গণসংগ্রামে কামাল লোহানী

বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ সোমবার (২০ জুন)। ‘শিল্প-সংস্কৃতি-সংগ্রাম, আমাদের যুদ্ধ অবিরাম’ স্লোগানটি বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থার। আর এ স্লোগানটি রচনা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠসৈনিক, ভাষা সংগ্রামী, সাংবাদিক কামাল লোহানী। 

১৯৮৩ সালের গোড়ার দিকে দেশ যখন স্বৈরাচারী শাসনের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা, তখন কামাল লোহানীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা’ নামের একটি জাতীয়ভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলা হয়। স্লোগানটি রচনা ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করায় এর উদ্দেশ্য নিরুপিত হয়ে যায় অনেকখানি। সংস্কৃতি যে জীবন সংগ্রামের অঙ্গ, আর এর মধ্য দিয়ে যে সাংস্কৃতিক সংগ্রামের ভিত রচিত হয়, এ বিষয় উপলব্ধি করেই কামাল লোহানী প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যানধারণায় উদ্বুদ্ধ কিছু মানুষকে নিয়ে এ পথে পা বাড়ান।

আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী ও রোকেয়া খান লোহানীর পুত্র কামাল লোহানী। খাস কাউলিয়ার বিস্তৃত পিতৃপুরুষের বসতভিটে যমুনার গর্ভে বিলীন হলে নতুন বসত গড়ে ওঠে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার খান সনতলায়। এই সবুজ গ্রামে কামাল লোহানীর জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন। পারিবারিক নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে তার হাতেখড়ি। দেশভাগের পর পাবনায় চলে আসেন। ভর্তি হন পাবনা জিলা স্কুলে। ১৯৫২ সালে এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন; কিন্তু ছকবাঁধা পড়াশোনায় কখনই মন ছিল না কামাল লোহানীর বরং বাম রাজনৈতিক চেতনায় মুক্তির আলোয় মেতে উঠলেন। 

যে পথে তিনি পা বাড়িয়েছিলেন, তা খুব মসৃণ নয়, যথেষ্ট কণ্টকাকীর্ণ। আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ পথে চলতে হয়; কিন্তু কামাল লোহানী এ পথে পা দিয়েছিলেন কিশোর বয়সেই। সেই ১৯৫৩ সালে, তিনি তখন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ছাত্র, মুসলিম লীগের কাউন্সিলে যোগ দেবেন খুনি নূরুল আমীন। বাঙালির মুখের ভাষা বাংলাকে কেড়ে নিয়ে ঊর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ক্ষেত্রে যার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য, সেই নূরুল আমীনকে পাবনায় মুসলিম লীগের কাউন্সিলে আসতে না দেওয়া আন্দোলনে প্রথম সারিতে ছিলেন কামাল লোহানী। রুখেও দিয়েছিলেন। তবে পাকিস্তানি শাসকদের কোপানলে পড়ে গ্রেফতার হতে হয় তাকে। কিশোর বয়সে জীবনের প্রথম সেই কারাবাসকে আলিঙ্গন করেছিলেন সানন্দ্যে।

আপোষ করে চলা কামাল লোহানীর চরিত্রের মধ্যে ছিল না। যেখানেই কাজ করতে গিয়েছিলেন, কাজের ধরন, নিজের চিন্তা, ধ্যান-ধারণার অমিল হলেই প্রত্যাগমন করেছেন সেখান থেকে। মূলত তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতা দিয়ে। এই সাংবাদিকতা করতে গিয়ে তাকে ছাড়তে হয়েছে বহু পত্রিকা। ১৯৫৫ সালের গোড়ার দিকে ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকায় যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার কর্মজীবন; কিন্তু সেখানে বেশি দিন থাকতে পারেননি। ছেড়েছেন ‘পাকিস্তান’, ‘সংবাদ’ ও ‘দৈনিক আজাদ’র মতো নামিদামি পত্রিকা। পাকিস্তান আমলে ‘পয়গাম’ ও ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকা থেকেও ইস্তফা দিয়েছিলেন তিনি নির্দ্বিধায়। 

সাংবাদকর্মীদের স্বাধীনতা, তাদের স্বার্থ নিয়ে সংগ্রাম কামাল লোহানীর জীবনের ব্রত হয়ে ওঠে। তাই যখনই পত্রিকার মালিকপক্ষের সঙ্গে পত্রিকার কর্মীদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব হয়েছে তখনই পত্রিকা ছেড়ে কামাল লোহানী নেমে পড়েছেন রাজপথে। তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

১৯৬০ সালে চাচাতো বোন সৈয়দা দীপ্তি রানীকে বিয়ে করেন কামাল লোহানী। ২০০৭ সালের ২৪ নভেম্বরে তার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অনুপ্রেরণাদাত্রী স্ত্রী দীপ্তি লোহানীর প্রয়াণে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন তিনি। এ দম্পতির এক ছেলে ও দুই মেয়ে সাগর লোহানী, বন্যা লোহানী ও ঊর্মি লোহানী।

কামাল লোহানী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তবে রাজনীতি তার জীবনকে পরিচালিত করেছে। রাজনীতির কারণে তাকে বার বার কারাজীবন ভোগ করতে হয়েছে। সংস্কৃতির সাথে রাজনীতির যে যোগ, তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সম্পূর্ণটুকু। তাই সংস্কৃতির প্রতি তার নিবেদনে রাজনীতি উপেক্ষিত হয়নি। সাম্রাজ্যবাদী চক্রের কবল থেকে আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচাবার যে সংগ্রাম, সে সংগ্রামে পিছপা হননি কোনো দিন। 

গণশিল্পী সংস্থার নানা আয়োজন করতে গিয়ে আমরা অর্থ সংকটে পড়েছি প্রতিনিয়ত। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে টাকা জোগাড় করতে, গণ মানুষের কাছ থেকে দু-এক টাকা করে নিয়ে আমরা তহবিল গঠন করেছি; কিন্তু কোনো এনজিও বা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কাছ থেকে তিনি টাকা নিতে দেননি। বলেছেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই, তাদের কাছে সাহায্য চাওয়াটা অনৈতিক এবং এতে আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার যে সংগ্রাম তা তার কর্মজীবনেও প্রতিফলিত হয়েছে বার বার।

অত্যন্ত মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও সমাজ পরিবর্তন অর্থাৎ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সংগ্রামে শামিল হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ইতি টানতে হয়েছে কামাল লোহানীকে। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী যুক্তফ্রন্টের সরকারকে ভেঙে দিয়ে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করা হলে কামাল লোহানীকে রাজনীতি না লেখাপড়া-এমন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। বাম রাজনীতির মন্ত্রে উজ্জীবিত কামাল লোহানীকে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের চাপ উপেক্ষা করে পরিবার ছেড়ে মাত্র তেরো টাকা সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় চলে আসতে হয়। জীবনের সহজ-সরল পথকে পরিহার করে বন্ধুর পথে পা রাখা তাঁর চরিত্রের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। আমৃত্যু তিনি এ ধারায় চলেছিলেন। আদর্শ আর মতের অমিল হলে লোভনীয় সব কাজ বা পদ ছেড়ে দিতে কাল-বিলম্ব করেননি তিনি। মন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের পদ থেকে নয় মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন তিনি। 

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ওপর আসে সরকারি বাধা। এ বাধায় পাকিস্তানি শাসকদের মুখোশ আর একবার উন্মোচিত হয়। তারা বাংলা, বাঙালি ও তার অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য মানতে নারাজ। বাঙালির বাঙালিত্বকে ধ্বংস করার পাক সরকারের হীন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান যারা করেছিলেন, তাদের মধ্যে কামাল লোহানী অন্যতম। সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তখন রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী উদ্্যাপনের জন্য যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কামাল লোহানী।

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন যখন পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মানতে অস্বীকার করেন এবং তার সম্পর্কে অনেক ঘৃণ্য মন্তব্য করেন, তখন কামাল লোহানী ক্রান্তি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর নেতৃত্বে এক দুর্বার আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলেন। এ আন্দোলনের ফলে তখন সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিষদ গঠিত হয়, যার আহ্বায়ক ছিলেন ওয়াহিদুল হক এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন কামাল লোহানী। এ সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিষদের উদ্যোগে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। এ আয়োজনের শেষ দিনে গভর্নর মোমেন খানের গুণ্ডাবাহিনী অনুষ্ঠানের ওপর হামলা করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে স্ত্রী-সন্তানদের ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে কাল-বিলম্ব করেননি লড়াকু কামাল লোহানী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর যতদিন তিনি পূর্ব বাংলায় ছিলেন, সামরিক শাসক চক্রের নানা দুরভিসন্ধির বিরুদ্ধে তৎপর ছিলেন। এ সময় তিনি প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘স্বরাজ’ পত্রিকায় কয়েকটি অগ্নিগর্ভ প্রতিবেদন রচনা করেন। অবশেষে এপ্রিলের শেষে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সব সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠনকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংঘবদ্ধ করে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী গোষ্ঠী’ গঠনে তৎপর ছিলেন; কিন্তু অবস্থার অবনতিতে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা চলে যান। সেখান থেকে ট্রেনযোগে কলকাতা। ওই সময় সাংবাদিক বন্ধু মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী তাকে ‘জয় বাংলা’ পত্রিকায় নিয়ে যান। সেখানে কাজ করতে করতে আমিনুল হক বাদশার সঙ্গে দেখা হয়। তিনি তাকে নিয়ে যান বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডে। সেখানে তখন আয়োজন চলছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভ ট্রান্সমিটার উদ্বোধনের। বালীগঞ্জের এ বাড়িতে মন্ত্রীরা (অর্থাৎ প্রবাসী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মন্ত্রীরা) বাস করতেন। তারা বেতারের জন্য বাড়িটি ছেড়ে দিয়ে চলে যান। 

একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হওয়ার পরদিনই চট্টগ্রামে প্রথম চালু হয়েছিল ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের’ কার্যক্রম, চট্টগ্রাম বেতারে। এরপর কালুরঘাটের প্রক্ষেপণ কেন্দ্রে স্থানান্তরিত বেতার কেন্দ্র আক্রান্ত হলে সেখানকার ট্রান্সমিটারটি সীমান্ত পার করে নিয়ে যান অসীম সাহসী কয়েকজন বেতারকর্মী। এরপর ভারত সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ৫০ কিলোওয়াট ক্ষমতার একটি ট্রান্সমিটার নিয়ে একাত্তরের ২৫ মে কলকাতার সেই বালিগঞ্জ রোডে কার্যক্রম শুরু হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের; সে সময় আগের নাম থেকে বাদ পড়ে ‘বিপ্লবী’ শব্দটি। সীমান্তের এমন একটি গোপন স্থানে ট্রান্সমিটারটি বসানো হয়েছিল, যা বেতারের কর্মীরাও জানতেন না।

স্বাধীন বাংলা বেতার প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মী, সাংবাদিক, শিল্পী, সুরকার, নাট্যকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী, লেখকসহ অনেকের সঙ্গে সেখানে যোগ দেন কামাল লোহানী। সীমিত জনবল আর সামর্থ্যরে মধ্যে একাত্তরে যুদ্ধের দিনগুলোতে টানা সম্প্রচার চালু রেখেছিলেন স্বাধীন বেতারের শব্দসৈনিকেরা। উত্তাল সেই দিনগুলোতে তাদের কারো কণ্ঠ, কারো কলমই হয়ে উঠেছিল অস্ত্র। কেউবা ছিলেন নেপথ্যের যোদ্ধা। 

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বার্তা বিভাগের প্রধানই শুধু নন, এ বেতার কেন্দ্রকে সুসংগঠিত করতে কামাল লোহানী নিরলস পরিশ্রম করেছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক কামাল লোহানীর ভাষায়, তাদের কার্যক্রম ছিলো ‘জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠের’ মতো। সংবাদপাঠ, কথিকাপাঠ, কবিতা আবৃত্তি, স্ক্রিপট লেখা, অনুষ্ঠান পরিকল্পনা সবখানেই তিনি ছিলেন সরব। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের শেষে ঐতিহাসিক শুভক্ষণে বিজয়ের খবরের বার্তাটি রচনা ও পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল তার।

স্বাধীন বাংলা বেতারের দুটি ট্রানজিস্টার ঘুরিয়ে বিভিন্ন রেডিও মনিটর করে নানা দিকের খবর সংগ্রহ করা হতো। আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তের আগে একটি ট্রানজিস্টারে ধরা পড়ে মিত্রবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান একে নিয়াজির কথোপকথন।

১৬ ডিসেম্বর বিকেলে আত্মসমর্পণ হবে, সেটি মাথায় রেখেই দুই থেকে আড়াই মিনিটের সংবাদ বুলেটিন তৈরির কাজ চলে, যেটি লিখেছিলেন বার্তা বিভাগের প্রধান কামাল লোহানী। সংবাদ পাঠক হিসেবে ওই দিনের ডিউটি রোস্টারে নাম ছিল বাবুল আখতারের; কিন্তু কঠিন কঠিন শব্দ ও সময়কে ধারণ করে সেই সংবাদ পড়তে পারছিলেন না তিনি। ফলে বিজয় ও আত্মসমর্পণের সেই সংবাদ কামাল লোহানীকেই পড়তে হয়েছিল।

দেশ স্বাধীন হলেও প্রশাসনে পরিবর্তন আসেনি বলে বেতারের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ১৯৭৩ সালে সাংবাদিকতায় ফিরে এসে যোগ দেন ‘দৈনিক জনপদ’-এ। ১৯৭৪ সালে ‘বঙ্গবার্তা’, এরপর ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ পত্রিকায় কাজ করেন।

সরকার ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সংবাদপত্র অ্যানালমেন্ট অধ্যাদেশ জারি করে মাত্র চারটি পত্রিকা ছাড়া সব পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। নির্মল সেন ও কামাল লোহানী বাকশালে যোগদানে অস্বীকৃতি জানান। 

ফলে চাকরিহীন অবস্থায় ১৯৭৭ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’র নির্বাহী সম্পাদক হন। ১৯৭৮ সালে তাকে সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধ হলে ‘দৈনিক বার্তা’ ছেড়ে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে (পিআইবি) যোগ দেন। প্রকাশনা পরিচালক ও ‘ডেপথনিউজ বাংলাদেশ’ এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার কয়েক মাস পরেই তিনি সেখানকার সহযোগী সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। দীর্ঘ ৩১ বছর বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থার হাল ধরে ছিলেন কামাল লোহানী। 

সাংস্কৃতিক-আন্দোলনকে বেগবান করতে, বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন তথা বাঙালির ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ গড়ে তোলার কাজ তিনি করে গেছেন আমৃত্যু। রাজধানীতে থেকেও দেশের নানা প্রান্তরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সোচ্চার ছিলেন। সংস্কৃতির ওপর স্বার্থান্বেষীদের আগ্রাসনকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে তাকে দিতে হয়েছে নেতৃত্ব। বাংলাদেশের যেখানেই পা রেখেছেন সেখানে বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থান সংরক্ষণ করার তাগিদ দিয়েছেন তার অনুসারীদের। নেত্রকোনায় হাজং-বিদ্রোহের নেত্রী রাসমনি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোক্তাদের প্রধান ছিলেন তিনি। মাস্টার দা সূর্যসেনের স্মৃতি বহনকারী বাস্তুভিটা যখন ভূমিদস্যুরা দখলের পাঁয়তারা করছিল, তখন সবার আগে প্রতিবাদ করেছিলেন কামাল লোহানী। নাচোল-বিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার বাগুটিয়া গ্রামের পৈতৃক ভিটা দখলমুক্ত করে সেখানে জাদুঘর নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছিলেন তার সংগঠন বাংলাদেশ গণশিল্পী সংস্থা ঝিনাইদহ শাখাকে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় কবি সুকান্তের পৈতৃক বাড়ি সংরক্ষণের জন্য তিনি বহুবার তার বক্তৃতা ও লিখনীতে তুলে ধরেছেন।

বাঙালি সংস্কৃতি লালন ও প্রসারের জন্য ষাটের দশক থেকে ঐতিহ্যবাহী ছায়ানট সাংস্কৃতিক সংগঠনটি অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছে। ১৯৬২ সাল থেকে সাড়ে চার বছর এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন কামাল লোহানী; কিন্তু একটি বিশেষ রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার কারণে তাকে পুরোপুরি বাম ধারায় পরিচালিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’ গঠন করতে হয়। ১৯৬৭ সালের ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে এ সংগঠনটির উদ্বোধন হয়। এতে গণসংগীতবিষয়ক অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘ধানের গুচ্ছে রক্ত জমেছে’। আর নাটকের শিরোনাম ছিল ‘আলোর পথ যাত্রী’, যাতে কামাল লোহানী নিজে অভিনয় করেছিলেন। ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেতে ও খামারে’ শিরোনামে নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হয়। এখানে উল্লেখ করার মতো ‘ক্রান্তি, ছায়ানট, গণশিল্পী ও উদীচী’তে তার নেতৃত্বে যত অনুষ্ঠান হয়েছে সবখানেই অনুষ্ঠানের ধরন ও মেজাজ ছিল লড়াই ও সংগ্রামের।

৯০ দশকে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন সারাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা বসে থাকেনি। ঢাকায় প্রায় সকল সাংস্কৃতিক সংগঠন, কর্মী ও নেতারা মিলে গঠন করলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। ফয়েজ আহমদের নেতৃত্বে গঠিত এই জোটে কামাল লোহানীর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে বাংলাদেশে যুদ্ধ অপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে সেখানেও কামাল লোহানী ছিলেন সামনের সারিতে। ন্যায়ের পথে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে কোনো বাধাই তার কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কখনো।

বাঙালি সংস্কৃতির মূর্ত প্রতীক হিসেবে নিজেকে সমাজের বুকে দাঁড় করিয়েছিলেন কামাল লোহানী। চেহারা, বাচনভঙ্গিতে অতি আধুনিকতার ছাপ, চিন্তা-মননে ও পোশাক-আশাকে, এমনকি চালচলনে খাঁটি বাঙালি। একেবারে কিশোর বয়স থেকে সেই যে পাঞ্জাবি-পাজামা পরেছেন আর কোনোদিন ছাড়েননি। শত বাধা আসলেও কেউ তাকে পাজামা-পাঞ্জাবি ছেড়ে ইউরোপীয় পোশাক পরাতে পারেনি। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক থাকাকালে একবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ইউরোপ সফরের ডাক আসে। সচিব মহোদয় কামাল লোহানীকে ভ্রমণের পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে পোশাকের প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন এবং পাঞ্জাবি-পাজামার বদলে স্যুট-কোর্ট কেনার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সচিবের এ পরামর্শ তিনি গ্রহণ করেননি। পাঞ্জাবি-পাজামা ছেড়ে স্যুট-কোর্ট পরতে পারবেন না বলে তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন। যা হবার তাই হলো। রাষ্ট্রপতির ইউরোপ সফর তাকে ছাড়াই সম্পন্ন হলো। যেখানে রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হওয়ার জন্য মানুষ কত তদবির-তাগাদায় মেতে ওঠে, অথচ কামাল লোহানী তার পোশাকের ঐতিহ্য ছাড়তে পারেননি, ছেড়েছেন রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব।

সাম্প্রতিক দেশকালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কেক কাটছেন কামাল লোহানী

২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাস। ঝিনাইদহ জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজন করা হয়েছে নাট্য উৎসবের। দেশে তখন নির্দলীয় সরকার। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ বেশ শৃঙ্খলিত। কামাল লোহানী পাঁচ দিনব্যাপী নাট্য উৎসবের প্রধান অতিথি। তিনি তার বক্তৃতায় বললেন, ‘আমরা যারা সাংস্কৃতিক-আন্দোলন করি, তারা তো মানুষেরই অংশ। আমরা জানি মানুষ মাত্রই রাজনৈতিক জীব। আর আমরা সেই মানুষেরই সংস্কৃতি করতে ইচ্ছুক; কিন্তু আমাদের সেই ইচ্ছা বর্তমান সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কোনো কর্মকাণ্ড তাদের নির্দেশ বা অনুমতি ছাড়া করা যাচ্ছে না। আসুন এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলি। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর স্বাধীনতা খর্ব করা চলবে না, আমাদের নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে দিন।’ এসব কথায় তার দৃঢ়তা, সাহস এবং সেই পুরনো বিদ্রোহী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। ২০০৮ সালে দুই বছরের জন্য আবার শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

যিনি সামাজিকভাবে যথেষ্ট পরিচিত একজন মানুষ, যার উচ্চ মহলে ছিল ব্যাপক সুনাম, বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানীসহ বহু জাতীয় নেতার সঙ্গে যার রয়েছে জেল খাটার অভিজ্ঞতা, দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু যাকে কাছে ডেকে রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে চেয়েছেন, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলার মাটিতে স্বাধীন বাতাসে, স্বাধীন মানুষ যার কণ্ঠে প্রথম বেতারে দেশের পূর্ণ বিজয়ের খবর শুনেছিলেন, সেই কামাল লোহানী নিজে ব্যক্তিগত জীবনে সুবিধা নেওয়ার জন্য কারও কাছে ধর্না দেননি। নিজের কিংবা পরিবারের জন্য তিনি কখনো কারও কাছে তদবির করেছেন বলে শোনা যায়নি। আর্থিকভাবে অনেক সময় নানা সংকটের মধ্যে থেকেও কোনো দিন কোনো রাষ্ট্রীয় বা অন্য কারও কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নেননি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নেননি কোনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা। নির্মোহ এ মানুষটি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার এ আদর্শ ও সংগ্রামে ছিলেন অটল। 

শুদ্ধভাবে গণসংগীত চর্চার ব্যাপারে কামাল লোহানীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল পরিচ্ছন্ন। গণসংগীতের ভাষা, এর গায়কী নিয়ে বহুবার আমাদের সতর্ক করেছেন। আমরা যারা গান করতাম বা করাতাম তাদের বার বার নির্দেশনা দিতেন- কোন গণসংগীত ভুল সুরে বা ভুল উচ্চারণে গাওয়া শুনলে তিনি কষ্ট পেতেন, মাঝে মধ্যে ক্ষেপেও যেতেন। গণসংগীত নিয়ে তার অনেক ভাবনা ছিল, সে ভাবনা নিয়ে কিছুটা কাজও করেছেন। ‘লড়াইয়ের গান’ নামে একটি গণসংগীতের বই সম্পাদনা করেছেন তিনি। সেখানে অনেক হারিয়ে যাওয়া গণসংগীত স্থান পেয়েছে। তার ইচ্ছে ছিল গণশিল্পী সংস্থার শিল্পীদের দিয়ে গণসংগীতের অ্যালবাম বের করা, যাতে এগুলো হারিয়ে না যায়।

তিনি গণসংগীত আয়োজনে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। ক্রান্তি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর ব্যানারে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে প্রথম গণসংগীতের আয়োজন করেন। গণশিল্পী সংস্থার ব্যানারে ঢাকায় এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে ঝিনাইদহ, খুলনা, পাবনা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণসংগীত উৎসবের আয়োজন হয়েছে সরাসরি তার নির্দেশনায়।

সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন তিনি প্রতিনিয়ত। আশাবাদী মানুষ হিসেবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের সে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। মৃত্যুর বহু আগে তিনি তার দেহ দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন চিকিৎসা শাস্ত্রের সহযোগিতার জন্য। যদিও কোভিড-১৯ আক্রান্তে মৃত্যুবরণ করার কারণে কামাল লোহানীর সেই শেষ ইচ্ছা পূরণ হয়নি। দৃশ্যত চলে গেলেও তিনি আরও বেশি করে রয়ে গেছেন জনমানুষের হৃদয়ে, বাংলার জল হাওয়ায় উত্থানে-পতনে আরও প্রবলভাবে।

কামাল লোহানীর লেখা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘আমরা হারবো না’, ‘সত্যি কথা বলতে কী’, ‘যেন ভুলে না যাই’, ‘মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার’,  ‘রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’, ‘এ দেশ আমার গর্ব’, ‘আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম’, ‘লড়াইয়ের গান’, ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার’,  ‘দ্রোহে প্রেমে কবিতার মত’ এবং কবিতার বই ‘শব্দের বিদ্রোহ’।

কামাল লোহানী ২০১৫ সালে সাংবাদিকতায় একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়াও তিনি কলকাতা পুরসভার দ্বিশতবর্ষ সম্মাননা, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সম্মাননা, রাজশাহী লেখক সংঘ সম্মাননা,  ক্রান্তি স্মারক, ঋষিজ সম্মাননা ও স্মারক, জাহানারা ইমাম পদকসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

তার আদর্শ অনুসরণ করে হয়তো একদিন বৈষম্যহীন সমাজও গড়ে উঠবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে ভোগ করার অধিকার পাবে। সেই সুদিনের প্রতীক্ষায় আমরা।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //