ভালোবাসি বাংলার বুনোপাখি

বুনোপাখি ভালোবাসি। জানিনে কেন বাসি। বলতে পারিনে, পাখির নেশাটা ভালো না মন্দ। তবু পাখির টানে বনে-বাদারে ঘুরি। নৌকার পাটাতনে পদ্মাসনে বসে জুমার দিন কাটে। লম্বা ছুটি পেলে উপকূলে গিয়ে কাদা-পানিতে হাঁটি। ভিজে-পুড়ে ঘরে ফিরি ছুটি ফুরিয়ে গেলে। চূড়ান্ত অর্জন, প্রত্যাশিত পাখিদের ক্ষণিক দর্শন। অথবা অপ্রত্যাশিত কোনো পাখির আকস্মিক আগমন। কিংবা দেখার আকাঙ্ক্ষা-ভরা পয়মন্ত কয়েক প্রহর। প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ সুকুমার কয়েকটি দিন।

এভাবেই দিন যায়, ছুটি শেষ হয়; পাখি দেখা শেষ হয় না। কারণ, পাখিরও যে শেষ নেই! সব পাখি দেখে ফেলেছে এমন মানুষ তো ভূ-ভারতে নেই। থাকলেও কি তার পাখি দেখা থেমে যেত? যেত না। যে পাখি কখনো এদেশে দেখা দেয়নি সেও তো এসে যেতে পারে যে-কোনো দিন। তা ছাড়া, দেখা-পাখি আবার দেখতে পেলে দেখার আনন্দ তো হারায় না; বরং প্রথম-দেখার উত্তেজক মুহূর্তটির স্মৃতি রোমন্থন করার সুযোগ মেলে। পাখি দেখা শুরু করলে তাই আর শেষ হয় না; চলতেই থাকে চলচ্ছক্তি থাকে যত দিন।

পাখির প্রজাতি-বৈচিত্র্যটাও তো কম নয়। পৃথিবীতে পাখির প্রজাতি-সংখ্যাটি এখন এগারো হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পাখি সম্পর্কে পণ্ডিতজনের জানাশোনাটা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রজাতি-সংখ্যা আরও কিছু বাড়বে। এখন যাদের এক-প্রজাতি বলে ধরা হয়, তাদের অনেকেই তা থাকবে না। নতুন নতুন প্রজাতি প্রতিষ্ঠিত হবে। পুরনো পাখি নতুন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত হবে। সে পাখি দেখার জন্য আবার নতুন করে পথে নামতে হবে। এমনটা অনেক হয়েছে; আগামী দিনেও হতে থাকবে।

এক থেকে একাধিক প্রজাতি হওয়ার ঘটনা এদেশেও কম ঘটেনি। সম্প্রতি আমাদের মেটে হাঁস, তিলা-ঘুঘু, নীলকান্ত আর পম্পাডু-হরিয়াল পাখির প্রত্যেকেই দুই প্রজাতিতে ভাগ হয়ে গেছে। আমাদের শাবুলবুলিতো এক থেকে তিন প্রজাতিতে বিভক্ত হয়েছে। এই তিন প্রজাতির নাম হয়েছে দেশি-শাবুলবুলি, উদয়ী-শাবুলবুলি আর চিনা-শাবুলবুলি। অনেক দেখেছি বলে আমরা শাবুলবুলিকে তেমন মনোযোগ দিয়ে দেখতাম না এক সময়। এখন দেশি, উদয়ী না চিনা, তা বোঝার জন্য শাবুলবুলিকে আবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হচ্ছে। 

কত প্রজাতির পাখি দেখা হলো, শুধু সে হিসেবটাই রাখেন অধিকাংশ পাখিদর্শক। অনেকে আবার পাখির উপপ্রজাতি দেখার হিসেবও রাখেন। লক্ষণীয় পার্থক্য আছে ও পৃথক নাম দেওয়া হয়েছে এমন উপপ্রজাতি বিশ্বে আছে লক্ষাধিক। যেমন, আমাদের দেশে ভুবনচিলের দুটো উপপ্রজাতি পাওয়া যায়। একটা উপপ্রজাতি সারাবছর এ দেশে বাস করে; যার নাম ‘গোবিন্দ’। অন্যটি শুধু শীতে বাংলাদেশে থাকে; নাম ‘লিনিয়েটাস’। চেহারা ও চরিত্রে এ দুটি উপপ্রজাতির পার্থক্য অগ্রাহ্য করা চলে না। ভুবনচিলকেও তাই আমরা খুঁটিয়ে দেখি; গোবিন্দ, না লিনিয়েটাস!

আপনি হয়তো জানেন যে বাংলাদেশে পাখির প্রজাতি-সংখ্যা সম্প্রতি সাত শত ছাড়িয়ে গেছে। এ সংখ্যাটা ভবিষ্যতে বাড়বে। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে অথবা নতুন আবাসের তালাশে যে পাখি একবার এ দেশে আসে সে চিরতরে আমাদের তালিকায় থেকে যায়; কিন্তু যে প্রজাতি হারিয়ে গেল তাকে তো তালিকাচ্যুত করা যায় না। তাই, তালিকায় যতো প্রজাতি থাকে, কোনো সময়ই দেশে তত থাকে না। আমাদের তালিকায় দুই প্রজাতির ময়ূর আছে, যদিও এ দেশে আর কোনোদিন তাদের দেখা মিলবে না। 

দেশে এখনো যে পাখি আছে তা দেখার সংকল্প করাও কম ধৃষ্টতা নয়। চাইলেই যে আপনি সব প্রজাতির পাখি দেখতে পাবেন, তা নয়। আদা-জল খেয়ে নামলেও এক জীবনে হয়তো সব দেখে যেতে পারবেন না। লোকালয়ে বাস করে এমন অনেক প্রজাতির পাখি আপনি দু-এক বছরে দেখে ফেলতে পারবেন। তারপর আপনাকে বনে-বাদারে যেতে হবে অন্য পাখিগুলো দেখতে; কিন্তু গেলেই যে তারা দেখা দেবে, তা নয়। যেতে হবে বার বার; কাটাতে হবে আকাঙ্ক্ষা-ভরা অনেক প্রহর।

যে জমিকে আমরা আজ বাংলাদেশ বলি সেখানে গত ২০০ বছরে ৯৫ পরিবারের ৭১৫ প্রজাতির পাখি দেখা গেছে, এ কথা অনেকেই হলফ করে বলে থাকেন। তবে এর মধ্যে ময়ূর, বাদি হাঁস, ডাহর, পাতি-সারস, রাজ-শকুন ইত্যাদি অনেক প্রজাতির পাখি এখন আর এদেশে নেই। বাংলার বিখ্যাত গোলাপি-হাঁস এখন শুধু এদেশে নয়, পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও আপনি চাইলে এদেশে আজও প্রায় সাতশ’ত প্রজাতির পাখি দেখার চেষ্টা করতে পারেন। 

দেখার সংকল্পটা করে ফেললে আপনি দেখার আগেই অনেক পাখি চিনতে পারবেন। দেখতে নামার আগেই তো আপনাকে জানতে হবে কোন পাখি দেখতে কেমন। তাই আপনি ফিল্ড গাইড অথবা ফেইসবুকে পাখির ছবি দেখতে শুরু করবেন। আর ছবি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে অনেক অদেখা পাখি আপনার চেনা হয়ে যাবে। আপনি নিজেই যদি পাখির ছবি তোলেন তো আপনার চেনা ও জানার পরিধি বিস্তৃত হতে বেশি দেরি হবে না।

তবে ভুলে যাবেন না,ছবির পাখি আর আসল পাখিতে অনেক ফারাক থাকে। পাখির পালক থেকে প্রতিফলিত আলোর যে ছটা আমরা চোখে দেখতে পাই সেটা কখনো ছবিতে মেলে না। একটা হীরকের প্রতিফলিত আলোটা তাকিয়ে দেখা আর তার আলোকচিত্র দেখার মধ্য যে তফাৎ, অনেকটা সে রকম। সঠিক আলোয় পাখিকে খুব কাছ থেকে দেখতে পেলে কিংবা দূরবীন দিয়ে ভালো করে দেখতে পারলেই বুঝবেন, আমাদের তোলা কোনো ছবিতেই পাখির ওই মনোহর রূপ ধরা পড়ে না।

মেটে-কাঠমৌর। ছবি: সায়াম চৌধুরী 

কেবলমাত্র ক্যামেরার ভিউ-ফাইন্ডারে কিংবা ফোন ও কম্পিউটারের মনিটরে পাখির ক্লোজ-আপ দেখলেও পাখির পালকের অপার সৌন্দর্যটুকু অদেখাই থেকে যায়। পাখির সৌন্দর্য পুরো উপভোগ করতে চাইলে আপনি গা-ঢাকা দিয়ে পাখিকে কাছ থেকে দেখুন অথবা দূরবীণের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ সময় চেয়ে থাকুন। প্রজনন মৌসুমে যখন পালকের জেল্লা পরিপূর্ণতা পায় তখনই পাখি দেখার সেরা সময়। ওই সময়ে মন ভরে দেখতে না পেলে অগত্যা পাখির একটা ছবির ওপর চোখ রাখতে পারেন; দুধের স্বাদ ঘোলেও কিছু মেটে।

এখন এ দেশে কখন কোথায় গেলে বুনো পাখিদের দর্শন মেলে সে কথা একটু বলি। এক এক করে পুরো সাতশ’ত প্রজাতির কথা বলা সম্ভব হবে না। এমনকি ৯৫টি পরিবারের প্রাথমিক আলোচনাও এই ছোট পরিসরে করা যাবে না।আর সে চেষ্টা করলে আপনিও সম্ভবত পত্রপাঠ বিদায় হবেন। তাই এখানে আমার পছন্দের দশটি তথাকথিত ‘অগায়ক’ পরিবারের কিছু পাখির কথা বলব। আমাদের পরিচিত, সুদর্শন অথবা অন্য নানা কারণে উল্লেখযোগ্য বলে এই সব পরিবারের পাখি নিয়ে দু’কথা না বলে পারা যায় না।

‘অগায়ক পাখি’ বললে কী বোঝায়, তা আগে বলি। গান গাইতে পারে না এমন পাখি পৃথিবীতে নেই। যে পাখির নাম ‘মিউট সোয়ান’ বা বোবা-মরাল সেও গাইতে পারে। তবে গান গাওয়ার ক্ষমতা ও অভ্যাস অন্য পাখির চেয়ে অনেক বেশি আছে এক দল পাখির। এই দলের পাখিকে বলা হয় ‘প্যাসারিন’ বা দণ্ডচারি; অনেকে বলেন ‘গায়ক পাখি’। বাংলাদেশে সুমচা থেকে শুরু করে চটক পর্যন্ত ৪৫ পরিবারের ‘গায়ক পাখি’ আছে। বাকি সব পাখিকে বলা যায় ‘নন-প্যাসারিন’ কিংবা ‘অগায়ক’। আমাদের দেশে ৫০ পরিবারের অগায়ক পাখি আছে।

বাংলাদেশের সুকুমার পাখির কথা বলতে গেলে প্রথমেই ফেসিয়ানিডি পরিবারের উল্লেখ করতে হয়। ময়ূর না থাকলেও এ পরিবারে কাঠমৌর, বনমুরগি, মথুরা, তিতির আর বটেরাসহ ১১ প্রজাতির ভূচর পাখি টিকে আছে। তবে কালেভদ্রে দু-একটি তিতির ও বটেরা ছাড়া লোকালয়ে এদের দেখা পাবেন না। এরা আমাদের পাহাড়ি বনের বাসিন্দা। সূর্য ওঠার আগে বনের প্রান্তে গেলে বন মুরগিকে হেঁটে বেড়াতে দেখতে পাবেন। ভাগ্যবান হলে মথুরাও মিলতে পারে। তবে কাঠমৌর দেখতে চাইলে বনের গহীনে যেতেই হবে।

মাটিতে দিন কাটাতে হয় বলে কাঠমৌর-মুরগি-মথুরারা লুকিয়ে চলার নানা কৌশল রপ্ত করেছে। বনে বনে ঘুরে এক মুহূর্তের জন্য এদের কারও ক্ষণিকের সাক্ষাৎ পেলে নিজেকে ভাগ্যবান জানবেন। তবে সুদর্শন এ সব পাখি রোদে এসে না দাঁড়ালে এর অসামান্য রূপ আপনার চোখ-চেতন-চিত্ত রঙিন করতে ব্যর্থ হবে। বনমোরগের মাথা থেকে ঝুলে থাকা ঝলমলে লাল, কমলা ও সিঁদুরে পালকের ঝালর থেকে ঠিকরানো আলো যিনি দেখেছেন তিনি অনুমান করতে পারেন স্বর্গধামে পাখিরা দেখতে কেমন হবে।

বাংলাদেশের সুদর্শন পাখির দ্বিতীয় পরিবারের নাম অ্যানাটিডি। গোলাপি-হাঁস আর বাদি-হাঁস বিদায় নিলেও এ পরিবারের ৩০ প্রজাতির বুনোহাঁস এদেশের নদ-নদী, হাওড়-বিলও উপকূলে বাস করে, যদিও এদের অধিকাংশই শীতের আগন্তুক। শীতকালে এদের সাজগোজ থাকে নিতান্ত সাদামাটা; কিন্তু প্রজনন মৌসুমে পুরুষ হাঁসের দেহে চাই পালকের মুগ্ধ আড়ম্বর। বসন্তেই শুরু হয় পুরুষের সাজগোজ; তাই মার্চ-এপ্রিলে এদেশের জলাশয়ে আমাদের ভাগ্য হয় নওশা-সাজে সজ্জিত হাঁসগুলো চেয়ে দেখার।

সবার আগে নতুন পালক পায় পুরুষ ফুলুরি-হাঁস। এর গাল হয় জ্বলন্ত সবুজ, পিঠ বেয়ে নামে রুপালি পালকের প্রস্রবণ আর বুকে ফুটে ওঠে শ্রাবস্তীর কারুকার্য। দীর্ঘ ও দর্শনীয় পালকের অলংকারে সাজে পুরুষ পাতি-তিলিহাঁস, বৈকাল-তিলিহাঁস,পিয়াং-হাঁস ও গিরিয়া-হাঁস। জোরালো রঙের নতুন পালকে উচ্চকিত হয়ে ওঠে পুরুষ সিঁথিহাঁস, খুন্তেহাঁস, ল্যাঞ্জাহাঁস আর নীলমাথা-হাঁস। লাল-পুতুলের মতো সেজে অলংকরণে সবাইকে হার মানাতে পারে মান্দারিন-হাঁস।

আমাদের দেশের অত্যন্ত শান্ত ও শোভন পাখিদের একটি পরিবারের নাম কলাম্বিডি। এ পরিবারে বাংলাদেশে ১৮ প্রজাতির পাখি আছে। এর একটিকে আমরা মুরগি ও হাঁসের মতোই গৃহপালিত বানিয়েছি; নাম তার কবুতর। আমাদের গৃহে কবুতরের চেহারা ও চরিত্র বদলে গেছে; কিন্তু আজও সুদর্শন পাখি বলে বুনো-কবুতরের খ্যাতি আছে। বুনো-কবুতরের গলার অসামান্য রঙের ছটা কাছ থেকে দেখলে আপনি মানবেন যে আলোকচিত্রের পাখি আর আসল পাখিতে অনেক তফাৎ। এ পরিবারের অন্যান্য পাখি হলঘুঘু, হরিয়াল ও ধুমকল; অধিকাংশই লোকালয়ে, প্রান্তরে ও পাহাড়ি বনে বাস করে। 

বিশ্বের আজবতম পাখিদের একটি পরিবারের নাম কিউকিলিডি। এই পরিবারের ১৯ প্রজাতির পাখি বাংলাদেশে দেখা সম্ভব। দেখা সহজ নয়; অনেক খোঁজাখুঁজি করলে দেখা মেলে যদিও এদের অনেকেরই আনাগোনা লোকালয়ে। মালকোয়া ও কুবো ছাড়া বাকি ১৭ প্রজাতির পাখিকে আমরা কোকিল অথবা পাপিয়া বলি। কোকিল-পাপিয়ারা লুকিয়ে অন্যপাখির বাসায় ডিম দিয়ে তাদের ওপরই চাপিয়ে দেয় ডিমে তা-দেওয়া ও ছানা-পালনের দায়ভার। এই প্রতারণায় পাকা হতে গিয়ে লুকিয়ে চলাটাই কোকিল-পাপিয়ার লাইফ-স্টাইলে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের সব চেয়ে বড় পাখিদের পরিবারিক নাম সিকোনিডি। স্টর্ক অথবা মানিকজোড় বললে এদের চেনা সহজ হয়। এ পরিবারে আমাদের ছয় প্রজাতির পাখি আছে। এর মধ্যে সব চেয়ে বিখ্যাত হলো মদনটাক এবং সংখ্যায় সব চেয়ে বেশি হলো শামখোল। বাকি চার জাতের মানিকজোড় এদেশের বিরল পাখি। এ চার প্রজাতির পাখি কালেভদ্রে নদী তীরে ও হাওড়ে দেখা দেয়। ইদানীং শীতে পদ্মার চরে রাঙা-মানিকজোড় বেশ আসে। গলার পালকে অপার্থিব রংয়ের জন্য কালাগলা-মানিকজোড় ও কালা-মানিকজোড় আমার খুবই প্রিয় পাখি। 

এর পর বাংলাদেশের অগায়ক পাখির তালিকার শেষ প্রান্তে গিয়ে ছয়টি পরিবারের অত্যন্ত সুদর্শন কিছু পাখির কথা বলতে চাই। এই ছয়পরিবারে আছে হুদহুদ, সুইচোরা, নীলকান্ত, মাছরাঙা, কাঠঠোকরা ও টিয়া। দ্রুত এই পাখিদের কথা পাড়ার আগ্রহে আমাকে ডাহুক, বক, প্যাঁচা, ঈগল, বাজ ইত্যাদি অনেক পরিচিত আর দাপুটে পাখি নিয়ে বয়ান করার লোভ সংবরণ করতে হয়েছে। তা না করলে এই ছয় পরিবারের অত্যন্ত মিষ্টি চেহারা ও মিষ্টি মেজাজের পাখিগুলোর কথা বলার আগেই সময় ফুরিয়ে যেত।

প্রথমেই বলি হুদহুদ পাখির কথা। হুদহুদ একাই দখল করে আছে একটি পরিবার যেমন একাকীই সে হাজির হয়েছিল পৌরাণিক কাহিনীতে ও কোরআন-কেতাবে। উঠতে-বসতে মুহূর্তের জন্য অতিকায় এক ঝুঁটি মেলে ধরে বলে হুদহুদের আরেক নাম মোহনচূড়া। পাখির আলোকচিত্রী হলে এই চূড়ার ছবি মিলবে আপনার ভাগ্যবলে অথবা কঠিন অধ্যবসায়ের ফলে; যদিও বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে প্রায়ই আপনি এর দেখা পাবেন।

হুদহুদের চূড়ার মতোই আজব অলংকরণ দেখতে পাবেন যদি আপনি নীলদাড়ি-সুইচোরা পাখির মুখোমুখি হন। এই পাখির থুতনি থেকে ঝুলে থাকে দীর্ঘ ও সুদর্শন নীল-পালকের দাড়ি। একে দেখতে হলে আপনাকে পাহাড়ি বনে যেতে হবে। সুইচোরা পরিবারের অন্য তিনটি প্রজাতি আপনি সহজেই লোকালয়ে দেখতে পাবেন। উড়ে চলা মৌমাছি, বল্লা, ভীমরুল-এইসব পতঙ্গ শিকারে এরা খুব পটু বলেই এদের ইংরেজি নাম হয়েছে বি-ইটার। 

মদনা-টিয়া। ছবি: কাজী সানজীদ

সুইচোরার পরেই নীল ও সবুজ রঙের পাখিদের আরেকটি পরিবার আছে; যার নাম নীলকান্ত। এ পরিবারের তিন প্রজাতির পাখির নাম বাংলা-নীলকান্ত, চিনা-নীলকান্ত ও পাহাড়ি-নীলকান্ত। পাহাড়ি-নীলকান্ত দেখতে হলে আপনাকে পাহাড়ি বনেই যেতে হবে। অন্য দুটি প্রজাতি বাংলাদেশের লোকালয়ের বিরল বাসিন্দা। ঢাকা নগরীতেও এদের দেখা মেলে। মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে আমরা সহজেই চিনা-নীলকান্ত দেখতে পাই, চিনে যেতে হয় না।

পোকা-শিকারি নীলকান্তদের পরেই পাবেন মাছরাঙা পরিবারের পাখি। এই উপমহাদেশে ১২ প্রজাতির মাছরাঙা আছে। এদের সবাইকে বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। একটি প্রজাতির দেখা আমি আজও পাইনি; তার নাম ব্লাইদের-মাছরাঙা। লোকালয়ের জলাশয়ে সময় দিলে আপনি নয় প্রজাতির মাছরাঙার সাক্ষাৎ পাবেন। অন্য দুই প্রজাতির জন্য আপনাকে পাহাড়ি ঝরনায় গিয়ে ধরনা দিতে হবে। পাহাড়ি সেই দুটি প্রজাতির নাম উদয়ী-বামনরাঙা ও ঝুঁটিয়াল-মাছরাঙা।

মাছরাঙার পরে রয়েছে পিসিডি পরিবার; অর্থাৎ কাঠঠোকরা পরিবার। মাছরাঙার চেয়েও চড়া রঙের অনেক পাখি আছে এ পরিবারে। বাংলাদেশেএ পর্যন্ত ২১ প্রজাতির কাঠঠোকরা দেখা গেছে। পিপিলিকাভুক এই পাখিদের বাংলায় অনেক নাম দেওয়া হয়েছে-কাঠকুড়ালি, কুটিকুড়ালি, বাটকুড়ালি, বামনকুড়ালি, হলদেকুড়ালি, মেটেকুড়ালি ইত্যাদি। আমাদের লোকালয়ে সহজেই দেখতে পাবেন বাংলা-কাঠঠোকরা ও বড়-কাঠঠোকরা; চোখ ধাঁধানো দুটি পাখি।

আমাদের পাহাড়ি বনের একটি কাঠঠোকরার নাম বড়-মেটে কুড়ালি। স্লেট রঙের এই পাখিটি পৃথিবীর বৃহত্তম কাঠঠোকরাদের দলে পড়ে। বৃহত্তম এই কাঠঠোকরার পাশাপাশি ক্ষুদ্রতম কয়েক প্রজাতিও বাস করে বাংলাদেশে। এদের নাম তিলা-কুটিকুড়ালি ও ধলাভ্রু-কুটিকুড়ালি। এরা আমাদের পাহাড়ি বন ও সুন্দরবনের বাসিন্দা। এই বনেই পাবেন চমক দেওয়া দুই প্রজাতির হলদে কুড়ালি। এদের ঘাড়ে ও মাথায় সর্বক্ষণ খাড়া থাকে দীর্ঘ, উদ্ধৃত ও আগুন-রঙ ঝুঁটি।

যে পারিবারের গল্প বলে আজকের কথা শেষ করব তার নাম সিটাসিডি। এই বিশাল পরিবারে বিশ্বে শত শত পাখি থাকলেও বাংলাদেশে আছে কেবল সাতটি প্রজাতি। আমরা এদের টিয়া নামে চিনি। সবজিভোজি এই পাখির চঞ্চূজোড়া আকারে ও শক্তিতে ঈগলের চঞ্চূর মতো। এদের চোখে ও মুখে অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে ঈগলের চেয়ে অনেক বেশি। গাছের ফল, ফুল, পাতা ও বাকল খেয়েই জীবন ধারণ করতে পারে বলে ঢাকা নগরীতেও হাজার হাজার টিয়া টিকে আছে।

লোকালয়েই সবুজ, মদনা ও চন্দনা টিয়ার সাক্ষাৎ মেলে। ফুলমাথা, লালমাথা ও মেটেমাথা টিয়ার সন্ধান মেলে কেবল পাহাড়ি বনে। সেই পাহাড়ি বনেই পাবেন এদেশের সবচেয়ে আজব টিয়া; যার পোশাকি নাম বাসন্তী-লটকনটিয়া। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এই টিয়া রাতে বাদুরের মতো ডালে লটকে ঘুমায়। পূর্বরাগ পর্বে পুরুষ লটকনটিয়াগুলোকে ডালে উল্টো ঝুলে স্ত্রী পাখির মনোরঞ্জনের চেষ্টা করতে দেখতে পাবেন। তবে সেটা তো আর আজব কিছু নয়; মনুষ্য জগতে এমন নিশ্চয়ই অনেক দেখেছেন।

পাখির জগতে বৈচিত্র্য আর চমকের অন্ত নেই। তাই পাখির আজব জগতে ক্ষণিক ভ্রমণে গেলেও কল্পকাহিনীর ভুবনে প্রবেশ ঘটেছে বলে সন্দেহ হয়। এখানে আজকের এই ক্ষুদ্র ভ্রমণ শেষ করে আপনার যদি কোনো কিছু বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে মনে হয়ে থাকে তবে আপনার ধারণাই ঠিক। পাখির জীবন সত্যিই অবিশ্বাস্য সব আচার ও পদ্ধতিতে ভরা।  


লেখক : বরেণ্য পাখিবিদ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //