অ্যান্ডারসনের নারীরা

ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন ও জেনি লিন্ড

ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন ও জেনি লিন্ড

হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন একজন রাজা, সম্রাট যা-ই বলি না কেন তাতে বড্ড খামতি লাগে। তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটি গল্পের ডালি। কোনো এক ধোঁয়াশা বেলায় বসে রূপকথাকার যখন গল্পের জাল বোনেন, তখন কল্পনার ওই আশ্চর্য কলে কত সহজেই আটকে পড়ে রূপসী রাজকন্যা, সাহসী রাজপুত্র, দশাসই দৈত্যের দল। কিন্তু কোনো রূপকথাকার যখন বার বার নিজেকে নিজেই বন্দি করেন রূপকথার রহস্যজালে, জীবনের রঙ্গমঞ্চ থেকে ছিনিয়ে আনা চরিত্রদের সামান্য রঙ মাখিয়ে নামিয়ে দেন গল্পদাদুর আসরে- তখন পাঠককে পা ফেলতে হয় অতি সাবধানে, সন্তর্পণে। এখানে এক উড়ন্ত ‘ট্রাঙ্কের পাশে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো বাতিস্তম্ভ ভিড় করেছে। এক জোড়া লাল টুকটুকে জুতার পাশে পাওয়া গেছে স্বর্গ থেকে খসে পড়া একটা পাতার উপাখ্যান, কিম্বা অদ্ভুত এক সুচের আত্মকাহিনি। আরও আছে বাস্তবের কঠিন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা লেখকের পরিচিতদের দল, লেখক স্বয়ং নানা রূপে, নানা মহিমায়, আর আছে রূপকথার জগতের নিয়মিত বাসিন্দাদের মহামিছিল!

রূপকথার এই অনন্য, অত্যাশ্চর্য জগতের সৃষ্টিকর্তা হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন- এখানে তাঁর আপন মনের মাধুরী-দুঃখ, দীর্ঘনিঃশ্বাসের সঙ্গে মিলে একাকার হয়ে গেছে- তাই তৈরি হয়েছে এক চমৎকার আজব সবুজ ফর্মূলা। এই জাদু দাওয়াই এর জোরে রূপকথা যেন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে- তৈরি হয়েছে সবুজ কাঁচের মধ্যে দিয়ে উপলব্ধি করা জীবনের ছবি। অর্থাৎ কিনা রূপের কথা, সুন্দরের অভিযান। এই রূপকথায় অনেক সময় আমরা মিলনাত্মক উপসংহার দেখতে পাই না, শুনতে পাই না ‘they lived happily ever after’-এর আশ্বাস। এই রূপকথায় আছে নতুনত্বের পরশ, বিষাদের প্রচ্ছন্ন সুরধ্বনি, এক শিশুসুলভ দৃষ্টিভঙ্গির উপলব্ধি। তাঁর রূপকথার তুলনা হয় ডেনমার্কের গ্রীষ্মকালীন আলোময় রাতের সঙ্গে- যার শিহরণ-জাগানো, অদ্ভুত ‘Northern Lights’-এর প্রভাবে ডেনিশ সাহিত্যে এসেছে- ‘a strange quality that is as sad and broading as Hamlet, nostalgic, out of this world.’

শেকসপিয়ারের হ্যামলেটের মতন অ্যান্ডারসনও নিজের জীবনের নায়িকাদের নিয়ে বিব্রত, কিছুটা বিপর্যস্তও ছিলেন। বাবার দেওয়া ‘পাপেট থিয়েটার’ বা পুতুল নাচের রঙ্গমঞ্চের পুতুলগুলো নিয়ে লেখক যেমন বহুদিন নাড়াচাড়া ক’রে সময় কাটিয়েছেন- ঠিক তেমন ক’রেই তিনি সামলেছেন তাঁর জীবনের রঙ্গমঞ্চে বহু নারীর আনাগোনা। মা থেকে ঠাকুমা, গল্পদিদাদের আসর থেকে ছেলেবেলায় দেখা পাগলা গারদের উলঙ্গ, উন্মত্ত নারী, নাটকের নায়িকার পাশে বিখ্যাত গায়িকা- এদের একটুকু ছোঁয়ায় লেখক মনে মনে শুরু করেছেন রঙে, রসে জাল বোনা। কিন্তু রূপকথাকার যাঁরা- যাঁরা রূপ এবং রূপসীর সাহায্যে কলম নিয়ে কারবার করেন- তাঁরা গল্পের শেষে নায়িকাদের সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘর করতে পাঠালেও-নিজেদের ক্ষেত্রে ‘সুখ’ সবসময় সুনিশ্চিত করতে পারেন না। যেমন পারেননি ফরাসী রূপকথাকার পেরো সাহেব অথবা জার্মান রূপকথা-সংগ্রহকার গ্রিম বা অ্যান্ডারসন স্বয়ং। মায়ের হতদরিদ্র শৈশব কালের ঘটনা, স্নেহময়ী পিতামহীর চোখে মুখে আভিজাত্যের ছাপ- সবই তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। পরবর্তীকালে মাঝে মধ্যে এসেছে প্রেমের মৃদুমন্দ প্রবেশ। এই সবই লেখক টেনে এনে ফেলেছেন তাঁর নিজের মনের গ্রিনরুমে। আর এই বিশেষ ঘরে মেক-আপ নিয়ে, পার্ট মুখস্থ ক’রে সাধারণ নারী থেকে অসাধারণ নায়িকায় পরিণত হয়েছে- জোহান লুইস হেইবার্গ, অ্যান মারী, জেনি লিন্ড ও হেনিরিয়েটদের দল।

‘দ্য বাটারফ্লাই’ গল্পটি এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রূপের সন্ধানকারী প্রজাপতিটি যেন লেখকের মানসিকতার ছাঁচে ঢালাই হয়ে ডানা মেলেছে, কারণ প্রজাপতির প্রয়াসে আমরা নিশ্চিতভাবে খুঁজে পাই অ্যান্ডারসনের নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি। প্রজাপতি ফুলের বাগিচায় সন্ধান করেছে তার জীবন সঙ্গিনীকে- বসন্ত, গ্রীষ্ম, হেমন্ত পেরিয়ে গেল- প্রজাপতি এখনও মনস্থির করতে পারল না। তারপর দেরী হয়ে গেল- এখন ফুলের তরতাজা সুবাস আর কোথায়? ডালিয়া আর শুকনো ক্রীসানথামাম-এর মধ্যে তাঁর সন্ধান পাওয়া যাবে না। অবশেষে প্রজাপতি যখন পুদিনা ফুল বা মিন্টের দিকে চেয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিল- তখন উত্তর এলো- “Friendship if you please but nothing more... but as to marrying- no- don't let us appear ridiculous at our age.”

শব্দের আড়ালে লেখকের নিঃসঙ্গতার সুর সুস্পষ্ট। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো অবহেলা করার দুঃখ অপরিসীম। তাই বোধহয় লেখকের প্রজাপতির প্রতি কটাক্ষটিতে সকরুণ আত্মসমালোচনার সুর সুস্পষ্ট। জীবন-সঙ্গিনী লেখকের জোটেনি বটে কিন্তু জীবনে তিনি একেবারে নিঃসঙ্গ ছিলেন না। জীবনের মূল্যবান মুহূর্তকে তিনি যেভাবে আস্বাদন করেছেন এমনটা আর কেউ নয়। তাঁর রূপকথা পড়ে তাই আমাদের কেবলই মনে হয় কোনো এক পশ্চিমী আলিবাবার মতন তাঁর জীবন কলসটাকে সুন্দর মুহূর্তের মোহরে পরিপূর্ণ করতে অ্যান্ডারসন ছিলেন ভীষণ রকম ব্যতিব্যস্ত। অ্যান্ডারসনের বয়স তখনো চল্লিশ হয়নি- যখন তাঁর জীবনে আসেন বিখ্যাত ‘সুইডিশ কোকিল’ জেনি লিন্ড। লেখক তখন বিভিন্ন প্রাসাদ ও জমিদার গৃহে নিমন্ত্রণ রক্ষায় রত-তাঁর চারপাশে সুন্দরীদের হাট বসেছে- কোথাও সুবাসিত বেশের আকর্ষণ, কোথাও দুধে-আলতা কাঁধের আবেদন; কখনো ঝকমকে হীরার হাতছানি, কখনও সুরের সাড়া-জাগানো আলোড়ন। জেনির সঙ্গে প্রথম দেখা এক পার্টিতে। তিনি জেনিকে দেখলেন এক লাজুক, গম্ভীর, অল্পবয়সী যুবতীর রূপে। জেনির গান শুনে লেখক এতই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে তিনি ঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। 

সমগ্র ডেনমার্কে ‘দ্য সুইডিশ নাইটিঙ্গেল’ নামে খ্যাত জেনিকে লেখক তুলে ধরলেন এক সুরেলা খয়েরী পাখির আকারে তাঁর বিশ্ববিখ্যাত রূপ-কথা ‘দ্য নাইটিঙ্গেল’ গল্পে। প্রথম থেকেই লেখক বুঝতে পেরেছিলেন যে জেনির জীবনে তাঁর বিশেষ কোনো জায়গা নেই। দু’জনকে দেখা গেছে কোপেনহেগের পথে পথে, বেকারিতে বসে গরম দুধ আর মিষ্টি বান রুটি খেয়ে সময় কাটাচ্ছেন। একবার জেনি যখন জাহাজে চড়ছেন তখন লেখক তাঁর হাতে একটা চিঠি ধরিয়েছিলেন- ‘a letter she must understand’। জেনি কিন্তু চিঠির কোনো উত্তর দিলেন না। সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব করতে গিয়েও পাত্তা পাননি লেখক। তাই বোধহয় ‘দ্য বাটারফ্লাই’ গল্পে পুদিনা পাতার চারাটি প্রেমিক প্রজাপতিকে বলে উঠেছে- ‘Friendship, if you please, but nothing more, I am old and you are old... .’. জেনি ধরা পড়লেন না প্রেমের পিঞ্জরে, প্রেমিকের কাছে পেলেন অবাধে আসা যাওয়ার এক পাসপোর্ট। জেনির সঙ্গে প্রেমের শেষ কথা তাই সব থেকে সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে স্বয়ং অ্যান্ডারসনের রূপ-কথার ভাষায়- ‘And the Nightingale flew away.’ লেখকের বেশি বয়সে এসেছিল এক নতুন প্রেমের উপলব্ধি- এখানে পাত্রীটি হলেন জোনা কলিন। খুব ছোট থেকেই তিনি লেখকের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন কিন্তু বয়স্ক অ্যান্ডারসনের ভালবাসায় এসেছিল অনন্য এক প্রসারতা। লেখকের চেষ্টায় জোনার বিবাহ হয় তাঁর গোপন প্রেমিক হেনরীবা স্ট্যাম্প এর সাথে। 

স্ট্যাম্পের মা, ব্যারেনস অফ্ নীসু কিন্তু ছিলেন এই প্রেমের ঘোরতর বিরোধী। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে উঠতে পেরেছিলেন লেখক তাঁর বয়স্ক বান্ধবীকে। এই তিনজন- অর্থাৎ জোনা, হেনরিবা ও ব্যারনেসকে নিয়ে তিনি রচনা করলেন তাঁর সুবিখ্যাত ‘The shepherdess and the bhumney sweep’, জোনা এখানে চীনা মাটির এক ছোট্ট মেষপালিকা পুতুল, ছেলেবেলার নিষ্পাপ প্রেম যা বড় হয়েও বেঁচে থাকে- তা যে সত্যি সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখার মতন অমূল্য জিনিস এক্ষেত্রে তা বোধহয় লেখক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি তাঁর পুতুল মেষপালিকাকে দিয়েছেন সুন্দর সোনার স্পর্শ। আর্তনাদের শব্দ কি সবসময় শুনতে পাওয়া যায়? অনেকের মধ্যে থেকেও একাকিত্বের অনুভব, এইরকম এক নিঃশব্দ বেদনার অনুভূতি - যে বেদনা বার বার দংশন করেছে কালিদাস থেকে কীটসকে, অ্যান্ডারসন থেকে কমলা দাসকে। লেখক তাই সুন্দরীদের ভিড়ে খোঁজ করেছেন তাঁর পরশ-পাথর সহচরীকে, সহজিয়া সঙ্গিনীকে। তাঁর ডায়েরি থেকে আমরা জানতে পারি তাঁর মনের তোলপাড় হওয়া তটের অবস্থা- ‘and I fight with myself...lucky is he who in married, is engaged.... Naples in more dangerous than Paris, for there one is cold, but here the blood bums.’ 

দুঃখের বিষয় এই যে তাঁর এই টগবগে রক্ত আর ছলছলে চোখ নিয়ে দিনের পর দিন রূপকথার রাজ্যে পালিয়ে গেছেন লেখক। মৃত্যুর ক্যানভাসে সন্ধান পেয়েছেন মিলনের রামধনুর। তিনি যে কেবল সারা জীবন ঝিনুক কুড়িয়ে গেলেন- পেলেন না মুক্তোর সন্ধান; কত নারীর মনের কথা শুনলেন আর শোনালেন কিন্তু মন দেওয়া নেওয়ার খেলায় শামিল হতে পারলেন না।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh