ছিলেন। এই দুটো স্বপ্নই আজ পূর্ণ হয়েছে। শেষের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার জন্য কার্ল সাগান নিজেও অনেক বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। মঙ্গলের রহস্য উন্মোচনে অনেক ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছে, কেউ কেউ জীবনও বাজী রেখেছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উলফ ভিসনিয়াক। যিনি এন্টারটিকার ১৫০ ফুট পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে পড়ে মারা গিয়েছিলেন।

প্রবন্ধটিতে মঙ্গলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কার্ল সাগান বলেছেন, আমরা প্রতিষ্ঠিত করেছি একটি উপস্থিতি- সেখানে আমরা পূরণ করেছি শতাব্দীর একটি স্বপ্নকে। কার্ল সাগান বলেছেন, ‘মঙ্গলের মাটিতে আমরা নামবো; কিন্তু আমি আতঙ্কিত, কারণ পৃথিবীকে বাজেভাবে ব্যবহার করার প্রচুর উদাহরণ আছে। মঙ্গলে যদি অণুজীবের মতো প্রাণ পাওয়া গেলেও আমাদের সেখানে ‘কিছুই করা উচিত হবে না’- যে কোনো বিচারেই চিন্তা করি না কেন। পার্শ্ববর্তী একটি গ্রহে স্বতন্ত্র জীববিজ্ঞানের (Independent Biology) অস্তিত্ব আমাদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। সুতরাং সংরক্ষণের মাধ্যমে অন্য যে কোনো ব্যবহার থেকে তাকে দূরে রাখতে হবে। আর যদি প্রাণ না থাকে তাহলে এটাকে ধীরে ধীরে বাসযোগ্য করে তুলতে পারি, যদিও তাতে শত শত বছর এমনকি হাজার বছরও লেগে যেতে পারে। 

পথিকের গল্প

পথিকের গল্প বা ট্রাভেলার টেল-এ সাগান ত্রয়োদশ শতকের আলবার্টাস ম্যাগনাসের একটি উক্তি দিয়ে শুরু করেছেন। ‘আরও কি অনেক জগৎ আছে, না একটিই জগৎ এটাই প্রকৃতি অধ্যয়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন’। ১৯৭৭ সালে এরকম কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সন্ধানে মানববিহীন ভয়েজার মহাকাশযান আঁধা বুদ্ধিবৃত্তিক কম্পিউটার নিয়ে নক্ষত্রের পথে চলে গেছে। সৌরজগতকে উন্মোচনে এই ভ্রমণ মানবজাতিকে মহিমান্বিত করবে। মানুষের ক্ষমতা বৃদ্ধির সীমানা দেখাতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ১৫ কি ১৬ শতকের দিকে কয়েক দিনের মধ্যে স্পেন থেকে থেকে Azores -এ যাওয়া যেত, বর্তমানে ঠিক একই সময়ে পৃথিবী থেকে চাঁদে যাওয়া সম্ভব। অল্প কয়েক মাসের মধ্যে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে নতুন জগৎ নামে পরিচিত আমেরিকায় পৌঁছানো যেত। বর্তমানে এই সময়ে অভ্যন্তরীণ সৌরজগৎকে অতিক্রম করে শুক্র বা মঙ্গলে নামা যায়।

এগুলো বাস্তবিকই নতুন জগত যা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সপ্তদশ বা অস্টাদশ শতাব্দীতে হল্যান্ড থেকে চীনে যাওয়া যেতো এক বছর কি দু’বছরের মধ্যে। এখন ভয়েজারে একই সময় বৃহস্পতিতে যায়। ১৫ থেকে ১৭ শতকের মধ্যে ইতিহাস অনেকগুলো বড় বাঁক নিয়েছিল। জ্ঞানের জন্য হল্যান্ড উল্লেখযোগ্য স্থানে পরিণত হয়েছিল। যখন গ্যালিলিও ও ব্রুনোকে তাদের বিপ্লবাত্মক ধারণার জন্য শাস্তি ও ভয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে সেই সময়ে হল্যান্ডে একটু অন্যরকম পরিবেশ ছিল। উদ্ভাবক ও আবিষ্কারকদের জন্য নিরাপদ ও তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল। তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলেন জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী ক্রশ্চিয়ান হাইজেনস। সাগান প্রবন্ধটিতে হল্যান্ডের এই বিজ্ঞানীর আবিষ্কার ও কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক কথাই বলেছেন। তিনি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পরম্পরা কীভাবে পৃথিবী থেকে গ্রহান্তরে প্রসারিত হয়েছিল তা দেখিয়েছিলেন হাইজেন্সের জ্যোতিবৈজ্ঞানিক টেলিস্কোপ আবিষ্কারের উদাহরণ দিয়ে।

উল্লেখ্য সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে হল্যান্ডে অনুবীক্ষণযন্ত্র ও দূরবীক্ষণযন্ত্রের যে বিকাশ ঘটেছিল তাতে হাইজেনসের মৌলিক অবদান ছিল। পরমাণু ও গ্যালাক্সির মতো বিষয়গুলোর পর্যবেক্ষণ এই সময় ও এই স্থানে আরম্ভ হয়েছিল। ক্রিশ্চিয়ান হাইজেনস লেন্সকে পালিশ করে পাঁচ মিটার লম্বা টেলিস্কোপ নির্মাণ করে মানুষের অর্জনের ইতিহাসে তার অবস্থানকে স্থায়ী করে নিয়েছিলেন। এরই মাধ্যমে ইরাতোস্থেনিসদের পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায়, তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি অন্য গ্রহের আকার পরিমাপ করেছিলেন।

সাগান যেন মহাকাশে ভয়েজারের ভ্রমণের সঙ্গে মানবজাতির ফেলে আসা অতীতের গল্প বলে চলেছেন বারবার অতীতকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য। কীভাবে আমরা পুরো পৃথিবীকে ঘর বানিয়ে ফেললাম। একই সময়ে পৃথিবীর দেশগুলোতে প্রতিবিপরীত ঘটনাপ্রবাহ। এ যেন ফেলে আসা স্মৃতি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে কথাপোকথন।

রাত্রির মেরুদণ্ড

রাত্রির মেরুদণ্ড বা দ্য ব্যকবোন অব নাইট-এ কার্ল সাগান ফিরে গেছেন মানবজাতির শৈশবকালে, প্রাচীনকালের একজন আদিম বিজ্ঞানীর চিন্তার ধরনটা তিনি এ অধ্যায়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, তিনি বলেছেন মাতৃজঠরে ভ্রুণের বিবর্তন ডরউইনীয় বিবর্তনের মতোই, যা প্রজাতির বিবর্তনের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করি, এক ধরনের পুণরাবৃত্তি। তিনি বলেন, এই ধরনের পুণরাবৃত্তি আমাদের স্বতন্ত্রবুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ক্ষেত্রে ঘটে, আমরা অসচেতনভাবে পুনঃচিহ্নিত করি পূর্বপুরুষদের চিন্তাভাবনা।

তিনি এই প্রসঙ্গটি স্পষ্ট করতে গিয়ে ফিরে গেছেন ঈজিয়ান সাগরের উপকূলে কীভাবে সত্যিকারভাবে বৈজ্ঞানিক চিন্তা দানা বেধে উঠলো। তাদের সততা, পরিশ্রম আর বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা কীভাবে প্রথম যৌক্তিকভাবে মহাকাশের দিকে তাকাতে সাহায্য করেছিলো; কী অসাধারণসব নাম: থেলিস, পিথাগোরাস, অ্যানাক্সিমেন্ডার, এমপিডক্লেস, অ্যানাক্সোগোরাস, হিপোক্রেটিস, ডেমোক্রিটাস, থিয়োডোরাস। কিন্তু কেন একটা পর্যায় গিয়ে এই চিন্তাধারা ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলো না তারা, কেন বিজ্ঞানবিরোধী পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিরোধী একটি পরিবেশের সৃষ্টি হলো। কেন আমরা শুধুই তাদেরকে সক্রেটিস, এরিস্টটলদের পূর্ববর্তী মনে করলাম? আয়োনীয়দের অগ্রযাত্রা কেন থেমে গেল? 

প্রাচীন বিজ্ঞানের অন্তিম পরিণতির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ বেঞ্জামিন ফেরিঙ্গটন এর কথাগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন সাগান। সেখানে ফেরিঙ্গটন বলেছেন, ব্যাবসায়িক মনোবৃত্তি আয়োনীয় বিজ্ঞানকে পরিচালিত করেছিল, পরিচালিত করেছিল একটা দাস অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে। দাসদের মালিক হওয়াটা ছিল সম্পত্তি ও ক্ষমতা তৈরির পথ। পলিক্রেটিসের দূর্গ নির্মিত হয়েছিল দাসদের দ্বারা। পেরিক্লিস, প্লেটো, এরিস্টোটলের সময়কার এথেন্স ছিল বিশাল দাস জনসংখ্যা অধ্যুষিত।

গণতন্ত্র সম্পর্কে এথেনীয়দের সব সাহসী ও ভাল কথাবার্তা ছিল খুবই স্বল্প কিছু সুবিধাভোগীর জন্য। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল কায়িক শ্রম, যা হতে দাস মালিকরা দূরে ছিল আর দাসরা বৈশিষ্ট্যগতভাবে কায়িক শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও বিজ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার বাস্তবতা ছিল না; ফলে এ অবস্থায় বিজ্ঞানচর্চার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। এই বিচারে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় বিজ্ঞানচর্চা হতো না। আয়োনীয়রা নিখুঁতভাবে চমৎকারীত্বপূর্ণ মেশিন তৈরিতে সামর্থ্য হয়েছিল; কিন্তু দাসদের সহজসাধ্য প্রাপ্তি, প্রযুক্তির উন্নয়নের অর্থনৈতিক গতিকে ব্যাহত করে দিয়েছিল। এভাবে ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি আয়োনীয় মহান জাগরণে অবদান রেখেছিল ৬০০ খ্রিস্টপূর্বের দিকে এবং সম্ভবত প্রায় দু’শত বছর পরে দাসত্বের মধ্যদিয়ে অন্তিম পরিণতি ঘনিয়ে আসে। 

যেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া পরস্পর-বিরোধী প্রকল্পগুলোর কোনোটিকে পছন্দ করার পথ নেই, যেখানে এটি ছাড়া বিজ্ঞানের অগ্রগতির কোনো সম্ভাবনা নেই। সেখানে পিথাগোরীয়দের অভিজ্ঞতালব্ধ বিরোধী সমস্যা কীভাবে টিকে আছে বর্তমান পর্যন্ত। কিন্তু কেন? পিথাগোরিয়দের পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতি এই ধরনের বিরাগ, অরুচি কোথা থেকে এলো?

সমকালীন তৃতীয় বিশ্বের (রাজনৈতিক) বড়ো সমস্যা হলো- শিক্ষিত শ্রেণীসমূহ প্রায়শই ধনী পরিবারের সন্তান, বর্তমান সামাজিক অবস্থায় যাদের থাকে এক ধরনের কায়েমি স্বার্থ এবং পলায়ন মনোবৃত্তি, নিজ হাতে কাজ করতে অনভ্যস্ত বা সাধারণ রীতিনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের কোনো প্রবণতা তাদের নেই। এভাবে মূলগতভাবে বিজ্ঞানের জায়গা করে নিতে অনেক সময় লেগে যাচ্ছে।

স্থান ও সময়ের ভেতর দিয়ে ভ্রমণ

স্থান ও সময়ের ভেতর দিয়ে ভ্রমণ বা ট্রাভেল ইন স্পেস এন্ড টাইম –এ আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতত্ত্বের মূলবিষয়গুলোকে সহজসাধ্য উদাহরণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন এবং সময় পরিভ্রমণের অসম্ভাব্যতাও তুলে ধরেছেন। কিন্তু তারপরও যদি সম্ভব হয় তাহলে নিশ্চয় ইতিহাসের অনেকগুলো গতিধারা থাকবে সেই গতিধারা বাঁকগুলো কেমন হতে পারে তার ওপর নিজে কিছু বিচারবিশ্লেষণ করেছেন। এই ধরনের সময় ভ্রমণ সম্ভব হলে প্রত্যেকটি কল্পনা বা ধারণাযোগ্য বিকল্প ইতিহাসের ধারা থাকা সম্ভব। তিনি মানবজাতির বিকাশের বর্ণনায় এমন কিছু অঘটনের কথা উল্লেখ করেছেন, যা সামগ্রিক সভ্যতায় অসংগতি তৈরি করেছে বা বলা যায় এক ধরনের সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি করেছে, বিপরীত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মানবমন বিকাশেও হয়েছে ক্ষতিগ্রস্থ’। যেমন আবদেরার ডেমোক্রিটাস একটি ‘শঙ্কু‘ অথবা একটি পিরামিডের আয়তনের নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যেভাবে চিন্তা করেছিলেন তাহলো শঙ্কু বা পিরামিডকে ভূমি হতে শীর্ষ পর্যন্ত আকারে ক্রমশ সরু হয়ে যাওয়া খুবই ছোট অসংখ্য ফালিতে বিভক্ত করে।

তিনি সমস্যাটিকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যাকে গণিতের ভাষায় বলা যায় লিমিট বা সীমা তত্ত্ব। ভাবলে হতবম্ব হয়ে যেতে হয় তিনি আসলে ডিফারেন্সিয়াল এবং ইনটেগ্রাল ক্যালকুলাসের দরজায় দাঁড়িয়েছিলেন। যদি ডেমোক্রিটাসের প্রায় সমস্ত কাজ ধ্বংস হয়ে না গেলে খ্রিষ্টাব্দ আসার আগেই সম্ভবত আর্কেমিডিসের হাতেই ক্যালকুলাস পেয়ে যেতাম, নিউটনের ১৮০০ বছর আগে! 

এ ছাড়াও ১৪৭৫ সালের জন্ম নেওয়া লিওনার্দো ভিঞ্চির কথা উল্লেখ করা যায়। সম্প্রতি তার নকশা অনুযায়ী সুইজারল্যান্ডের প্যারাসুটিস্ট ভিয়েট্রি টেপা এমন প্যারাসুট তৈরি করেছেন, যা সফলভাবে ৬৫০ মিটার উঁচু থেকে ভূমিতে অবতরণ করতে পারে। প্রায় ৫০০ বছর আগের ভিঞ্চির নকশা অনুযায়ী প্যারাসুট তৈরি করে অনেকেই ব্যর্থ হয়েছেন। ভিঞ্চির নকশা অনুযায়ী প্যারাসুটটি তৈরিতে বারবার ব্যর্থ হওয়াতে অনেকে মনে করেছিলেন নকশায় ভুল ছিল। কিন্তু ভিয়েট্রিই প্রমাণ করলেন ভিঞ্চির নকশায় কোনো ভুল ছিল না।

লিওনার্দো উড়ুক্ক-যান বা বিমান নির্মাণের নকশা তৈরি এবং মডেল বানিয়ে যন্ত্রটির একটা পূর্ণাঙ্গ প্রতিরূপও তৈরি করেন; কিন্তু সেগুলো একটিও ওড়েনি। কারণ তখন কোনো শক্তিশালী ও হালকা ইঞ্জিনের অস্তিত্ব ছিল না। আবার কোনোটি সেই সময়কার সামাজিক সমন্বয়ের অভাবের কারণে ঘটেনি। নকশাগুলো ছিল অসাধারণ প্রতিভার প্রকাশ, যা উৎসাহ জুগিয়েছিল ভবিষ্যৎ প্রকৌশলীদের; কিন্তু এই ব্যর্থতায় লিওনার্দোর নিজের মন ভেঙে গিয়েছিল। হয়তো আয়োনীয় অগ্রগতি থেমে না গেলে, আলেক্সান্দ্রিয়া ধ্বংস না-হলে, তিনি এই সময়ের ফাঁদে পড়তেন না।

ইতিহাসের গতিধারা গভীরভাবে প্যাঁচানো দড়ির একটি জটিল কু ণ্ডের মতো- সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির পার¯পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল যা স্পষ্ট করা খুবই দূরহ ব্যাপার। অসংখ্য ছোট ছোট, ভবিষ্যদ্বাণীর অযোগ্য ও বিশৃংখল ঘটনা ঘটে চলেছে অবিরামভাবে, যেগুলোর বেশিরভাগেরই কোনো সূদুর প্রভাব বা ফলাফল নেই। তবে ব্রাঞ্চ পয়েন্ট বা শাখা বিন্দুতে ওই ধরনের কিছু সাধারণ ঘটনাই ইতিহাসের বিন্যাস পরিবর্তন করে দিতে পারে। বাস্তবিকই নিতান্তই সাধারণ ঘটনাবিন্যাস দ্বারা সম্ভবত ওই ধরনের ক্ষেত্রগুলোতে গভীরভাবে পরিবর্তন ঘটে যেতে পারে।

নক্ষত্রের জন্মমৃত্যু

নবম অধ্যায় নক্ষত্রের জন্মমৃত্যু বা দ্য লাইভস অব স্টার-এ তিনি নক্ষত্রের জন্মমৃতুর বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। কীভাবে কোনো কোনো নক্ষত্র নিউট্রন নক্ষত্র বা কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয় তাও বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের প্রসঙ্গ এসেছে। তিনি এই প্রসঙ্গে বলেছেন যে, মানুষের মতোই নক্ষত্র ও গ্রহ জগতগুলোর জন্ম হয়, জীবনযাপন করে, আবার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। একজন মানুষের জীবনকালের ব্যপ্তির পরিমাপ করা হয় দশকের ভিত্তিতে; সূর্যের জীবনকালের ব্যাপ্তি এর চেয়ে ১০কোটি গুণ বেশি।

নক্ষত্রের তুলনায়, আমরা হলাম প্রজাপতির মত, দ্রুতধাবমান ক্ষণস্থায়ী। এই জীবটি তাদের সমস্ত জীবনকাল অতিবাহিত করে একটি একক দিনের ধারায়। সেই হিসেবে প্রজাপতির দৃষ্টিতে মানুষের জীবন হলো অবিচল, বিরক্তিকর, প্রায় সামগ্রিকভাবে স্থবির এবং যে কোনো সময় যে কোনো কিছু করতে পারার জীবন। নক্ষত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাকালে মানব জীবন হলো আলোর ঝলকের মত, অস্থিরতায়পূর্ণ ক্ষীণ শতকোটি সংক্ষিপ্ত জীবনের একটি। যে জীবের আয়ুস্কাল সাতকোটি বছরের এক নিযুতাংশ মাত্র, তার কাছে এই সুদীর্ঘ সময়টি কীভাবে প্রতিভাত হয়? আমরা হলাম প্রজাপতির মতো যেটি একটি দিনকে মহাকাল ভেবে বসে আছে। 

জীবনের উৎপত্তি ও বিবর্তন হলো নক্ষত্রের উৎপত্তি ও বিকাশের সঙ্গে অতি ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কযুক্ত তা সাগান স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন। প্রথমত: যথার্থভাবে ওই পরমাণুগুলো দ্বারা যেগুলো দিয়ে আমরা তৈরি, যেগুলো প্রাণকে সম্ভব করে তোলে, অনেক আগে এবং বহু দূরবর্তী বিশাল লাল নক্ষত্রে উৎপন্ন হয়েছিল। মহাবিশ্বে পাওয়া রাসায়নিক মৌলগুলোর আনুপাতিক প্রাচুর্যতা নক্ষত্রে উৎপন্ন হওয়া ওই পরমাণুগুলোর আপেক্ষিক প্রাচুর্যতার সঙ্গে এত ভালভাবে খাপ খায়, যাতে অল্পই সন্দেহ থাকে যে লাল দানব ও সুপারনোভা হলো এমন চুল্লি, যেখানে পদার্থগুলো তাপ ও চাপ প্রয়োগে গঠিত হয়। সূর্য দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের নক্ষত্র।

আমাদের দেখা চারিদিকের সব পদার্থই, নাক্ষত্রিক আলকেমির একবার অথবা দুইবার পূর্ববর্তী চক্রগুলোর মধ্যদিয়ে এসেছে। দ্বিতীয়ত: পৃথিবীতে ভারী পরমাণুগুলোর অস্তিত্ব ঈঙ্গিত দেয় যে, সৌরজগৎ গঠিত হওয়ার স্বল্প সময় পূর্বে নিকটবর্তী একটি সুপারনোভার বিস্ফোরণ হয়েছিল। মূলত সুপারনোভার কারণে উৎপন্ন শকওয়েভ আন্তনাক্ষত্রিক গ্যাস ও ধুলিকণা সংকোচিত করেছিল এবং সৌরজগতের ঘনীভবনকে ত্বরান্বিত করেছিল।

তৃতীয়ত: সূর্য জ্বলে ওঠার সময় এর অতিবেগুণী রশ্মি প্রবাহিত হয়েছিল পৃথিবীর আবহমন্ডলের মধ্যদিয়ে; এর উষ্ণতা উৎপন্ন করেছিলো বিদ্যুৎ চমকানী; এবং এই শক্তি উৎস ত্বরান্বিত করলো জটিল জৈব অণু তৈরিতে, যা জীবনের উৎপত্তিকে পরিচালিত করেছিলো। চতুর্থত: পৃথিবীতে প্রাণের গতি টিকে থাকে সৌর আলোকের ওপর নির্ভর করে। উদ্ভিদ ফোটনগুলোকে আহরণ করেছিল এবং সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে পরিণত করেছিল। প্রাণীজগত উদ্ভিদের পরজীবিতে পরিণত হয়েছিল। সুপারনোভা বিস্ফোরণে উৎক্ষিপ্ত আলোর গতিতে ছুটে চলা উচ্চ-শক্তির কণাই হলো মহাজাগতিক রশ্মি; এগুলো থেকে মিউটেশনগুলো তৈরি হয়েছিল, যা থেকে প্রকৃতি জীবন গঠনের নতুন প্রকরণ নির্বাচন করে, যা সৃষ্টি হয় মহাজাগতিক রশ্মির অংশে। পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তন চালিত হয় দূরবর্তী, ভরসম্পন্ন সূর্যের সুবিন্যস্ত প্রক্রিয়ায়।

চিরকালের প্রান্ত

চিরকালের প্রান্ত বা দ্য ইজ ফর এভার -এ মহাবিশ্বের সৃষ্টি এবং তার বিবর্তন ও প্রকৃতি নিয়ে কথা বলেছেন কার্ল সাগান। তিনি এ অধ্যায়ে গ্যালাক্সিবিষয়ক বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ১৯৮০ সালের প্রেক্ষাপট থেকে এটা আসলেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তিনি বলেছেন, কতগুলো নক্ষত্রের ঝাঁক আছে যা গোলকীয় জ্যামিতিক বিন্যাসে সজ্জিত হয় প্রাকৃতিকভাবে; কতগুলো উপবৃত্তাকার আকৃতিতে গঠিত। অন্যান্য ঝাঁকসমূহের অপেক্ষাকৃত অনিয়মিত জ্যামিতিক গঠন রয়েছে, রয়েছে অনেক সর্পিলাকার ও বিষমাকৃতির গঠন। গ্যালাক্টিক সংঘর্ষেও গোলীয় ঝাঁকসমূহের আকৃতি পাল্টে যায় এবং উপবৃত্তাকার গঠনগুলো থেকে সর্পিলাকৃতি বা বিষমাকৃতির গঠন উৎপন্ন হতে পারে। গ্যালাক্সিগুলোর আকৃতি ও প্রাচুর্যতা আমাদের কাছে সম্ভাব্য বৃহত্তম মাত্রায় প্রাচীন ঘটনাগুলোর এমন এক গল্প উপস্থাপন করে, যা আমরা কেবল জানতে শুরু করেছি।

কসমোলজী বোঝার চাবিকাঠি হিসেবে ডপলার ইফেক্ট তত্ত্বটিকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। মহাবিশ্বের প্রসারণ রেডশিফ্ট এর মাধ্যমে কীভাবে বোঝা যায় তা বর্ণনা করেছেন। দ্বিমাত্রিক, ত্রিমাত্রিক এবং চতুর্মাত্রিক অস্তিত্বের মধ্যকার সম্পর্কের কথাও তিনি বলেছেন। ফোরডাইমেনশনাল হাইপারকিউব বা টেসারেক্টের কথা বলেছেন। বলেছেন আমরা ত্রিমাত্রিক জগতের বন্দিজীব। তিনি ওয়ার্মহোলের কথা বলেছেন, যা টিউবের মতো ভৌত চতুর্থ মাত্রায় প্রবাহিত কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যদিয়ে। বিশ্বের দুইপ্রান্তে মূহূর্তের মধ্যে যাওয়া সম্ভাবনার কথা বলেছেন।

বিজ্ঞান বা ধর্মে, এমন একটি ধারণা আছে যা অদ্ভুত, শিহরণ জাগানো, সূক্ষ অনুমানগুলোর একটি। এটি সম্পূর্র্ণভাবে অপ্রতিপাদিত; হয়তো এটি কখনোই প্রমাণিত হবে না। এই অনুমান রক্তে আলোড়ন তোলে। এটি বলে যে, বিশ্বের রয়েছে অসীমসংখ্যক অনুক্রম, যাতে ইলেক্ট্রনের মতো একটি মৌলিক কণাকে ভেদ করা সম্ভব হতো তাহলে কণাটি নিজেকেই প্রকাশ করতো সমগ্র আবদ্ধ বিশ্ব হিসেবে। এর অভ্যন্তরে, সংগঠিত হতো স্থানীয় তুল্যরূপে গ্যালিক্সগুলো এবং ক্ষুদ্রতর গঠনকাঠামোগুলো, আর রয়েছে অপরিমেয় সংখ্যক অনেক ক্ষুদ্র মৌলিক কণিকা, যেগুলো পরবর্তী পর্যায়ে নিজেরাই হয়ে যায় বিশ্বব্রহ্ম- এবং এভাবেই চলতে থাকে চিরকাল- এক অসীম নিম্নমুখী প্রত্যাবৃত্তি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভেতর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, অন্তহীনভাবে। এবং উর্ধ্বদিকেও একই ঘটনা। গ্যলাক্সিসমূহ এবং নক্ষত্ররাজি, গ্রহসমূহ এবং মানুষ মিলে আমাদের এই পরিচিত বিশ্বব্রক্ষন্ডও হয়তো উর্ধ্বদিকের পরবর্তী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের র একটি একক মৌলিক কণিকামাত্র, আরও একটি অসীম প্রত্যাবৃত্তের প্রথম ধাপ।

তিনি প্রশ্ন করেছেন, অন্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ডগুলো কেমন হবে? এগুলো কি ভিন্ন কোনো পদার্থবিদ্যার ওপর নির্মিত হবে? তাদের কি গ্যালাক্সি, নক্ষত্র এবং গ্রহ, অথবা প্রায় সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো কিছু রয়েছে? জীবনের কল্পনাতীত ভিন্ন গঠনের কিছু সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে? তাদের মাঝে প্রবেশ করতে হলে কোনো একভাবে আমাদেরকে ভেদ করতে হবে চতুর্থ ভৌত মাত্রা- নিশ্চিতভাবেই এটি কোনো সহজ ব্যাপার নয়; কিন্তু হয়তো একটি কৃষ্ণবিবর দিতে পারে কোনো উপায়। হয়তো সৌরজগতের আশেপাশে অঞ্চলে রয়েছে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবিবর। অনন্তের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, আমরা হয়তো ঝাঁপিয়ে পড়ব..।

স্মৃতির আঁধার

স্মৃতির আঁধার বা পারসিসটেন্স অব মেমরি অধ্যয়টি আরম্ভ হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ বছর আগের মানুষের সৃষ্টির এশিরীয় বর্ণনার একটি কবিতা দিয়ে। কবিতাটিতে এশিরীয়দের নিজেদের এবং প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের তীব্র ইচ্ছাকে ব্যক্ত করা হয়েছে। পৃথিবীতে সমস্ত গ্রন্থাগারে বিভিন্ন বইয়ের শব্দ ও ছবিতে তথ্য সংখ্যা হলো অনেকটা ১০১৬ বা ১০১৭ বিট। অবশ্যই এর বেশির ভাগ প্রয়োজনাতিরিক্ত। কিন্তু আর কোনো প্রাচীন জগতে, যেখানে প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে পৃথিবী থেকে অনেক আগে, সম্ভবত তারা জানে ১০২০ বা ১০৩০ বিট - শুধু তথ্যই নয় বরং তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভিন্ন তথ্য। কার্ল সাগান সেই অধ্যায়ে তিমিদের নিঃসঙ্গতার কথা বলেছেন, বলেছেন পৃথিবীর দুপ্রান্তে থেকেও দুটি তিমির সাবসনিক শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগের কথা। কীভাবে মানুষ লিপিস্টিকের মতো প্রসাধনের জন্য তিমি হত্যা করেছে। সমুদ্রে স্টীম ইঞ্জিন চলার ফলে ফিনব্যাক তিমির যোগাযোগ ৫০০ মাইলে জায়গার মধ্যে কমে এসেছে। তাদের মস্তিষ্কের পরিমাণ যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি। হাম্পব্যাক তিমির সম্ভাষনসহ পৃথিবীর আরও ৫৫টি ভাষায় এই সম্ভাষনের রেকর্ড নিয়ে ১৯৯০ সালের দিকে ভয়েজার ১, ২ সৌরজগতের বাইরে চলে গেছে।


কার্ল সাগান বলেছেন, লাগাম ছাড়া বাণিজ্যিক কর্মকান্ড ও প্রচারণা আমাদের বিভ্রান্ত করে ফেলেছে। মস্তিষ্ক বিবর্তনের খারাপ ফলাফলকেই আমরা জাগিয়ে তুলছি আমাদের অর্জিত প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতা দিয়ে। পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার মানুষের সঙ্গে, অপেক্ষাকৃত কম বুদ্ধিমান প্রাণিদের সঙ্গে, বৃহৎ নরবানরদের, ডলফিনদের সঙ্গে আমাদের যে আচরণ তাতে যদি অনেক উন্নত বহির্জাতিক প্রাণের সঙ্গে দেখা হয়, তারা যদি আমাদের ধ্বংস করতে চায় তাহলে আমাদের কী নৈতিকভাবে বলার কিছু রয়েছে? মানুষের মস্তিষ্ক বিকাশের কথা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, স্পাইনাল কর্ডের স্ফীত উর্ধ্বাংশে অবস্থান করছে সবচেয়ে পুরাতন অংশ ‘ব্রেইন-স্টেম’। এই অংশটিকে আর-কমপ্লেক্স বা সরিসৃপজাতীয় মস্তিষ্ক ঢেকে রাখে। যার উদ্ভব ঘটেছিল প্রায় ২৫ কোটি বছর আগে আমাদের সরিসৃপ জাতীয় পূর্ব-পুরুষদের মাঝে। আমাদের প্রত্যেকের স্কালের একেবারে ভেতরের দিক হলো- কুমিরের মস্তিষ্কের মত অনেকটা। আক্রমনাত্বক আচরণ, ধর্মীয় আচার আচরণ, দেশরক্ষা, সামাজিক যাজকতন্ত্রের জন্য এই অংশ দায়ী- এই অংশের কারণেই আমরা নেতা নামের ব্যক্তিটির পেছনে যুক্তিহীনভাবে অন্ধের মতো দৌঁড়াই। 

আর-কমপ্লেক্সকে ঘিরে আছে যে অংশটা তাহলো লিম্বিক সিস্টেম অথবা স্তন্যপায়ীদের মস্তিষ্ক, যার উদ্ভব ঘটেছিল ২১ কোটি বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে, ‘লিম্বিক সিস্টেম’ হলো- আমাদের মেজাজ-মর্জি, আবেগ, উদ্বেগের এবং নবীনদের প্রতি স্নেহ-বাৎসল্যের একটা বড় উৎস। মস্তিষ্কের আগের আদিম অংশগুলোকে নিচে রেখে এবং তাদের সঙ্গে বৈরিতামূলক সহাবস্থান নিয়ে লক্ষ লক্ষ বছর আগে আমাদের প্রাইমেট পূর্বপুরুষদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল সেরেব্রাল কর্টেক্স। সেরেব্রাল কর্টেক্স এখানে আছে বলে আমাদের আছে ধারণা ও প্রেরণা, এটা এখানে বলেই আমরা পড়ালেখা করি, এখানে বলেই গণিতশাস্ত্র নিয়ে মাথা ঘামাই, সংগীত রচনা করি, কবিতা লিখি। কর্টেক্স আমাদের সচেতন জীবন-যাপনকে নিয়ন্ত্রণ করে।

এটা হলো আমাদের প্রজাতির স্বতন্ত্রতা, মানবিকতার আবাসস্থল। সভ্যতা হলো ‘সেরেব্রাল কর্টেক্সের‘ একটি ফলাফল। মানুষের মধ্যে শুভ ও অশুভ প্রবৃত্তির যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব তা প্রকৃতপক্ষে আর-কমপ্লেক্স এর সঙ্গে লিম্বিক সিস্টেম ও সেরেব্রাল কর্টেক্সের বিরোধ। আর-কমপ্লেক্স মুক্ত হওয়ার একটাই উপায় তাহলো নিরন্তর জ্ঞানচর্চা; যা সেরেব্রাল কর্টেক্সকে বিকশিত করবে; সেই তুলনায় আর কমপ্লেক্সকে ক্রমশ দুর্বল করে দেবে। জ্ঞানচর্চা তথা গণিত, বিজ্ঞান, সংগীতচর্চা কবিতা লেখার মধ্যদিয়ে আমাদের নিয়ে যাবে ওই উপলব্ধিতে, যা আমাদের শেখাবে মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষ কত ক্ষুদ্র, কত অল্প সময় অধিকার করে আছে; অথচ ক্ষমতার দম্ভ আর শ্রেষ্ঠত্বের রোগা অক্লান্ত চেষ্ট করে যাচ্ছি মহাবিশ্বকে অনুধাবনের।

এনসাইক্লোপেডিয়া গ্যালাকটিকাতে

এনসাইক্লোপেডিয়া গ্যালাকটিকাতে বহির্জাগতিক প্রাণের সন্ধানে আমরা কি কি উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিপজ্জনক দিকগুলো কী, আমাদের গ্যালাক্সিতে উন্নত প্রাযুক্তিক সভ্যতা থাকার সম্ভাবনা কতটুকু, থাকলে সংখ্যা কত?- এগুলো সম্পর্কে তিনি বলতে গিয়ে তিনি হায়ারোগ্লিফিক্স নিয়ে আলোচনা করেছেন। এক কোটি উন্নত প্রাযুক্তিক সভ্যতার হিসেব তিনি দিয়েছেন। কীভাবে একটি সভ্যতার জৈবিক বিবর্তন ও সংস্কৃতিক বিবর্তন ধারায় উচ্চ শিখরে উঠে এসে তাঁর আন্তঃগ্যালাক্টিক জাল বিস্তার করে তা বর্ণনা করেছেন। হয়তো সেসব সভ্যতা এত উন্নত হতে পারে, যে তারা আমাদের কাছে থাকলেও তাদের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারবো না।

কিন্তু পৃথিবীর বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায় যে, কোনো সময়ে ১০টির বেশি সভ্যতা অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না। কিন্তু কি এমন সমস্যা সৃষ্টি হয় যার ফলে প্রাযুক্তিক জ্ঞানসম্পন্ন সভ্যতার এক কোটির মধ্যে শুধু ১০টির টিকে থাকার সম্ভাবনা দেখা যায়। কেন প্রযুক্তিক সভ্যতার আত্মধ্বংসের বিষয়টা মারাত্মক হয়ে ওঠে? সভ্যতাগুলোর প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন অবস্থায় পৌঁছানোর পর নিজেদের ধ্বংস করার প্রবণতা যদি খুব বেশি হয়, তাহলে আমাদের ছাড়া অন্য কাউকে কথা বলার জন্য পাব না, আমরাও নিয়তির মতো ধ্বংসের দিকে যাব। যে সভ্যতার বিবর্তনের সর্পিল পথ ধরে গড়ে উঠতে কয়েকশত কোটি বছর লেগে যায়, ক্ষমার অযোগ্য এক ভুলে এভাবেই ধ্বংস করে ফেলতে পারে। হয়তো সভ্যতাগুলো পরাভূত হয় লোভ আর অজ্ঞানতার কাছে, ধ্বংস হয়ে যায় নিউক্লিয়ার যুদ্ধের কাছে। সাগানের মতে বিজ্ঞানীরা বলেছেন সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারা হিসাব করে ও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বলেন প্রতি শতাব্দীতে পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অর্ধেকের বেশি (ষাট শতাংশের) সম্ভাবনার আছে। 

কিন্তু অন্যরকম অবস্থা বিবেচনা করা যাক, যেখানে অন্তত অল্প কিছু সভ্যতা উচ্চস্তরের প্রযুক্তি সম্পন্ন জ্ঞান নিয়ে বাঁচতে শিখেছে; যেখানে মস্তিষ্কের বিবর্তনে উদ্দেশ্যহীনভাবে আরোপিত অসংগতি সচেতনভাবে দূর করে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পেরেছে; অথবা যদি বড় রকমের বিপর্যয় ঘটে, সেই বিপর্যয়ও শতকোটি বছরের বিবর্তনে কাটিয়ে উঠতে পারবে। ওই রকম সমাজগুলোর দীর্ঘ সময় ধরে সাফল্যজনকভাবে টিকে থাকা সম্ভব।

কারা পৃথিবীর জন্য কথা বলবে 

সাগান তার কসমস গ্রন্থের শেষ অধ্যায় কারা পৃথিবীর জন্য কথা বলবে বা হু স্পিকস ফর আর্র্থ পর্বে অনেকগুলো প্রশ্ন তুলে এনেছেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে মস্তিষ্ক বিবর্তনের এই অসংগতি কেমনভাবে দূর হবে? বারবার আয়োনিয়া, আলেক্সান্দ্রিয়ার ঘটনা থেকে বোঝা যায় কোনো এক অঞ্চলে একটি সভ্যতা কিছুদিন পর আপন ইচ্ছায় ধ্বংস হয়ে যায়। রাজনৈতিক সামাজিক, অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি অনেক কারণই হয়তো আছে। ঢাকা শহর তার উদাহরণ হতে পারে। কিন্তু একটি ব্যাপার স্পষ্ট তাহলো সাধারণ মানুষের সঙ্গেবিজ্ঞানের গণবিচ্ছিন্নতা সেই সময়কার জ্ঞানবিজ্ঞানের ধারণা থেকে। এই প্রবন্ধে সাগান পৃথিবীর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বাকের নিয়ামক ভূমিকা পালনকারী কয়েকজন ব্যাক্তির কথা উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেছেন বর্তমানে বিশ্বব্যাপি পরামাণু অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে। ক্ষমতাধর দেশ ছাড়াও ছোট দেশগুলো নানা মাত্রায় পরামাণু বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। আর বলছে তাদের দেশের জনগনের অধিকতর নিরাপত্তা বিধানে তারা এই কাজ করছে। কিন্তু পৃথিবী আবহাওয়া ক্রমাগতভাবে মানুষ্যবসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। তেজস্ক্রিয়তার কারণে নানা ধরণের মরণব্যাধি বেড়ে যাচ্ছে। সবাই তার দেশ এবং জাতির জন্য কথা বলছে। কিন্তু পৃথিবীর জন্য কারা কথা বলবে? পৃথিবীকে এই ভয়াবহ বিপদ থেকে কারা রক্ষা করবে? এটাতো সত্যি যে এই পৃথিবী না বাঁচলে এই জাতি রাষ্ট্র কোনো কিছুই থাকবে না।

উপসংহার 

পৃথিবীতে বিজ্ঞান বইয়ের ইতিহাসে কসমস এমন একটা বই যেখানে বিজ্ঞানের বর্ণনাকে কাব্যময়তার জগতে নিয়ে আসা হয়েছে। যেখানে গণিতের যুক্তি বিজ্ঞানের তত্ত্ব ইতিহাসের কাহিনী আর চলচ্চিত্রের নাটকীয়তার এক মহাসমাবেশ ঘটানো হয়েছে। এজন্য বিজ্ঞানকে খাটো করতে হয়নি। সাধারণ মানুষকে বোঝানোর জন্য ‘জনপ্রিয় বিজ্ঞান’ বলে কোনো নতুন বিভাগ খুলতে হয়নি। বিজ্ঞান মানুষের কাছে ধরা দিয়েছে আরও ব্যাপকতা নিয়ে আরও গভীরভাবে। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন এই মহাবিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলই খালি। সেই তুলনায় আমাদের অবস্থান কত ক্ষুদ্র। কোনো গ্রহ অথবা গ্যালাক্সিই সাধারণ নয়। এই সীমাহীন শীতল বিশ্বজনীন শূন্যতার ভেতর সাধারণ জায়গা বলতে যদি কিছু থাকে তবে তা অন্তহীন রাত্রিতে নিমজ্জিত আন্তগ্যালাক্সীয় শূন্যতা।

তিনি বলেছেন, আমরা যদি আন্তগ্যালাক্সীয় অবস্থান হতে তাকাই তাহলে দেখব অগণিত বিবর্ণ খড়ের আঁটির মতো আলোর লতানো অঙ্গ যা সাগরের ফেনার মতোই ভাসমান। এইগুলো হলো গ্যালাক্সি, কিছু হলো নিঃসঙ্গ পথিক, তবে বেশির ভাগই দলবেঁধে মহাজাগতিক তমসার মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে। প্রাণ কোনো বিশেষ ব্যাপার নয়। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বিশ্বের যে কোনো জায়গায় প্রাণের উদ্ভব সম্ভব। ইতিহাসের পর ইতিহাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, মূল্যবোধের অভাব, সামান্য লোভ আর তুচ্ছ সব কারণে পৃথিবীর এক সভ্যতা আর এক সভ্যতাকে কতো নির্মমভাবে ধ্বংস করেছে।

কসমস সিরিজ নির্মাণের ৩০ বছর পরও কি-তা নিয়ে আলোচনা থাকবে?- এরকম এক প্রশ্নের মুখে দাড়িয়ে সাগানের সহযাত্রী অ্যান ড্রুয়ান বলেছেন, ‘সত্যিই আমি তা ভেবেছি। ... এটা সত্যি সেরকম কিছু-বিজ্ঞানের বাস্তবতা নিয়ে গল্পের কথকতা, এ দুটো মিলিয়ে এটা তৈরি হয়েছিল। যে-ব্যাক্তি কসমস নিয়ে ১৩টি পর্ব দেখেছে সে নিজেকে দাবি করতে পারে একজন বিজ্ঞান-শিক্ষিত বলে। মানুষের বিজ্ঞান জানা ও বোঝার জন্য কসমস হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কসমস হচ্ছে বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের গল্প যা ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে বর্ণনা করা হচ্ছে। আমি মনে করি, এটা আমাদের কাছে দুঃখজনক যে বিজ্ঞানকে কখনো সেভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। এমন অনেক মেধাবি ছেলেকে আমি জানি, যারা বিজ্ঞানকে ঘৃণা করে। তাই আমি বিষয়টাকে শুরু করতে চাই প্রাক-বিদ্যালয় থেকেই, যখন এসব চমৎকার ছেলেমেয়েরা জানতে পারবে-তখনই এভাবেই শুরু হবে আমরা কারা, আমরা কী ইত্যাদি বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু এক প্রজন্মের।

কার্ল সাগান কসমসে ইতিহাসের পর ইতিহাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, সাংস্কৃতিক পার্থক্য, মূল্যবোধের অভাব, সামান্য লোভ আর তুচ্ছ সব কারণে পৃথিবীর এক সভ্যতা আর এক সভ্যতাকে কত নির্মমভাবে ধ্বংস করেছে, তিমির মতো একটি বোধসম্পন্ন সামাজিক প্রাণীদের হত্যা করছে লিপস্টিক তৈরিতে। বিভিন্ন কাহিনীর বিশ্লেষণ করে ও প্রমাণের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন ইউএফও এবং ফ্লাইং-সসারের মতো কাহিনীগুলো কত হাস্যকর ঠুনকো যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

সাগান তার কসমস গ্রন্থে বলেছেন ‘বিজ্ঞান কখনো শেষ হবে না এবং আমরা পৃথিবীকে অর্থবহ করে তুলতে পারব আমাদের প্রশ্ন করার সাহস এবং উত্তরের গভীরতা দ্বারা’। আর যদি এর ব্যত্যয় ঘটে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির যদি সমন্বয় ঘটানো না যায় তাহলে পুনরায় মধ্যযুগের মতো অন্ধকার যুগ আসন্ন।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh