এক হৃদয়ের অভিন্ন ফুল মুজিব ও নজরুল

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেয়ে বয়সে একুশ বছরের ছোট। কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দ। আর জাতির পিতা জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ। জাতির পিতা যখন জন্মগ্রহণ করেন, কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ কবিতাগুণে কবিখ্যাতি লাভ করেছেন। কবির জীবন ছিল বিচিত্র। নানা ঘাত-প্রতিঘাতে আকীর্ণ। সৈনিকজীবনও উপভোগ করেছেন; কিন্তু নজরুল মানস ছিল স্বাধীনচেতা। ঔপনিবেশিক ভারতবাসীর প্রকৃত মুক্তিকাঙ্খায় উন্মুখ। অসি ছেড়ে তিনি মসি দিয়ে রচনা করে যাচ্ছিলেন একের পর এক রক্ত গরম করা কবিতা, গান। 

জাতির পিতাও হৃদয়ে পোষণ করতেন বাঙালির মুক্তি; স্বাধীনতা লাভ। উভয়ই চেয়েছেন শোষণ ও নিষ্পেষণমুক্ত সমাজব্যবস্থাপনা, যেখানে বাঙালি তথা সর্বস্তরের বাংলাদেশি প্রকৃত মুক্তির স্বাদ ভোগ করবেন। উভয়ই ছিলেন দুঃসহ জীবনের মুক্তির কাণ্ডারি। একজন দেখিয়েছিলেন মুক্তির স্বপ্ন এবং আরেকজন সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। চেতনা এবং আদর্শিক দিক থেকে উভয়ই ছিলেন একই পবিত্র হৃদয়ের অভিন্ন ফুল।

বঙ্গবন্ধু এবং কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম সাক্ষাৎ সম্পর্কে তেমন নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও ১৯৪১ সালে ফরিদপুরে নজরুলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতের তথ্য পাওয়া যায় তারই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন— ‘একটা ঘটনার দিন-তারিখ আমার মনে নাই, ১৯৪১ সালের মধ্যেই হবে, ফরিদপুর ছাত্রলীগের জেলা কনফারেন্স, শিক্ষাবিদদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারা হলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, ইব্রাহিম খাঁ সাহেব। সে সভা আমাদের করতে দিল না, ১৪৪ ধারা জারি করল। কনফারেন্স করলাম হুমায়ুন কবির সাহেবের বাড়িতে। কাজী নজরুল ইসলাম সাহেব গান শোনালেন। আমরা বললাম এই কনফারেন্সে রাজনীতি আলোচনা হবে না। শিক্ষা ও ছাত্রদের কর্তব্য সম্পর্কে বক্তৃতা হবে।’ 

নজরুলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আগ্রহ জাগানোর মূল ভূমিকাটি পালন করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান। তিনি বাড়িতে দৈনিক আনন্দবাজার, বসুমতী, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাত রাখতেন। নজরুল মাসিক ‘সওগাত’-এ ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে এবং পরে মাসিক ‘মোহাম্মদী’তে নিয়মিতভাবে লিখতেন। এসব থেকে সহজেই অনুমিত হয়, নজরুলের চেতনাবোধ এবং আদর্শিক অবস্থান সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শৈশবেই জ্ঞাত হন। জাতির পিতার শিক্ষাজীবনে নজরুল ১৯৩৬ ও ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর সফর করেন এবং তিনি গানে, কবিতায়, বক্তৃতায়, হাস্যরসে, আড্ডায় সবাইকে মাতিয়ে যান। কাজী নজরুল ইসলাম কবি হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করলেও ব্যক্তিজীবনে অবিভক্ত বাংলার রাজনীতির সঙ্গেও প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন। অবিভক্ত বাংলার কংগ্রেসের বিভিন্ন অধিবেশনেও অংশগ্রহণ করেছেন। প্রত্যক্ষভাবে তিনি ১৯২৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের প্রাদেশিক রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করেন। তিনি কৃষক-শ্রমিকশ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন। শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দল গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। অবিভক্ত বাংলার কংগ্রেসের বিভিন্ন অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করেন। জাতির পিতা তার শৈশবে এসব তথ্য নিশ্চয় পেয়েছিলেন তার গৃহশিক্ষকের কাছে। দেশের প্রতি মমত্ববোধ, জাতীয়তাবোধ, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং রবীন্দ ও নজরুল সম্পর্কে ব্যাপক আগ্রহী করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন গৃহশিক্ষক হামিদ মাস্টারই। কারণ তখন তিনি নিজেও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

নজরুলের কবিতার প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল অসম্ভব টান। তিনি তার অসংখ্য কবিতা মুখস্থ বলতে পারতেন। প্রিয় ছিল নজরুলের গান। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠ থেকে জানা যায়, নজরুলের অনেক কবিতাই মুখস্থ ছিল তার। একবার (সম্ভবত ১৯৫৩ সাল) হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে করাচি যাওয়ার পথে কয়েক পাকিস্তানি আইনজীবী তার কাছে নজরুলের কবিতা শুনতে চান। ওই স্মৃতির বর্ণনা দিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমি তাদের ‘কে বলে তোমায় ডাকাত বন্ধু’, ‘নারী’, ‘সাম্য’- আরও কয়েকটা কবিতার কিছু কিছু অংশ শুনালাম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবিতাও দু-একটার কয়েক লাইন শুনালাম। শহীদ সাহেব তাদের ইংরেজি করে বুঝিয়ে দিলেন।” নজরুলের ‘নমঃ নমঃ নমঃ বাংলাদেশ মম’ গানটি ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রিয় গানগুলোর মধ্যে একটি। নজরুলের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং উভয়ের চেতনা ও আদর্শিক দিক অভিন্ন হওয়ায় কবির প্রতি গভীর মমত্ববোধ তৈরি হয়েছিল জাতির পিতার। ফলে ১৯৫৪ সালে বিশেষ কাজে কলকাতায় গেলে ছুটে গিয়েছিলেন কবির বাড়ি। এমনকি নজরুলের গান ও কবিতায় সামান্য হেরফের করে ইসলামি শব্দ প্রয়োগ করে তাকে ‘খাঁটি মুসলমান’ বানানোরও বিরোধিতা করেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন দীর্ঘ নয় মাসে মুক্তিসেনানীদের উজ্জিবিত রাখতে স্বাধীন বেতার কেন্দ্র থেকে বাজানো হতো আগুনঝরানো নজরুলের গান।

বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের শেষাংশে যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহার করেন, তা আক্ষরিক অর্থে নজরুলই প্রথম ব্যবহার করেন তার ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায়। আগস্ট ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘ভাঙার গান’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে এ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়। গ্রন্থ প্রকাশের কয়েক মাস পর ১১ নভেম্বর সেটি সরকার বাজেয়াপ্ত করে। অন্যদিকে ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার যে ডাক দেন, তার কয়েকদিন পর ২৬ মার্চ তাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গ্রেফতার করে। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাংলার জয়’ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জয় বাংলা’ যে এক এবং অভিন্ন এ সম্পর্কে নজরুলগবেষক মুহম্মদ নূরুল হুদা তার সম্পাদিত গ্রন্থ ‘বিদ্রোহী কবি ও বঙ্গবন্ধু’তে যথার্থই বলেছেন- ‘আসলে বাঙালিত্বের সংজ্ঞায়নের প্রশ্নে নজরুল ও বঙ্গবন্ধু দুটি সম্পূরক সত্তা। একজন পূর্বসূরি, অন্যজন উত্তরসূরি।’ 

নজরুলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আত্মিক সম্পর্কের কারণেই দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে স্বাধীন বাংলার মাটিতে পা রাখেন কবি। চিকিৎসার ব্যয়ভার, মেডিক্যাল টিম গঠন থেকে নাগরিকত্ব প্রদানের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদা প্রদান- সবই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সম্পন্ন হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকারই ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি নজরুলের ‘চল্ চল্ চল্ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ গানটি জাতীয় রণসংগীত হিসেবে ঘোষণা করে। 

মানুষকে ভালোবেসে, পৃথিবী ভালোবেসে, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ থেকে কাজী নজরুল ইসলাম আবেগ এবং ভাষার উন্মাদনায় যে পর্বত চূড়া স্পর্শ করেছিলেন, সেই নজরুলপাঠের মধ্যদিয়েই বঙ্গবন্ধুও এ দেশ, দেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবেসেছিলেন। দীর্ঘ সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার মানুষকে এনে দিয়েছেন প্রকৃত মুক্তি, স্বাধীনতা। উভয়ই অসীম কীর্তিগুণে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। 


সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //