এস ওয়াজেদ আলি এবং তাঁর ‘ডকট্রিনের’ খোঁজে

‘এলিট’ এবং ‘নাগরিক জীবনযাপনের’ পরও তিনি তাঁর লেখা-পত্তরে বারবারই ‘গ্রামীণ জীবনের নস্টালজিয়া’ দ্বারা ভেসে গেছেন। তাঁর লেখায় ‘সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ’ এবং ‘গ্রামীণ সমাজকে’ ব্যবহার করেছেন। ফলে একটা ‘আধা সামন্ততান্ত্রিক’ এবং ‘আধা নাগরিক’ মন এস ওয়াজেদ আলির চিন্তায় নানাভাবে সক্রিয় ছিল। সেই বিষয় তাঁর সাহিত্যকর্মে এবং অন্যান্য লেখাজোকায় স্পষ্ট হয়েছে; কিন্তু এর উৎস কোথায়? তিনি নিজেই তাঁর জন্ম ও পূর্বপুরুষের বৃত্তান্ত বলতে গিয়ে মূল বিষয়টা আমাদের জানান। আবার অসম্পূর্ণ নগরায়ন এবং তার প্রভাবে নিজ জীবনের নানান জটিলতা থেকেও যেন একটু কোমল আর নিসর্গের সমন্বয়ে নির্মিত গ্রামীণ জীবনের দিকে সরে এসেছেন; কিন্তু ব্যক্তির নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং চর্চাপদ্ধতি তাঁকে নগর ছেড়ে গ্রামে বসবাস করতে দেয়নি।

সাহিত্যের রয়েছে নানান মত ও পথ। চিন্তা ও আদর্শের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। সাহিত্যের এই নানান মত ও পথের একটা বড় অংশ মনে করেন শিল্প কেবল শিল্পের জন্য; আবার আরেকটা বড় অংশ মনে করেন শিল্প মূলত মানুষের জন্য। এস ওয়াজেদ আলি (১৮৯০-১৯৫১) এই হিসেবে দ্বিতীয় ধারার লেখক। তিনি শিল্পকে কেবলই শিল্পের বিষয় মনে করেননি। তিনি এই বিষয়ে বলেছেন, ‘মানুষ শিল্পের জন্য নয়, শিল্প হচ্ছে মানুষের জন্য।’ দুনিয়ায় ১৮১৫ সাল নানান কারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; কিন্তু ‘বেঙ্গল রেনেসাঁর’ জন্য এই সালটা গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এই সময়েই রাজা রামমোহন রায় কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করলেন, এবং ‘লিবারেল ডকট্রিন’ সম্পন্ন করার জন্য নানান কর্মকাণ্ড হাতে নিলেন; কিন্তু প্রথমদিকে এই ধারার কর্মকাণ্ডে বাঙালি মুসলমানের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না।

অনেকটা ‘ধর্মীয় গোঁড়ামি’ এবং একইসঙ্গে ‘পরাজিতের মনস্তত্ত্বের’ বিষয় এইক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল; কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় হিন্দু এলিটরা সমানে অংশগ্রহণ করেছিলেন, এবং তারাই প্রথমদিকে এই লিবারেল ডকট্রিনকে সামনে নিয়ে গিয়েছিল। আর এই প্রক্রিয়ায় বেশ দেরি করে অংশগ্রহণ করেছিলেন মুসলমানরা। তাও তাদের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। এস ওয়াজেদ আলি এঁদের মধ্যে অন্যতম। কাণ্ডজ্ঞান হওয়া থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এস ওয়াজেদ আলি এই ‘লিবারেল ডকট্রিনে’ বিশ্বাস রেখেছিলেন। এবং এই বিষয়ে তাঁর চিন্তা-আদর্শের স্বতন্ত্র অবস্থান ছিল। আগেই বলে নেওয়া উচিত যে, রাজা রামমোহন রায় যে ডকট্রিনের সূচনা করেছিলেন, সেই ডকট্রিনে পরবর্তীতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের অবদান ছিল সর্বাপেক্ষা বেশি। আর এই ধারায় মুসলমানদের মধ্যে বেশি ভূমিকা রাখা লোকজনদের অন্যতম এস ওয়াজেদ আলি। ‘এস ওয়াজেদ আলিরা’ যদিও বেশ দেরিতে এই কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবুও তাঁদের প্রত্যেকের চিন্তার অবদান কম নয়। এবং মুসলিম কমিউনিটির উদারনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক মূল্যবোধের নির্মাণের পিছনে অন্যান্যের মতো এস ওয়াজেদ আলিরও বিশেষ অবদান রয়েছে। তিনি পূর্বতন ‘ডকট্রিনে’ বিশ্বাস রাখলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং নিজ কমিউনিটির প্রতি দায়বোধ থেকে তার পরিবর্তন হয়েছে। ফলে রাজা রামমোহন রায় যে চিন্তা-আদর্শে তাঁর ‘লিবারেল ডকট্রিন’ নির্মাণ করেছেন, সেই ধারা থেকে এস ওয়াজেদ আলির ‘লিবারেল ডকট্রিনের’ পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

ব্যক্তিজীবনে এস ওয়াজেদ আলি কলকাতার জীবনযাপন পদ্ধতিকে মান্য করেছেন। জীবনের একটা বড় সময়কাল তাঁর কেটেছে কলকাতায়। এবং মৃত্যু অবধি তিনি কলকাতায়ই অবস্থান করেছিলেন। এই জীবনযাপনের বিষয়-আশয় তাঁর লেখাজোকায় স্পষ্ট হয়েছে। একইসঙ্গে একটা ধনিক ব্যবস্থার ভিতরে এলিট জীবনযাপন করেছেন তিনি। শৈশবে লেখাপড়া করেছেন ইংরেজদের পরিচালনায় ইংরেজি স্কুলে। পরবর্তীতে লেখাপড়া করেছেন আলীগড় এবং লন্ডনে। চাকরি জীবনেও তিনি বেশ ‘সাহেবি ঢঙের’ চাকরি করেছেন। ব্যারিস্টারিও করেছেন। আবার একটা সময় ম্যাজিস্ট্রিতেও যোগদান করেছিলেন। বিদেশে পড়তে গিয়ে মেমসাহেব বিয়ে করেছিলেন। এবং এর প্রভাবে কৈশোরের বিয়ে ভেঙে গেল। আবার পরবর্তীতে এই মেমসাহেবও তাঁর অর্থকষ্টে টিকতে না পেরে তাঁরই ভাইকে বিয়ে করে ফেলল। এই সমস্ত বিষয় তাঁকে এক জটিল জীবনের ভিতরেই নিয়ে গেছে। এবং ব্যক্তিজীবনে এক ধরনের চরম নৈঃসঙ্গতার ভেতর দিয়ে তিনি সময় পার করেছেন। এই সমস্ত বিষয় পর্যালোচনার পর তাঁর জীবনযাপনের আদর্শ যে নাগরিক এবং এলিট চিন্তাসম্পন্ন-তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু এইরকম ‘এলিট’ এবং ‘নাগরিক জীবনযাপনের’ পরও তিনি তাঁর লেখা-পত্তরে বারবারই ‘গ্রামীণ জীবনের নস্টালজিয়া’ দ্বারা ভেসে গেছেন। তাঁর লেখায় ‘সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ’ এবং ‘গ্রামীণ সমাজকে’ ব্যবহার করেছেন। ফলে একটা ‘আধা সামন্ততান্ত্রিক’ এবং ‘আধা নাগরিক’ মন এস ওয়াজেদ আলির চিন্তায় নানাভাবে সক্রিয় ছিল। সেই বিষয় তাঁর সাহিত্যকর্মে এবং অন্যান্য লেখাজোকায় স্পষ্ট হয়েছে; কিন্তু এর উৎস কোথায়? তিনি নিজেই তাঁর জন্ম ও পূর্বপুরুষের বৃত্তান্ত বলতে গিয়ে মূল বিষয়টা আমাদের জানান। আবার অসম্পূর্ণ নগরায়ন এবং তার প্রভাবে নিজ জীবনের নানান জটিলতা থেকেও যেন একটু কোমল আর নিসর্গের সমন্বয়ে নির্মিত গ্রামীণ জীবনের দিকে সরে এসেছেন; কিন্তু ব্যক্তির নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং চর্চাপদ্ধতি তাঁকে নগর ছেড়ে গ্রামে বসবাস করতে দেয়নি। এই জটিলতা দ্বারাই তিনি নিয়ন্ত্রিত হয়েছেন আজীবন। তার প্রভাব তিনি অস্বীকার করতে পারেননি। ফলে এই বিষয়টা যেমন সক্রিয় ছিল তাঁর ব্যক্তিজীবনে, তেমনি ছিল তাঁর লেখকসত্তায়ও; কিন্তু আবারও বলছি, জীবনযাপন পদ্ধতিতে তিনি পুরোপুরি ভিন্ন; কলকাতার সে সময়কার এলিট শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হবেন।

এস ওয়াজেদ আলি চিন্তা ও আদর্শে সমন্বয়বাদী ছিলেন; কিন্তু পুরোপুরি পাশ্চাত্য সমন্বয়বাদী চিন্তা-আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হন নাই। তুর্কিদের হঠাৎ করেই পাশ্চাত্য জীবনধারা দ্বারা ‘অতি আধুনিক’ হওয়ার বিষয়কে সমালোচনা করেছেন কঠোরভাবে। বিশেষ করে নিজ ঐতিহ্য এবং ইতিহাস চেতনা সক্রিয় ছিল তাঁর চিন্তার গভীরে। একইসঙ্গে তিনি উদারনৈতিক ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এবং তা মান্য করেছেন; কিন্তু নিজের ভূমির ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে বাতিল করে দিয়ে নয়। আবার একইসঙ্গে তিনি আবুল হুসেন প্রমুখদের একেশ্বরবাদী ধর্মচিন্তার সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে ধর্মহীন হয়ে নয়, যার যার ধর্ম পালন করে, সমন্বয়বাদী চিন্তার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চিন্তা নির্মাণ করা সম্ভব। এবং এ প্রক্রিয়ায়ই অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নির্মাণও সম্ভব।

এইখানে বলে নেওয়া ভালো যে, এস ওয়াজেদ আলি ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ নির্মাণে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি সমর্থন করতেন ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। এই বিষয়ে তিনি এও বলেছেন যে, ভাষার ভিত্তিতে সর্ব ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নির্মাণ সম্ভব না হলেও ‘প্রদেশভিত্তিক’ গড়ে উঠতে পারে। এই চিন্তার ওপর সওয়ার হয়েই তিনি ‘স্বতন্ত্র বাংলাদেশের’ স্বপ্ন দেখেছিলেন। বাংলার ‘পূর্বাঞ্চলেই’ যে একসময় ‘প্রকৃত বাঙালি রাষ্ট্র’ এবং ‘সমাজ জীবন’ নির্মিত হবে, সে বিষয়ও তিনি বলে গিয়েছিলেন। বাস্তবে তো তাই হয়েছিল। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চিন্তার ভিতর দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল।

তবে এক্ষেত্রে বলে নেওয়া ভালো যে, ভাষা এবং ভাষাগত চিন্তার বেলায় তিনি এককভাবে কলকাতাকেন্দ্রিক চিন্তাকে প্রাধান্য দেন নাই। যদিও তিনি কলকাতার রেনেসাঁকেই মান্য করতেন, পূর্ববর্তী নবজাগরণের বুদ্ধিজীবীদের চিন্তাকেও মান্য করতেন; কিন্তু তারপরও তাঁর চিন্তায় যে ‘কমিউনিটি প্রীতির’ বিষয়টা রয়ে গিয়েছিল, সেই বিষয়ই তাঁর ভাষাচিন্তা এবং ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষ করে তাঁর গল্পগ্রন্থের নামের ভিতরেও ‘মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিসংলগ্ন শব্দ’ ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এবং তাঁর ভাষায় শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই বিষয় উল্লেখযোগ্য। যদিও তাঁর গদ্য রচনা শুরু হয়েছিল প্রমথ চৌধুরীর বিশেষ তাড়নায়।

কিন্তু এই ভাষাগত বিষয়টা তিনি যে সাম্প্রদায়িক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, এমন নয়। তিনি এই বিষয় তাঁর লেখায় আলোচনা করেছেন যে, প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীদের নিজস্ব ‘ধর্মভিত্তিক কালচার’ থাকে। সেই কালচারের সঙ্গে অন্য কালচারের একটা ফারাকও থাকে; কিন্তু এইরকম বিভিন্ন কালচার নিয়েই একটা সমন্বয় সাধন জরুরি। এবং এই সমন্বয় আর ভাষার একত্রীকরণের ভেতর দিয়েই সম্ভব হবে। ভাষার বেলায় এই বিষয়ই মেনে চলেছেন বিশেষভাবে, এস ওয়াজেদ আলি। অর্থাৎ ভাষার ক্ষেত্রে কলকাতার প্রভাবও মেনে নিয়েছেন; একইসঙ্গে একটা নিজস্ব কমিউনিটির ‘কালচারকেও’ এই ভাষার ভেতর দিয়ে প্রকাশ করার প্রয়াস পেয়েছেন।

যদিও তাঁর এই চিন্তা দেশভাগের পরবর্তী সময়ে সম্ভব হয় নাই। ধর্মভিত্তিক নয়, ভাষাভিত্তিক স্বতন্ত্র জাতীয়তার যে বিষয় তিনি ‘প্রাদেশিক জাতীয়তবাদের’ ক্ষেত্রেও উত্থাপন করেছিলেন, তা পাকিস্তান এবং ভারত- এই দুটি রাষ্ট্রের নির্মাণের ভিতর দিয়ে ভেস্তে যায়। অর্থাৎ বেঁচে থাকা পর্যন্ত তিনি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ-নির্মিত রাষ্ট্র বা প্রদেশ কোনোটাই দেখে যেতে পারেননি। অবশ্য পূর্ব বাংলাকে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে যে তিনি আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন; এবং পরবর্তীতে তা সার্থকও হয়েছিল- কিন্তু তা তাঁর মৃত্যুর বিশ বছর পরে। যদিও এইসময় ‘এস ওয়াজেদ আলিদের’ ডকট্রিনকে ‘বাতিল জিনিস’ হিসেবে সমালোচনা করা হচ্ছে। তবে এই সমালোচনার মোক্ষম উত্তর হবে, অতীত বিস্মৃত হওয়ার প্রবণতা বাঙালির বহুদিনের বাজে অভ্যাস।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //