১৯০৫ ও ১৯৪৭ বাংলা ভাগের দুই আখ্যান

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ, এই দুই আলাদা বঙ্গের কথা শুনে আমরা ও আমাদের আগের বেশ কয়েক প্রজন্ম বড় হলেও পুরনো ইতিহাস বা ভূগোল বইতে শুধুই বাংলা নামের এক দেশের কথা জানা যায়। সেই অবিভক্ত অঞ্চলে, বাংলা ও বাঙালি, এই দুটি শব্দ প্রায় সমার্থক ছিল। বাংলা নামের সেই দেশের সংজ্ঞাও তখন ছিল দিব্যি সহজ-সরল। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী ভৌগোলিক দিক থেকে অবিভক্ত বঙ্গভূমি ছিল এমন এক অঞ্চল, যাতে বাংলা ভাষাভাষী লোকের বাস। সেখানে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কথা আলাদাভাবে উচ্চারিত হতো না। বরং, এই সাধাসিধে সহাবস্থানের ধারণার সঙ্গে মিলেমিশে ছিল জাতি-সম্প্রদায় ও এক সামাজিক অনুশাসনের ধারণা। 

উল্লেখ্য, এই সবকটি উপাদান একসঙ্গে মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল এক মিশ্র সংস্কৃতি এবং সহজাত এক ভাবের আদান-প্রদান, যে ঐতিহ্য ও পরম্পরার কথা বার বার উঠে এসেছে পরবর্তীতে বরেণ্য ইতিহাসবিদ, সাহিত্যিক বা সমাজবিজ্ঞানীদের লেখায়। ঔপনিবেশিক শাসন এই পরম্পরায় পরিকল্পনামাফিক পথে বাদ সাধে। কীভাবে? মূলত সম্প্রদায়গত চেতনা বা সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের হিসেবের ধারা শুরু হয় সেন্সাসের ধারণা থেকে। ব্রিটিশ সরকার ভারতে সুসংহত শাসনব্যবস্থা তৈরি ও প্রশাসনিক কাজে গতি আনার জন্য এক অদ্ভুত গণনা পদ্ধতির সূচনা করেছিল। এটা শুরু হয়েছিল জমি জরিপ করা নিয়ে, যার শেষ হয় মানুষ, পরিবার, সম্প্রদায়, জাতি, ধর্মীয় গোষ্ঠী ইত্যাদি গণনার মাধ্যমে। বিতর্ক আছে, সেন্সাসে মানুষ গণনার সরাসরি প্রভাব আদৌ সম্প্রদায়গত বিভাজনের পেছনে কাজ করেছিল কিনা। নাকি রাজনৈতিক বিভাজনই আসল কারণ ছিল? এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, ১৯০৫-এর সময়ের রাজনীতি আর ১৯৪০-এর দশকের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি চরিত্রগত দিক থেকে ছিল অনেকটা ভিন্ন। এমনকি সম্প্রদায়গত মনোভাব বা বিভাজনের আকার-প্রকারও এই দুই সময়ে একদম আলাদা ছিল। যদিও মাঝে ছিল মাত্র তিন দশকের ব্যবধান। তবু সাধারণ মানুষের মন-মানসিকতায় সম্প্রদায়ের বিভাজনের ধারণাকে খানিকটা হলেও প্রথিত করতে পেরেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসকবর্গ ও তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের মূল রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। কী ছিল এই সময়ের আসল চিত্র? কেনই বা সাধারণ মানুষ দুই বাংলার মাঝে ভাগ তৈরির স্বপক্ষে রায় দিলেন? কিসের কারণে দুই সম্প্রদায়ের জন্য দুটি দেশ- এক খণ্ডিত বাংলার অস্তিত্বকে মেনে নিল সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষগুলোও? এইসব জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে, দু’রকম বাংলা ভাগের সময়ে। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আর ১৯৪৭ সালের ভারত-ভাগ ঐতিহাসিক দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ঘটনা। তার গুরুত্বও আলাদা; কিন্তু সময়ের বিভাজনের নিরিখে অনেকরকম সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের মধ্যে এক্ষেত্রে একমাত্র মিলের জায়গা হলো এই দু’বারেই আসলে বাঙালির হৃদয়ভঙ্গ হয়। প্রথমবার আপাতভাবে জোড়া লাগলেও দ্বিতীয় ভাগের জেরে এখনও দুই বাংলা আক্ষরিক অর্থে আলাদা। যদিও আমাদের খানিকটা হলেও এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে সেই ঐতিহ্য ও মিশ্র সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ। 

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আসলে কী? জনপ্রিয় মতামত মোটামুটি দুটি। এক. বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে সেই সময় যে বিরাট অঞ্চল একসঙ্গে জুড়ে ছিল, আইনি ভাষায় প্রশাসনিক সুবিধের জন্য তাকে ভেঙে নতুন দুটি আলাদা প্রদেশ তৈরি করা। দুই, পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে নতুন এক প্রদেশ তৈরি করে হিন্দু-মুসলমান বাঙালির মধ্যে ভেদাভেদ তৈরি করা। কেন? তার পেছনে যুক্তি কী ছিল? ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময়ে বাংলাকে ভেঙে দু-টুকরো করা হয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে জনসমক্ষে বলা হয় মূলত দুটি কারণের কথা, ‘Ôthe reinvigoration of Assam and relief of Bengal’। বাংলার থেকে চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহীসহ আরও কিছু ছোট ছোট অঞ্চলকে আসাম প্রদেশের সঙ্গেজুড়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত হয়। কারণ এগুলো তৎকালীন সময়ে ছিল ‘the hot bed of the purely Bengali movement’। নতুন প্রদেশের নাম দেওয়া হয় ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’। তাতে ১৮ মিলিয়ন মুসলমান আর ১২ মিলিয়ন হিন্দু সহযোগে দু’রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়। সম্প্রদায়ের বিভাজনের নতুন অঙ্ক এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের এই হঠাৎ পরিবর্তনে একাধারে এক নতুন দিশা তৈরি হয় মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে, বিশেষ করে তাদের সমাজে। অন্যদিকে হিন্দুরা স্বভাবত এক আশঙ্কার অবস্থার শিকার হন। এর ফলে, বঙ্গভঙ্গের ঘোষণার পর মূলত কংগ্রেসের মধ্যকার হিন্দু নেতৃত্ব বাংলা ভাগের ‘চক্রান্তের’ বিরুদ্ধে যে আন্দোলন করেন, তাতে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয় ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে নিতে; কিন্তু সত্যি কি তাই? আপামর হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের মত কী ছিল? দুটি উদাহরণ তুলে ধরা যাক। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী সেই সময়ের কংগ্রেসের অন্যতম বিশ্বস্ত মুখ হিসেবে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণার পর লিখেছিলেন, ‘We felt that we have been insulted, humiliated and tricked. We felt that the whole of our future was at a stake, and that was a delibarate blow aimed at the growing solidarity and self-conciousness of the Bengali speaking population’। আবার মূলত মুসলমান সম্প্রদায়ের দ্বারা পরিচালিত, কলকাতা থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশিত মুসলিম ক্রনিকল পত্রিকায় ১৯০৪ সালের ৯ই জানুয়ারিতে স্পষ্ট করে লেখা হয়েছিল, ‘We do not recollect that there has, in the discussion of public questions ever before so much unanimity of voice as that which was raising its shouts of protests against the proposed partition of Bengal’। তাই হিন্দু-মুসলমান, এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই আসলে বাঙালির হৃদয়-ভঙ্গের তত্ত্বের নিরিখে প্রমাণ ইতিহাসে প্রচুর। ঢাকা শহরের দেয়ালজুড়ে ১৯০৪ থেকে লেখা হয়, ‘Do not turn us into Assamese’ বা ‘Do not divide us’-এর মতো সহজ-সরল স্লোগান। বাংলার মানুষ আসলে কখনোই ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গকে একটি ‘Settled fact’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি। প্রতিবাদ যে শুধু বাঙালিদের তরফ থেকে এসেছিল তা নয়, দ্য স্টেটসম্যান, দ্য ইংলিশম্যান এবং দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতো কিছু অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান প্রেসও সচেতনভাবে জোরালো প্রতিবাদ করেছিল বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ও তার বাস্তব রূপায়নেরও। 

১৯০৫ সালের বাংলা ভাগের ঘটনার পর্যায়ক্রম ও তার থেকে উঠে আসা বিতর্ক নিয়ে ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা অনেক কাজ করেছেন। তাই এক্ষেত্রে স্বভাবত তেমন তথ্যের অপ্রতুলতাও নেই; কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই যে, বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার ১১৫ বছর পর, দেশভাগ, বিশেষ করে বাংলা ভাগ নিয়ে বিশেষ সংখ্যায় আলোচনা প্রসঙ্গে, কেন বঙ্গভঙ্গ নিয়ে লেখা গুরুত্বপূর্ণ? বঙ্গভঙ্গ নিয়ে ঐতিহাসিক ঘটনাবলির বিবরণ প্রায় দুই বাংলাতেই সবার জানা। এমনকি দুই দেশের ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকেও বঙ্গভঙ্গের বেশ জোরালো উপস্থিতি ও বর্ণনা। তাহলে? এ প্রসঙ্গে, ইতিহাসে দিকে তাই আবার ফিরে তাকানো যাক। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ঘটনাকে আসলে দু’ভাবে দেখা উচিত। প্রথমত, ব্রিটিশ দৃষ্টিকোণ থেকে, মানে সাম্রাজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, যা নিয়ে বিংশ শতক থেকে শুরু করে প্রায় সবরকম তত্ত্ব ও তথ্যকে সম্মিলিত করে অনেক মোটা মোটা বই কিন্তু ইতিমধ্যেই লিখে ফেলেছেন ঐতিহাসিকরা। আর দ্বিতীয়ত, দেশীয় বাঙালি মানুষের, বরং বলা ভালো যে, হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখা। তার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা যায়, ১৯০৬ সালে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা। ১৯০৬ সালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে তৈরি মুসলিম লীগ এবং ঠিক এই বছরেই হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্ঠা; কিন্তু, এটা কি সত্যি কাকতালীয়? নাকি, নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার থেকে উঠে আসা একই রকমের প্রভাব বা সমাপতন? এই মানবিক, মানসিক ও আপাত দ্বিধাবিভক্তটা আসলে কার তৈরি ছিল? হিন্দু ও মুসলমান- এই দুই সম্প্রদায়ের? নাকি তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের? 

বঙ্গভঙ্গ শব্দটির সঙ্গে ইতিহাসে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আরেকটি নাম। লর্ড কার্জন। লন্ডনে অবস্থিত ব্রিটিশ লাইব্রেরির মধ্যেকার ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির বঙ্গভঙ্গ সংক্রান্ত নথিপত্র ঘেঁটে দেখলে কিন্তু বাংলা বিচ্ছেদের পরিকল্পনা নিয়ে আরও দু’জনের নাম পাওয়া যায়। এএইচএল ফ্রেশার এবং এইচএইচ রিসলে, এই দু’জন প্রশাসনিক আধিকারিকও কিন্তু সমানভাবে বাঙালির এই হৃদয়-ভঙ্গের অংশীদার বা দাবিদার ছিলেন। যাইহোক, ইতিহাসবিদ সুমিত সরকারের মত অনুযায়ী, বাংলাকে ভাগ করার যে ব্রিটিশ চক্রান্ত তা শুরু হয়েছিল ১৮৬৬ সাল থেকে। স্যার স্টাফোর্ড নর্থকোট নাকি উড়িষ্যা মহামারির পর প্রথম বাংলা প্রেসিডেন্সির মোট আয়তন কমানোর পক্ষে সওয়াল করতে শুরু করেন। ১৯০১ সাল থেকে প্রশাসন এ ব্যাপারে উঠে পড়ে লাগে। যুক্তি হিসেবে খাড়া করা হয়, প্রশাসনিক সুবিধা সংক্রান্ত কারণকে; কিন্তু, সত্যি কি বিষয়টি অত সাদামাটা ছিল? ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত দলিল দস্তাবেজে বার বার সীমানা পুনর্গঠনের তত্ত্বকেই মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। কি বলা হয়েছে তাতে? বঙ্গভঙ্গ এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘The Governor General in council is further pleased to declare and appoint that upon the constitution of the said Province of Eastern Bengal and Assam, the districts of Dacca, Mymensingh, Faridpur, Backergunj, Tipperah, Noakhali, Jalpaiguri, Rangpur, Bogra, Pabna, and Malda, which now form part of the Bengal Division of the Presidency of Fort William, shall cease to be subject to or included within the limits of that Division and shall henceforth be subject to and included within the limits of the Lieutenant-Governorship of the Province of Eastern Bengal and Assam’. এর বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় যে, বাংলার ভৌগোলিক অঞ্চলকে ভেঙে নতুন ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ বলে একটি নতুন প্রদেশ তৈরি, আর আবার সেই প্রাদেশিক সরকারের আওতায় ঠিক কোন কোন অঞ্চলকে জুড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তার বিবরণ। বঙ্গভঙ্গ সংক্রান্ত সরকারি কাগজপত্রে তাই কোন অঞ্চল বিভক্ত করা বা জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে আলোচনা প্রচুর। সেইসময়ের আসাম প্রাদেশিক শাসকদের নথিপত্রেও এই বিতর্ক শুধু অঞ্চল বা আঞ্চলিক অধিকার নিয়ে। ওই অফিসিয়াল নথিপত্রে হিন্দু-মুসলমান, জাতিসত্তা বা সম্প্রদায় নিয়ে বিশেষ কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি সম্প্রদায়ের চেতনার বা অস্তিত্ব তৈরির প্রক্রিয়ার কথা তারা যে জানতেন, সেটিও বোঝা যায় না।

কিন্তু ১৯০৪ সালে যখন প্রথম গভর্নরের প্রস্তাব হিসেবে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবনাকে প্রকাশ করা হয়, লর্ড কার্জন তখন পূর্ববঙ্গে এক সরকারি সমীক্ষার কাজে গিয়েছিলেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল, জনসাধারণের মনোভাব বোঝা ও তাদের মতামতকে খানিকটি হলেও প্রভাবিত করা। বঙ্গভঙ্গের পেছনে আসল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রথমে ছিল ভিন্ন ধরনের। তাতে কোনো হিন্দু-মুসলমানজনিত বিষয় ছিল না। মূল ধারণা ছিল, পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের কলকাতার হিন্দুদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত করা; কিন্তু পরে সম্প্রদায় সংক্রান্ত ধারণা বিভাজনের ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ঐতিহাসিক শীলা সেন তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, লর্ড কার্জন কীভাবে ১৯০৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় প্রদত্ত ভাষণে সরাসরি মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক চেতনাকে উস্কে দেন। লর্ড কার্জন স্পষ্ট বলেছিলেন যে, ‘Partition would make Dacca the Centre and possibly the capital of a new and self-sufficing administration which must give to the people of these districts by reason of their numerical strength and their superior culture the preponderating voice in the province so created, which would invest the Muhammedans in Eastern Bengal with a unity which they have not enjoyed since the days of the old Mussalman Viceroys and Kings’। ততদিনে হিন্দু জমিদার ও জোতদার শ্রেণির বংশানুক্রমিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের কারণে, সাধারণ গরিব মুসলমান পরিবারগুলো এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে- তাদের বংশানুক্রমিকভাবে নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার এক চিরকালীন অব্যাহতির আঁধার হিসেবে দেখেছিল ও স্বাগত জানিয়েছিল। ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জী তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, শুধু সাধারণ চাষা-ভুষা বা গরিব মুসলমান পরিবারগুলো নয়, উচ্চশিক্ষিত/উচ্চবর্ণের হিন্দু এলিটদের রাজনৈতিক বা সামাজিক একাধিপত্য এবং অত্যাচারের হাত থেকে উচ্চশিক্ষিত, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন মুসলমান শ্রেণিগুলোও একে মুক্তির পথ হিসেবে দেখেছিল। রিসলে ১৯০৬ সালে স্যার আর্থার গডলে, অর্থাৎ তৎকালীন ভারত রাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারিকে লেখেন, ‘Mohammedans sympathies with Hindus is falseÕ and ÔPartition should be maintained as most advantageous to Mohammedans’, তিনি বর্ণনা দিয়েছিলেন যে, ‘A meeting composed of about 1,000 Mohammedans of Cachar district held in the Silchar Janaianj Bazar Mosque on 6th October, 1906. This meeting empathically assures the Government that the slightest modification in the partition of Bengal will be ruinous both to the Government and Mussalman community’. পরবর্তীতে স্যার ব্যাম্ফিলড ফুলার, পূর্ববঙ্গ ও আসাম যুক্ত প্রদেশের প্রথম গভর্নর ১৯১০ সালে প্রকাশিত তার Studies in Indian Life and Sentiment বইতে উল্লেখ করেছেন যে, মুসলমানরা কীভাবে এই সময় স্বাভাবিকভাবেই ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক- মূলত এই দুটি কারণেই ব্রিটিশদের এই নীতির ওপর খানিকটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন। নতুন যুক্তপ্রদেশ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ আসলেই মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোকে নিয়ে তৈরির চেষ্টা করা হয় সচেতনভাবে। 

ব্রিটিশ শাসকরা ইংরেজবিরোধী, আত্মসচেতন ও আত্মবিশ্বাসী বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভাঙার জন্য মূলত এই পরিকল্পনা করেন, যার আরেক সুর আবার স্পষ্ট ধরা পড়ে স্বদেশী আন্দোলনের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে। বঙ্গভঙ্গের ঘোষণার সময়ে বা পরে, বিশেষ করে স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের দ্বিধা-বিভক্তি সামান্য হলেও, খানিকটা প্রকাশ্যে আসতে থাকে। যেমন ঐতিহাসিক রফিক জাকারিয়া উল্লেখ করেছেন, ১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে যখন বঙ্গভঙ্গে-বিরোধী আন্দোলন দৃঢ়ভাবে সংগঠিত হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়ে দুটি উল্লেখযোগ্য সংস্থা the Mohammedan Literary Society and Central National Mohammedan Association মুসলমানদেরকে বারণ করেন মূলত হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত স্বদেশী আন্দোলনে যোগদান করতে। কারণ তাদের মতে, ১৯০৬ সালের ১৬ অক্টোবর আসলে মুসলমানদের জন্য উদযাপনের দিন। পূর্ববঙ্গে স্বদেশী আন্দোলনের পক্ষে এই সমর্থন ও বিরোধিতা আসলে বহু শতাব্দী ধরে ঘটতে থাকা হিন্দু জমিদারদের সঙ্গে তাদের মুসলমান প্রজাদের যে শোষণের সম্পর্ক ছিল, সেই পুরনো কৃষিকেন্দ্রিক মনোভাব বা মানসিকতার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। তাই যখন হিন্দুরা ফুলার এর পদত্যাগ দাবি করে আন্দোলন করছিলেন, তখন মুসলমান সম্প্রদায় ফুলার এর পদত্যাগপত্র যাতে গ্রহণ করা না হয়, তার জন্য সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এর কারণ তলিয়ে দেখলে প্রথম যেটি পরিষ্কার বোঝা যায়, তা হলো, ঊনবিংশ শতক থেকে ভারতে যে তথাকথিত ‘নব্য যুগ’ এর সূচনা হয়েছিল, সেই মানসিক না জাগতিক আধুনিকতার অংশ হিসেবে কখনোই মুসলমান সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাই, এক অর্থে ঊনবিংশ শতকের রেনেসাঁস থেকে গেছে ‘হিন্দু রেনেসাঁস’ বা তার ধারণা। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দুদের মধ্যে বিশেষ করে সাংস্কৃতিক দিক থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখার যে মানসিকতা ছিল, তার পরিষ্কার এক নেতিবাচক ছাপ পড়েছিল বিংশ শতকের যে কোনো রকম বা সবরকম সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি রাজনৈতিক আন্দোলনেও। স্বদেশী আন্দোলনের সময় দুই সম্প্রদায়কে কাছাকাছি আনার এক প্রচেষ্টা যদিও শুরু হয়, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। কারণ, ঔপনিবেশিক শাসকরা কিন্তু সচেতনভাবে এই আপাত মানসিক বিভেদ এবং তার থেকে তৈরি হওয়া বিচ্ছেদের মুনাফা নিতে শুরু করেছিলেন। হিন্দুদের খানিক অগ্রসরতার সঙ্গে তুলনা টানতে শুরু করেছিলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের পশ্চাদপসরতাকে। এটা হয়ে উঠেছিল শাসক পক্ষের কাছে রাজনীতির ‘তুরুপের তাস’। আর, স্বদেশী আন্দোলনের সময় যেভাবে ‘ভারতমাতা’র ধারণাকে তুলে ধরা হয়, তা ছিল সম্পূর্ণ একটি হিন্দু ধারণার মতো। মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষরা স্বভাবতঃই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের এই সংগ্রামের স্বাভাবিক অংশ বলে ভাবতে পারেননি। মুজাফফর আহ্মদ তার লেখায় উদাহরণ দিয়েছেন এমন অনেক মুসলমান মানুষের, যারা ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ করে স্থায়ী সরকারি ও অনেক সময় ইংরেজ মালিকানাধীন কোম্পানির বেসরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে, তারা তথাকথিত সামাজিক প্রতিপত্তি ত্যাগ করেছিলেন। কংগ্রেসের এলিট নেতৃত্ব কখনো স্বদেশী আন্দোলনের একটি আবশ্যিক অংশ হিসেবে মুসলমানদের জড়িয়ে রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার কালান্তর গ্রন্থে স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘Hindu and Muslim communities in the past were not conscious of their differences’। এই আপাত সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতা বা সাময়িকভাবে বাঙালি মুসলমান ও অসমীয়াদের ক্ষমতা অর্জনের আনন্দ বা হিন্দু বাঙালিদের তাদের দ্বারা প্রভাবিত অঞ্চলে সামাজিকভাবে স্থানচ্যুতির ভয়; কিন্তু তাদের বাঙালি হৃদয়কে প্রভাবিত করেনি। তৎকালীন পত্র-পত্রিকা, বিশেষ করে আত্মজীবনীমূলক লেখাতে যার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।

এই সব মিলিয়েই আসলে ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যেকার সময়ে সামাজিক, বিশেষ করে মানসিকস্তরে সাময়িক এক আপাত-বিভাজন বা দ্বিধাবিভক্তি তৈরি হয়, তার পুরোপুরি মুনাফা ভোগ করেছিল ব্রিটিশ শাসক বা তাদের প্রতিনিধি- উঁচু প্রশাসনিক স্তরে বসে থাকা উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণের মানুষগুলো। ১৯০৫ সালে, যখন প্রথম সম্প্রদায় হিসেবে হিন্দু-মুসলমান বা ‘মেজরিটি’ ও ‘মাইনরিটি’ এর নামকরণ ও ধারণা তৈরি শুরু হয়, তার প্রক্রিয়া আরও জোরদার হয়েছিল ১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কারের সময় থেকে। কারণ এর মাধ্যমে এক প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি শুরু হয়। মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা করে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা হয়, যা ছিল ব্রিটিশ সরকারের ‘divide and rule’ নীতির অনুসারী; কিন্তু এই সময় যে এ ধরনের বিভাজনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সেরকম কোনো ইতিবাচক প্রচেষ্টা নেওয়া হয়নি, কোনো তরফ থেকেই সেটি ঠিক নয়। ১৯১৬ সালের লক্ষ্‌নৌ প্যাক্ট এর মাধ্যমে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া তৈরির চেষ্টা করা হয়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এর স্বপ্ন ছিল, এক ‘independent and sovereign Bengal’ তৈরি করা; কিন্তু কমরেড মুজাফফর আহমদের মতে, কংগ্রেস এবং তাদের অনুসারী দলগুলো প্রাণপণে চেষ্টা করেছিলেন বেঙ্গল প্যাক্ট-এর বিরোধিতা করার। তবু যতটুকু আপাত-সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তাকে সচেতনভাবে বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় ১৯১৯ সালের সংস্কারের মাধ্যমে। ঐতিহাসিক জন গ্যালাঘার এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, ‘By widening the functions of local government bodies in municipalities and the rural areas, which were to be chosen by the same voters who elected the new provincial councils, they linked the politics of localities more closely to the politics of the province’। ঐতিহাসিক জয়া চ্যাটার্জিও এই নির্দিষ্ট সময়কাল যে হিন্দু-মুসলমান বাঙালির সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা তার লেখায় গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছেন। এই বিষয়ে ঐতিহাসিকদের নানা সময়ে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, তারা কেউ অস্বীকার করেননি যে, ১৯০৯ থেকে ১৯১৯, এই দশ বছর বাংলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল ছিল এবং বাংলা প্রদেশে সম্প্রদায়-সংক্রান্ত দেশভাগের রাজনীতির ক্ষেত্রে এই ঘটনার একটি বেশ বড় ভূমিকা ছিল। 

১৯২০ দশকে যদিও কংগ্রেস ভারতবর্ষে অবিসংবাদিত রাজনৈতিক দল হিসেবে উঠে এসেছিল এবং তার অস্তিত্ব জাহির করার মতো সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানও খানিকটা অর্জন করেছিল; কিন্তু অদ্ভুতভাবে ব্রিটিশ নীতির প্রকৃত স্বরূপ বোঝার পরেও, মুসলমান সম্প্রদায়কে কখনই তারা দলের এক আবশ্যিক অঙ্গ করার জন্য, বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। যে কারণে ব্রিটিশ সরকার সবসময় ভাবার সুযোগ পেয়েছিল যে, কংগ্রেস আসলে, ‘representative of only a microscopic minority’। এর ফলস্বরূপ স্বভাবত সামাজিক দিক থেকে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মনের দূরত্ব বাড়ছিল। ঐতিহাসিক মুশিরুল মন্তব্য করেছেন, ‘The definition of‘Muslim identity’ was integrally related with relevant issues like economic discontent, escalating violence, projection of the political area, new social groups with higher levels of consciousness and greater stakes in power structures, which led to ‘community based strategies’। আবার ঐতিহাসিক অসীম রায়ের মতে, ‘The entire process of identity formation’ of the Bengal Muslims ‘on one hand underlines the seminal role of the elite, spurred into action by the changed historical circumstances of their position, their inner divergences and conflicts underlying their differential response, their manipulation of symbols of group identification for the optimal participation and mobilization of the masses’। মুসলিম লীগ সে সময়ে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিল যে, মুসলমান সম্প্রদায় অবশ্যই যৌথ সমস্যার এক সমাধানসূত্র খুঁজতে চায়; কিন্তু তা অবশ্যই সেই সময়ে তারা যে বিশেষ সুযোগ সুবিধাগুলো শাসকজাতির কাছ থেকে পাচ্ছিল, সেগুলোকে বর্জন করে নয়। সেসময় অনেক মুসলমান দ্বারা পরিচালিত পত্রিকায় এ বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় লেখা হয়, ‘The Hindu authors were sowing the seeds of distrust and hatred. If the Hindus were not aware of its consequences, the cordial relationships between the two communities would never be possible’। আবার শেখ ওসমান আলী মন্তব্য করেছিলেন, ‘Hindus might be advanced and cultured, but not all of them were. Similarly, though many Muslims might be backward and illiterate, not all of them were. Therefore there is no reason to regard Muslims as contemptible inferiors; I hope every Hindu brother, instead of regarding us with contempt or dislike, will embrace us with genuine brotherly love’। তাই, ১৯২০-এর দশকের পারস্পরিক বিশ্বাসহীনতা এবং সম্প্রদায়গত সহনশীলতা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসার এক ধারা যে পরবর্তী দশকের সম্প্রদায়গত ঘটনাক্রমকে বেশ জোরালোভাবে প্রভাবিত করেছিল, তা বলাবাহুল্য। 

১৯৩০ এর দশক থেকে দুই সম্প্রদায়ের পথ প্রায় আলাদা হতে শুরু করে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে হিন্দু, মুসলিম লীগের নেতৃত্বে মুসলমান এবং হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে কট্টরবাদী হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলের অনুসারীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, দুই সম্প্রদায়ের জন্য দুটি আলাদা দেশ থাকাই শ্রেয়। তাতে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ সুস্থিতির সঙ্গে, শান্তিতে বাঁচবেন। ১৯২০ দশক অবধি যেখানে ‘colonialism’ একটি জরুরি শব্দ ছিল, ১৯৩০ এর দশকে এসে ‘nationalism’ ও ‘communalism’ বেশি জনপ্রিয় শব্দ হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ১৯৩২ সালের Ramsay Macdonald-এর দ্বারা ঘোষিত ‘Communal Award’ একটি বড় ভূমিকা পালন করেছিল। কংগ্রেস এক্ষেত্রে চুপ করে থাকার নীতি নেয়, সরাসরি একে সমর্থন বা বিরোধিতা কিছুই করেনি। ১৯৩৫ সালের সাংবিধানিক সংস্কারের পরে কৃষক-প্রজা পার্টির বাংলায় উত্থানের মূল কারণ ছিল, কোয়ালিশন সরকার তৈরিতে কংগ্রেসের অনীহা। যে কারণে তারা মুসলিম লীগের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে প্রাদেশিক সরকার তৈরি করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য, এ কে ফজলুল হক এক সময় মন্তব্য করেছিলেন, ‘It is not a civil war in the Muslim community but it is a fight in which people of Bengal are divided on a purely economic issues...the problem of dal and bhat and some kind of coarse cloth is the problem of problems which stares us in the face and which must be solved immediately’। তাই, ১৯৩০-এর এইসব ঘটনার গতি প্রকৃতি যে ১৯৪০-এর দশকে বাংলায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের গতিপথকে আলাদা করে দিয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য। ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ এবং ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের সময়ে বাংলার গ্রাম ও শহরের রাজনীতির যে চরিত্র আলাদা- তাও স্পষ্ট হয়ে যায় সব রাজনৈতিক দলের কাছেই। ১৯৪৬ সালের রায়পুর (নোয়াখালী) বা কলকাতা দাঙ্গার স্বরূপ বিচার করার জন্য সম্প্রদায়গত সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪০ এর দশকে সারা পৃথিবীর রাজনীতি ও জাতীয় স্তরে ভারতের রাজনীতির অবস্থা হয়ে উঠেছিল টালমাটাল। সেখানে যদি বাংলার রাজনৈতিক অবস্থাকে বিচার করা যায়, তাহলে বলতে হবে যে, বাংলা বিভাজনের মানসিক প্রস্তুতির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল ১৯৪০ এর দশকের শুরু থেকেই। কারণ উভয় সম্প্রদায়ই নিজেদের জন্য বরাদ্দ এক ‘স্বপ্নভূমি’র কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। বাংলাকে অবিভক্ত রাখার ক্ষেত্রে শেষ আন্তরিক চেষ্টা করেছিলেন, আবুল হাশিম আর শরৎ বসু; কিন্তু তাদের পরিকল্পনাকে কেউ সেরকম গুরুত্ব দেননি। 

পরিশেষে বলা যায়, ১৯০৫ এবং ১৯৪৭ এর বাংলা-ভাগের দুই-আখ্যান আসলেই দু’রকম। এর মধ্যে কোনো তুলনা টানা যায় না। এমনকি কোনো ঘটনা, কিরকমভাবে, কত জোরালো উপস্থিতি নিয়ে, ঠিক কোন পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছিল, তাও স্পষ্ট বোঝা যায় না; কিন্তু পরবর্তীতে ইতিহাসের গতি-প্রকৃতির ধারা বিচার বিশ্লেষণ করে দুটি জিনিস স্পষ্ট উঠে আসে। এক, প্রথম প্রথম দেশভাগের পরপর এমনকি বর্ডার তৈরির সময়েও অধিকাংশ হিন্দু ও মুসলমান পরিবারের সদস্যরা ভাবতেন যে, ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের সময়ের মতোই ১৯৪৭-এর বিভাজনও স্থায়ী হবে না। দাঙ্গার ঘটনাগুলো বন্ধ হলে, তারা যে যার ভিটা-মাটিতে ফিরে যাবেন। সেই আশায় বহু পরিবার অনেক বছর ফেলে আসা বাড়ির চাবি রেখে দিয়েছিলেন, দুই বঙ্গেই। দুই, এই দু’রকম দেশভাগের সবচেয়ে বড় যেটি প্রভাব ছিল, তা হলো, হিন্দু ও মুসলমান, এই উভয় সম্প্রদায়ের বাঙালির অস্তিত্ব সংকট। হৃদয়-ভঙ্গের অনুভূতি আসলে ছিল দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর ক্ষেত্রে একেবারেই একরকম। যেখানে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল তাদের বাঙালি সত্তা। তাতে কিন্তু চিড় ধরাতে পারেনি ব্রিটিশ শাসক, কোন সাম্প্রদায়িক স্বার্থান্বেষী দল। সেই আলাদা ভূমি তৈরি হয়ে থাকার যন্ত্রণার কাহন শোনা যায় এই একবিংশ শতকেও।  

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //