ইউক্রেনের রণক্ষেত্র কি ট্যাংকের বিদায় ঘণ্টা বাজাচ্ছে?

ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সেনাবাহিনীর বড়সংখ্যক ট্যাংক ধ্বংস হওয়ার খবরে অনেকেই চিন্তা করতে শুরু করেছেন যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ট্যাংকের বিদায় কি খুবই সন্নিকটে কি-না? বিশেষ করে পশ্চিমাদের সরবরাহকৃত ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সাফল্যের খবরে কেউ কেউ টাংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন করছেন।

সম্প্রতি মার্কিন ম্যারিন কোর ট্যাংক ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীও তাদের ট্যাংকের সংখ্যা ব্যাপক হারে কমিয়ে ফেলেছে। ডাচ সেনাবাহিনী তাদের সব ট্যাংক বিক্রি করে দিয়েছে। ডাচ প্রতিরক্ষা ওয়েবসাইট ‘ওরিক্স’-এর স্টাইন মিতজার এবং তার দল ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স হিসাব করে তথ্য দিয়েছে যে, রুশরা ইউক্রেনে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২ হাজার ৯৯২টি সামরিক গাড়ি হারিয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৫৮১টি ধ্বংস হয়েছে। অক্ষত অবস্থায় ইউক্রেনিয়ানদের হাতে পড়েছে ১ হাজার ১২১টি। এই সংখ্যার মধ্যে ট্যাংক রয়েছে ৫১৯টি, যার মধ্যে ২৬৩টি ধ্বংস হয়েছে। ২০৭টি অক্ষত অবস্থায় ধরা পড়েছে। এছাড়াও ৯৬২টি অন্যান্য সাঁজোয়া যান এর মধ্যে রয়েছে। এই বিরাটসংখ্যক সাঁজোয়া যানের ক্ষয়-ক্ষতি কি ট্যাংকের কনসেপ্ট বাতিল হয়ে যাবার কারণে, না-কি রুশদের অক্ষমতার কারণে? 

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’র ডিরেক্টর পল সার ‘বিজনেস ইনসাইডার’কে বলেছেন, তার ধারণা ট্যাংক ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে সামনের ভূমিকা থেকে পিছনের ভূমিকায় চলে যাবে। রাশিয়ার সাথে কোনো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যুদ্ধে ন্যাটোর উচিত হবে দূরপাল্লার আর্টিলারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ট্যাংকগুলোকে ঘায়েল করে এরপর নিজেদের ট্যাংক নিয়ে অগ্রসর হওয়া। ইতিহাসবিদ জেরেমি ব্ল্যাক তো মনে করেন, ভবিষ্যতে ট্যাংক আকাশে এবং ভূমিতে মনুষ্যবিহীন ড্রোনের জন্যে মাদারশিপ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ট্যাংককে ঘায়েল করার অস্ত্রগুলো যত শক্তিশালী হচ্ছে, ট্যাংক ততই ক্ষুদ্র ভূমিকায় চলে যাচ্ছে। 

তবে অনেকেই এই যুক্তির সাথে একমত নন। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘র‌্যান্ড করপোরেশন’-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক স্কট বস্টন ‘ইয়াহু নিউজ’কে বলেছেন, ট্যাংকের দিন যে শেষ হয়ে যায়নি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, ইউক্রেনিয়ানরা এখন পশ্চিমাদের কাছ থেকে ট্যাংক চাইছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেন্সকি আবেদন করেছেন, যাতে পশ্চিমারা তাদের ২০ হাজার ট্যাংকের মধ্য থেকে ১ শতাংশ ইউক্রেনকে দিয়ে দেয় বা ইউক্রেনের কাছে বিক্রি করে। তবে ইউক্রেনে রুশ ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে বেশি। কারণ রাশিয়া আক্রমণে রয়েছে। ইউক্রেন যখন আক্রমণে যাবে, তখন ইউক্রেনেরও অনেক ট্যাংক ধ্বংস হওয়ার খবর আসবে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউক্রেনের সেনারা রুশদের সাপ্লাই লাইনে হামলা করছে। যে কারণে রুশ ট্যাংক ইউনিটগুলো সময়মতো জ্বালানি পাচ্ছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, অনেক রুশ ট্যাংক তাদের সেনারা অক্ষত অবস্থায় ফেলে রেখে গিয়েছে, যেগুলো ইউক্রেনের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বস্টন বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে পদাতিক সেনাদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে বর্মাবৃত পরিবহন প্রয়োজন। অপরদিকে পদাতিক সেনারা ট্যাংকগুলোকে রক্ষা করে। এখানেই ‘কম্বাইন্ড আর্মস’- এর চিন্তাটার বাস্তবায়ন হচ্ছে। এটা না হলে যুদ্ধক্ষেত্রে অন্য সব জিনিসের মতো ট্যাংকও অদরকারি হয়ে যাবে। 

মার্কিন সেনাবাহিনীর ‘ওয়েস্ট পয়েন্ট’ একাডেমির শিক্ষক সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডেভিড জনসন ‘ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস, অস্টিন’-এর প্রতিরক্ষা ম্যাগাজিন ‘ওয়ার অন দ্য রক্স’-এর এক লেখায় ট্যাংকের ইতিহাস ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধই প্রথমবার নয় যে, ট্যাংকের বিদায়ঘণ্টা নিয়ে অনেকে কথা বলেছেন। এর আগে ১৯৭৩ সালে রুশ ‘স্যাগার’ ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে ইসরাইলের ট্যাংকগুলো বাতিল মনে হয়েছিল। ২০০৬ সালে লেবাননে হিযবুল্লাহর হাতে রুশ ‘কর্নেট’ ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা ইসরায়েলি ‘মেরকাভা’ ট্যাংক ধ্বংস হওয়ার পরেও একই কথা বলা হয়েছিল।

বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক ব্যবহারের কৌশলটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানরা উন্নত করেছিল, যেখানে ট্যাংক এবং যুদ্ধবিমান একত্রে একটা ইউনিট হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে গতি নিয়ে এসেছিল। ১৯৭৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ‘ইয়োম কিপ্পুর’ যুদ্ধে ইসরায়েলের বিমানগুলোকেও বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মোকাবেলা করতে হয়েছিল। যে কারণে তাদের বিমানগুলো ট্যাংকগুলোকে সহায়তা দিতে পারেনি। তবে ইসরাইল ‘স্যাগার’ ক্ষেপণাস্ত্রের সমাধান বের করেছিল। মর্টার, আর্টিলারি এবং পদাতিক সেনা শত্রুপক্ষের ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে ঘায়েল করে ফেলে ট্যাংকগুলোকে রক্ষা করেছে। আর ২০০৬ সালে লেবাননের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ইসরায়েল ট্যাংককে সুরক্ষা দিতে ‘ট্রফি’ নামে ‘একটিভ প্রোটেকশন সিস্টেম’ ডেভেলপ করে, যার মাধ্যমে শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র ট্যাংকে আঘাতের আগেই ধ্বংস হয়ে যাবে; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এবং আকাশ থেকে মনুষ্যবিহীন ড্রোন ট্যাংকের ওপর থেকে আক্রমণ করছে, যে অংশটায় বর্ম সবচেয়ে কম থাকে। এটার সমাধান এখনো কেউ দিতে পারেনি।

কর্নেল জনসন বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের শুরুতেই প্রশ্ন করতে হবে, পদাতিক সেনাদেরকে বর্ম দিয়ে রক্ষা করার প্রয়োজনটা এখনো রয়েছে কি-না। যদি সেটা থাকে, তাহলে ট্যাংক থাকবে। 

মার্কিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল এইচ আর ম্যাকমাস্টার ‘বিজনেস ইনসাইডার’কে বলেছেন, তিনি মনে করেন না যে, যুদ্ধক্ষেত্রে পদাতিক বাহিনীকে সহায়তা দিতে কাছে থেকে গোলা নিক্ষেপের বিষয়টি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কোনো একটা অস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত এনে দিতে পারে না। শহুরে অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সাফল্য পেতে হলে, কমান্ডারকে পদাতিক সেনার সাথে ট্যাংক, আর্টিলারি ও বিমানের সমন্বয় সাধন করতে হবে। ম্যাকমাস্টারের ধারণা, রুশরা ‘কম্বাইন্ড আর্মস’ অপারেশনে অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। তবে ‘আমেরিকান মিলিটারি ইউনিভার্সিটি’র ‘এজ’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা ওয়েস ও’ডনেল মনে করেছেন, একটা সামরিক বাহিনী ‘কম্বাইন্ড আর্মস’এ পারদর্শী হলে তাদের কাছে ট্যাংকের গুরুত্ব থাকবে। রুশরা ‘কম্বাইন্ড আর্মস’ বুঝতে পারার জন্যে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা রাখে। আর তাদের প্রযুক্তিও বেশ ভালো। হয়তো এখানে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে।

‘র‌্যান্ড’-এর স্কট বস্টন বলেছেন, ইউক্রেনে রুশ বাহিনী হয়তো ভেবেছিল যে, ইউক্রেন যুদ্ধ করবে না; আর ইউক্রেনের যথেষ্ট সংখ্যক কর্মকর্তা হয়তো রাশিয়ার পক্ষে চলে যাবে। এ কারণেই রুশরা হয়তো তাদের পরিকল্পনা করার সময়ে ভুল করেছে। যে ব্যাপারটায় সকলেই একমত তা হলো, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ট্যাংকের বিদায় এখনই হচ্ছে না। হয়তো কিছু সময়ের জন্য ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্রগুলো এগিয়ে আছে।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //