ICT Division

মধ্যযুগে মুসলমানদের জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় অবদান

মধ্যযুগে মুসলিম সভ্যতা সারা বিশ্বের জ্ঞানের জগতে বিরাট অবদান রেখেছিল। ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের পর মুসলমানরা প্রথম বিভিন্ন দেশ জয়ের লক্ষ্যে অভিযান শুরু করে। পরে তারা বুদ্ধিবৃত্তিচর্চায় আত্মনিয়োগ করে। মানবেন্দ্রনাথ রায় মন্তব্য করেছেন, শতবর্ষব্যাপী তারা একান্ত বিনয়ের সঙ্গে প্রাচীন গ্রিকদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করেছে।

এভাবে নিজেদের সমৃদ্ধ করে জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় তারা স্বাধীন ও মৌলিক বক্তব্য উপস্থাপন করেছে। তিনি আরও বলেন, ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী আরবদের জ্ঞানচর্চা চলছিল পাঁচশ বছর ধরে আর এই সময়ই ছিল ইউরোপের ইতিহাসের অন্ধকারতম যুগ।

ইউরোপীয় ইতিহাসবিদদের মতে, মধ্যযুগের ইউরোপে বর্বরতা, পশ্চাৎপদতা, বুদ্ধিবৃত্তির স্থবিরতা এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে তা বর্ণনাতীত। ভিন্ন দিকে মধ্যযুগ সম্পর্কে স্ট্যানলি লেনপুল বলেন, বহু শতক ধরে মুসলিম মুর শাসিত স্পেনে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার বিরাট ধারা অব্যাহত দেখা গিয়েছিল এবং শিল্পকলা ও বিজ্ঞান সাধনার জন্য বিরাট কেন্দ্র ছিল।

মধ্যযুগের ইউরোপের অন্য কোনো দেশ তখন মুরদের জ্ঞানপিপাসার সমকক্ষ হতে পারেনি।  

হিট্টি লিখেছেন, মধ্যযুগে কর্ডোভা, সেভিল, মালাগা ও গ্রানাডার মতো সুবৃহৎ নগরীতে মুরদের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপের গির্জা, মঠকেন্দ্রিক শিক্ষাঙ্গন সৃষ্টির বহু পূর্বে আরব সাম্রাজ্যের সব বড় বড় শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তরুণ ও প্রতিভাবান মুসলিম শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করত এবং সেখানে সুকুমার বৃত্তি ও জ্ঞানার্জনের প্রকৃত পরিবেশ ছিল।

মুসলিম শাসিত স্পেনের শিক্ষানীতি ছিল উদার। কোনো ধরনের ধর্মান্ধতা শিক্ষার পরিবেশকে কলুষিত করেনি এবং শিক্ষার ক্ষেত্র সীমাবদ্ধ ছিল না। মুর শাসিত স্পেনের বিশ্ববিদ্যালয়ে খ্রিষ্টান ও ইহুদি শিক্ষকরা নির্বিঘ্নে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে অধ্যাপনা করতেন।

সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত ছিল। স্ট্যানলি লেনপুল বলেন, যখন ইংরেজি ভাষার প্রচলন হয়নি এবং যখন লেখাপড়ার মতো গুণাবলি কেবল যাজকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তখনই মুরদের অভূতপূর্ব সভ্যতার কথা জানা যায়। যখন সমগ্র ইউরোপ অজ্ঞতা ও অসভ্য আচার-ব্যবহার দ্বারা নিমগ্ন, বিধর্মী মুরেরা তখন তাদের প্রতিভার দ্বারা নিখিল বিশ্বকে আলোকিত করে।  

ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহাম্মদের (স.) মৃত্যুর পর আবুবকর (রা.) খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হয়ে মদিনায় ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজধানী স্থাপন করেন। ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য অতঃপর পারস্য ও সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং তা জয় করেন।

খলিফা উমরের (রা.) শাসনকালে ইরাক, পারস্য, সিরিয়া, মিশর, ফিলিস্তিন প্রভৃতি এলাকা ইসলামী সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। খলিফা উসমান (রা.) ইসলামী সাম্রাজ্যকে আরও প্রসারিত করার লক্ষ্যে নিশাপুর, বলখ, তুর্কিস্তান প্রভৃতি অঞ্চলে বিজয় অভিযান সম্পন্ন করেন। মাতৃভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশে আরবরা ব্যবসায় ও যুদ্ধে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে।

মরুভূমিবাসীর সাহসিকতা ও যুদ্ধপ্রীতির কাহিনি ছিল প্রায় রূপকথার মতো। সুতরাং আরব মুসলমানরা যে নিজেদের যোদ্ধা বলে দাবি করে তা ইসলামী বিশ্বাস থেকে পাওয়া নয়। ইসলামের সামরিক বিজয় যতটা না আরবীয় নবীর ধর্মীয় শিক্ষার ফল, তারচেয়ে অনেক বেশি যে দেশে এর জন্ম সেই দেশের সামাজিক পরিবেশের ফলাফল।

নবীর আবির্ভাবের আগে আরবরা যত যুদ্ধ করেছে তা ছিল পরস্পর রক্তক্ষয়ী হিংস্রতা ও নিষ্ঠুরতায় পূর্ণ। ইসলামের নবীর আহ্বানে সেই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। বহুকাল যুদ্ধের নামে যে গৌরব তারা বোধ করেছে এবং নিজেদের মধ্যে যে ভয়াবহ ও কঠিন যুদ্ধ তারা করেছে, অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই সময় তার পরিসমাপ্তি দাবি করেছিল। 

মূলত আরব ব্যবসায়ীদের স্বার্থে প্রথম খলিফা যে অর্থনৈতিক অনুশাসন জারি করলেন, তাতেই সমাজের প্রাচীন ধারায় এলো আমূল পরিবর্তন। মানবেন্দ্রনাথ রায় লিখেছেন, ইসলামকে কেবল সামরিক শক্তি হিসেবে দেখলে তা হবে ইতিহাসের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় অন্যায়। মুহাম্মদ (স.) শুধু আরব যোদ্ধাদেরই নন, তিনি আরব বণিকদেরও নবী ছিলেন।

মরুভূমির গোত্রভিত্তিক বিবদমান সমাজে ইসলামের নবী যে ঐক্যের আহ্বান করেছিলেন, আরব বণিকদের জন্য তা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই ব্যবসার উন্নতি বা সমৃদ্ধি সহজে ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে গোত্রভিত্তিক বিবদমান সমাজে সবার স্বার্থে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা ছিল অপরিহার্য।

নবী তাই করেছিলেন। তিনি গোত্রভিত্তিক যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য বহু দেবতার জায়গায় একেশ্বরবাদের ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। সেজন্য প্রথমেই বণিক সমাজের সমর্থন পেলেন তাঁর একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠায়, যা তাঁকে দ্রুত সাফল্য এনে দেয়। ইসলামী রাষ্ট্রের বহু নীতি নির্ধারিত হতো আরব ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যের গতি ও স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে।

জওহরলাল নেহরু লিখেছেন, ইসলাম ধর্র্মের বিস্তার এবং আরবজাতির ক্ষমতালাভের কথা বলার আগে সে সময়ের চারদিকের অবস্থাটা পর্যবেক্ষণ করা যাক। স্বল্প আগেই রোম নগরীর পতন হয়েছে। গ্রিক-রোমান সভ্যতার চিহ্নমাত্র নেই। একদিকে প্রাচীন সভ্যতা সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে, নতুন সভ্যতারও বিকাশ হয়নি।

সুতরাং ইউরোপে তখন অন্ধকারের যুগ। ইউরোপের পূর্ব প্রান্তে অবশ্য পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য তখনো টিকে ছিল। রাজধানী কনস্টানটিনোপল তখন খুব সমৃদ্ধিশালী, ইউরোপের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নগর। জাঁকজমকের সেখানে অন্ত ছিল না। কিন্তু ছিল না জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসার। ইউরোপের যখন এইরকম অবস্থা তখন ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়।

মদিনায় পালিয়ে যাবার সাত বছরের মধ্যে বিজয়ীর বেশে মক্কায় ফিরে এলেন মুহাম্মদ। নতুন শক্তি সঞ্চয় করলেন মরুজাতির মধ্যে। যখন মুসলমান আরবরা দেশ জয়ে বের হলেন, অনেক সময় বিনাযুদ্ধেই জয়লাভ করেছেন তারা। পয়গম্বরের মৃত্যুর ২৫ বছরের মধ্যে আরবরা পারস্য, সিরিয়া, মিশর, আরমেনিয়া ও মধ্য এশিয়া আর আফ্রিকার কতকাংশ জয় করে নেয়।

মিশর অতি সহজেই পরাজিত হলো আরবদের কাছে। কারণ রোমান সাম্রাজ্যের শোষণ এবং বিভিন্ন খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়গুলোর বিরোধের ফলে মিশর একেবারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। ফলে জনগণ নতুন কারো শাসনের জন্য অপেক্ষা করছিল।  

কিছুদিন আগেও যে আরবরা ছিল যাযাবর, জনগণের বড় অংশটাই ছিল দরিদ্র আর বিশ্ব রাজনীতিতে ভূখণ্ডটি ছিল অনালোচিত, স্বল্প সময়ে মধ্যযুগের বিশ্বে হয়ে দাঁড়াল বিরাট সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। মুসলমানদের পরপর এইসব বিজয় সে যুগের মুসলমান আর অমুসলমান পণ্ডিতদের চমৎকৃত করেছিল।

মুসলমানদের সেই সভ্যতার সঙ্গে সমসাময়িক ইউরোপীয় সভ্যতার তুলনা করতে গেলে আশ্চর্য হতে হয়। সবচেয়ে বেশি লক্ষ করার বিষয়টি হলো, আরব মুসলমানরা শুধু বিভিন্ন রাজ্য জয় করেই ক্ষান্ত হয়নি, প্রত্যেক অঞ্চলের সংস্কৃতি আর জ্ঞান-বিজ্ঞানকে পরম উদারতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিল।

সাহিত্যিক-প্রবন্ধকার গোপাল হালদার সে সম্পর্কে লিখেছেন, যা লক্ষণীয় তা এই যে, ইসলামের বাস্তব ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ, আরব-অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমেই বদলে যেতে লাগল, তখনকার নতুন দীক্ষিত মুসলিম-সমাজেরও সেই পরিবর্তন মেনে নিতে হলো। মরুভূমির বিজেতা আরবেরা শুধু ইহুদি-খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নয়, নানা জাতির সংস্পর্শে এলো।

গ্রিক-রোমক সভ্যতার সমৃদ্ধি ও সুলভ্য পৌর জীবন-যাত্রার সৌন্দর্য দেখতে পেল, নতুন ধরনের শহুরে জীবনযাত্রার খোঁজ পেল। এসব শহর ও তাদের জীবনযাত্রার মারফত জানতে পারল ইরানি ও ব্যাবলনীয় সভ্যতার দান সম্পর্কে। বিজয়ী হিসেবে পরে ভারতবর্ষের শিল্প ও বিজ্ঞানের সঙ্গে পরিচিত হলো।

ইসলাম সম্পর্কে এই দিকটা মাথায় রাখা দরকার। যাযাবর মরুজীবন আরবদের শিখিয়েছিল কঠোর পরিশ্রমী হতে। যাযাবর জীবন শিখিয়েছিল পরিশ্রমই স্বাধীনতার মূলকথা। প্রথম দস্যুবৃত্তি মরুভূমির বেদুইন সমাজে প্রভাব বিস্তার করলেও ধীরে ধীরে ব্যবসাই হয়ে ওঠে স্বাধীন মানুষের জীবিকা অর্জনের লাভজনক ও আকর্ষণীয় পেশা।

ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল শ্রমের জয়গান করে, বাণিজ্য বিকাশের পথকে সুগম করে দিয়েছিল তা। সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, পারস্য ও ওক্সারের তীরবর্তী অন্যান্য এলাকা জয় করার পর আরবরা দখল করে নেয় চীনের ব্যবসা-বাণিজ্য। সেই সঙ্গে তাদের নিজেদের রাজ্য আফ্রিকা ও স্পেনের মধ্য দিয়ে পশ্চিম ইউরোপের বাজারের দিকে দৃষ্টি ফেরালো।

অষ্টম শতক থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত একদিকে ভারতবর্ষ ও চীনের সঙ্গে এবং অন্যদিকে ইউরোপের সঙ্গে প্রায় সব বাণিজ্যই করেছে আরবরা। হাজার হাজার বাণিজ্য যাত্রীদল মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে চীন ও ভারতবর্ষের সুদূর প্রান্তসীমা থেকে স্পেন ও মরক্কো পর্যন্ত পথ হেঁটেছে।

রাজ্য জয়, ব্যবসা-বাণিজ্যকে ঘিরে আরব সাম্রাজ্যের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার পথ এমনভাবে খুলে গেল, তা আরব জাতির মনে উদারতা, দুনিয়ার মানুষকে আপন করে দেখার সুবুদ্ধি আর সব কিছুকে বিচার-বিবেচনা করে দেখার চোখ সৃষ্টি করে দিয়েছিল। ইসলাম যেমন প্রাচীন সভ্যতার জীর্ণদশাকে ধ্বংস করে সেখানে নিজের অবস্থান করে নিয়েছিল, তেমনি কালক্রমে আরও উন্নততর সমাজব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিল।  

জওহরলাল নেহরু লিখেছেন, কিন্তু আশ্চর্য যে এই মরুজাতি শিগগিরই তাদের প্রথম দিকের সরল জীবনযাপন বাদ দিয়ে বিলাসবৈভবে অভ্যস্ত হয়ে উঠল। নগরে নগরে গড়ে তোলা হলো বিরাট সব অট্টালিকা। প্রথম বিজয়ী তাঁবুর জীবন ছেড়ে আরামে গা ভাসাতে থাকল। আবুবকর আর উমর এই দুই মহান খলিফার শাসনের পরেই ইসলাম ধর্মে উপদ্রব সৃষ্টি হতে থাকে।

মুসলমানরা সবকিছুর পরেও ব্যবসার নীতি বা স্বার্থে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিল। মানবেন্দ্রনাথ রায় লিখেছেন, বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনা করে বিজয়ী মুসলমানরা পবিত্র মক্কা নগরীতে সব ধর্মের মানুষকে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল। মক্কায় কারোই তীর্থযাত্রার অধিকার খর্ব তো করলই না বরং উৎসাহিত করল।

কট্টর গিবন পর্যন্ত এই উপসংহারে এসেছিলেন যে, মুহাম্মদ বিনা দ্বিধায় খ্রিষ্টান প্রজাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দিয়েছিলেন, নিরাপত্তা দিয়েছিলেন তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের, ধনসম্পদের। আর দিয়েছিলেন তাদের নিজ নিজ উপাসনা করার অধিকার। এই মহৎ সহনশীলতার নীতি বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই পালন করা হতো।  

দামাস্কাস 

দামাস্কাস ছিল মুসলমান শাসনের রাজধানী। খুব সুন্দর শহর ছিল এই দামাস্কাস। জওহরলাল নেহরু লিখেছেন, কত গির্জা, প্রাসাদোপম অট্টালিকা আর ফোয়ারা ছিল। দামাস্কাস শহরের জল সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল চমৎকার। এই সময়ে আরবরা নতুন ধরনের এক স্থাপত্যশিল্প গড়ে তুলেছিল।

সাদাসিধা অথচ সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক স্তম্ভ, তোরণ, মসজিদের চূড়া, গম্বুজ ইত্যাদিতে ওই শিল্পের বিকাশ হয়েছিল। ঘোড়দৌড়, শিকার, দাবাখেলা আরবদের খুব প্রিয় ছিল। গানবাজনার প্রতি তাদের একটা অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। আরবদেশে স্ত্রীলোকেরা পর্দানশীন ছিলেন না। অবরোধ প্রথা না থাকায় তারা প্রকাশ্যে চলাফেরা করতেন, গির্জা কিংবা সভাসমিতিতে যেতেন, এমনকি বক্তৃতাও দিতেন।

কিন্তু ক্রমে আরবরা পূর্ব রোম আর পারস্য এই দুটি প্রাচীন সাম্রাজ্যের কতকগুলো আচার ব্যবহার ও রীতিনীতি অনুকরণ করতে শুরু করল। কনস্টানটিনোপল আর পারস্যের প্রভাবেই আরবদের নারী-সমাজে অবরোধ প্রথার সৃষ্টি হয়। সেই সব স্থানের প্রভাবেই ক্রমে 

হারেম-ব্যবস্থা প্রচলিত হলো। সামাজিকভাবে স্ত্রী-পুরুষের দেখাসাক্ষাৎ বিরল হয়ে দাঁড়াল। ইসলামের প্রথম যুগের স্বাধীন নারীদের দেখা পাওয়া যাবে না এখানে। কিন্তু পাশাপাশি মুসলিম শাসনের নানা ইতিবাচক দিক দেখতে পাওয়া যায়।

মানবেন্দ্রনাথ রায় লিখেছেন, মুসলমানরা তাদের শাসনের প্রথম হাজার বছরে যে সহনশীলতা দেখিয়েছিল, কখনো তা খ্রিষ্টানরা দেখাতে পারেনি। মুসলমানরা সপ্তম শতকে জেরুজালেম দখল করেও খ্রিষ্টানদের জানমাল জীবন কর্মের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। কিন্তু চারশ ষাট বছর পর যখন আবার জেরুজালেম খ্রিষ্টীয় ধর্মযোদ্ধাদের হাতে দখলে চলে গেল, প্রাচ্যের খ্রিষ্টানরা সদাশয় আরব খলিফাদের শাসনের অবসানে অনুশোচনাই করেছিল।

কারণ মুসলমানদের সহনশীলতার পরিবর্তে খ্রিষ্টানরা জেরুজালেম দখলের পর সাধারণের সম্পত্তি লুট করল। তিনদিন ধরে অভাবনীয় হত্যাযজ্ঞের মধ্যে তারা গা ভাসিয়েছিল। বয়স কিংবা স্ত্রীলোক কোনো বিবেচনাই তাদের রাগ কমাতে পারেনি। সত্তর হাজার মুসলমানকে নির্বিচারে হত্যা এবং মন্দিরের মধ্যে নিরীহ ইহুদিদের পুড়িয়ে মারে।

এ প্রসঙ্গে ড্রেপার জানাচ্ছেন, মুসলমানদের সহিষ্ণুতার সঙ্গে ইউরোপীয় অসহিষ্ণুতার আশ্চর্যজনক পার্থক্য ছিল। মুসলমানদের দেখেও ইউরোপীয় জাতির মধ্যে সহিষ্ণুতার মানসিকতা কখনো তৈরি হতে দেখা যায়নি।  

মুসলমানদের আচরণের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল খ্রিষ্টানদের আচরণ। খ্রিষ্টান গির্জা শুরু থেকেই ছিল ভয়াবহ রক্ষণশীল, প্রথম থেকেই সব রকম জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার বিরুদ্ধে। যখন কনস্টানটাইন পূর্বের পৌত্তলিক ধর্ম বাতিল করে খ্রিষ্টধর্মকে রোমান সাম্রাজ্যের সরকারি ধর্মের স্বীকৃতি দেয়, তখন থেকেই জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্পকলা, চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য নির্মাণ, নাট্যাভিনয় সবকিছুর বিরুদ্ধে চড়াও হয়।

সম্পূর্ণভাবে এসবের চর্চা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কট্টরপন্থা আর অসার ধর্মানুরাগ এবং সাধুতার ভণ্ডামি খ্রিষ্টানদের উসকিয়ে দিয়েছিল প্রাচীনকালের জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অপবিত্র বলে অবজ্ঞা করতে। ফলে তারা প্রাচীন গ্রিস ও রোমের জ্ঞানবিজ্ঞানকে ধ্বংস করতে বা পিঠ দেখাতে সামান্য দ্বিধা করেনি। খ্রিষ্টান পুরোহিতদের এই মূর্খতার অহংকারের পরিণতিতে ইউরোপের জনগণ মধ্যযুগের অন্তহীন অতল অন্ধকারে তলিয়ে যায়।  

মুসলমানদের শাসনে ঘটেছিল বিপরীত ঘটনা। গোপাল হালদার লিখেছেন, মরুভূমির সংগ্রামী ইসলাম আর আগের মতো উগ্র রইল না, অনেকটাই পরমত সহিষ্ণু হয়ে উঠল। বিজিত বৈভব হাতে পেয়ে আরব রাষ্ট্র নতুন পথঘাট, প্রাসাদ প্রস্তুত করার দিকে মন দিলো। বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়ের ফলে নিজেদের নিয়ম-কানুন তখন সংশোধন করতে থাকে। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় ভারতের কাছ থেকেও বহু কিছু গ্রহণ করেছিল মুসলমানরা।

খলিফা মুয়াবিয়া উমাইয়া শাসনের গোড়াপত্তন করেন। মুয়াবিয়া ও তার পরবর্তী উমাইয়া বংশের রাজত্বকালে যুদ্ধবিগ্রহ, অরাজক অবস্থার পাশাপাশি বৌদ্ধিক বিকাশের ধারার সূচনা হয় যা পরবর্তীকালে বারো শতক পর্যন্ত আব্বাসী বা অন্যদের রাজত্বে প্রবহমান ছিল। খলিফার সাম্রাজ্যে পারসিক, সিরীয়, মিশরীয়, খ্রিষ্টান, ইহুদি, গ্রিক, আরামীদের প্রভাবে এক বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির যুগ শুরু হয়।

আল হিজাজের মক্কা ও মদিনা, আল-ইরাক, আল-বসরা, আল-কুফা ছিল উমাইয়া আমলের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। দামাস্কাস, হিমস নগরগুলো ছিল ফিনিসীয় বর্ণমালা, হিব্রুদের ধর্মতত্ত্ব, গ্রিক দর্শন, রোমান বিচার ব্যবস্থার শিক্ষাকেন্দ্র। প্রথম দিকে আরবরা মূলত গ্রিক ও পারস্য থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞান শিখেছিল।

খালিদ বিন ইয়াজিদ বিভিন্ন গ্রিক ও খ্রিষ্টান চিকিৎসাশাস্ত্র, গ্রিকদের জ্যোতিষশাস্ত্রের রচনাগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন। সিবাওয়াইহ প্রথম আরবি ব্যাকরণের পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন, এর নাম ছিল আল-কিতাব। মুসলমান খলিফাদের মতো উদারতা দেখাতে পারেনি খ্রিষ্টান শাসকরা।

খ্রিষ্টধর্ম রোমান শাসনে বহু দূর বিস্তৃত হয়েছিল। কিন্তু কট্টরতার জন্যই দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা হারাতে থাকে। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, উত্তর আফ্রিকার আলেকজান্দ্রিয়া থেকে কার্থেজ পর্যন্ত অঞ্চলেই ইসলাম প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে খ্রিষ্টধর্ম একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মানবেন্দ্রনাথ রায় বলেন, কারণ খ্রিষ্টের বাণী বিকৃত হতে হতে এমন এক ভ্রান্ত সন্ন্যাসবাদের মধ্যে গিয়ে পড়ে যে সেখান থেকে উঠে আসবার আর কোনো পথই ছিল না।

খ্রিষ্টধর্মের দুর্গতি আর অধঃপতন যখন চলছিল, বলিষ্ঠ মতবাদ নিয়ে ইসলামের তখন আবির্ভার ঘটে। গিবন বলেছিলেন, জরথ্রুস্টের রীতির চেয়ে উন্নত এবং মুসার আইন-কানুনের চেয়ে উদার ছিল মুহাম্মদের ধর্ম। খ্রিষ্টীয় ৮২৬ সালে নানা রহস্যময় মতবাদ ও কুসংস্কার খ্রিষ্টের সুসমাচার ও সুশিক্ষার চেহারায় কালিমা লেপন করেছিল, আর এরই পাশে ইসলাম এসে দাঁড়াল এক অনাড়ম্বর অথচ বিবেক-বুদ্ধিসমৃদ্ধ চেহারা নিয়ে। ইসলামের নাটকীয় প্রসারের এগুলোই হচ্ছে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা।  

জওহরলাল নেহরু লিখেছেন, ইসলামে ন্যূনতম হলেও গণতন্ত্রের ধারণা বহাল ছিল প্রথম দিকে। কিন্তু পরে ক্ষমতা প্রদর্শন আরম্ভ হলো। যখন আব্বাসীরা খলিফার পদ অধিকার করলো, তখন তারা উমাইয়াদের উপর প্রতিশোধ নিতে শুরু করে। ফলে অনেক দিন ধরে হত্যাকাণ্ড চলল। যখন যেখানে উমাইয়াদের পেল, নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসী খলিফাদের শাসন শুরু হয়।

শুরুটা শুভ না হলেও, আব্বাসীদের আমলে আরবজাতি খুব উন্নতি লাভ করেছিল। নানা বিষয়ে অনেক পরিবর্তন হয়েছিল। স্বদেশে আব্বাসীরা বিজয়ী হলেও সুদূর স্পেনে ছিল উমাইয়াদের শাসন। কিন্তু উমাইয়া শাসকরা আব্বাসীদের খলিফা হিসেবে মানতে অস্বীকার করে।

মিশর তো আব্বাসীদের উপেক্ষা করে নিজেরা নতুন এক খলিফা মনোনীত করল। আফ্রিকাতেও আব্বাসীদের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ঠিক এই আব্বাসী শাসনের শুরুতেই মুসলিম-আরবদের সাম্রাজ্য বিভক্ত হয়ে যায়। খলিফা আর মুসলিম জগতের একচ্ছত্র অধিপতি বা ধর্মগুরু থাকলেন না। ইসলাম ধর্মের একতা নষ্ট হলো।

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নিজেদের মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটতে থাকে। শিয়া আর সুন্নী মতবাদে বিভক্ত হয়ে গেল মুসলমানরা। ভিন্ন দিকে উমাইয়া আর আব্বাসীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চলতে থাকে। কিন্তু পরধর্মমত সহিষ্ণুতার উদাহরণ মুসলমানদের মধ্যে তখনো ছিল।

বাগদাদ

যখন ক্ষমতা উমাইয়াদের হাত থেকে আব্বাসীদের কাছে গেল, রাজধানী দামাস্কাস থেকে স্থানান্তর হলো বাগদাদে। আব্বাসী শাসকরা নিজেদের সাম্রাজ্যকে সংহত করতে মন দিলেন। আব্বাসীদের দ্বিতীয় খলিফা ছিলেন আব্বাসের ভ্রাতা আবু জাফর, যিনি আল মনসুর উপাধি নিয়ে রাজ্য শাসন করেন। তিনি ছিলেন আব্বাসীদের শ্রেষ্ঠ খলিফাদের অন্যতম।

তিনি সিরিয়ার শাসনকর্তা আবদুল্লাহ বিন আলীর বিদ্রোহ দমন করেন। তিনি আফ্রিকার বার্বার ও খারিজিদের বিদ্রোহ দমন করেছিলেন। চতুর্থ কনস্টানটাইন তাঁর কাছে পরাজিত হন। মনসুর রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে তাবারিস্থান, গীলান, দায়লাম, এশিয়া মাইনরের জর্জিয়া, মসুল প্রভৃতি নিজ অধিকারে আনেন। তিনি স্পেন জয়ের চেষ্টা করে সাফল্য পাননি।

মনসুরের পরবর্তী শাসক ছিলেন আল মাহদী, তারপর আল হাদী এবং তারপর আল-মাহদীর পুত্র হারুন আল রশিদ। খলিফা হারুনের সময় ছিল সংহতির যুগ। হারুনের শাসনে বাগদাদ বিরাট শহর, কতো প্রাসাদোপম অট্টালিকা, বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, কার্যালয়, বিচারালয় আর দোকানপাট এবং প্রমোদোদ্যান আর খেলার মাঠ ছিল সেই শহরে।

প্রাচ্য আর প্রতীচ্যের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ফুলে ফেঁপে উঠলো এই সময়ে। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো ডাকবিভাগ, শহরে হাসপাতাল ছিল অসংখ্য। দেশ-বিদেশ থেকে লোকজনের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিল, বিশেষ করে ছাত্র আর শিল্পীদের। কারণ খলিফারা সত্যিই বিদ্বান আর শিল্পীদের গুণের কদর করতে জানতেন। তিনি বহু গ্রিক দার্শনিককে নিজ রাজ্যে সাদরে স্থান দিয়েছিলেন। কারণ খ্রিষ্টানদের অত্যাচারে তারা নিজের ভূমিতে থাকতে পারেননি।    

ষষ্ঠ শতকে সাধু জাস্টিয়ানের গোঁড়ামি শেষ পর্যন্ত খ্রিষ্টানদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মরাজ্য থেকে পৌত্তলিক শিক্ষার শেষ চিহ্নগুলোও অপসারিত করলো। সবশেষে গ্রিক পণ্ডিতদেরও প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হলো। প্রাচীন গ্রিক সাধকরা জ্ঞানের যে আলোকবর্তিকা জ্বেলে রেখে গিয়েছিলেন খ্রিষ্টানরা তা বরবাদ করে দিতে বদ্ধপরিকর ছিল।

যখন খ্রিষ্টান গির্জা গ্রিক পণ্ডিতদের নিজেদের বিদ্যাপীঠ ত্যাগ করতে বাধ্য করে ঠিক তখন তাদের অনেকে আশ্রয় পেল বাগদাদের আব্বাসী খলিফাদের রাজদরবারে। বিদেশি বিধর্মীদের জ্ঞানবুদ্ধিতে বাগদাদের মুসলমান শাসকরা এতটাই মুগ্ধ হলেন যে, কুরআন বা ইসলামের ধর্মবিশ্বাস তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হলো না। স্বাধীনভাবে নিজেদের কাজ করার সুযোগ পেলেন তারা। মুসলমানরা জানতে পারলেন, প্রাচীন গ্রিস-রোমের দর্শন, জ্ঞানবিজ্ঞান আর বিভিন্ন চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কে। খলিফা কেবল শরণার্থী গ্রিক পণ্ডিতদের আশ্রয়ই দিলেন না, প্রাচীন গ্রিক মনীষীদের সব গ্রন্থ সংগ্রহ করার পরামর্শ দিলেন।

ঠিক তারপরেই অ্যারিস্টটল, হিপারকাস, হিপোত্রাটেস, গ্যালেন ও অন্য বৈজ্ঞানিকদের মূল্যবান গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হলো। যাতে করে বিধর্মীদের লেখা এই ধর্মবিরোধী গ্রন্থগুলো সমগ্র মুসলিম জাহানে বিস্তার লাভ করতে পারে, খলিফারা তার জন্য সব রকম উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

বিপুল উৎসাহে অভিজাত থেকে সুতার-মিস্ত্রি পর্যন্ত সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীভুক্ত হাজার হাজার ছাত্রকে বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে প্রতিষ্ঠিত হলো অসংখ্য বিদ্যালয়। গরিব ছাত্ররা বিনা পয়সায় শিক্ষা গ্রহণ করতো। শিক্ষকরা ধর্মতত্ত্ব নয়, পড়াতেন সাহিত্য, বিজ্ঞান আর দর্শন।  

জওহরলাল নেহরু তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে লিখেছিলেন, ইসলামের ইতিহাসের সেটা ছিল ভিন্ন যুগ। বাগদাদ ছিল সবদিক দিয়ে তৎকালের শ্রেষ্ঠ শহর। শুধুমাত্র আরবশাসিত স্পেন ছাড়া তৎকালে ইউরোপের তুলনায় বাগদাদ ছিল সবদিক থেকে এগিয়ে এবং শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য আর শাসন পদ্ধতিতে উন্নত। এই সময়ে আরবদেশে বিজ্ঞান চর্চাও শুরু হয়।

ইউরোপের সেই অন্ধকার যুগে আরবদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা দেখা গিয়েছিল, সুতরাং তাদের আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মদাতা বলা যেতে পারে। বাগদাদ হয়ে উঠেছিল আব্বাসী আমলে মধ্যপ্রাচ্যের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাগদাদ ছিল কনস্টানটিনোপলের সমকক্ষ। শিক্ষা-সাহিত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান সকল ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব বিকাশ পরিলক্ষিত হয়। এই সময়কালে গ্রিক দর্শন চিন্তা আব্বাসীদের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। আল কিন্দি দার্শনিক হিসেবে এ সময়ে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন।

আল-ফারাবী গ্রিক দর্শন ও ইসলামী দর্শনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেন। আল ফারাবী দর্শনে প্লেটো, অ্যারিস্টটল ও সুফী মতাদর্শের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ফারাবী রচিত ‘রিসালাত ফুসুস-উল-হিকমা’ দর্শনশাস্ত্রের একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এই সময়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের যথেষ্ট অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীকালে গ্রিক জ্যোতির্বিদ্যার সংস্পর্শে আসার ফলে আরবীয়রা এ সংক্রান্ত টলেমীর গ্রন্থটি আরবিতে অনুবাদ করেন।

খলিফা মামুন বাগদাদে একটি মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নবম শতকে দক্ষিণ-পশ্চিম পারস্যের মহাকাশ পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছিল। আরবীয়রা জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় মনোযোগ দেওয়ার পর সৌরজগৎ, গ্রহ নক্ষত্র সম্পর্কে বহু নতুন অজানা তথ্য আবিষ্কার করেন। মাইকেল হ্যামিলটন মরগান তার ‘হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, বর্তমানের নাসার সৌরগবেষণার পথিকৃৎ ছিলেন মধ্যযুগের মুসলিম জ্যোতির্বিদরা। হ্যামিলটন তার অসংখ্য উদাহরণ বা প্রমাণ দিয়েছেন।   

মুসা আল খাওয়ারিজম ছিলেন এই যুগের বিখ্যাত গণিতশাস্ত্রবিদ। সংখ্যা গণনা, পাটিগণিত, বীজগণিত সংক্রান্ত বিভিন্ন রচনা তিনি সংকলন করেন। জ্যামিতির জনক বলা হয় তাঁকে। তিনি একই সঙ্গে জ্যোতির্বিদ ও ভূগোলবিদ ছিলেন। রসায়নশাস্ত্রের জনক ছিলেন জাবির ইবন হাইয়ান। জ্যোতির্বিদ্যা ও ত্রিকোণমিতি ব্যাখ্যায় আল-ওয়াফা ছিলেন অন্যতম ব্যক্তিত্ব।

মুসলমানদের জ্যোতির্বিদ্যায় অবদান সম্পর্কে মেঘনাদ সাহা লিখেছিলেন, ভারতের পণ্ডিত জগন্নাথ সংস্কৃত ভাষায় ‘সিদ্ধান্ত সম্রাট’ নামক যে গ্রন্থ রচনা করেন তা টলেমীর রচনার আরব্য সংস্করণের অনুবাদ মাত্র। হিন্দুর তিথি ইত্যাদি গণনা, শুভ-অশুভ দিনের মতবাদ কতকগুলি মধ্যযুগীয় ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং হিন্দু পঞ্জিকা ছিল একটা কুসংস্কারের বিশ্বকোষ। জয়পুর মহারাজ সে কারণেই প্রাচীন ভারতীয় ‘সিদ্ধান্ত জ্যোতিষ’ পরিত্যাগ করে আরব্য-জ্যোতিষের প্রবর্তন করেন।

ভিন্নদিকে ভূগোলশাস্ত্রেও আরবীয়রা অসামান্য পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। মসজিদ নির্মাণ আর কিবলা নির্ধারণ কিংবা হজ্জযাত্রা পালনের ফলে মুসলিমরা ভূগোলশাস্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন। কারণ জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা ছিল আবশ্যিক। দিকনির্ণয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা যাতায়াতের পথ, আবহাওয়া প্রভৃতি সম্পর্কে জানার ইচ্ছা আরবীয়দের ভূগোল গবেষণার দিকে টেনে নিয়ে যায়।

খলিফা আল মামুন ‘পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি’ নামে একটি মানচিত্র তৈরি করান। এই মানচিত্র তৈরিতে মোট ঊনসত্তর জন পণ্ডিত সাহায্য করেছিলেন। আরব ভৌগোলিক যাত্রাকারীরা যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করতেন। আল মাসুদি মশির, উত্তর ও দক্ষিণ আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করে ‘মুরুজ উজ-জাহাব’ নামে গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

উমাইয়া আমলে মোটামুটি ইতিহাস চর্চা শুরু হলেও আব্বাসী আমলে ইতিহাস রচনার এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়। 

মুসা আল খাওয়ারিজম ছিলেন যেমন শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ, তেমনি ইসা-আল মাহানী ছিলেন আধুনিক বীজগণিতের আবিষ্কারক। সেই সময় আল বিরুনী ছিলেন বিখ্যাত গণিতবিদ, পদার্থবিদ, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ। নৃবিজ্ঞান চিন্তার স্রষ্টা বলা হয় তাঁকে। নাসির উদ্দীন তুষি সমসাময়িক ষোলোটি গণিত গ্রন্থের সম্পাদন করেছিলেন।

হারুন আল রশিদের সময় ছিল সেরা বুদ্ধিজীবী জাগরণের সময়। মামুনের সময় তা আরও বৃদ্ধি পায়। হারুনের পুত্র মামুন সবরকমভাবে জ্ঞানবিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। খলিফা হারুন সংগীতকলাকে মহান পেশায় উন্নীত করেন। মুসলমানরা এই সময় চীনের কাছ থেকে কাগজ প্রস্তুত করা শিখে তা আরও মানসম্পন্ন করেছিল।

সেই সময় বাগদাদে কাগজের কল প্রতিষ্ঠিত হয়। সে যুগে ন্যায়বিচারের আদর্শ ছিল ইসলামের অন্যতম নৈতিক কর্তব্য। প্রদেশের বিচারককে কাজি বলা হতো এবং রাজধানীর বিচারকার্যের প্রধান বলা হতো কাজি-উল-কুজ্জাত। ইসলামী আইন অনুসারে বিশ্বাসী, সৎ চরিত্রের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ইসলামী আইনের পণ্ডিত কোনো একজন পুরুষ ব্যক্তি বিচারকের পদ অলংকৃত করতে পারতেন।

যারা মুসলিম সম্প্রদায়ের নন, এই বিচারকরা তাদের বিচার করতে পারতেন না। অ-মুসলিম নাগরিকরা বিচারের ক্ষেত্রে নিজস্ব ধর্মের বিচারক বা নিজ ধর্মীয় প্রধানের কাছ থেকে নির্দেশ লাভ করতেন।  

কর্ডোভা গ্রানাডা

যখন খ্রিষ্টান চার্চ পশ্চিম ইউরোপে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা নিষিদ্ধ করে দেয়, মুসলমানরাই তারপর গ্রিসের জ্ঞানবিজ্ঞানকে রক্ষা করে এবং তার চর্চা করে। প্লেটো, অ্যারিস্টোটলসহ ভারতীয় গণিত মুসলমানদের দ্বারাই বিকশিত হয়। জওহরলাল লিখেছেন, চিকিৎসা, গণিতশাস্ত্র ইত্যাদি কতকগুলি বিষয় আরবের মুসলমানরা ভারতবর্ষের কাছ থেকে শিখেছে।

চীনের কাছ থেকে শিখেছে আরবরা কাগজ তৈরি করা। সংস্কৃত ভাষায় রচিত গ্রন্থাদি আরবরা নিজ ভাষায় অনূদিত করেছিল। কিন্তু অপরের কাছ থেকে যা শিখেছে, সেটা ভিত্তি করে অনেক কিছু আবিষ্কার করেছে। মুসলমানরা তখন নানান অসম্ভব ঘটনা ঘটাচ্ছিলো। জওহরলাল নেহরু লিখেছেন,  ইউরোপের স্পেন জয় করতে বেগ পেতে হলো না।

আরবরা ফ্রান্সের দক্ষিণ-অঞ্চলে প্রবেশ করলো। দক্ষিণ-ফ্রান্সে আরবরা সংখ্যায় ছিল অল্প। কিন্তু তথাপি ফ্রান্সের ওই আরবদের ভয়ে পশ্চিম ইউরোপ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠেছিল। কয়েকটি দেশ সম্মিলিতভাবে আরবদের বিরুদ্ধে জোট বাঁধলো। মুসলমানরা সেখানে হেরে গেল। ফ্রান্স আর জয় করা হলো না। কিন্তু স্পেনে তাদের আধিপত্য বজায় থাকলো কয়েকশো বছর। যাযাবর মরুজাতি কি না স্পেন থেকে মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত বিরাট এক সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে দাঁড়ালো।

মুসলমান সেনাপতি তারিক খ্রিষ্টীয় ৭১১ সালে সমুদ্র পার হয়ে আফ্রিকা থেকে স্পেনে পদার্পণ করেন, স্পেন এইভাবে বিরাট আরব-সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়ে যায়। স্পেনের আরবরা ছিলেন উমাইয়াদের প্রতিনিধি। একাদিক্রমে আরবরা যে স্পেন শাসন করেছিল সে কথা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। আরও আশ্চর্যের হলো, এই আরব মুরদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি। এদিক থেকে তারা যে খুবই উন্নত ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

কৃষি শিল্প ও মানবিক উন্নতির ক্ষেত্রে আরবরা তখন সমগ্র জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ। গ্রানাডা নগরীর গৌরব আর সুনাম ছিল জগৎব্যাপী। সত্যি বলতে তখন স্পেনের মুসলিম পণ্ডিতেরা অ্যারিস্টটল, টলেমী, ইউক্লিড, বিভিন্ন গ্রিক চিকিৎসাশাস্ত্র, রোমান আইন ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন। স্পেনের মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে জ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো ইউরোপীয় পণ্ডিতদের সামনে।

মধ্যযুগ পর্যন্ত অঙ্কশাস্ত্র সম্পর্কে ইউরোপের জ্ঞান ছিল অতি প্রাথমিক পর্যায়ের। আরবীয়রা ভারতবর্ষ থেকে সংখ্যা, শূন্য ও দশমিকের ব্যবহার শিখেছিল আর সেগুলোর আরও উন্নতি ঘটিয়েছিল। সংখ্যার ধারণা ও ব্যবহার আরবদের হাত দিয়ে গিয়ে পৌঁছালো ইউরোপে। পাটিগণিত, বীজগণিত ও জ্যামিতিশাস্ত্রে আরবদের অর্জিত জ্ঞানের বিশাল ঐতিহ্যের মুখোমুখি হলো ইউরোপ। 

বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা নিষিদ্ধ ছিল স্পেনের মুসলিম শাসনে। মুসলমানদের যেমন যাকাত দিতে হতো, খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের জিজিয়া কর দেয়ার বিধান ছিল। ইতিহাসবিদ হোল বলেছেন, গথিক শাসন অপেক্ষা মুসলিম শাসন ছিল মঙ্গলময়। তিনি বলেন, স্পেনের মুসলিম শাসন ছিল জনমঙ্গলকর এবং নিপীড়ন ও নির্যাতনবিরোধী।

ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকায় খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা তাদের উপাসনালয়ে উপাসনা করতে পারতো। গথিক আমলে ইহুদিদের দুর্দশার অন্ত ছিল না। পাদ্রী ও অভিজাতদের উৎপীড়নে তাদের সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকতে হতো। গথিকদের শাসনে বলপূর্বক খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষা, হত্যা, বিতাড়ন এমনকি পরস্পরের মধ্যে বিবাহ বন্ধন পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু মুসলিম শাসনামলে ইহুদিদের সঙ্গে খ্রিষ্টানরা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করে।

খ্রিষ্টানদের কর্ডোভার সেন্ট ভিনসেন্ট গির্জার স্বত্বাধিকার কেড়ে নেয়া হয়নি এবং মুসলমানরা সেটা ক্রয় করে মসজিদে রূপান্তরিত করার পূর্ব পর্যন্ত খ্রিষ্টানরা সেখানে উপাসনা করতে পারতো। ইতিহাসবিদ হোল বলেন, খিলাফতের পতনের পূর্ব পর্যন্ত গির্জা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল এবং উপাসনার জন্য গির্জার ঘণ্টা বাজার প্রতি কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না।

বিখ্যাত ইংরেজ ঐতিহাসিক স্ট্যানলি লেনপুল মুসলমানদের এই ভব্যতার প্রশংসা করে বলেন, খ্রিষ্টানদের চেয়ে মুররা ছিল অনেক বেশি সভ্য। সেই জন্যই নির্যাতিত, উৎপীড়িত খ্রিষ্টান ভূমিদাস আর ইহুদিরা মুসলমানদের এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছিল। মুরেরা স্পেন জয় করে সুবিখ্যাত আন্দালুসিয়া রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এই রাজ্যটি ছিল মধ্যযুগের ইউরোপের সবচেয়ে সভ্য দেশ।

সমগ্র ইউরোপ যখন বর্বরোচিত অজ্ঞতা ও কলহবিবাদে নিমগ্ন তখন কেবল আন্দালুসিয়া পাশ্চাত্য জগতের সম্মুখে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সুয়েভি, ভিসিগথ, ভ্যানডাল, বার্বেরিয়ান প্রভৃতি ইউরোপীয় জাতির মতো মুরেরা স্পেনে ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা করেনি বরং নব বিজিত অঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা, সাম্য, মৈত্রী, সম্প্রীতির ভাব সৃষ্টি করার প্রয়াস নেয়। উমাইয়া খিলাফতের অধীনে বিজিত প্রদেশ হিসেবে তারা আন্দালুসিয়ায় একটি জনমঙ্গলকর ও কার্যকরী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে।

মুসলিম শাসিত রাজধানী কর্ডোভা, গ্রানাডা ও সেভিল সমৃদ্ধিশালী নগরীতে কেবল পরিণত হয়নি, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। স্থাপত্য, শিল্পকলা, সংগীত, নৃত্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুররা অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। হিট্টি বলেন, মধ্যযুগীয় ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাসে স্পেন একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করে।

টমাস আর্নল্ড বলেন, মধ্যযুগের পূর্ব পর্যন্ত খ্রিষ্টান পণ্ডিতদের মানসিক বিকাশের জন্য মুরদের মাধ্যমে গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞানের লঘু জ্ঞান আহরণ করতে হতো। ইউরোপ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলিম স্পেনের নিকট ঋণী। দ্বাদশ শতকের প্রথমার্ধে আন্দালুসিয়ার সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় আরবের নব যুগের সূচনাকারী মহান আরব যুক্তিবাদীরা যে বিকশিত হচ্ছিলো তা রজার বেকনের সুপরিচিত উচ্চারণে ঘোষিত হয়েছে।

খ্রিষ্টধর্মের কর্তৃত্ব এবং ধর্মতন্ত্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে ইউরোপে বিদ্রোহের পতাকা উড়েছিল ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে। যুক্তিবাদী বিদ্রোহীরা অনুপ্রেরণা পেয়েছিল প্রাচীন গ্রিক বৈজ্ঞানিক শিক্ষা থেকে।

মুসলমানদের মাধ্যমে কাগজ সর্বপ্রথম ইউরোপে প্রসার লাভ করে। যখন লন্ডন শহরের লোকসংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ তখন কর্ডোভার জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখ। স্নানাগারের সংখ্যা ছিল নয়শো। ড্রেপার স্বীকার করেন যে, অষ্টম শতকে কর্ডোভার রাস্তায় যখন বাতি জ্বলতো তার ৭০০ বছর পরেও লন্ডনে কোনো সরকারি বাতি ছিল না। কর্ডোভার খ্যাতি তখন পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছিল।

দশম শতকে একজন জার্মান লেখক কর্ডোভার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘এ শহর পুরো বিশ্বের ভূষণস্বরূপ’। দূর দেশ থেকে ছাত্ররা আসতো কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যাশিক্ষা করতে। আরব দর্শনের প্রভাব ইউরোপের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়ে- প্যারিস, অক্সফোর্ড, উত্তর ইতালির বিখ্যাত বিদ্যাকেন্দ্রগুলোতে এই দর্শনের যথেষ্ট সমাদর হয়।

দ্বাদশ শতকের জ্যোতির্বিদ আবু বকরই গ্রহ-উপগ্রহের অবস্থান নিয়ে টলেমীর ধারণাকে প্রথম বর্জন করেন। তিনি বললেন, গ্রহমণ্ডলীর মধ্যে এক অদ্ভুত শৃঙ্খলা এবং দিব্যগতি আছে। তাঁর এই ধারণাই পরবর্তীকালে জিওরদানো ব্রুনো, গ্যালিলিও এবং কপারনিকাসের যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্ভব করে তোলে।

মুরদের নগরীগুলো ছিল সুপরিকল্পিত। প্রশস্ত রাস্তাগুলো এমনভাবে বানানো হয় যাতে শকট বা যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে। রাস্তায় ভিড় হতো না। যানবাহন ও পথচারীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক পুলিশের ব্যবস্থা ছিল। প্রত্যেক নগর সুস্বাস্থ্যকর ছিল এবং পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা ছিল। স্বাস্থ্যরক্ষার সব ধরনের আইন-কানুন মেনে চলতে হতো।

নিখুঁত নর্দমার ব্যবস্থা থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হতো না। নিয়মিত আবর্জনা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ড্রেপার কর্ডোভার সঙ্গে গ্রেট ব্রিটেনের তুলনা করে বলেছেন যে, সমগ্র গ্রেট ব্রিটেনে যেখানে অর্ধ কোটি লোকের বাস ছিল সেখানে একমাত্র কর্ডোভা শহরে দু লাখ লোকের বাস ছিল। ইউরোপের অন্যান্য রাজধানী শহরে যখন স্বাস্থ্য রক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না তখন কর্ডোভায় সুশৃঙ্খলভাবে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা যেতো।

ড্রেপার বলেন যে, ইউরোপের লোকেরা খুবই নিম্নমানের জীবনযাপন করতো। বিছানাপত্র ও কাপড়- চোপড়ে ছারপোকা চরে বেড়াতো। রাস্তাঘাট নিরাপদ ছিল না। খ্রিষ্টানদের বাসগৃহগুলো ছিল খুবই স্বল্প পরিসর এবং তাতে মাত্র একটি ছিদ্র থাকতো ছাদে এবং এর ফলে বাড়িঘরগুলো হতো অন্ধকারাচ্ছন্ন।  

ইউরোপের সাধারণ গৃহগুলো যেখানে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী কাঠ-খড় ইত্যাদি দিয়ে নির্মিত হতো সেখানে মুরদের বাসভবনগুলো ইট ও পাথরের তৈরি হতো। বেশিরভাগ গৃহের সম্মুখে বিভিন্ন ধরনের ফুলের বাগান ছিল। সূর্যের প্রখর তাপ থেকে বাঁচার জন্য মুরেরা গ্রীষ্মকালে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি পর্যন্ত চাঁদোয়া টাঙিয়ে রাখতো। রাতে রাস্তা আলোকিত করতো রাস্তার পাশের ঘর থেকে আসা প্রদীপের আলো।

ড্রেপার বলেন, অসংখ্য বাতির আলোকে একজন মানুষ সূর্যাস্তের পর একাদিক্রমে দশ মাইল পথ সরলরেখার মতো হেঁটে যেতে পারতো এবং এর সাত বছর পরেও লন্ডনে কোনো সরকারি বাতি ছিল না। হিট্টির বক্তব্যে ড্রেপারে কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়। হিট্টি বলেন, প্যারিসে এর বহু শতক পরেও যে কেউ বর্ষাকালে তার দরজার বাইরে গেলে তার পা হাঁটু কর্দমাক্ত হয়ে যেতো।

ভিন্ন দিকে ড্রেপার দেখাচ্ছেন, প্রাসাদ, বাসভবন, স্নানাগার, মসজিদ-মিনার নির্মাণে সুসভ্য জাতি হিসেবে মুরদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজপ্রাসাদ মহাড়ম্বরে সুশোভিত থাকতো। ফ্রান্স, জার্মানি ও ইংল্যান্ডের রাজপ্রাসাদের তুলনায় মুরদের স্থাপত্যিক সৌকর্য ছিল বিস্ময়কর।  

মুররা সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে। সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ছিলেন ইবনে রুশদ। জ্যোতির্বিজ্ঞানে ছিল তাঁর ব্যাপক অবদান। তিনি ধর্মকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে না দিয়েই বিজ্ঞান সাধনার পক্ষে ভিন্নতর যুক্তি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, দার্শনিকদের কাছে ধর্মের বৈশিষ্ট্য হলো, যা ঠিক তার চর্চা করা।

ঈশ্বরের সৃষ্ট জ্ঞান ছাড়া আর কোনো উপাসনা নেই, যা তাকে জানার বাস্তবতার পথে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, ধর্মের মূলে কখনো অন্ধ গোঁড়ামি কিংবা অসহিষ্ণুতা থাকতে পারে না। ধর্মের যুক্তিবাদী এমন সূক্ষ্ম ভাবনা ইবনে রুশদের মনেই এসেছিল। ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ৫০০ বা ৬০০ বছরে এমন সব পণ্ডিত সৃষ্টি করেছিল যারা স্বর্গীয় দেবদূত ইত্যাদির চেয়ে বেশি মনোযোগী হয়েছিলেন গ্রহ-উপগ্রহ প্রভৃতি জ্যোতির্বিদ্যা চর্চায়। আর কুরআনকে সরিয়ে রেখে ইহজাগতিক বই-পুস্তকের সাধনায় গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি।

অনেক বিপ্লবী চিন্তানায়ক যুক্তির কাছে বিশ্বাসকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন অত্যন্ত কঠিনভাবে। সন্দেহ নেই, আব্বাসীয়, ফাতেমীয় ও উমাইয়াদের গৌরবোজ্জ্বল শাসনামলে একই সঙ্গে এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে শিক্ষা ও সংস্কৃতি ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করে। গ্রিক দর্শন ও শিক্ষার অমূল্য সম্পদ যা চাপা পড়ে গিয়েছিল খ্রিষ্টীয় চার্চের অসহিষ্ণুতা ও কুসংস্কারের নিচে, সেগুলোকে আরবরাই পুনরুদ্ধার করেছিল। মানবেন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন, আরবরা না থাকলে তা একেবারেই হারিয়ে যেতো এবং এমন দুর্ঘটনার দুঃখজনক পরিণতি কী হতে পারতো তা সহজেই অনুমান করা যায়। 

পি কে হিট্টি বলেন, মধ্যযুগের ইউরোপের বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাসে স্পেন একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, অষ্টম শতকের মধ্যভাগ থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত আরব ভাষাভাষী লোকেরাই সমগ্র পৃথিবীব্যাপী সংস্কৃতি ও সভ্যতার মশালবাহী ছিল। তমসাচ্ছন্ন ইউরোপে মুসলিমশাসিত স্পেনই ছিল জ্ঞানবিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা। জে ডব্লিউ ড্রেপারের ভাষায়, ‘ইউরোপীয়রা তখন বর্বর বন্য অবস্থা ছাড়িয়ে ওঠেনি বলা চলে। তাদের দেহ অপরিচ্ছন্ন, হৃদয় তিমিরাচ্ছন্ন ছিল। হীন ধর্মতত্ত্ব প্রচারক উচ্চাকাক্সক্ষী পাদ্রীরা ক্ষমতার জন্য বিবাদে মত্ত ছিল। 

ত্রয়োদশ শতকের শুরুতেই রাজা আলফানসো স্পেনে সালামাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মধ্যযুগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সালামাঙ্কা ছিল খুবই বিখ্যাত। সালামাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে, আরব আর ইউরোপের যোগাযোগ। সালামাঙ্কায় চিকিৎসা অনুষদের অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিল আরব চিকিৎসাবিদদের গবেষণা। দশম শতকেই জেরবার্ট, পরে যিনি পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টার হন, চিকিৎসা শিখতে মুসলমানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। সালামাঙ্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের উপর স্পেনের মুসলমানদের উপস্থিতি, আরব বিজ্ঞানের ঔজ্জ্বল্য, আল বেরুনীর দর্শন, ইবনে সিনার চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদির প্রভাব ছিল।     

ইউরোপীয় ইতিহাসবিদদের মতে, মধ্যযুগের ইউরোপের বর্বরতা, পশ্চাৎপদতা, বৃদ্ধিবৃত্তির স্থবিরতা এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে তা বর্ণনাতীত। তৎকালীন সময়ে ইউরোপে জ্ঞানের প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ চলছিল। এমন অবস্থা সম্পর্কে ড্রেপার বলেন, তৎকালে বহু শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে অধ্যয়নের উপযুক্ত কোনোরূপ গ্রন্থাদি রচিত হয়নি। শাসক শক্তির দুর্বিষহ নির্যাতন আর অত্যাচার হতভাগ্য শিক্ষিত সম্প্রদায়ের উপর প্রয়োগ করা হতো। পৃথিবী গোলাকার এরূপ ধারণায় কেউ আস্থা স্থাপন করলে ভয়ানক শাস্তি তার প্রাপ্য ছিল।

জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে গিয়ে আলেকজান্দ্রিয়ার খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের হাতে বিদুষী হাইপেশিয়ার দেহ শত সহস্র খণ্ডে বিখণ্ডিত হয়েছিল। ফলে ইউরোপে বহু শতক ধরে প্রতিভাশালী আইনজ্ঞ, সূক্ষ্মদর্শী দার্শনিক ও সুরুচিসম্পন্ন কবির আবির্ভাব হয়নি। স্মরণ রাখতে হবে, বাইজানটাইনদের বর্বরতা টলেমীদের সব প্রশংসনীয় কীর্তি ধ্বংস করে দেয়। আলেকজান্দ্রিয়ার যা কিছু ধ্বংস করার তা আগেই করেছিল খ্রিষ্টান যাজকরা।

খ্রিষ্টান পোপদের জ্ঞানচর্চায় অনীহা ছিল প্রবল। মুক্তচিন্তার কোনো অবকাশ ছিল না। পোপদের প্রভাবে সমগ্র ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ব্যাহত হয়। জ্ঞানচর্চার প্রতি প্রচণ্ড অনীহা সমগ্র ইউরোপকে এমনকি বাইজানটাইন আমলেও গ্রাস করেছিল। মধ্যযুগের ইউরোপে বিচারের জন্য কোনো ন্যায়ানুমোদিত আইন বলবৎ ছিল না। ফলে নিম্নশ্রেণীভুক্ত লোকেরা ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হতেন।

যখন খ্রিষ্টান পোপদের মধ্যে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার অনীহা দেখা দেয়, তখন কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয় সারা ইউরোপে এমনকি পশ্চিম-এশিয়াতেও বিদ্যার পীঠস্থান হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। দরিদ্র প্রজাদের জন্য অনেকগুলো অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। বিশেষ করে একজন ইতিহাসবিদ বলেন, স্পেনের অধিকাংশ লোকই লিখতে পড়তে জানতেন। খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ইউরোপে কিন্তু তা ছিল না। সেখানে একমাত্র যাজক-সম্প্রদায় ছাড়া বলতে গেলে উচ্চবংশীয় লোকেরা পর্যন্ত নিরক্ষর ছিলেন। কর্ডোভার সঙ্গে একটি মাত্র শহর তুলনীয় ছিল, তা হলো আব্বাসী মুসলমানদের শাসিত শহর বাগদাদ।  

মধ্যযুগে বিশেষ করে অষ্টম শতকে সমগ্র ইউরোপ যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল, তখন আইবেরীয় উপদ্বীপে মুরদের শাসনে জ্ঞানের শিখা প্রজ্বলিত হয়। সেদিক থেকে বিচার করলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, মুসলমানদের স্পেন বিজয় ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে। মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের ফলে কেবলমাত্র মুসলিম আধিপত্যই বিস্তৃত হয়নি, বরং স্পেন তথা ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে এসেছিল পরিবর্তন। কর্ডোভা নতুন চিন্তাচেতনার মশাল জ্বালিয়েছিল সমগ্র ইউরোপ ভূখণ্ডে।

স্ট্যানলি লেনপুল বলেন, ‘আমরা দশম শতকের কর্ডোভার গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলোর কথা এমনভাবে স্মরণ করি যখন স্যাক্সন বা ইংল্যান্ডের পূর্বপুরুষেরা কাঠের কুটিরে বাস করতেন; যখন লেখাপড়ার মতো গুণাবলী কেবল যাজক সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তখনই মুরদের অভূতপূর্ব সভ্যতার কথা কিছুটা উপলব্ধি করতে পারি।’ তিনি আরো বলেন, যখন সমগ্র ইউরোপ বর্বরোচিত অজ্ঞতা ও অসভ্য আচার-ব্যবহারে নিমগ্ন এবং যখন কেবলমাত্র কনস্টানটিনোপল ও ইতালির কিয়দংশ মার্জিত রুচির কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়, তখনই আইবেরীয় উপদ্বীপের বিধর্মী মুরেরা তাদের প্রতিভালোকে নিখিল বিশ্ব আলোকিত করে। 

দশম শতকে প্রথম ফরাসী পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টার স্পেনের কর্ডোভা ও সিভিলী নগরে বিজ্ঞান শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনিই পরে গ্রিক-রোমের পাটিগণিত, অংক, জ্যোতির্বিদ্যা, দশমিক পদ্ধতি ইত্যাদির সঙ্গে ইউরোপের পণ্ডিতদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সমসাময়িকেরা আরবদের সঙ্গে সিলভেস্টারের যোগাযোগকে অপরাধ বলে গণ্য করতেন।

তখন অনেকে গুজব তুলেছিল যে, তিনি নাকি মুসলমানদের কাছে গিয়ে তুকতাক আর ডাইনিবিদ্যা শিখে এসেছেন। তার দুই শতক অতিক্রান্ত হবার পর ত্রয়োদশ শতকে গির্জার কর্তাব্যক্তিদের মানসিকতা আর অতোটা পশ্চাৎপদ ছিল না।

দেখা গেছে, অনেক পোপ নিজেরাই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। পোপ ইনোসেন্ট প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়কে যথেষ্ট সহায়তা দিয়েছিলেন এই কারণে যে, তিনি নিজেও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। মধ্যযুগের চার্চের কর্তাব্যক্তিরা তখন ভাবতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের, বিশেষ করে বিজ্ঞান শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈশ্বর আর খ্রিষ্টধর্মকে আরও গভীরভাবে জানা। তখন তাদের ধারণা ছিল বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ আরও ধর্মমনস্ক হবে।

মধ্যযুগের মুসলমানরা ভেবেছেন ভিন্নরকম। মুসলিম শাসকদের ইহজাগতিক বিজ্ঞান চর্র্চা ও মুক্তচিন্তার জন্য সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ইসলাম ধর্মের বহু মানুষ, যেমন মুতাজিলারা কুরআনের ঐশ্বরিক উৎপত্তির কথা বিশ্বাস করতো না। সব ধর্মের প্রতিই ছিল সহনশীলতা। শত শত বছর ধরে নির্যাতিত ইহুদিদের সাদর আশ্রয় দিয়েছে মুসলমানরা। সেই সাথে আশ্রয় দিয়েছে উদারপন্থী খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের। আরব সাম্রাজ্য সুদৃঢ় ভিতের উপর দাঁড়িয়ে গেলে ক্যাথলিক চার্চের প্রতিও উদারতা দেখিয়েছে। মুসলিম রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে খ্রিষ্টানরা নিয়োগ লাভ করেছে।

প্লেটো, অ্যারিস্টটল, ইউক্লিড, এপোলোনিয়াস, টলেমী, হিপোক্রাটস গ্যালনের সমগ্র রচনা আধুনিক ইউরোপের জনকরা প্রথম পেয়েছে আরবি অনুবাদের মাধ্যমে, পেয়েছে পাণ্ডিত্যপূর্ণ সমালোচনাসহ। নতুন নিরীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে আরব দার্শনিকরা পৃথিবীর পরিধি এবং গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান ও সংখ্যা সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান লাভ করে। তাদের হাতেই জ্যোতির্বিদ্যা যথার্থ বিজ্ঞানে রূপ পেল। মুসলিম শাসনে স্পেন তখন একটি শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। দর্শন, ইতিহাস, জ্যোতিষবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র চর্চা হতো। গ্রিক দর্শন এবং গ্রিক অনুবাদ রচনাগুলো স্পেন হয়ে ইউরোপে পৌঁছায় আরবদের হাত ধরে।    

ইউরোপকে আলোকিত করেছিল স্পেনের মুর পণ্ডিতরা। মুসলমানদের মাধ্যমেই ইউরোপের জনগণ পুনরায় খুঁজে পেল ব্যবহারিক জীবনের উন্নতি, বুদ্ধির অগ্রগতি ও ধর্মীয়-আধ্যাত্মিকতার হাত থেকে মুক্তির পথ। ইউরোপ আধুনিক যুক্তিবাদের অধিকারী হয়েছে আরব দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিকদের মাধ্যমেই। রজার বেকন ছিলেন আরবদের শিষ্য।

হাম্বলের মতে, পদার্থবিজ্ঞান বলতে আজ আমরা যা বুঝি, সেই জড়বিদ্যার আসল প্রতিষ্ঠাতা আরবরা। প্রয়োগ পরীক্ষা এবং পরিমাপই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, যার সাহায্যে তারা অগ্রগতির পথ খুঁজে পেয়েছিল এবং নিজেদের গ্রিক বিজ্ঞানের অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির সেতুবন্ধ হিসেবে গড়ে তুলেছিল। কর্ডোভা ছিল ৫০০ বছর ধরে মুর রাজ্যের রাজধানী।

পুরো ইউরোপ যখন অজ্ঞান ও হিংসা-বিদ্বেষের অন্ধকারে ডুবে ছিল তখন পশ্চিম-জগতের দৃষ্টির সম্মুখে কর্ডোভা জ্ঞান ও সভ্যতার আলোক তুলে ধরেছিল। শহরে অনেকগুলো গ্রন্থাগার ছিল। জওহরলার নেহরু লিখেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল খলিফা বা আমির হাকামের খাস গ্রন্থাগার। এ গ্রন্থাগারের পুস্তক সংখ্যা ছিল চার লক্ষ। 

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান

মুসলিম সভ্যতার আল কিন্দি, আল হাসান, আল ফারাবি, আবিসেনা বা ইবনে সিনা, আল গাজ্জালী, আরুবকর, এভেন পেস বা ইবন্ বাজ্জা, আল ফেট্রাজিয়াস, ইবনে খাল্দুন প্রমুখ মানব সভ্যতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। মহান ইবনে রুশদের কীর্তি অমর হয়ে আছে এমন একজন মানুষ হিসেবে যিনি আধুনিক সভ্যতার অগ্রদূতদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অ্যারিস্টটলের প্রতিভার সঙ্গে।

এভাবে ইউরোপের মানবতা তার ধর্মীয় গোঁড়ামি ও মধ্যযুগীয় বন্ধ্যা দর্শনের পক্ষাঘাতদুষ্ট প্রভাব থেকে মুক্তি পেয়েছিল। মুর সভ্যতার অন্যতম অবদান ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ইতিহাসবিদদের মতে রাজধানী কর্ডোভায় কমপক্ষে ৫০টি চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। পূর্বের সব চিকিৎসা পদ্ধতি মুরদের হাতে আরও ব্যাপকভাবে উন্নতি লাভ করে তা নতুন দিগন্ত বিস্তৃত করে। 

মুরশাসিত স্পেনে একাদশ শতকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেন আবুল কাসেম খালাফা ইবনে আব্বাস আল-জাহরাউই, পাশ্চাত্যে তিনি আবুল কাসিস নামে সুপরিচিত ছিলেন। দ্বিতীয় হাকামের রাজদরবারে বিশিষ্ট চিকিৎসক আল-জাহরাউইয়ের খ্যাতির মূল উৎস ছিল তাঁর রচিত ‘আল তাসরিফ লি-মান আজইজ আন আল-তালিফ’ নামের প্রখ্যাত গ্রন্থটি। এই অমূল্য গ্রন্থে চিকিৎসাবিজ্ঞানের কমপক্ষে ৩০টি শাখায় তাঁর পাণ্ডিত্য ও গবেষণালব্ধ ফসল লিপিবদ্ধ হয়েছিল। সর্বপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল শল্যচিকিৎসার উপর।

মূলত শল্যচিকিৎসক হিসেবে আল-জাহরাউই পাশ্চাত্যে অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর শল্যচিকিৎসা সম্পর্কিত পরিচ্ছেদগুলো লাতিন ও হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। ক্রিমোনার জেরার্ড এই শল্য অংশ লাতিনে অনুবাদ করেন যা ১৪৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ভেনিসে, ১৫৪১  খ্রিষ্টাব্দে ব্যাসেলে এবং ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে অক্সফোর্ডে প্রকাশিত হয়।

হিট্টির ভাষায় এ গ্রন্থটি বহু শতাব্দী পর্যন্ত সালেরনো মল্টপিলার এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যান্য বিদ্যালয়ে শল্যবিদ্যার সার্বক্ষণিক পুস্তক হিসেবে বিবেচিত হতো। আল জাহরাউই গ্রন্থটিতে শুধু তথ্য দিয়ে ক্ষান্ত ছিলেন না, শল্যচিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ছবিসহ বর্ণনা দেন। ইতালির সালেরনো বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিল প্রধান একটি চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়। আরব চিকিৎসাবিদদের প্রভাবের কারণেই চিকিৎসাবিদ্যা দিয়ে সালেরনো বিদ্যালয়টি শুরু হয়। মনে করা হয় এটি ছিল ইউরোপের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়।

সালেরনো খ্যাতি শুরু হয় গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যার চর্চা দিয়ে। গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যার পুনর্জাগরণ ঘটেছিল সেখানে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের একাধিক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি। মূলত সেগুলো ছিল সব আরবি থেকে অনুবাদ। কিছু ছিল গ্রিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের আরবি অনুবাদের লাতিন পুনরানুবাদ।

বহুজনই স্বীকার করেন যে, আবুল কাসেম খালাফা ইবন আব্বাস আল-জাহরাউই ছিলেন মধ্যযুগের ইউরোপের সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত শল্যচিকিৎসক। কথাটি স্কট স্বীকার করে বলেন, তিনি ছিলেন আধুনিক শল্যচিকিৎসার জনক। সব ধরনের কঠিন ও জটিল অস্ত্রোপচার চালাতে আল-জাহরাউই সঙ্কোচ বা দ্বিধা বোধ করতেন না।

স্ট্যানলি লেনপুলও লিখেছেন যে, আধুনিককালে ব্যবহৃত অস্ত্রোপচারের যে পদ্ধতি রয়েছে তা তার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। সমগ্র ইউরোপ যখন চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক অসহনীয় অবস্থা বিরাজ করছিল তখন মুর চিকিৎসকরা তাদের পাণ্ডিত্য, ধীশক্তি, মৌলিক গবেষণা দ্বারা সমগ্র ইউরোপে ব্যাপক অবদান রাখতে সমর্থ হন।

মধ্যযুগের ইউরোপে চিকিৎসা শাস্ত্রের অভাবে জীবনযাত্রা ছিল দুর্বিষহ। প্রার্থনা, কবচ, সাধু-সন্ন্যাসীদের উপদেশ প্রভৃতির উপর তাদের নির্ভর করতে হতো। স্নান নিষিদ্ধ হওয়ায় স্নানাগার ছিল না খ্রিষ্টানজগতে। ফলে রোগজীবাণু ছড়িয়ে জনজীবনে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হতো। এসব কারণেই সংক্রামক রোগ ব্যাপক আকার ধারণ করে ফ্রান্সে। বিশেষ করে কুষ্ঠরোগ।

বলা হয়েছে যে, ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সে দু’হাজার এবং ইউরোপের অন্যান্য স্থানে ১৯ হাজার কুষ্ঠ নিবাস ছিল। বিবাহিত, অবিবাহিত, যাজক অথবা সাধারণ লোক, পোপ দশম লিও থেকে পথের ভিক্ষুক- কোনো শ্রেণীর লোকই সিফিলিসের আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি।  

মুররা চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রকৃত জ্ঞান লাভের জন্য একদিকে যেমন চিকিৎসা বিদ্যালয় প্রবর্তন করেন, অন্যদিকে বাস্তব অভিজ্ঞতা দ্বারা চিকিৎসার ব্যাপক অগ্রগতি সাধনের জন্য বহু স্থানে হাসপাতাল বা আরোগ্য নিকেতন নির্মাণ করেন।

আব্বাসীয়, ফাতেমীয়, মামলুক আমলে কায়রো, দামেস্কসহ বিভিন্ন স্থানে যেরূপ হাসপাতাল, চিকিৎসা বিদ্যালয়, ঔষধালয় ও পর্যবেক্ষণাগার প্রতিষ্ঠিত হয়; অনুরূপ প্রতিষ্ঠান স্পেনের সর্বত্র গড়ে ওঠে। গীবন স্বীকার করেন যে, মুরদের চিকিৎসা কৌশলের উপরই স্পেনের আর এক প্রান্তের ক্যাথলিক শাসকদেরও জীবন নির্ভর করতো।

স্ট্যানলি লেনপুল স্বীকার করেন যে, গ্যালেনের পর থেকে শত শত বছরের মধ্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে উন্নতি হয় আন্দালুসিয়ার চিকিৎসক ও শল্যচিকিৎসকদের আবিষ্কারের ফলে তা তদপেক্ষা অনেক অধীত-সমৃদ্ধ হয়। 

মানবেন্দ্রনাথ রায় লিখেছেন, ইসলামের আকস্মিক উত্থান এবং নাটকীয় বিস্তৃতি মানব ইতিহাসের এক চমকপ্রদ অধ্যায়। পক্ষপাতমুক্তভাবে এ সম্পর্কে অধ্যয়ন করাটা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ জ্ঞানানুসন্ধিৎসু মন নিয়ে যে-কেউ এ বিষয়ে পড়াশোনা করলে অনেক উপকৃত হতে পারেন। ইতিহাসে ইসলামের যথার্থ ভূমিকা এবং মানব সংস্কৃতিকে এ ধর্মের অবদান বর্তমান ভারতের বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের যথাযথভাবে জানাটা, যথেষ্ট রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। তিনি আরও বলেন, ইসলাম মানব-সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী বৈশিষ্ট্যের ছাপ রেখে গেছে।

ইসলামের অগ্রাভিযানে ধ্বংস ছিল কেবল একটা সম্পূরক অংশ মাত্র। নতুন নির্মাণের প্রয়োজনে জরাজীর্ণ পুরাতনকে উপড়ে ফেলেছে। সামরিক অভিযান এবং সমাজ-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক কালজয়ী সম্ভাবনার সূত্রপাত করেছিল। নতুন ধ্যান-ধারণার নতুন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষকে তাদের সরিয়ে ফেলতে হয়েছিল।

কারণ প্রাচীন পারসিক পুরোহিতদের কুসংস্কারচ্ছন্ন বিশ্বাস এবং গ্রিক পুরোহিতদের হতশ্রী পরিবেশ, পারস্য ও বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের প্রজাদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ করে দিয়েছিল।  

রক্ষণশীলতা এবং পতন

মানবেন্দ্রনাথ রায় বলেন, ইসলামের গোঁড়ামি ও উগ্রতা সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণহীন হয় যখন দেখা যায়, ইসলামের নবীর উত্তরাধিকাররা শিক্ষিত মানুষদের উচ্চকিত প্রশংসা করতেন, তাঁদের অধিকাংশের ধর্মমতের বালাই ছিল না। তাঁদের কেউ কেউ আবার প্রকাশ্যে ধর্মের বিরোধিতা করতেন।

তাঁদের শিক্ষার মর্মকথা ছিল, বুদ্ধিই মানুষের সত্য নির্ণয়ের একমাত্র মানদণ্ড। খলিফারা দ্বিধাহীন চিত্তে সব যৌক্তিক চিন্তার বিকাশকে উৎসাহিত করেছেন, ইতিহাসে যার উদাহরণ কমই পাওয়া যাবে। আফ্রিকার ফাতেমীরা এবং স্পেনের উমাইয়ারা যেমন রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ধনৈশ্বর্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রসার নিয়ে। ইতিহাসবিদ হ্যামিলটন মর্গান লিখেছেন, তখনকার মুসলিম মহান চিন্তাবিদ, শিল্পী, বিজ্ঞানী বা আবিষ্কারক সবারই ছিল সৃষ্টিশীল মন। সমসাময়িক বিজ্ঞান গবেষণায় তারা ছিলেন বহুমুখী বিদ্যায় পারদর্শী।

সত্যকে জানার জন্য তারা প্রশ্ন করতেন। বিভিন্ন ধর্মের মানুষরা সেদিন তাদের জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার অনুসারী হয়েছিলেন। কিছু রক্ষণশীল মানুষ বা চিন্তাবিদ যে ছিলেন না তা নয়। কিন্তু সবকিছুর পরেও জ্ঞানের সন্ধানে মুসলমান শাসকদের যথেষ্ট অবদান বা ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে নবম শতকে তাদের হাত ধরেই এই জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার প্রভূত বিকাশ শুরু হয়েছিল।

তিনি বলেন, মধ্যযুগের মুসলিমদের জ্ঞানবিজ্ঞানে অবদানের বিষয়টি হারিয়ে যাচ্ছে, কারণ অনেকেই এ ব্যাপারে সচেতন নন। ভিন্নদিকে মাঝখানে বহু শতক পেরিয়ে গেছে, সেই সঙ্গে আছে ভাষার প্রশ্ন। সবার কাছে আরবী ভাষা সহজবোধ্য নয়। পাশাপাশি সেই যুগের অনেক রচনা ধ্বংস হয়ে গেছে।

পাঁচশো বছর ধরে ইসলামের চিন্তাধারার যে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছিল; ইবনে রুশদ যখন তাঁর বিপ্লবী মতামতের কথা বললেন যে, বিচারবুদ্ধি বা যুক্তিই সত্যের একমাত্র উৎস, একদল রক্ষণশীল তা মানতে রাজি ছিলেন না। মঙ্গল আক্রমণকে ঘিরে সেইসব কট্টর ধর্মপ্রাণদের চাপে পড়ে কর্ডোভার সুলতান আল্ মনসুর ধর্মের কর্তৃত্বের দাবিতে সবরকম ধর্মবিরোধী মতামতের জন্য নরকাগ্নির ভয় দেখিয়ে রাজানুশাসন জারি করলেন।

ইসলাম যখন তার শ্রেষ্ঠ সম্পদ বিজ্ঞানমনস্কতাকে অস্বীকার করলো তখনই শুরু হলো তার অবনতি। কালক্রমে মানব সভ্যতার উন্নতির চালিকাশক্তি না হয়ে তার বিপরীতে হয়ে পড়লো প্রতিক্রিয়াশীল-অসহিষ্ণুতা, অজ্ঞতা আর অন্ধবিশ্বাসের অস্ত্র। শত শত বছরের স্বাধীন চিন্তার আবাসভূমি কর্ডোভার রাজসভা থেকে ইবনে রুশদ বিতাড়িত হলেন। যুক্তিবাদকে বলা হলো ধর্মদ্রোহিতা।

কালক্রমে প্রতিক্রিয়াশীলতার জয় হলো। পরিণতি এমন হলো যে, গোঁড়া মুসলমানের কাছে দর্শন হয়ে দাঁড়ালো অধার্মিকতা, অসাধুতা ও পাপাচারের শামিল। ইবনে রুশদ তাঁর আপন মানুষদের কাছে অস্বীকৃত হলেও ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকাররা  তাঁকে রাজার সম্মান দিয়েছিল।

বিশ্বাস আর বুদ্ধির মধ্যে, অজ্ঞতার স্বেচ্ছাচার আর স্বাধীন চিন্তার মধ্যে যে সংঘাত; দ্বাদশ থেকে পরবর্তী শতকগুলোতে যা ইউরোপকে টলিয়েছিল আর কাঁপিয়ে দিয়েছিল ক্যাথলিক চার্চের ভিত্তিমূলকে, তা ছিল আরব দার্শনিকদের শিক্ষারই অনুপ্রেরণা। ইবনে রুশদ ও ইবনে রুশদবাদ ৪০০ বছর ধরে ইউরোপের বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছে। 

হ্যামিলট লিখেছেন, মধ্যযুগের মুসলমানরা আট শতক থেকে ১২ শতক পর্যন্ত বিদগ্ধ সময় পার করেছে, গ্রিক চিন্তা আর জ্ঞানের যা কিছু তারা যে অনুবাদ করেছে, তা মুসলমানদের হাত ধরে পাশ্চাত্যে বা ইউরোপে পৌঁছেছে। ইউরোপ সেভাবেই সমৃদ্ধ হয়েছে জ্ঞানবিজ্ঞানে। পরবর্তীতে মঙ্গলদের আক্রমণের কারণে মুসলমানদের ধর্মনিরপেক্ষ বা মুক্তচিন্তার সমাজব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়।

সেই সময়ে ক্ষমতায় আসে নতুন রক্ষণশীলরা। তাদের হাতে মুসলিম সভ্যতা, চিন্তার স্বাধীনতা, বিজ্ঞানের অগ্রগতি, উদারনৈতিক গণতন্ত্রে চর্চার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। মুসলমানরা তারপর জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা থেকে পেছাতে পেছাতে কূপমণ্ডূক হয়ে পড়ে। বর্তমানে সে ধারাই বজায় রয়েছে। 

লেখক: শিক্ষক, সমাজ-গবেষক, নাট্যকার


সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //