আমার অভিনয়-জীবন

আমাদের চারপাশে বিরাজমান বিভিন্ন চরিত্র নিজের মধ্যে ধারণ করে সেই চরিত্রটি হয়ে উঠবার বাসনা ছোটকাল থেকে ছিল। যখন চারপাশটাকে বুঝতে শুরু করেছি, ঠিক সেই সময়েই রুপালি পর্দার শিল্পীদের অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করত। নিজের মধ্যে একজন অভিনয় শিল্পী হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। প্রথম সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা মায়ের কোলে বসে। তবে আমার অভিনয়জীবনের শুরু দেশের জনপ্রিয় নাট্যদল আরণ্যকের হয়ে মঞ্চে কাজ করার মধ্যে দিয়ে। আর নিয়মিত নাট্যচর্চায় যুক্ত হই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই। নাট্যজন মামুনুর রশীদের রচনা ও মোশারফ হোসেনের পরিচালনায় ‘ওরা কদম আলী’ নাটক দিয়ে আমার অভিনয় শুরু। তারপর ‘ওরা আছে বলেই’ ‘গিনিপিগ’ ‘সমতট’ ইত্যাদি নাটকে নিয়মিত অভিনয় করে গেছি। যদিও দীর্ঘদিন মঞ্চ থেকে দূরে আছি টেলিভিশন নাটকে ব্যস্ততার কারণে।

একটি নাটক পরিপূর্ণভাবে মঞ্চে প্রদর্শনযোগ্য করে তুলতে অনেক ক্ষেত্রের সমন্বয় প্রয়োজন হয়। যেমন পাণ্ডুলিপি, অভিনয়শিল্পী, আবহসংগীত, আলোক নির্দেশনা, সেট ডিজাইন, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা, প্রযোজনা ব্যবস্থাপনা, নাট্য নির্দেশনা, রূপসজ্জা, সংগঠন ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। একটি নাট্যদলে এই ক্ষেত্রগুলোরই সমন্বয় জরুরি। এর মধ্যে সবচেয়ে দায়িত্বপূর্ণ এবং সৃজনশীল ক্ষেত্রটি হচ্ছে নাট্য নির্দেশনা। একজন নাট্য নির্দেশককে সব ক্ষেত্রের সঙ্গে সমন্বয় করে নাটকটি সার্থকভাবে মঞ্চে উপস্থাপন করতে হয়। আমার নাট্যগুরু আরণ্যকের প্রতিষ্ঠাতা মামুনুর রশীদ। তিনি তরুণ নাট্যকর্মীদের মেধা বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন এবং এখনো করে চলেছেন। তবে আরণ্যক একের পর এক তরুণ নাট্যকার ও নির্দেশক তৈরি করেছে মূলত ‘আরণ্যক নির্দেশনা দল’ গঠনের মাধ্যমে।

দলের তরুণ সদস্য, যারা নির্দেশনা বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাদের সম্পৃক্ত করে গঠন করা হয় ‘আরণ্যক নির্দেশনা দল’। ‘ওরা কদম আলী’ নাটকের পর নতুন নাটক ‘ওরা আছে বলেই’ দিয়ে ১৯৭৭ সালে শুরু হয় আরণ্যক নির্দেশনা দলের কার্যক্রম। সেই নির্দেশনা দলের একজন সদস্য হিসেবে আমারও শুরু হয় নির্দেশনা শেখার কাজটি। শিখতে শুরু করলাম নির্দেশনার খুঁটিনাটি। 

মহিলা সমিতি এবং গাইড হাউস মিলনায়তন, এই দুটি মঞ্চেই হতো নিয়মিত নাটকের প্রদর্শনী। তখন শিল্পকলা একাডেমিতে জাতীয় নাট্যশালা তৈরি হয়নি। যখনই যে দলের নতুন নাটক মঞ্চে আসতো সেই নাটকটি দলের সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে দেখতেই হতো। এটা ছিল এক ধরনের অ্যাসাইনমেন্ট। নাটকটি দেখার পর সেই নাটকটি নিয়ে বিভিন্নভাবে আলোচনা করে আমরা নিজেরা সমৃদ্ধ হতাম। বিভিন্ন সময়ে দেশে এবং বিদেশে নাট্যবিষয়ক কর্মশালায় অংশগ্রহণ করার সুযোগও তৈরি হয় এবং সেখানে আমার মতো দলের অনেকেই অংশগ্রহণ করে।

‘ওরা আছে বলেই’ নাটকের পর মঞ্চে আসে ‘ইবলিশ’, সেটিও আরণ্যক নির্দেশনা দলের নির্দেশনায়। পাশাপাশি নাটক রচনার ক্ষেত্রে যারা আগ্রহী তাদেরও অনুপ্রেরণা দিতে থাকেন দলের প্রধান মানুষটি। তারই ধারাবাহিকতায় ‘ইবলিশে’র পর মঞ্চে আসে ‘সাতপুরুষের ঋণ’ নাটকটি। এই প্রথম মামুনুর রশীদের পর একজন নতুন নাট্যকারের আবির্ভাব হলো আরণ্যক নাট্যদলে, তিনি আব্দুল্লাহেল মাহমুদ। 

তার লেখা ‘সাতপুরুষের ঋণ’ নাটকটি আরণ্যক নির্দেশনা দলের নির্দেশনায় মঞ্চে এলো ১৯৮২ সালে। এরপর ‘গিনিপিগ’ ১৯৮৩ সালে। আব্দুল্লাহেল মাহমুদের লেখা ‘নানকারপালা’ ১৯৮৫ সালে। ১৯৮৯ সালে আরেকজন নাট্যকারের যাত্রা শুরু হলো, ‘মান্নান হীরা’। তিনি নাট্যরূপ দিলেন শেক্সপিয়রের নাটক ‘কোরিওলেনাস’। ১৯৯১ সালে একক নাট্য নির্দেশক হিসেবে আরণ্যক তরুণদের সুযোগ তৈরি করে দেয়। তরুণ নাট্যকার মান্নান হীরার লেখা ‘খেলা খেলা’ নাটকটির নির্দেশনা দেন ‘শাহ আলম দুলাল’। একজন তরুণ নির্দেশক হিসেবে ১৯৯২ সালে সুযোগ এলো আমার। নাট্যকার মামুনুর রশীদ আমার হাতে তুলে দিলেন নাটক ‘পাথর’। উপমহাদেশে সেই সময়ে মৌলবাদের পুনরাবির্ভাবে যে অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয় তার মৌলিক উপাদান নিয়েই ‘পাথর’ নাটকের ঘটনা। সাধারণ এক গ্রামের নানা সম্প্রদায়ের মানুষগুলো মুখোমুখি দাঁড়ায় একটি ভীতিকর সম্মুখযুদ্ধে।

এরপর ১৯৯৪ সালে মঞ্চে আসে মান্নান হীরার নাটক ‘আগুনমুখা’। নির্দেশক হিসেবে হাতেখড়ি হয় আরেক তরুণ নাট্য পরিচালকের, তিনি হলেন ‘আজাদ আবুল কালাম’। এভাবে আরণ্যকে তরুণ নাট্যকার ও নির্দেশকের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৩ সাল থেকেই আরণ্যক নিয়মিতভাবে ১ মে উদযাপন শুরু করে, যেখানে অবধারিতভাবে একটি পথ নাটকের প্রদর্শনী হয়। প্রতি বছর নতুন নতুন পথ নাটক প্রদর্শিত হতে থাকে। 

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর সমরেশ বসুর লেখা ‘আদাব’ এর নাট্যরূপ করেন ‘মান্নান হীরা’। আবারও নির্দেশনার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপর। সারাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে দুটি দলে বিভক্ত হয়ে আরণ্যক নাট্যদল ‘আদাব’ নাটকটি নিয়ে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় পথে পথে প্রদর্শনী করি। ১৯৯৪ সালে ১ মে মান্নান হীরার লেখা পথনাটক ‘ঘুমের মানুষ’ আমার নির্দেশনায় তৈরি হয়।

মঞ্চের পাশাপাশি টেলিভিশনেও নিয়মিত অভিনয় করতে থাকি। এরই মধ্যে ১৯৯৪ সালে টেলিভিশন প্যাকেজ নাটকের যাত্রা শুরু হলে শিল্পীদের পেশাদার হবার একটি সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। টেলিভিশন নাটকের ব্যস্ত শিল্পীরা প্যাকেজ নাটকেও ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেবার সুযোগ আসায় আমার মতো অনেক শিল্পী অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেয় এবং প্যাকেজ নাটকে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে আমার দূরত্ব বাড়তে থাকে মঞ্চের সঙ্গে। দলের বিশেষ কোনো প্রদর্শনী বা অনুষ্ঠান ছাড়া মঞ্চে ওঠার আর সুযোগ হয় না। পেশার কারণে সেখানে নিয়মিত সময় দিতে হয় বলেই এই দূরত্বটা তৈরি হয়। ১৯৯৫ সালে মঞ্চে আসে ‘জয়জয়ন্তী’। এই নাটকটি ছিল মঞ্চে আমার শেষ কাজ। এরপর প্রতিটি নতুন নাটকের জন্য বারবার প্রস্তাব পাবার পরও ব্যস্ততার কারণে আর সময় দেয়া হয়ে ওঠেনি। তখন তুমুল ব্যস্ততা প্যাকেজ নাটকে অভিনয় নিয়ে। 

তখন আমি ‘শিল্পী’ ‘দানব’ ‘সুন্দরী’ ‘নক্ষত্রের রাত’ এই নাটকগুলো নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার মধ্যেই জিনাত হাকিমের লেখা ‘যা হারিয়ে যায়’ ধারাবাহিকটি নির্দেশনা দেবার দায়িত্ব নিয়ে নিলাম। এরপর একে একে আমার নির্দেশনায় ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ ‘প্রবাসে পরবাসে’ ‘দিন চলে যায়’ ‘নিজ গৃহে পরবাসী’ ‘ভালোবাসা রঙ’ বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হতে থাকে। অভিনয় নিয়ে যখন আমার প্রচণ্ড ব্যস্ততা; সেই সময় নির্দেশনা দিতে শুরু করায় ক্যারিয়ার ও নির্দেশনার কাজটি পাশাপাশি সমান তালে চালিয়ে গিয়েছি। 

নির্দেশক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, একজন নির্দেশককে নাটকের সব ক্ষেত্রের সঙ্গেই সমন্বয় করতে হয়। আর এই সমন্বয়ের কাজটি করতে গেলে সব শাখাতেই মনোযোগী হতে হয়। একটি সুন্দর নাটক তখনই উপস্থাপন করা সম্ভব যখন সব ক্ষেত্রকে সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বয় করা যায়। এক কথায় নির্দেশনার কাজটি বড়ই কঠিন এবং জটিল। নির্দেশক হচ্ছেন জাহাজের ক্যাপ্টেনের মতো, তিনি যেদিকে নিতে চাইবেন জাহাজ সেদিকেই চলতে থাকবে। সুতরাং নির্দেশকের দায়িত্ব অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। দায়ও গুরুত্বপূর্ণ। তাকে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গায় থাকতে হবে স্বচ্ছ। নাটক, চলচ্চিত্রের গল্পে যেমন থাকতে হবে সামাজিক বাস্তবতা, তেমনি নির্দেশকেরও দায়িত্ব সেই বাস্তবতার কতটুকু তিনি সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করবেন, শিল্পসম্মতভাবে দেখবেন। তার কাজ তিনি এমনভাবে তুলে ধরবেন যাতে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র্রের মানুষ বিভ্রান্ত না হন।

আমরা আগে সিনেমা, নাটকে পরিবারের মোটামুটি সব সদস্যের উপস্থিতি পেতাম, কিন্তু ইদানীং পরিবারকে খুঁজে পেতে খুব কষ্ট হয়। টেলিভিশন নাটকের অভিনয়ের কারণে অনেক প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। বিটিভিতে যারা নাটক পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন তাদের প্রযোজক বলা হয়; কিন্তু প্রযোজক বলতে সাধারণত যা আমরা বুঝি তা হলো, তিনিই প্রযোজক, যিনি অর্থলগ্নি করেন। এখনো সেই ধারা অব্যাহত আছে। 

একটি নাটক নির্মাণ করার ক্ষেত্রে পরিচালক নাটকের নাট্যকার থেকে শুরু করে এর শিল্পী, কলাকুশলী, সেট ডিজাইনার, মিউজিক ডিরেক্টর সবার সঙ্গে প্রি প্রোডাকশন মিটিং করতেন। একাধিক মহড়া করতেন। নাটকটি নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করে সবার মতামতের ওপর ভিত্তি করে নাটকটি চিত্রায়নের উপযোগী করতেন। এরপর সেটে প্রত্যেক চিত্রগ্রাহকদের প্রতিটি দৃশ্য ধারণের পূর্বে রিহার্সাল করাতেন। কারণ রেকর্ডিং হতো একসঙ্গে ৩/৪ ক্যামেরায়। পোস্ট প্রোডাকশনে নাটক এডিট হবার পরও যদি পরিচালকের মনে হতো নাটকের কোথাও দুর্বলতা আছে, তাহলে আবার রি রেকর্ডিং করতেন। এই যে পরিচালকের সঙ্গে শিল্পীর, নাট্যকারের কলাকুশলীদের মিথষ্ক্রিয়া, এটা তারা সবসময় করতেন এবং গুরুত্ব দিতেন। 

আমি কাজ করেছি, আব্দুল্লাহ আল মামুন, মুস্তাফিজুর রহমান, আতিকুল হক চৌধুরী, জিয়া আনসারী, নওয়াজীশ আলী খান, অহসান হাবীব, আব্দুল্লাহ্ ইউসুফ ইমাম, ফখরুল আবেদীন, শহীদুল হক খানসহ অনেকের সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের কাজের ধারা একেক রকম। তাদের কাছ থেকে দেখে, কাজ করে এসব আমি নিজের মধ্যে ধারণের চেষ্টা করেছি। 

অনেকেই হয়তো বলতে পারেন এই সময়ের পরিচালকরা কি এসব নিয়ম মেনে কাজ করছেন না? আমি ঢালাওভাবে বলছি না যে, এখনকার পরিচালকরা তা করছেন না। অনেক তরুণ নির্মাতা আছেন যারা করেন; কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই কম। অধিকাংশ পরিচালক বাজেট সংকোচন এবং সময় স্বল্পতার কারণে এই অতি জরুরি কাজগুলো করতে পারেন না। 

একটি নাটক পরিপূর্ণভাবে সুন্দর করতে এরসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের সৃজনশীলতাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হয়। এই কাজের ক্ষেত্রে যারা কাজ করতে আসেন তারা প্রত্যেকেই অসাধারণ মেধাবী এবং সৃজনশীল। নাটকের একটি চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে বা বিশ্বাসযোগ্য করতে সেই চরিত্রের অভিনয় শিল্পীকে প্রচুর গবেষণা করতে হয়। তোতা পাখির মতো সংলাপ বলে গেলেই চরিত্রটি বিশ্বাস যোগ্য হবে তার কোনো কারণ নেই। ঠিক তেমনিভাবে একজন চিত্রগ্রাহকও তার সৃজনশীল চিত্রায়ন দিয়ে নাটকটি দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে পারেন। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশও এগিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক দশকে প্রযুক্তির বিশাল অগ্রগতি হয়েছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের নাটক, চলচ্চিত্র এগিয়ে যাচ্ছে। 

উন্নত বিশ্ব ডিজিটাল হয়েছে। আমাদের দেশও বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল হচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে। অনেক আন্তর্জাতিক মানের কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে। আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পাচ্ছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। দেশ এবং সংস্কৃতিকে যদি আমরা সমৃদ্ধ করতে চাই, তাহলে আমাদের যার যার দায়িত্বের প্রতি বিশ্বাসী এবং শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। 

ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার যে ক্ষেত্র আমরা দেখি, যেমন টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, বেতার, মঞ্চের সবই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই, যারা এই মাধ্যমে কাজ করি জানি; কিন্তু বর্তমান সময়ে এই মাধ্যমগুলোর কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরণে মঞ্চ নাটক এক ধরনের বিপ্লব ঘটিয়েছিল। শুধু মঞ্চ নাটক নয়, সাহিত্যও এদেশের মানুষের মেধা ও মননের বিকাশে বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে। পরিবার গঠন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র নির্মাণে-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিছুদিন আগে পর্যন্ত আমরা গল্পে মানবিকতা খুঁজে পেতাম। গুণী নাট্যজন ও নির্মাতারা সমাজ ও দেশকে বিশ্লেষণ করে নাটক, চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেন। এখন বেশকিছু সীমাবদ্ধতা গুণী নির্মাতাদের সৃজনশীলতাকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। ভেতরের কারণগুলো কী, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে।

তবে প্রধান কারণ হচ্ছে নির্মাণ ব্যয়। আগে নির্মাণের জন্য বাজেট ছিল উন্মুক্ত। নাট্যকার ও নির্মাতারা গল্প লেখায় এবং নির্মাণে ছিলেন স্বাধীন। তাই সেইসব নাটকের গল্পে আমরা পরিপূর্ণ পরিবারকে খুঁজে পেতাম। আর এখন বাজেট সংকুচিত হবার কারণে পরিবার হয়েছে উধাও, আর গল্প সীমাবদ্ধ হয়েছে দু’একজনের মধ্যে। এহেন কারণে পরিচালকরা হয়ে পড়েছেন সীমাবদ্ধ। গল্পকে করে ফেলছেন সীমিত, পরিবারকে ঠেলে দিচ্ছেন দূরে।

একজন অভিনয় শিল্পী হিসেবে অনেক গুণী নির্মাতা ও অভিনয় শিল্পীর সঙ্গে কাজ করবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। নির্মাতাদের মধ্যে আমি পেয়েছি আমার গুরু মামুনুর রশীদ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আব্দুল্লাহ ইউসুফ ইমাম, আতিকুল হক চৌধুরী, মুস্তাফিজুর রহমান, মো. বরকতউল্লাহ, আল মনসুর, আবু তাহের, ফখরুল আবেদীন, আলাউদ্দিন আহমেদ, জিয়া আনসারী এবং এই সময়ের দীপংকর দীপন, অনিমেষ আইচ, নুরুল আলম আতিকসহ অনেককে। অনেক সাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম নিয়েও কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে। তাদের মধ্যে জহির রায়হান, মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, সেলিনা হোসেন, রাবেয়া খাতুন, শওকত ওসমান, শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজামান ইলিয়াস, ইমদাদুল হক মিলনসহ এই সময়ের হরিশংকর জলদাস, আনিসুল হক, শাহাদুজ্জামান, শহীদুল জহির এবং আরও অনেকের লেখা আমাদের আন্দোলিত করে, ভাবনাকে প্রভাবিত করে। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে আমাদের দেশও এগিয়ে যাচ্ছে। এই এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মকেও মানবিক বিষয়গুলো মাথায় দিয়ে দিতে হবে। আর এই গুরুদায়িত্ব সৃজনশীল পরিচালকদের। এটা আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। 

অভিনয়ের পাশাপাশি আমি সম্প্রতি যুক্ত হয়েছি বাংলাদেশের অন্যতম ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘ওয়ালটন’ গ্রুপে। অভিনয় ও কর্মক্ষেত্রের সমন্বয় করে কাজ করছি। দুই মাধ্যমেই দেশ সেবার সুযোগ রয়েছে। আমি মনে করি এটা আমার জন্য সবার ভালোবাসা। এই ভালোবাসা নিয়েই আমৃত্যু কাজ করে যেতে চাই। নতুন ভাবনা-চিন্তা যুক্ত হয়ে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অটুট থাকুক, সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হোক। জয় হোক মানুষের, কল্যাণ হোক মানবতার। 

লেখক : অভিনেতা ও নির্দেশক

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //