শতবর্ষ পূরণ করলো ইরানি চলচ্চিত্র

ইরানি চলচ্চিত্র একটি সৃজনশীল গণমাধ্যম হিসেবে আখ্যায়িত। গত ১২ সেপ্টেম্বর নানা আয়োজনে দেশটিতে পালিত হলো জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস। ২০০০ সাল থেকে ১২ সেপ্টেম্বর দিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে উদযাপন করে আসছে ইরান। 

ইরানের চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে ধরার জন্য এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জানা জরুরি। এজন্য চোখ ফেরাতে হবে প্রায় একশ’ বছর আগের ইরানের দিকে। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট শাসকরা ইরানের সরকার ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে পার্লামেন্টারি ভোটাভুটিতে যখন রেজা শাহ পাহলভি ক্ষমতা পান ঠিক তখনই ইরানি চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়। যদিও এই সময়টা ছিল ইরানি চলচ্চিত্রের জন্য একটা কঠিন সময়। ইরানের দেশীয় চলচ্চিত্রকে নানারকম বিধিনিষেধ আর সেন্সরের যাঁতাকলে বন্দি রাখা হতো। 

এইরকম প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ইরানের প্রথম নির্বাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আবি ও রাবি’ মুক্তি পায়। এর ঠিক তিন বছর পর ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘লরের মেয়ে’ মুক্তি পায়। কিন্তু সময়টা ছিল ইরানের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ঔপনিবেশিকতার বেড়াজালে আবদ্ধকাল। ফলে হলিউডের আমদানি করা সিনেমার কাছে ইরানের এই সিনেমাগুলো টিকতে পারেনি। একইসাথে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবও সমানতালে দেখা যায়। ফলে মুখ থুবড়ে পড়ে ইরানি সৃজনশীল নির্মাতাদের প্রচেষ্টা।

এরপর ইরানে এক তরুণ নির্মাতার আবির্ভাব ঘটে, যার নাম দারিউস মেহেরজুই। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মেহেরজুই নির্মাণ করেন ‘দ্য কাউ’ চলচ্চিত্রটি। এর আগে দীর্ঘ তিন দশকজুড়ে ইরানের জনগণ দেখতে থাকে বাণিজ্যিক ধারার বস্তাপচা সব ছবি। তবে এ সময় ইরানের পরিচালকরা যে-একেবারে বসে ছিল তা নয়, হলিউডি মারপিট আর বলিউডি নাচ-গানে ভরা ছবির অনুকরণে তারা নির্মাণ করে চলচ্চিত্রের বিশেষ এক ধরন ফিল্ম জাহেলি। এইসব ঘটনার মধ্যে ১৯৫৮ সালে পরিচালক ফারুক জেফারি নির্মাণ করেন ‘সাউথ অব দ্য সিটি’। আর এই সময়ে ইতালির নিও-রিয়ালিজমকেন্দ্রিক সিনেমার প্রভাব পড়ে ইরানের মধ্যেও। আর তাতে ইরানি চলচ্চিত্রকারদের অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায়ও মনে হয়েছিল যেভাবেই হোক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে।

ওই সময়ে নির্মিত উল্লেখযোগ্য ইরানি চলচ্চিত্র হলো  ‘জেফারের দ্য নাইট অব দ্য হ্যান্স ব্যাক’ (১৯৬৩), ‘অসাউদ কিমায়ির ঘেউসার’ (১৯৬৬)। তখনো ইরানি চলচ্চিত্র সঠিক দিশা পায়নি। আর ইরানিদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতাও বিরাজ করছিল। ঠিক সেই সময় তরুণ নির্মাতা দারিউস মেহেরজুই ১৯৬৯ সালে তৈরি করেন ‘দ্য কাউ’ চলচ্চিত্রটি। পরবর্তীকালে এটি অনেক স্বাধীন নির্মাতাকে স্বপ্ন দেখায়।

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত ও সম্মানজনক পুরস্কার অস্কার থেকে শুরু করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার ঘরে তুলে নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটি। চলতি বছরেই অস্কারের ৮৯তম আসরে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার জিতে নেয় ইরানি ছবি ‘দ্য সেলসম্যান’। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার অস্কার জিতলেন ছবিটির পরিচালক আসগর ফারহাদি। এর আগে ‘অ্যা সেপারেশন’ তাকে এনে দেয় এই সম্মাননা। তবে আগেরবারের মতো এবারের ট্রফি নিজের হাতে গ্রহণ করতে অস্কার আসরে উপস্থিত ছিলেন না আসগর ফারহাদি। 

দেশটি অস্কারের আগামী প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এরই মধ্যে ১০টি চলচ্চিত্র চূড়ান্ত করেছে। ইরানের নয় চলচ্চিত্র তারকার সমন্বয়ে একটি মূল্যায়ন কমিটি বাছাই করে এসব চলচ্চিত্র। বিদেশি ভাষার ক্যাটাগরিতে চলচ্চিত্রগুলো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। 

ইরানের ওই ১০টি চলচ্চিত্র হচ্ছে, ‘দি মিডডে ইভেন্ট’, ‘দি ভিলা টেন্যান্টস’, ‘টুয়েন্টি-ওয়ান ডেজ লেটার’, ‘সাবডিউয়েড’, ‘রেড নেইল পলিশ’, ‘মাই ব্রাদার খসরু’, ‘এ হাউস অন ফোরটি ওয়ান স্ট্রিট’, ‘ম্যালেরিয়া’, ‘ব্রেথ’ ও ‘ইনভারসন’। এই ছবিগুলোর মধ্যে এবার এক ইরানি নারী চলচ্চিত্রকারের ছবিও স্থান পেয়েছে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh