অবহেলিত যাত্রা শিল্প

বিশ্ব সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে বিনোদনের অনেক মাধ্যম আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের গ্রাম বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে আজ বিলুপ্তির পথে পুঁথি পাঠের আসর, যাত্রাপালার মতো জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যমগুলো। দুর্গাপূজা এবং শীতকাল হচ্ছে যাত্রাপালার ভরা মৌসুম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই ভরা মৌসূমেও যাত্রা শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা সংকটের মধ্যে দিয়ে চলছে। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা অভাবেই বিনোদনের জনপ্রিয় এই  মাধ্যমটি আজ ঝুঁকির মধ্যে।

ষোড়শ শতকে সূর্যের দক্ষিণ দিকে যাত্রা শুরুর মুহূর্ত থেকে অনুষ্ঠিত হতো সূর্যপূজা; সূর্যের গমন থেকে যাত্রার উৎপত্তি। এ যাত্রা শুরুহতো শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রার পর থেকে দুর্গাপূজার সপ্তমীর দিন পর্যন্ত। এ সময় পালা রচনা এবং মহড়া অনুষ্ঠিত হতো। প্রচীন নাট্যধারায় দুই ধরনের নাটকের তথ্য পাওয়া যায়, একটি মঞ্চস্থ হতো উন্মুক্ত মঞ্চে অন্যটি প্রেক্ষাগৃহে। 

যাত্রার ক্রমবিকাশ সম্পর্কে যাত্রা গবেষক ও কবি ড. তপন কুমার বাগচী লিখেছেন, ‘১৮৬০ সালে ঢাকায় কৃষ্ণকমল গোস্বামী (১৮১১-৮৮) কৃষ্ণ বিষয়ক ঢপ কীর্তন পরিবেশনের পাশাপাশি পৌরাণিক পালা রচনা ও মঞ্চায়নের মাধ্যমে যাত্রার যে গতি সঞ্চার করেন, চারণকবি মুকুন্দ দাসের (১৮৮৭-১৯৩৪) হাতে তা হয়ে ওঠে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জাগরণী মন্ত্র।’ কিন্তু সেই জাগরনী মন্ত্র আজকে যাত্রা পেশাদারি শিল্প মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে নানারকম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী- বর্তমানে কুশলী ও কর্মীসহ যাত্রাশিল্পীর সংখ্যা ২০ হাজার ৩শ’। প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৫ লাখ। ৯০’র পর থেকে অশ্লীলতা, নিরাপত্তা সমস্যাসহ নানা অজুহাতে যাত্রাশিল্পকে আবদ্ধ করা হয় নিয়ন্ত্রনের বেড়াজালে। ১৯৯১-৯৬’র মধ্যে ৬ বার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় যাত্রানুষ্ঠান বন্ধের জন্য। সে সময় ১০১৪ দিন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে যাত্রানুষ্ঠান। তারপর থেকে এখনো অনেক জায়গায় যাত্রার নাম শুনলে অনুমোদন দেওয়া হয় না। সারা দেশে যাত্রাপালার অনুমোদন অঘোষিতভাবে বন্ধ রয়েছে। যাত্রাপালা আয়োজনে জেলা প্রশাসনের অনুমোদন দরকার হয়। কিন্তু যাত্রার কথা শুনলেই প্রশাসন আর অনুমোদন দিচ্ছে না। বাংলাদেশ যাত্রা শিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। দেশে যেখানে ৩০০-এর বেশি যাত্রা দল ছিল, এখন ৩০টি দলও সংগঠিত হচ্ছে না। প্রায় দুই বছর ধরে যাত্রাপালা বন্ধ।

তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, সরকার শিল্প সংস্কৃতি চর্চায় অনুপ্রাণিত করলেও মাঠপর্যায়ের অবস্থা খুবই জীর্ণশীর্ণ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জঙ্গি হামলা এমন নানা অযুহাত দেখিয়ে যাত্রার অনুমোদন বন্ধ রাখা হয়েছে।

যাত্রা শিল্প উন্নয়ন পরিষদের সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাংলায় আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত যাত্রার ভরা মৌসুম। গত কয়েক বছর কোনো যাত্রাপালা হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েক জায়গায় হয়েছে। তাও চালু অবস্থায় বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন।

যাত্রাশিল্পের সঙ্গে বহু লোকের জীবন জীবিকা রয়েছে। প্রতিটি দলে শিল্পী, কলাকুশলী মিলিয়ে জনাচল্লিশেক লোক থাকে। এ হিসাবে তিন শতাধিক যাত্রা দল অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার লোকের জীবিকার সংস্থান। পালা মঞ্চস্থ না হওয়ায় এসব মানুষ বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকেই চলে গেছেন অন্য পেশায়। অনেক দক্ষ অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক বাদক, পালাকার চলে গেছেন দল ছেড়ে। ফলে ক্রমেই আলোহীন হয়ে হয়ে পড়ছে ঐতিহ্যবাহী যাত্রার জৌলুশ।

দীর্ঘদিন ধরে যাত্রা, সার্কাস এসব নিয়ে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ও গবেষণা করছেন লোকগবেষক বাংলা একাডেমির সহপরিচালক সাইমন জাকারিয়া। তিনি জানালেন, ঐতিহ্যবাহী যাত্রা দলগুলো এখন অস্তিত্ব সংকটে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার এলাকার চাবাগান ছাড়া অন্য কোথাও নিয়মিত যাত্রাপালা আর হয় না। চাবাগানে এই যাত্রা হয় চাশ্রমিকদের জন্য। 

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে দু:খজনক হলো, যাত্রাপালা নাম পাল্টে এখন হয়ে যাচ্ছে লোকনাট্য। যাত্রা দলগুলোর যে কেবল নাম পরিবর্তন হচ্ছে তা-ই নয়, তাদের মঞ্চায়নের রীতিও বদলে যাচ্ছে। প্রশাসনের কাছে তারা লোকজ নাটক মঞ্চায়নের অনুমোদনের জন্য আবেদন করে থাকে। ফলে যাত্রার মতো প্যান্ডেল করে আর পালা পরিবেশন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। টিকিট বিক্রিরও কোনো ব্যবস্থা নেই। সাইমন জাকারিয়া জানিয়েছেন, খোলা মঞ্চে এসব লোকনাট্য মঞ্চস্থ করা হয়। স্থানীয় কোনো মহল বিশেষ কোনো উপলক্ষে এলাকায় নির্দিষ্ট কয়েক দিন লোকনাট্য মঞ্চায়নের জন্য প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমোদন নেয়। এরপর তারা দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে। একটি দরদাম করে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকায় দলগুলো তাদের পুরোনো পালাগুলোই একটু এদিক-ওদিক করে মঞ্চায়ন করে। যাত্রার অভিনয় বলতে গেলে এখন এভাবেই চলছে।

যাত্রাশিল্পী কল্পনা ঘোষ জানান, শিশুকাল থেকে যাত্রাপালায় অভিনয় করছি। এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে ৩ ছেলে মেয়ে মানুষ করেছি। ভালবেসে এখনো ধরে রেখেছি যাত্রাভিনয়। বর্তমানে তরুণরা আর যাত্রাভিনয়ে আসতে চায় না। তরুণরা এগিয়ে আসলে এ শিল্পের উত্তরণ ঘটতো। এটি একটি ভাল মাধ্যম। এখানে শেখার অনেক কিছু রয়েছে।

যাত্রা পালাকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এম এ মজিদ বলেন,  এখন তো যাত্রাপালার মৌসুম দুর্গাপূজার সপ্তমী থেকে যাত্রার মৌসুম শুরু, আর এপ্রিলের ১৩ তারিখ পর্যন্ত এর শেষ ধরা হয়। আসলে আয়োজকদের উদ্যোগের অভাবে যাত্রাশিল্প এখন বন্ধের পথে। এমন অনেক আয়োজক রয়েছেন যারা যাত্রাকে সামনে রেখে অশ্লীলতা প্রদর্শন ও অন্যান্য ব্যবসার জন্য ব্যস্ত থাকেন। যে কারণে অনেক সময় প্রশাসন অনুমতি দেয় না। সুস্থ ও সুন্দর আয়োজন হলে প্রশাসন কেন দেবে না! ২০১৩ সালে নীতিমালা পাসের পর থেকে শিল্পকলা দেশব্যাপী কিছু যাত্রা উৎসবের আয়োজন করেছে। ১১১টি দলকে নিবন্ধন দেওয়ার পর আরও ৬টি দল নতুন করে নিবন্ধিত হয়। যাত্রাপালায় অশ্লীল কিছু হলে শিল্পকলার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে জানানো হয়। প্রশাসন কিন্তু অনুমতি দিয়ে থাকে সুস্থ যাত্রাপালার। তবে কিছু ভুল বোঝাবুঝির কারণে যাত্রাপালার নিয়মিত আয়োজন ব্যাহত হচ্ছে।

যাত্রা গবেষক ড. তপন বাগচী জানান, যাত্রাশিল্পে সংকটের অন্যতম হলো রাজনৈতিক কারণ। আর আরেকটি সংকটের কারণ হচ্ছে, আগের মতো মেলায় লোক যাত্রা দেখতে আগ্রহী হয় না। মানুষের মন-মানসিকতা নেই যাত্রা দেখার। প্রযুক্তির বহুবিধ ব্যবহারে মানুষ অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে। যাত্রা তেমন করে টানে না। যেখানে সিনেমার প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ, সেখানে যাত্রাশিল্প কীভাবে বেঁচে থাকবে? হলে গিয়ে ছবি দেখারই তো মানসিকতা নেই, যাত্রা দেখবে কীভাবে! 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh