ইসলামি শিল্পকলা: বিকল্প শিল্পচর্চার ধারা

দ্বৈরথে-দ্বন্দ্বে
ইসলাম ও শিল্পকলা নিয়ে চারপাশে নানা আলোচনা-সমালোচনা বিদ্যমান। বিগত দিনে আমরা দেখেছি-ধর্মনিষ্ঠ হতে গিয়ে মুসলিম সমাজের অনেক শিল্পী ছবি আঁকায় শেষ পর্যন্ত নিজেকে আর যুক্ত রাখতে পারেননি। সর্বতভাবে সুন্দরের সাধনা বা চারু-কারুর চর্চা থেকে ছুটি নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

মিসরীয় সুপণ্ডিত ইউসুফ আলকারদাভি (১৯২৬) তার ‘শিল্পকলা ও ইসলাম’ গ্রন্থে বলেছেন, মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যাপারগুলোর মধ্যে বিনোদন ও শিল্পকলা সম্ভবত সবচেয়ে উপেক্ষিত বিষয়গুলোর একটি। যদিও বাস্তবে এটি আমরা মনে রাখি না।

ফলে লোকেরা এ বিষয়ে হয় অত্যাধিক বাড়াবাড়ি করে, নয়তো খুব বেশি শিথিলতা প্রদর্শন করে। কারণ, এগুলো যতটা না মানুষের জ্ঞান ও বিবেচনাবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত, তারচেয়েও বেশি আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কারণে এগুলোর মাধ্যমে একদিকে যেমন বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন হয়, তেমনি অন্যদিকে কঠোরতা ও বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধেও এগুলোকে কাজে লাগানো যায়।

অনেকে মুসলিম সমাজের এমন একটি চিত্র তুলে ধরেন, যাতে মনে হয় এখানে কেবল ইবাদত বন্দেগি এবং কাজ আর কাজ নিয়েই পড়ে থাকতে হয়। আনন্দ-বিনোদন, হাসি-উল্লাস, গানের কোনো স্থানই যেন এখানে নেই! এই সমাজে অট্টহাসি বা মুচকি হাসি, প্রফুল্ল মন বা হাসিখুশি চেহারা- এসবের কোনোটাই যেন জায়েজ নয়!

এদের ঠিক বিপরীত ধরনের কিছু মানুষও রয়েছে, যারা নিজের কুপ্রবৃত্তির খায়েশ মেটাতে লাগামহীন জীবনযাপন করে। তারা তাদের পুরো জীবনটাকেই খেল-তামাশায় পরিণত করেছে। বৈধ-অবৈধ, আবশ্যিক-অবাঞ্ছিত, হালাল-হারামের মাঝে যত পার্থক্য রয়েছে, সবগুলোকে তারা ঘুচিয়ে দিয়েছে।

এই সংকট নোবেলজয়ী তুর্কি ঔপন্যাসিক ওরহান পামুকের (১৯৫২) হৃদয়েও ঝড় তুলেছে। তাই বিষয়টি নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন তিনি। যার নাম ‘আমার নাম লাল’ (মাই নেইম ইজ রেড)। দ্বন্দ্ব-দ্বৈরথের মাঝখানে থেকে বিকল্প এক শিল্পকলা আমাদের অনেকের নজর এড়িয়ে গেছে। যে শিল্পকলা নির্বাক বয়ানে এগিয়েছে বহুদূর। এর সূচনা কয়েক শতাব্দী আগে। যার নাম ইসলামি শিল্পকলা।

উন্নত মম শির
সভ্যতার ইতিহাস যত পুরনো, শিল্পকলার ইতিহাসও তত পুরনো। তবে ইসলামি শিল্পকলার ইতিহাস শুরু হয়েছে সপ্তম শতাব্দী থেকে। মদিনারাষ্ট্র সূচিত হবার পরই এই বিকল্প শিল্পধারাটি বিকশিত হতে থাকে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে একটি শিরকমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেন। ‘ইসলাম পূর্বযুগের আরবেরা তাদের দেবীসমূহ, যেমন-লাত, আল উজ্জা এবং মানাত-এর ছবিই শুধু পূজা করত না, পবিত্র কাবাগৃহের মাঝে তাদের মূর্তিও প্রতিষ্ঠিত করে রাখত। অবশ্য তখন কাবাগৃহে শুধু এই তিনেরই নয় বরং আরো বহু দেব-দেবীর মূর্তি সংরক্ষিত হত। মহানবী (সা.) এখানে নবী ইবরাহিম, ইসমাইল ও ঈসা (আ.)-এর মা মরিয়ম (আ.)-এর মূর্তি দেখে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন।’ এ মত-জার্মান পণ্ডিত মুরাদ হফম্যানের (১৯৩১-২০২০)।

অন্য একটি বর্ণনা রয়েছে মিসরীয় পণ্ডিত ড. হোসাইন হায়কলের (১৮৮৮-১৯৫৬)। তিনি বলেন, ‘মহানবী (সা.) কাবা ঘরের ভিতরের দেয়ালে বিভিন্ন নবী ও ফেরেশতার ছবি দেখতে পান। এই সব ছবির হাতে জুয়া আর ভাগ্য পরীক্ষার তীর ছিল। তিনি কাঠের তৈরি একটি কবুতরও দেখতে পান। তিনি কবুতরটি নিজ হাতে ভেঙে মাটিতে ফেলে দেন। হযরত ইবরাহিমের ছবিটি তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। অতঃপর বলেন, আল্লাহতায়ালা এটি ধ্বংস করুন। এতে আমাদের পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিমকে জুয়া খেলারত দেখানো হয়েছে। অথচ জুয়ার তীরের সঙ্গে তার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না। হযরত ইবরাহিম ইহুদি কিংবা খ্রিস্টানও ছিলেন না। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী এবং একনিষ্ঠ মুসলমান। মুশরিকদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। ফেরেশতাদের ছবি খোদাই করা হয়েছিল সুন্দরী নারীদের আকৃতিতে। তিনি এসব ছবি ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশ দিলেন। কাবা ঘরের আশপাশেও প্রতিমা ছিল। কুরাইশরা ও অন্যরা এসবের পূজা করত। এগুলো কাবাঘরের প্রাচীরে শক্ত করে লাগানো ছিল। হোবল দেবতা কাবা ঘরের ভেতরে রাখা হয়েছিল। মক্কা বিজয়ের প্রথম দিনেই কাবাঘর ও আশপাশের সব প্রতিমা ভেঙেচুরে ফেলা হয়।’ এভাবেই একেশ্বরবাদকে উচ্চকিত করা হয়। এখান থেকেই নতুন সৌন্দর্য চর্চা শুরু হয়। ধর্মচর্চার সমস্ত স্তরে দেবচিত্রসমূহের বা যে কোনো চিত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কোরআনে ঘোষিত হয়েছে-বান্দা প্রার্থনা করলে আল্লাহ সবকিছু মাফ করবেন। কিন্তু মূর্তি পূজককে কখনো ক্ষমা করবেন না। (৪:৪৮)

ক্ষতি নয়, বেশি লাভ
তবে চূড়ান্ত বিচারে চিত্র বা মূর্তির সাহায্যে উপস্থাপনের ওপর ইসলামের যে নিষেধাজ্ঞা তা ক্ষতিকারক না হয়ে লাভজনক হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। কারণ এর ফলে নতুন বা বিকল্প শিল্পকলার উদ্ভব হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা না থাকলে মানুষ হয়তো কোনোদিনই জানত না, যেমন জড়িত লতাপাতার নকশা (Arabesque design) যা মোজাইক এবং খোদাই শিল্পে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, ক্যালিগ্রাফি এবং পুস্তক অলঙ্করণ ইত্যাদি। ক্রমে কোরআনিক ক্যালিগ্রাফি ইসলামি স্থাপত্যশিল্পের একটি মৌলিক ও প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

আমরা লক্ষ্য করেছি, ইসলামি শিল্প খুবই জটিল শিল্প, কারণ এই শিল্পের বিস্তৃতি অনেক বেশি ছড়ানো এবং নানান দেশের মুসলিমরা সাড়ে ১৪০০ বছর ধরে এই শিল্পের চর্চা করছে। আজ এটি শুধু একটি বিশেষ গোষ্ঠীর শিল্প নয়, এটি কোনো বিশেষ সময়ের শিল্পও নয়, অথবা কোনো জায়গা বা আঁকা-আঁকির মতো নির্দিষ্ট গণ্ডির শিল্প নয়। এই শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রই অনেক বিস্তৃত। ইসলামি স্থাপত্য যেমন অনেক বেশি বিস্তৃত, ঠিক তেমনি ইসলামি ক্যালিগ্রাফি বা লিখন শিল্প, আঁকা-আঁকি, গ্লাসে তৈরি কারুকাজ, ইসলামিক মৃৎশিল্প, টেক্সটাইল শিল্পে কারুকাজ, ইসলামি এমব্রয়ডারি ইত্যাদি ক্ষেত্রের পরিসরও কম নয়। এটি শুধু ধর্মীয় শিল্প নয়, ধনী এবং সব ধরনের মুসলিম সমাজের একটি শিল্প। তবে এ শিল্পকলার ইতিহাস তৈরি করতে গিয়ে শিল্পীদের কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। তত্ত্বের বেড়াজালে আটকে অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিল্পচর্চা।

শেষ পর্যন্ত মুসলিম শিল্পীদের হাতে এক বৈচিত্র্যময় শিল্পসম্ভার গড়ে উঠেছে। সমস্ত শিল্পই মানুষের আত্মপ্রকাশের অদম্য আবেগকে বহন করছে। ইসলামের শুরুর দিকে শরীয়তি বিধি নিষেধের চাপ প্রবল থাকার পরও সমাজের মানুষেরা শিল্পিসত্তা আত্মপ্রকাশের যে পথটি খুঁজে নিয়েছিল নিঃসন্দেহে সেটি অলঙ্করণ শিল্প। চৌদ্দ শতকের একটি ফার্সি বিশ্বকোষ ‘নাফাইস আল কানুন’ গ্রন্থে ইসলামি শিল্পকলা ও বিজ্ঞান প্রসঙ্গে লেখক মুহাম্মদ ইবনে মাহমুদ আল আসালি লিপিকলা বিষয়ে নবির একটি বাণী উদ্ধৃত করেছেন- ‘হস্তলিপির সৌন্দর্য তোমাকে অর্পণ করা হয়েছে, কারণ এটি হল মানুষের প্রাত্যহিক খাদ্য অর্জনের অন্যতম উপায়।’ অসংখ্য নজির আছে, যাতে দেখা যাবে লিপিকলার প্রতি শরীয়তি উৎসাহ ও প্রেরণা ছিল। প্রথম থেকেই আত্যন্তিক এবং তার উদ্দেশ্য ছিল পবিত্র কোরআন কপি বা লিপিবদ্ধ করা। বাদশাহ-সুলতানদেরও অনেকে তা নিজের হাতেই করেছেন পুণ্যার্জনের অভিপ্রায়ে। ভারতে মুগল বাদশাহ আওরঙ্গজেব, তার আগে তুর্কি সুলতান নাসির উদ্দিন প্রমুখ করেছেন। এগারো শতকের শেষদিকে গজনির সুলতান ইবরাহিম ইবনে মাহমুদ যতদিন বেঁচে ছিলেন, প্রতি বছর কোরআন কপি করে মক্কায় পাঠাতেন। মুসলিম সমাজে লিপিকলার পেছনে ধর্মীয় প্রেরণা মৌল একটি কারণ হওয়ার দরুন বিশেষ করে আরবি-ফার্সি লিপি, যার উদ্ভব আরামীয় লিপি থেকে (আরামীয় লিপির উদ্ভব ফিনিসীয় লিপি থেকে), ক্রমশ একটি পৃথক শিল্পকলার আবির্ভাব ঘটায় এবং তার প্রভাব চিত্রকলার ওপরও গিয়ে পড়ে।

মানুষের মনের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সামগ্রিক রূপ হচ্ছে শিল্পকলা। শিল্পী তার কল্পনা ও প্রতিভার সঙ্গে দক্ষতা ও রুচির সমন্বয়ে শিল্প সৃষ্টি করেন। শিল্পী তার সৃষ্টির আনন্দ থেকে শিল্প সৃষ্টি করেন বলে কোনো বাঁধাধরা নিয়মের অধীনে শিল্পকে ফেলা যায় না। শিল্পীর কাজ হচ্ছে শিল্পকলার মাধ্যমে আমাদের অন্তর্দৃষ্টিকে সম্প্রসারিত করা, আমাদের কল্পনার পরিধি বাড়িয়ে তোলা।    (চলবে)

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh