ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন

উৎসবের ভোটে দলীয় কোন্দলের বাড়-বাড়ন্ত

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দল ৩৯টি হলেও এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে শুধু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ হাতে গোনা কয়েকটি দল। শক্তিশালী বিরোধী দল বিএনপিসহ প্রায় অন্তত ৩০টি দল নির্বাচন বয়কট করেছে। তবুও নির্বাচনী মাঠে সহিংসতায় প্রাণ ঝরছে একের পর এক। ৬ ধাপের ভোটের মধ্যে ইতিমধ্যে শেষ হওয়া দুই ধাপের ভোটে সহিংসতায় প্রাণ গেছে অর্ধশতের কাছাকাছি মানুষের।

ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নপ্রাপ্ত এবং মনোনয়নবঞ্চিত (স্বতন্ত্র) চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখা, বংশীয় প্রভাব, ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং দল ও দলীয় নেতাদের কাছে এলাকায় নিজের প্রভাব কতটুকু- তা প্রমাণের চেষ্টার কারণে উৎসবের ইউপি নির্বাচন যেন রক্তের হোলিখেলা চলছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা। এ অবস্থা চলতে থাকলে আর ভোটাররা ভোট কেন্দ্রমুখী হবেন না বলেও মনে করছেন তারা। অপরদিকে নির্বাচন কমিশন সহিংসতা সামাল না দিয়ে উল্টো দায় চাপাচ্ছে দলগুলোর ওপর। তবে সহিংসতা বাড়তে থাকায় নড়ে-চড়ে বসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে সহিংসতায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। পাশাপাশি কীভাবে এত হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, সহিংসতায় কারা জড়িত, বৈধ কোনো অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে কি-না- এসব বিষয়ে মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য চেয়েছে মন্ত্রণালয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই ধাপের ইউপি নির্বাচনে গত ২২ নভেম্বর পর্যন্ত ২৫ জেলায় নিহত হয়েছে ৪৬ জন। এর মধ্যে নরসিংদীতে দুই দফায় মারা গেছেন ৯ জন। এ ছাড়া কক্সবাজারে পাঁচ, মাগুরায় চার, বরিশালে তিন এবং গাইবান্ধা, মেহেরপুর, কমিল্লা ও ঢাকার ধামরাইয়ে দু’জন করে নিহত হয়েছেন। আর ভোলা, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, ফরিদপুর, সিলেট, নড়াইল, রাঙামাটি, মৌলভীবাজার, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর, রাজবাড়ী, রংপুর, পটুয়াখালী ও মাদারীপুরে একজন করে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সংঘর্ষের সময় গুলিতে নিহত হয়েছেন ২১ জন। এর তিনজন মারা গেছেন পুলিশের গুলিতে।

দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাব এবং ভোটের মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারাটাও এ জন্য অনেকাংশে দায়ী। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়ায় সহিংসতা বেড়েই চলেছে বলে মনে করেন তারা।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, নির্বাচনে এত গোলাগুলি ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিক থেকে বাড়তি কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। নির্বাচনের আগে কোনো অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানও হয়নি। কয়েকটি ঘটনা ঘটার পরও অস্ত্র উদ্ধার ও আসামি গ্রেফতারের উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘অস্ত্র উদ্ধার একটি চলমান প্রক্রিয়া। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেসব এলাকায় গুলির ঘটনা ঘটেছে, সেসব এলাকায় অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে কয়েকটি স্থানে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তার কোনোটাই প্রত্যাশিত ও কাম্য নয়। তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে ছিল নির্বাচনকে সামনে রেখে আধিপত্য বিস্তার, বংশীয় প্রভাব, ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক কোন্দল।’

সিইসি বলেন, ‘গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী সারাদেশে নির্বাচনি সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব প্রাণহানির ঘটনার সবগুলো নির্বাচনি সংঘর্ষের কারণে হয়েছে কি-না তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি ঘটনা ভোটকেন্দ্রে বা ভোটের দিন ঘটেছে। কোনো ঘটনা নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগেই ঘটেছে আবার কোনোটা রাতের আঁধারে ঘটেছে।’

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, এটা তো নির্বাচনি সহিংসতা না, এটা ক্ষমতা দখলের সহিংসতা। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্যই তাদের নির্বাচিত হওয়া দরকার।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের প্রতীক পায় যে সব প্রার্থী, প্রশাসন কিংবা নির্বাচন কমিশন তাদেরই বাড়তি সুবিধা দেয়। এতে বঞ্চিতরা ক্ষুব্ধ হওয়ায়; বাড়ছে সংঘর্ষ-প্রাণহানি। এ ছাড়ও এখানে নির্বাচিত হতে পারলে তো নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা, লুটপাটের ভাগিদার হওয়া যাবে। ফলে তারা সর্বশক্তি নিয়ে নির্বাচনের মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এখানে আধিপত্যের লড়াইয়ে যে টিকে থাকতে পারবে, সেই সুবিধাগুলো পাবে। ফলে এটাকে ভোটের সহিংসতা না বলে আধিপত্যের লড়াইয়ের সহিংসতা বলাই ভালো। আর নির্বাচন কমিশন তো নিজেদের অবস্থান আগেই নষ্ট করে ফেলেছে। এই ধরনের সহিংসতা বন্ধে তাদের কোনো ধরনের পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তাদের কেউ মাঠেও নেই।

ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপের থেকে দ্বিতীয় ধাপে সহিংসতা ও মৃত্যু বেশি হয়েছে। সামনে আরও কয়েকটি ধাপ আছে। নিরপেক্ষও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দলীয়ভাবে কি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের সহিংসতার কথা বললে অতীতে যেতে হবে। অতীতে ৫শ’-৬শ’ লোকেরও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আপনারা জানেন দলীয় প্রতীকে নির্বাচন এটা বেশি দিনের না। দ্বিতীয়বারের মতো দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করছি। গত বছর যেসব সমস্যা ছিল এবার সেসব সমস্যা অনেকটা সমাধানের পথে এগিয়ে গেছে। আগামী বছর নির্বাচনে যখন এ বিষয়টা মাইন্ডসেট হয়ে যাবে। এখনো আমাদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আছে। তবে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে দায়বদ্ধতা থাকে। সেটা যে দলের প্রতীক হোক না কেন; কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হলে তার দায়বদ্ধতা থাকে না। স্থানীয় সরকারগুলো যেভাবে শক্তিশালী ও কর্মমুখর হচ্ছে, সেখানে প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার পাশাপাশি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থাকা উচিত।

সহিংসতা কমিয়ে আনার কী পদক্ষেপ নেবেন এমন প্রশ্নের জবাবে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সহিংসতার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখে। আপনারা জানেন একটা ওয়ার্ডে অসংখ্য সদস্য প্রার্থী থাকেন। তাই নির্বাচনী প্রচারণাটাও অনেক বেশি হয়। ভোট কাস্টিং প্রায় ৯৫ শতাংশ হয়ে যায়। কারণ সর্বশেষ ভোটার কোথায় আছে সেটাও খুঁজে বের করা হয়। কাজেই অনেকগুলো বিষয় এখানে কাজ করে। এত বেশি প্রচারণার মধ্যে কিছু ঘটনা ঘটে যায়। কিছু কিছু ঘটনা তো সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে।

এগুলো আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী- বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, আনসার থাকছে তারা দেখছে। আমার মনে হয়, যেহেতু আমাদের নির্বাচন ধাপে ধাপে হচ্ছে, একসঙ্গে হচ্ছে না। কাজেই আমাদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার যে সদস্য আছে তাদের পরিধি আরও বাড়াতে পারলে, আমার মনে হয় সহিংসতা কমে আসবে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //