অসন্তোষের ‘ব্রেক্সিট’

নানা মতৈক্যের পর যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্প্রতি ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। তবে ব্রেক্সিট কখনোই অর্থনৈতিক প্রকল্প ছিল না। এর ভাগ্য ২০১৬ সালে গণভোটের ব্যালট পেপারেই একরকম নির্ধারণ হয়ে যায়। 

মোদ্দাকথা, ইইউর সাথে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদই ‘ব্রেক্সিট’। আর বিচ্ছেদের মর্ম কেবল বিচ্ছিন্নরাই উপলব্ধি করতে পারেন। ‘রিমেইনার’ অর্থাৎ, ব্রেক্সিটের বিপক্ষে যারা ছিলেন, তারা এখনো বিষয়টি নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন। এই রিমেইনারদের অনেকের কাছে ব্রেক্সিট মানেই অভিবাসীবিরোধী অনুভূতি। এখানে অর্থনৈতিক বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক হলেও কখনোই মূল বিষয়বস্তু ছিল না। 

ইইউর সাথে বিচ্ছেদ- আবেগঘন রাজনৈতিক প্রস্তাব ছিল যুক্তরাজ্যের জন্য, অর্থনৈতিক নয়। ব্র্রিটেনের সার্বভৌমত্বের দর্শনে ব্রেক্সিট মূলত একটি আকাক্ষা, যা ব্রিটিশ মিডিয়ার প্ররোচণায় বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ব্রেক্সিটে বিভ্রান্ত ব্রিটিশরা। বিভ্রান্তির বিষয়টি এখনই নজরে আসছে না সেভাবে। এর বাস্তবতা আর কয়েক মাস বা বছরের মধ্যেই উপলব্ধি করতে পারবেন তারা। 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের কলামিস্ট মার্টিন কেটলের মতে, ব্রেক্সিট কেবল আলু বা গাড়ির দামে হেরফের নয়। গত বছরের বড়দিনের আগে ইইউর সাথে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি পর্যবেক্ষণ করতে হবে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে। মেরি ব্রেক্সমাস বা বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কিত প্রকৃত খবর গোপন করে এখন তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর চিন্তাধারা তৈরি হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে, এটি ব্রিটেনের জন্য মামুলি চুক্তি ও সাধারণ অর্থনৈতিক সংবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। ব্রেক্সিটে অর্থনীতির বিষয়টি সবসময়ই গৌণ ছিল। 

বাস্তবিক অর্থে, ব্রেক্সিট নিয়ে রিমেইনাররা তো বটেই দোলাচলে রয়েছেন সমর্থনকারীরাও। ঠিক যেন উপলব্ধি করতে পারছেন না এর মূল বিষয়বস্তুটিকে, বিশেষত অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে। আরো সহজ করে বললে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মতো বাণিজ্য চুক্তিগুলো ব্রেক্সিটের মূল উদ্দেশ্য নয়। মুক্ত বাণিজ্য ব্রেক্সিটের উদ্দেশ্য হলে ব্রিটেন একক বাজার ও কাস্টমস ইউনিয়নে অবস্থান করত। 

বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন কৃত্রিম আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে বলেছিলেন, এ চুক্তি ‘একটি বিশাল মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল’ তৈরি করবে। অথচ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল সেখানে এখনই রয়েছে। আর নতুন চুক্তির শর্তাবলি থেকে এ সম্পর্কে সামান্য ধারণাই মেলে। 

এ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সম্প্রতি যা হলো, তা ইইউর ইতিহাসে এ যাবৎকালে সবচেয়ে নিকৃষ্ট বলে বিবেচিত। ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, কথিত সার্বভৌমত্বের নামেই ব্রিটেন ইইউ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। এরপর মানব ইতিহাসে হয়তো প্রথমবারের মতো ব্যবসায়িক অংশীদারদের পৃথক করার উদ্দেশ্যে হয়েছে বাণিজ্য আলোচনা। বিষয়টি এমনিতেই ভীষণ জটিল। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে অবাস্তব কৌশল অবলম্বন করছে ব্রিটেন। আর এতে পরিস্থিতি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। 

এক্ষেত্রে অপ্রিয় সত্যিটি হলো- সব বাণিজ্য চুক্তিই পারস্পরিক সুবিধার জন্য সার্বভৌমত্ব নিয়ে সমঝোতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করবে। এটিই চুক্তির মূল অর্থ বলে মনে করেন মার্টিন কেটল। একুশ শতকে সার্বভৌমত্ব বলতে কি বোঝায়, তা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ইউরোপীয় কমিশনের (ইসি) প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লাইন বলেন, সব শক্তি জোটবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে কথা বলাই হচ্ছে সার্বভৌমত্ব। সব দিক বিবেচনা করলে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিতে নতুন কিছু নেই। ইইউ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাররা সাড়ে চার বছর আগে ভোট দিয়েছিলেন। বরিস জনসনের আমলে তাদের ভোটের ফলাফল বাস্তবায়ন হয়েছে। 

মার্টিন কেটল বলেন, ‘ব্রেক্সিট বাস্তবায়নই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর একমাত্র বিজয়। আর এ বিষয়টির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। ইইউর বিরুদ্ধে আজীবনই মিথ্যাচার করেছেন বরিস। হতে পারে এখন জনসনের প্রধানমন্ত্রিত্বের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই; কিন্তু এই বাণিজ্য চুক্তি যুক্তরাজ্য সরকারের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। ব্রেক্সিটের অর্থনীতি ও ব্রেক্সিটের রাজনীতি সবসময়ই বরিস জনসনকে তার বিপরীত দিকে টেনে নিয়ে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘জনসন নিজেকে যতটা চালাক মনে করেন, তিনি ঠিক ততটা চালাক নন। আবার বোকাও বলা যায় না তাকে। তিনি জানেন, ভৌগোলিক নৈকট্য এবং প্রতিষ্ঠিত সরবরাহ নেটওয়ার্ক ব্যবসার ক্ষেত্রে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। অফিস ফর বাজেট রেসপন্সিবিলিটর হিসাব অনুযায়ী, কোনো চুক্তি বাস্তবায়ন ব্যর্থ হলে ব্রিটেনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১৫ বছরে ৫ শতাংশের বেশি কমতে পারে। বিষয়টি জনসনের অজানা নয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানেন, কভিড-১৯ সংকট আরও গভীর হওয়ায় ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ব্যবসাগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখতে তীব্র লড়াই করছে। কোনো চুক্তি না থাকলে কোভিড-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য বড় চাপের সম্মুখীন হবে। এ পরিস্থিতি আরো কঠিন হবে, সে সম্পর্কেও ধারণা রয়েছে জনসনের।’

২০১৪ সালে এক গণভোটে যুক্তরাজ্য শাসিত স্কটল্যান্ডের ভোটাররা সামান্য ব্যবধানে ব্রিটেনে থেকে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালে গণভোটে সেখানকার প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তবে ব্রিটেনের মানুষ সামগ্রিকভাবে ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় দেয়ায় স্কটল্যান্ডবাসীরা ইইউতে থেকে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে তারা স্বাধীনতা চান কি-না, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। স্কটল্যান্ডের সরকার ও স্বাধীনতাকামীরা ব্রেক্সিটের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য থেকে পৃথক হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। বিষয়টি বরিস অগ্রাহ্য করলেও ব্রেক্সিট চুক্তি স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টার্জেনের জন্য বড়দিনের বিশেষ উপহার বলা যায়। কারণ ব্রেক্সিট কার্যকর মানেই যুক্তরাজ্য থেকে স্কটল্যান্ডকে পৃথক করার দিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেলেন তিনি। 

ব্রেক্সিট নিয়ে উন্মাদনা কমবে আগামী বছরগুলোয়। সময়ের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরো জোটবদ্ধ হওয়ার দিকে অগ্রসর হবে। বাণিজ্য চুক্তি এসবেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। জনসনের হিসাবে দলীয়-রাজনৈতিক যুক্তিও রয়েছে। এটিই তাকে সব কিছুর বিপরীত দিকে ঠেলে দেয়। তিনি শুধু যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী নন; এক অস্থির, উগ্র রক্ষণশীল নেতাও বটে। এসব বৈশিষ্ট্যই তাকে রক্ষণশীল দলের নেতা বানিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ২০১৯ সালের নির্বাচনে তিনি এগুলোর জন্যই জয়ী হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে ইইউর বাণিজ্য চুক্তিটি সমালোচনার জন্ম দেয়। স্বাভাবিক সময়ে অর্থাৎ, করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাব না থাকলেও এটি সমালোচনাপূর্ণই হতো; কিন্তু ২০২০ সালের পরিস্থিতি ব্রেক্সিটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করেছে।

বছর শেষে উৎসবের মৌসুম, উদ্বেগজনক করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার- সব কিছু ছাপিয়ে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর শিরোনাম ব্রেক্সিট ও বরিস জনসন। জনসনকে ‘কমান্ডিং লিডার’ হিসেবে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। সার্বিকভাবে আগামী দিনগুলোয় জটিলতা আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ব্রেক্সিট নিয়ে সংশয় নিষ্পত্তি না হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে হয়- ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। 

তথ্য আদান-প্রদান ও আর্থিক সেবা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ইইউ ও যুক্তরাজ্য। মাছ ধরা সংক্রান্ত চুক্তিটি পাঁচ বছর মেয়াদি। মেয়াদ শেষে কী হবে, তা নিয়ে নেই পরিকল্পনা। এছাড়া যুক্তরাজ্য ও ইইউ এখন কয়েকটি নিয়মে ঐকমত্য হলেও ভবিষ্যতে একই নিয়ম মেনে চলার প্রয়োজন হবে না। এক্ষেত্রে কোনো পক্ষ কোনো বিষয়ে পরিবর্তন চাইলে বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। যেমন- ব্রেক্সিটের পরও আগের মতোই যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলো বিনা শুল্কে ইইউ সীমান্তে পণ্য বেচাকেনা করতে পারবে। পণ্যের পরিমাণ নিয়ে তখনকার মতো এখনো কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। 

এ নিয়মে পরিবর্তন আনতে চাইলে কিছু পণ্য আমদাানিতে শুল্ক বসানোর সিদ্ধান্ত হতে পারে। এতে যুক্তরাজ্য-ইইউ সম্পর্কের ভিত নড়ে ওঠার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh