উষ্ণতার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

আবহমানকাল থেকে শরৎকালে কমে গরমের দাপট। আকাশে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি আর দমকা হাওয়া থাকার কথা। পাওয়া যায় আরামদায়ক আবহাওয়ার পরশ। সেই শরৎকাল শেষ হয়ে গেল। চলছে হেমন্ত। বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হলেও কমছে না উষ্ণতা। আশ্বিনের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে কার্তিক মাস শুরু হলেও, কোথাও নেই শীতের পরশ। শুধু শরৎ বা হেমন্ত নয়, যেভাবে আবহাওয়ার ধরন দিনকে দিন বদলে যাচ্ছে, তাতে আর কয়েক বছর পর বসন্তের অস্তিত্বও থাকবে কি-না, তা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। 

আবহাওয়ার হেঁয়ালি আচরণে গ্রীষ্মে থাবা বসাচ্ছে শীত, ঝড়ো হাওয়া বইছে শীতে কিংবা বর্ষাকালেও। ঘটছে বজ্রপাত আর শিলাবৃষ্টি। সুস্পষ্টভাবে স্থির হয়ে দেখা দিচ্ছে না নতুন কোনো ঋতুচক্র। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শহরে ঋতুর অনুভূতি হারিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ছে কর্মক্ষমতা। পরিবেশের এমন বেখায়ালি আচরণ সম্পর্কে আবহাওয়া অফিসের ব্যাখ্যা, গেল চার দশকে দেশে তাপমাত্রা বেড়েছে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার আরও বেশি। ফলে ঋতু-বৈচিত্র্য বোঝা যাচ্ছে না শহরগুলোতে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান বলেন, সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ২-৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা বেশি রয়েছে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও ১-৩ ডিগ্রি বেশি আছে। গত বছরের মে মাস থেকে আমরা স্বাভাবিকের অপেক্ষা অধিক তাপমাত্রা রেকর্ড করে আসছি।

গত কয়েক বছরের পর্যবেক্ষণ বলছে, অনেক সময় শীত থাকছে ফাল্গুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত; কিন্তু তার পরেই তাপমাত্রা চড়ে যাচ্ছে ৩৫ ডিগ্রির ওপরে। দখিনা বাতাসে থাকছে উষ্ণতা। আবার শীতের পরেই লাফ দিয়ে চলে আসছে গ্রীষ্ম। আবার দেশের এক স্থানে বৃষ্টিপাত তো অন্য স্থানে থাকছে প্রচণ্ড গরম। গবেষকদের মতে, আবহাওয়ার এই রূপ বদল ঘটছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা দেশের ষড়ঋতুর ওপর ভালোভাবেই জেঁকে বসেছে। যার প্রভাব পড়ছে জীবন ও প্রকৃতিতে। ঝুঁকিতে পড়ছে কৃষি, বাড়ছে দুর্যোগ, বাস্তচ্যুত হচ্ছে মানুষ। নতুন নতুন রোগও মোকাবেলা করতে হচ্ছে মানুষকে। শুধু বাংলাদেশ নয়, আবহাওয়ার এ বৈরী আচরণ চলছে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বজুড়েই।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির বিপদ : বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবে ঢাকাবাসীর কর্মক্ষমতা বিশ্বে সবচেয়ে কমেছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে বছরে এ শহরে মোটের ওপর ৫ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ (বিভিন্ন কাজে ঢাকার বাইরে থেকে আসা মানুষসহ) তাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতার চেয়ে কম কাজ করতে পারছেন। শুধু তাই নয়, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে স্বাস্থ্য সমস্যাও বাড়ছে। বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে এ তালিকায় ঢাকা ছাড়াও রয়েছে- কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও সিরাজগঞ্জ।

যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা, ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনা এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার একদল গবেষক যৌথভাবে গবেষণাটি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসে সম্প্রতি গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বের ৫০টি শহরের ওপর করা একটি সমীক্ষার ফলাফলও তুলে ধরা হয়।

গবেষণায় উঠে এসেছে, দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে মানুষ কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন, বিশ্বের এমন ২৫টি দেশের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ভারত। আর বাংলাদেশ রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। ঢাকাবাসীর কর্মক্ষমতা হ্রাসের কারণও উঠে এসেছে গবেষণায়। তাতে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে জনসংখ্যা বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত (২ দশমিক ৭ শতাংশ) হারে বাড়ছে। ১৯৮৩ সালে এখানকার জনসংখ্যা ছিল ৪০ লাখ। ২০১৬ সালে তা বেড়ে প্রায় দুই কোটি হয়। এ ছাড়া এই শহরে সারাবছরই দেশের অন্যান্য জেলা থেকে মানুষ আসা-যাওয়া করে। সব মিলিয়ে এই শহরে মানুষের উপস্থিতির সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি ধরেছেন গবেষকরা। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এই শহরের গাছপালা কমেছে। বেড়েছে কংক্রিটের ইমারত। এই ৩২ বছরে ঢাকার মোট তাপমাত্রা যে পরিমাণে বেড়েছে, তাতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা

বৃদ্ধির ভূমিকা ২০ শতাংশ। বাকি ৮০ শতাংশ মূলত দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঘটেছে।

গবেষণায় দ্রুত উষ্ণতা বেড়েছে, বিশ্বের এমন ২৫টি দেশের কত মানুষ উষ্ণায়নের কারণে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন, তার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ তালিকায় শীর্ষে থাকা ভারতে উষ্ণায়নের কারণে ১১০ কোটি ৪০ লাখ মানুষ কর্মক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশে ১৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ এই ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ৩৭ শতাংশ ভূমিকা রেখেছে। বাকি ৬৩ শতাংশ ঘটেছে স্থানীয় কারণ। ১৪ কোটি ৩১ লাখ মানুষ কর্মক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে থাকায় তালিকায় পাকিস্তান তৃতীয়, ১১ কোটি ৭৫ লাখ মানুষের ঝুঁকির কারণে চীন চতুর্থ এবং ৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ঝুঁকিতে থাকায় নাইজেরিয়া পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

রাজধানীতে ২৫ হিট আইল্যান্ড : গরমের মধ্যে পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে ঢাকায় তাপপ্রবাহের ফলে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ২৫টি এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে এক গবেষণায়। এই এলাকাগুলোর নাম গবেষকরা দিয়েছেন ‘হিট আইল্যান্ড’। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, জার্মান রেড ক্রস এবং বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর যৌথভাবে ঢাকা শহরের তাপদাহ নিয়ে ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি অন হিট ওয়েভ ইন ঢাকা’ শীর্ষক একই গবেষণা চালায়। গত সেপ্টেম্বরেই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

ঢাকার হিট আইল্যান্ডগুলো হলো- বাড্ডা, গুলশান, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, গাবতলী, গোড়ান, বাসাবো, টঙ্গী, শহীদনগর, বাবুবাজার, পোস্তগোলা, জুরাইন, হাজারীবাগ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, কুর্মিটোলা, আজমপুর, উত্তরা, কামারপাড়া, মোহাম্মদিয়া হাউজিং, আদাবর, ফার্মগেট, তেজকুনিপাড়া, নাখালপাড়া, মহাখালী। অসহনীয় গরমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকায় হিট ওয়েভ বা তাপপ্রবাহের প্রবণতা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘হিট আইল্যান্ড’গুলোতে গড়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। ঘনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় গরম তখন তাপপ্রবাহের পর্যায়ে চলে যায়।

২০০০ থেকে ২০১৯ সালের তাপমাত্রার ধরন বিশ্লেষণ করে এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের প্রধান তিনটি বড় শহর- ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ‘উষ্ণ নগরদ্বীপ’ বা আরবান হিট আইল্যান্ড তৈরি হচ্ছে। এত দিন মনে করা হতো, শুধু ঢাকার কিছু কংক্রিটময় ও সবুজহীন এলাকায় এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে; কিন্তু এ গবেষণায় দেশের অন্য বড় শহরগুলোতেও এ প্রবণতা দেখা গেছে।

কতটা প্রস্তুত : ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে তাপপ্রবাহের প্রবণতা বাড়িয়ে তুলেছে ঘনবসতিপূর্ণ বসবাস, বড় বড় দালান, প্রচুর গাড়ি, অনেক কারখানা। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে নেই তেমন প্রস্তুতি। তাপপ্রবাহের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার সময় এখন হয়েছে বলে মনে করেন আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে সতর্ক করতে হবে। স্যালাইন, পানীয়, ওষুধ সরবরাহ ও প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তার বিষয়টি রয়েছে।

রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির সহকারী পরিচালক শাহজাহান বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। অনেকে বুঝতে পারছে না, কী কারণে এ শহর অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন ধরনের রোগ হচ্ছে মানুষের, অনেক সময় হিট স্ট্রোক হচ্ছে, এর জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে, তা নিয়ে সচেতন করা দরকার।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে ঢাকা শহরের ৬৫ ভাগ কংক্রিট বা অবকাঠামোতে আচ্ছাদিত ছিল। ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয় প্রায় ৮২ ভাগ। এই সময়ে জলাশয় ও খোলা জায়গা প্রায় ১৪ ভাগ থেকে কমে ৫ ভাগের নিচে নেমেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য নগরগুলোর শীর্ষে থাকছে। চট্টগ্রামসহ অন্য বড় শহরগুলোতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এভাবে বেশি দিন চলতে থাকলে দেশের বেশির ভাগ বড় শহর ঢাকার মতো বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে উঠবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকার নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের বিদ্যমান জলাভূমি ও সবুজ এলাকা রক্ষা, রাজধানীর খালগুলো দখলমুক্ত করে সবুজায়ন এবং বাড়ির ছাদে বাগান করলে ১০ শতাংশ গৃহ কর মওকুফ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মেয়রের আশা, এতে রাজধানীতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার কমে আসবে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //