একুশ ও আমাদের সাহিত্য

তুলনাটা লাগসই মনে নাও হতে পারে। কিন্তু বায়ান্নপূর্ব এদেশের সাহিত্য সৃষ্টি প্রসঙ্গে উনিশ শতকী বাংলা সাহিত্যের প্রধান ধারাটির কথাই মনে পড়ে যায়। উনিশ শতকের রেনেসাঁসের পটভূমি সত্ত্বেও তখনকার প্রধান সাহিত্যস্রোতে রক্ষণশীলতা ও সম্প্রদায়গত সংকীর্ণতা ছিল লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য; অবশ্য বিষয়ে-উপকরণে, প্রকরণে নয়। সে তুলনায় গণতান্ত্রিক চেতনার ধারাটি ছিল ক্ষীণকায় ও কম শক্তিশালী।

সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের চরিত্র নিয়ে দেশ বিভাগ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নতুন ভূখণ্ডে নয়া প্রেরণায় সংস্কৃতি চর্চা ও সাহিত্য সৃষ্টির যে আবেগ-সংকুল প্রচেষ্টা দেখা দেয় তাতে ওই ঊনিশশতকী সম্প্রদায়- চেতনাজড়িত রেনেসাঁসের প্রভাবের মতোই পাকিস্তানি চেতনার রক্ষণশীল প্রভাব ছিল স্পষ্ট। অবশ্য এর সূচনা চল্লিশের দশক থেকে, পাকিস্তান পরিকল্পনার হুজুগে তৈরি ‘পূর্ব-পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’, ‘পূর্ব-পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ ইত্যাদি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে কেন্দ্র করে।

প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানি জোশ এবং সরকারি সমর্থনের জোরে পাকিস্তানবাদী সাহিত্যচর্চা যুগের হুজুগে পরিণত হয়েছিল। সেই সাহিত্য সৃষ্টির বিষয়ে, প্রকরণে বা তার আধুনিক চেতনায় উৎকর্ষের কোনো ছাপ দেখা যায়নি। বরং সেখানে ধর্মীয় সংস্কৃতির সংকীর্ণ দামামা বাজানোর চেষ্টাই প্রধান হয়ে উঠেছিল সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের মতো বিদগ্ধদের হাতেও। গুণগত উৎকর্ষে নয় বা আধুনিক চিন্তার প্রতিফলনেও নয়, শুধু লেখকের সংখ্যায় এবং রচনার আয়তনে, সেই সঙ্গে প্রচারের হট্টনাদে পর্যাপ্ত পাকিস্তানি সাহিত্য তখনকার মতো প্রধান ধারা হয়ে উঠেছিল।

তথাকথিত এই প্রধান ধারার লেখকদের সবাই ছিলেন পাকিস্তানি রাজনীতির আদর্শে কমবেশি উদ্বুদ্ধ, নব্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে সম্প্রদায়ভিত্তিক সংস্কৃতিচর্চা এবং সংকীর্ণ ও রক্ষণশীল চিন্তার সাহিত্যসৃষ্টির উগ্র প্রবক্তা। সাহিত্যে উদার মানবিক চেতনার চেয়ে ধর্মীয় চেতনায় বিশ্বাসী এইসব লেখক ছিলেন জনসংস্কৃতির নামে ধর্মীয় সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহী। বাংলা সাহিত্যের উদার ঐতিহ্যের বদলে একমাত্র পুঁথিসাহিত্যকেই তাঁরা ঐতিহ্য হিসাবে গ্রহণ করেন।

অথচ চল্লিশ দশক বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা ধারায় যে বেগবান সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ, এবং যে-প্রগতিধারার সঙ্গে চল্লিশের অন্তত তিনজন শক্তিমান মুসলমান সাহিত্যিক যুক্ত ছিলেন, সেই সাহিত্যধারাটিকেও পাকিস্তানবাদী সাহিত্যিকগণ গ্রহণ করতে রাজি ছিলেন না। সম্প্রদায়চেতনাযুক্ত এবং প্রগতিচেতনামুক্ত সাহিত্য বৈশিষ্ট্য ধারণ করার ফলে এরা চল্লিশের সাহিত্যচরিত্র পরিহার করে ইসলামি সাহিত্যের ধারায় বিচরণই শ্রেয় মনে করেছেন, এবং নতুন দেশে জীবনঘনিষ্ঠ আধুনিক সাহিত্যধারা পত্তনের গৌরব থেকে নিজদের বিঞ্চিত করেছেন।

পাকিস্তানি চেতনার জোয়ার তখন সাহিত্য-সংস্কৃতি খাতেও এত প্রবল এবং ব্যাপক যে, আবুল মনসুর আহমদের মতো লেখকও তখন ‘ধর্মভিত্তিক সাহিত্য, পুঁথিসাহিত্যভিত্তিক মুসলমানি সাহিত্য’ এবং ‘তমুদ্দনী আজাদি’র প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। এরা সবাই কমবেশি ‘পুঁথিসাহিত্যে’র নামে এতটাই ক্ষেপে উঠেছিলেন যে, বায়ান্ন-পূর্ববর্তী সময়ে এদেশ আধুনিক ও মননশীল সাহিত্যসৃষ্টির সম্ভাবনার কবর রচিত হয়।

তাই বলে এ সময়টা একেবারে বন্ধ্যা ছিল না। চল্লিশ দশকের সাহিত্যসংস্কৃতি প্রচেষ্টার প্রগতিবাদী উৎক্ষেপ এখানকার তরুণদের একটি ছোট অংশকে প্রভাবিত করেছিল; কবিতা ও কথাসাহিত্য এই উভয় ক্ষেত্রেই এদের প্রচেষ্টার ফসল নানা গুণগত মান নিয়ে ধরা দিয়েছে। প্রধানত কবিতায় এদের আত্মপ্রকাশ সমাজ পরিবর্তনমূলক প্রগতিচেতনার প্রতিফলনে। এই পথে আহসান হাবীব, হাবীবুর রহমান, সিকান্দার আবু জাফর থেকে ইমামুর রশীদ, তরীকুল আলম, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান এবং আরও কেউ কেউ বিচরণ করেছেন। এরই পাশাপাশি মধ্যবিত্ত জীবনভাবনা এবং বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সমাজভাবনার প্রতিফলনও ঘটেছে আধুনিক সাহিত্যরীতির মাধ্যমে; শুরুতে শামসুর রাহমান এবং আরও কয়েকজন এই ধাারার অনুসারী ছিলেন; পরে অবশ্য এদের যাত্রার দিক বদল ঘটেছে।

কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তঝরা আবেগ সাহিত্য অঙ্গনের সব কিছু তছনছ করে দিয়েছিল। তীব্র জ্বালাময় অভিব্যক্তি নিয়ে কবিতাই প্রথম একুশের পতাকা কাঁধে তুলে নিয়েছে। হয়তো অত্যধিক আবেগ ও তারুণ্যের রোমাণ্টিক চেতনা এর কারণ। ফেব্রুয়ারি কৃষ্ণচূড়ার সময় নয়। তবুও কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম প্রতীকে রক্তাক্ত আন্দোলনের কাব্যিক প্রকাশ ঘটেছে, কমবেশি অনেকেরই হাতে। গুলিবর্ষণের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সব বন্ধ দরজা এক আঘাতে খুলে গিয়েছিল; সংবেদনশীল কবিচিত্তে সঞ্চারিত হয়েছিল উত্তাপ আর সৃষ্টিশীল উত্তেজনা। পাকিস্তানবাদী সাহিত্যের পরাজয় সেই শুরু, ক্রমে তা অন্ধকারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

যতদূর জানা যায়, একুশের রক্তাক্ত স্মৃতির প্রথম প্রতিবাদী প্রকাশ চট্টগ্রামের মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’ তাৎক্ষণিকভাবে লেখা এই কবিতাটির সুর চড়া এবং প্রতিবাদী গদ্যকথকতার ঢং-এ এর প্রকাশ। এখানেও সেই কৃষ্ণচূড়া, আগুন, রক্ত, আল্পনা সবই আছে যা প্রতিবাদী জাতীয়চেতনার প্রতিফলন ঘটিয়েছে; কিন্তু এর মূল সুর ক্রোধের, ঘৃণার এবং শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের, সেই সঙ্গে প্রতিশোধেরও। প্রত্যক্ষভাবে সরকারবিরোধী বক্তব্য সম্বলিত কবিতা সহ্য করা পাকিস্তানি সরকারের স্বভাবধর্ম ছিল না। তাই কবিতাটি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিষিদ্ধ করা হয়। দীর্ঘদিন আর প্রকাশিত হয়নি এই কবিতা। মাত্র কয়েক বছর আগে (১৯৮৮) একই শিরোনামে একটি কবিতার বই প্রকাশ পায় এ কবির।

কবিতাটির শুরু এভাবে :
“ওরা চল্লিশজন কিম্বা আরো বেশি
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে রমনার রৌদ্রদগ্ধ
    কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায়
ভাষঅর জন্য, মাতৃভাষার জন্য, বাংলার জন্য
    যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
একটি দেশের মহান সংস্কৃতির মর্যাদার জন্য...
 সেইসব মৃত্যুর নামে
আমি ফাঁসির দাবি করছি
যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে
     চেয়েছে তাদের জন্য
    আমি ফাঁসি দাবি করছি।
 হে আমার মৃত ভায়েরা...
 তোমারে আশঅ অগ্নিশিখার মতো জ্বলবে
প্রতিশোধ এবং বিজয়ের আনন্দে।”

কষাঘাত-হানা, দাবদাহসম্পন্ন গদ্য বয়ানের এই কবিতাটির শৈল্পিক মূল্যের চেয়ে কাব্যিক উত্তাপই বড় কথা, যা প্রতিবাদী চেতনার সলতেয় আগুন ধরানোর কাজে সেদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে কবিতায় উল্লিখিত চল্লিশজন শহীদ হন নি; কিন্তু অঙ্কটা সেদিন মুখে মুখে এর চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল।

একুশের আবেগ, এর উত্তাপ এতটাই তীব্র ও গভীর হয়ে লেখক বুদ্ধিজীবীর চেতনায় দাগ কেটেছিল যে, এর প্রভাব দেখা গেছে পরবর্তী কয়েক বছর লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও স্মৃতিচারণে। কবিতায় এই প্রভাব সব চাইতে বেশি। এর প্রমাণ মেলে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনের দিকে তাকালে। কবিতাই এখানে প্রধান, এবং প্রতিটি কবিতায় আবেগ এবং উত্তাপই প্রধান। শামসুর রাহমানের কবিতায়ও সেই একই আবেগ স্বাদেশিকতার সুতীব্র উচ্চারণে ফেটে পড়েছে, ভাষার অধিকার সেখানে উপলক্ষ মাত্র :
“আমার আত্মার স্বর বীক্ষণের প্রতিভা ছড়াবে অমাবস্যা-নিমগ্ন
         প্রাণের শিকড়ে শিকড়ে,
প্রমিথিউসের গানের মতো আমার গলার রৌদ্রোজ্জ্বল চীৎকার
কাঁপিয়ে দেবে এই পৃথিবীর আকাশ-বাতাস,
খসে যাবে তোমাদের রাত্রির দীপ্তিমান তারা, দিনের সূর্য।...
 তোমরা কুচি কুচি করের ছিঁড়ে ফেলো আমার হৃৎপিণ্ড-
 যে হৃৎপিণ্ডে ঘন ঘন স্পন্দিত হচ্ছে আমার দেশের গাঢ় ভালোবাসা”

 গোটা কবিতাটি অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে আক্রোশ, ঘৃণা, যন্ত্রণা এবং আত্মদানের প্রগলভ শপথে স্পন্দিত।
এমনি ধারায় আঘাতে বেদনায় স্বদেশচেতনার তরঙ্গ আন্দোলিত হয়েছে কবিদের চিত্তে, জন্ম নিয়েছে স্বদেশের রক্তাক্ত ভাবমূর্তি কখনো আত্মদানের ব্যক্তিক পটভূমিতে, কখনো ঘরোয়া ছবির ফ্রেমে। ভাষা আন্দোলনের খরচেতনার ক্যানভাসে কি আশ্চর্য জাদুমন্ত্রে আমরা আবিষ্কার করি বাংলার সৌন্দর্যময় মুখশ্রী ; রক্তাক্ত কাহিনীর পটভূমিতে মানুষ-নিসর্গ মিলে এক একটি ক্যানভাস হয়ে ওঠে। প্রাক-বাহান্ন কবিতার গতানুগতিক চেহারা বীরের রক্তস্রোতে ভিন্নরূপ পরিগ্রহ করে। কথকতার ঢঙ্গে লেখা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতায় তাই দুঃখিনী গ্রামীণ জননী দেশমাতৃকায় রূপান্তরিত হয়ে যায় :
“মাগো ওরা বলে,
সবার কথা কেড়ে নেবে
 তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুতে দেবে না।
বলো মা তা কি হয়?...
 তোমার জন্য কথার ঝুড়ি নিয়ে
তবেই না বাড়ি ফিরবো।...
মাত্র তো আর কটা দিন।”

অনুভূতির গভীরতায় সিক্ত কবিতাটি বুকের স্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। যেমন দেয় হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতায় মাতৃ-সম্বোধনে সূচিত অমর শহীদদের পরিচিতি-জ্ঞাপক পংক্তিমালা, যা শহীদ বন্দনার অক্ষয় ক্যানভাস হয়ে আছে :
“আম্মা তার নামটি ধরে একবারও ডাকবে না তবে আর?...
সালাম রফিকউদ্দিন জব্বার- কি বিষণ্ণ থোকা থোকা নাম;
এই একসারি নাম বর্শার তীক্ষ্ণ ফলার মতো এখন হৃদয়কে হানে;”

ভাষঅ শহীদের আত্মদানের পথ বেয়ে হাসান চলে গেছেন কৃষাণের দাওয়াঃয়, দেশজননীর মুক্তির বিনিময়ে ‘পঞ্চাশটি শহীদ ভাইয়ের’ মৃত্যুও তুচ্ছ হয়ে যায়।
কিন্তু শহীদ স্মৃতি অমর করা শহীদ মিনারকে অমরত্ব দিয়েছে আলাউদ্দিন আল আজাদের গভীর অনুভূতিসিক্ত কবিতা, যেখানে শুধু শোক কান্না ঘৃণা আর আক্রোশই নয়, সংগ্রামের অদ্ভুত এক প্রত্যয় ফুটে উঠেছে আগামীকালের সংগ্রামী যাত্রিকদের জন্য পাথেয় হিসেবে। আজাদ জানিয়েছেন, ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি প্রথম শহীদ মিনার ভেঙ্গে ফেলার প্রতিক্রিয়ায় ‘হলে’ ফিরে গিয়ে জমাট গাঁথুনির একটি কবিতায় তিনি শৈল্পিক ও মতাদর্শগত ক্যাথারসিস সম্পন্ন করেছেন। বিচূর্ণ শহীদ মিনার যেন অমরত্ব অর্জন করেছে এই কবিতায়, কিন্তু শহীদ মিনার অমরত্বের বদলে প্রতিরোধই ধরে রাখে সংগ্রামীদের জন্য। শহীদ মিনার জাদুমন্ত্রে স্মৃতির মিনার হয়ে ওঠে:
“স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু আমরা এখনো চারকোটি পরিবার খাড়া রয়েছি তো।...
 ভেঙ্গেছে ভাঙ্গুক। ভয় কি বন্ধু দেখ একবার আমরা জাগরী
         চারকোটি পরিবার ॥...
এ কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠে না কান্না, ঝরে না অশ্রু?
হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং
সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং-”

এ কবিতা মৃত্যুর শোকগাথা নয়, মহিমাময় মৃত্যুর অমরত্বকথা। শহীদ মিনার নিয়ে আরো একটি চমৎকার কবিতা লিখেছিলেন- চিত্রশিল্পী মর্তুজা বশীর, সেটি ছাপা হয়েছিল খুব সম্ভবত কলকাতার ‘পরিচয়’ সাহিত্য পত্রিকায়। ছোট্ট কবিতা। কিন্তু জমাট-অনুভূতির শিলাখণ্ড।
হাসানের এই সংকলনে আরো স্থান পেয়েছিল সৈয়দ শামসুল হক, ফজলে লোহানী, আনিস চৌধুরী প্রমুখের কবিতা। পরবর্তীকালে একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস এবং সেই সুবাদে বর্ণমালার ইতিকথা নিয়ে কবিতা লিখেছেন অনেকেই। সিকানদার আবু জাফরের হাতেও একুশের রক্তরাগ ক্রোধের আর ঘৃণার বিস্ফোরক চিত্র তৈরি করেছিল।
কিন্তু ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে শামসুর রাহমান নতুন করে এঁকেছিলেন জন্মদুঃখিনী বর্ণমালার গাঁথা। কবিতাটি শুধু মনেই দাগ কাটে না, অসম্ভব জনপ্রিয়তাও অর্জন করেছে। ততোদিনে ভাষা আন্দোলন জাতিসত্তার গণআন্দোলনের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে :
“তাদের হাত থেকে নক্ষত্রের মত
ঝরে অবিরত অবিনাশী বর্ণমালা
আর বরকত বলে ঘাঢ় উচ্চারণে
এখনো বীরর রক্তে দুঃখিনী মাতার অশ্রুজলে
 ফোটে ফুল বাস্তবের বিশাল চত্বরে
হৃদয়ের হরিত উপত্যকায়।”

অবশ্য ১৯৫৪ সালে ফেব্রুয়ারিতে লেখা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘কৃষ্ণচূড়ার মেঘ’ কবিতাটিও রীতিমত উল্লেখযোগ্য রচনা। এখানে সংহত আবেগে এক ঝাঁক নামের পটভূমিতে মাটি, মানুষ, লড়াই একাত্ম হয়ে উঠেছে; মাথার উপরে কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম মেঘ ছায়া ফেলে তৈরি করেছে অবিনাশী সংগ্রামের প্রতীকী ক্যানভাস:
“বিষণ্ণ পিপাসা
নিয়ে তাই তারা ছড়িয়েছে
     কী দুরন্ত কৃষ্ণচূড়া মেঘ
ঝড়ের আবেগ
তারা জুড়ে আছে এ দেশের সমস্ত হৃদয়
তাই তারা বিস্মৃতির ইতিহাস নয়।”

সর্বজনীন মুক্তির পটভূমিতে চিত্রিত একুশের স্মৃতি ১৯৫৩ সালে লেখা আরেকটি কবিতায় অনুরূপ আবেগের উৎসার ঘটিয়েছে; কবিতাটির অংশবিশেষ:
‘বাতাসে মুক্তির ডাক, প্রান্তর-ধূলায়
থমথমে স্মৃতি ওড়ে, অশ্রুহীন ছায়ানামা
নগর বন্দর গ্রামে বাংলার ঘরে ঘরে
রক্তে দোলে ছবি-
ধাতব স্পর্ধার মুখে সে ছবি আমার প্রিয়
প্রাণের অধিক,...
তখন বাংলার মাঠে ঘর- ফেরা পথে পথে
কমলা রোদের ঢেউ ছবি আঁকে মিছিলের মুখে,
প্রিয়তম সেই স্মৃতি স্বেদে ও শোণিতে
 জেগে থাকে ব্যথার স্নায়ুতে।”

এমনি করে অনেকেই একুশের আবেগ কবিতায় তুলে ধরতে চেয়েছেন; এর চিত্ররূপ কবিতায় এঁকে তুলেছেন সেই ১৯৫২ থেকেই। প্রতি বছর একুশে উপলক্ষে প্রকাশিত পত্র পত্রিকায় কত শত লেখা প্রকাশিত হয়। অন্য কোনো আন্দোলন দূরে থাক, বৃহত্তর গণআন্দোলন নিয়েও রচিত হয় নি এত কবিতা। হয়তো প্রথম রক্তঝরা গণতান্তিক আন্দোলন বলেই কবি-বুদ্ধিজীবী সবার চেতনায় একুশে প্রবল অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। এ কারণেই এর প্রতিক্রিয়াও হয়েছে তেমনি তীব্র। এখানে মাত্র কয়েকটি কবিতার অংশ বিশেষ বা কিছুসংখ্যক কবিতার প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছে, এবং প্রধানত বায়ান্ন সালের পরবর্তী দু-এক বছরের পটভূমিতে। বায়ান্ন-পরবর্তী কয়েক বছরে রচিত কবিতার পর্যালোচনা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, একুশের অভিঘাত আমাদের সাহিত্যে কি প্রবল শক্তিমত্তায় রূপান্তরের পথ তৈরি করেছিল, সৃষ্টি করেছিল স্বাধিকার চেতনার পুষ্পিত সম্ভার। আমাদের সাহিত্য সেই পথেই নিজেকে চিনে নিতে পেরেছে। ফলে আজকের দিনে আমাদের সাহিত্য হয়ে উঠেছে- মহিমান্বিত ও প্রগাঢ় প্রাণের ভাষায় যা আজও উজ্জ্বল এবং অমর কীর্তি।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh