বইমেলা মানে বই উৎসব

ইংরেজি ২০২২ সাল, জানুয়ারি মাস। করোনার নতুন ভেরিয়েন্ট ‘ওমিক্রন’ সাঁই সাঁই করে ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবী জুড়ে। মানুষ ঝিমিয়েপড়া থেকে যতটাই উঠে আড়মোড়া ভাঙছিল- ঠিক ততটাই যেন স্তব্ধ হচ্ছে ফের। বাঙালি সাহসী জাতি, সামনেই ভাষার মাস, এগিয়ে আসছে আমাদের সামনে করোনাকালে আরও একটি বইমেলা।

অমর একুশের বইমেলার প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলা শুরু হলো কবি-লেখক, ছোট কাগজ সম্পাদক, চিত্রশিল্পী সবার সঙ্গে। এ পর্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছোট কাগজ ‘চিহ্ন’র সম্পাদক অধ্যাপক শহীদ ইকবাল কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এহসান হায়দার। 

ইংরেজি নতুন বছর শুরু হলো। নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাই আপনাকে। সামনেই ফেব্রুয়ারি মাস। অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হবে ভাষার এ মাসে। এবারের মেলায় আপনার নতুন কোনো গ্রন্থ প্রকাশ পাচ্ছে কি-না এ বিষয়ে বিস্তারিত বলুন...

গ্রন্থ প্রকাশ তো কোনো সিজনাল ব্যাপার না। কিছু কাজের পরিকল্পনা থাকে। আর সে পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় এবারে আমার দুটি বই হতে চলেছে। তার মধ্যে কলকাতার যাপনচিত্র প্রকাশন ইতিমধ্যেই ‘বাংলাদেশের নাট্যচর্যা (১৯৪৭-২০২১)’ গ্রন্থটি বের করে ফেলেছে। এটা মূলত বাংলাদেশের নাটক বিষয়ে তথ্যপ্রধান পুস্তক। এবিষয়ক বইয়ে বাংলাদেশের নাটকের পরিচিতি ও পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা মিলেছে। বোধ করি, এমন বই আগেও আমার ছিল, সেটির পরিমার্জন ও আপটুডেট সংস্করণ এটি। অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে আমি কাজটি করার চেষ্টা করেছি। নাটকবিষয়ক এই আমার শেষ কথাবার্তা। আমার পক্ষে এ ফিল্ডে আর অগ্রসর হওয়ার সুযোগ কম।

আমার অপর গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের কবি ও কবিতা’ নিয়ে। এরও সময় ১৯৪৭ থেকে ২০২১। এটি বেশ বড় বই। এ কাজও আগের ধারাবাহিকতায় এবার পূর্ণতা পেয়েছে। অন্তত, আমার মতো। অর্থাৎ বই করা ছিল। সেটি পূর্ণাঙ্গ এবং পরিমার্জন করে, গুরুত্ব বুঝে কবিদের শ্রেণীকরণ করে, একাডেমিক একটি এপ্রোচ দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছি। এটিও বাংলাদেশে কবিতাবিষয়ক আমার শেষ পদক্ষেপ। বইটি মাওলা ব্রাদার্স আগামী বইমেলায় আনার কথা। 

করোনা নামের বৈশ্বিক মহামারির মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো এ মেলা শুরু হবে এ বছর। গত বছরের মেলার থেকে এ মেলাকে আপনি কীভাবে দেখছেন- কেমন হতে পারে এবারের বইমেলা?

বইমেলা মানে বই উৎসব। বাংলাদেশের মতো দেশে বছরের একমাস বই নিয়ে হইচই একটা দারুণ ব্যাপার। সেটা যেরকমই হোক, যারাই করুক জনসমর্থন তো আছেই। এটা অন্যসব কিছুর ঊর্ধ্বে অবশ্যই একটা পজেটিভ ব্যাপার। সেটা হোক। গতবার তেমন জমেনি, এবার জমে উঠুক। করোনার বাস্তবতা প্রতিরোধ করেই তা সম্মুখে এগিয়ে যাক। তবে এমন বই উৎসব নিয়ে আমাদের ভেতরে ভেতরে আরও কাজ করা উচিত। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা, কলকাতা বইমেলার চেয়ে আমাদের বইমেলা আরও উন্নত হতে পারে- দেশি-বিদেশি প্রকাশকের আগমনের ও স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্য দিয়ে। থেমে থাকার সুযোগ নেই। আর এ নিয়ে রক্ষণশীল হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। 

আপনার সম্পাদিত ‘চিহ্ন’, দীর্ঘদিন যাবৎ নিয়মিতভাবে প্রকাশিত পত্রিকা। এবারের মেলায়ও নিশ্চয়ই প্রকাশ করছেন, এ পত্রিকার মাধ্যমে নতুন সাহিত্যচর্চায় ভূমিকা রাখতে পারছেন কী? 

দেখুন পত্রিকাটা আমরা অনেক দিন ধরে চালাচ্ছি, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে। সবাই খুব উদ্যোগী। আমরা পরস্পরের কাছে শিখি, পড়ি। সামগ্রিক সৃষ্টিশীলতার চর্চা চলে নিরন্তর। নিয়মিতই সেটা হয়। ফলে, বৃহত্তরতার প্রশ্ন মাথায় তেমন একটা আসে না, কাজ তো করতে হবে- শিখতে হবে, তাই কাজ করি। ফল যদি কিছু হয়, সেটা পাঠকই বিচার করবে। এ নিয়ে এখানে কথা বাড়িয়ে কী হবে!

এ সময়ের তরুণ কবি, লেখকদের মাঝে ‘চিহ্ন’ একটি পত্রিকা হিসেবে কিংবা সাহিত্যের প্রতিনিধি রূপে নতুন ভাবনার বার্তা নিয়ে পৌঁছুতে পেরেছে বলে মনে করেন?

আমরা চেষ্টা করি। সীমাবদ্ধতা তো আছেই। আর চলতি সমাজের সবকিছু নিয়েই তো আমাদের চলাফেরা। তবে গত বাইশ বছরে, ৪২টি সংখ্যায় দুই বাংলা মিলে আমাদের অর্জন ও পরিচিতি উল্লেখ করে শ্লাঘা প্রকাশেরও কিছু নেই; কিন্তু আমরা তো নিজেদের বদলাতে পেরেছি, কিছুটা অন্তত শিখতে পেরেছি। এটাই গৌরবের মনে হয়। আমাদের অনেকেই এ প্রক্রিয়ায় এগিয়ে গেছেন, ক্রমবিকশিত হয়েছেন। পাঠকরাও সেটা ধারণ ও গ্রহণ করে নিশ্চয়ই তৃপ্তি পেয়ে থাকবেন। তাঁরা যুক্ত হয়েছেন, আমাদের সঙ্গে। এটা আমাদের বড় প্রাপ্তি, কাজেরও স্বীকৃতি। 

আপনি প্রধানত প্রবন্ধ সাহিত্যের মানুষ, গত ৫০ বছরে এদেশে প্রবন্ধের ভাষা এবং চিন্তায় কী লক্ষ্য করেছেন? এ ছাড়া আমাদের ভাষা-সাহিত্যে বিশেষত প্রবন্ধ অবহেলিত অনেকাংশে এর প্রধান কারণগুলো বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

আসলে পুঁজি ও প্রযুক্তির দাপটে আমরা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছি। সমাজে প্রশ্নশীল মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। ফলে, বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে আমাদের যত নানামুখী সাফল্য ছিল- সেগুলো সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সে মাফিক উচ্চতা পায়নি। যত আমরা সময়ে এগিয়ে যাচ্ছি, ততই পুরনোদের হারাচ্ছিও; কিন্তু তাদের মাপের চেয়েও যে বড় একটা কিছু হওয়ার কথা আমরা সেটা হতে পারছি কই! শূন্যতার গর্ভ পূরণ হচ্ছে কই? এর মূল কারণ, বুদ্ধি বৃত্তিকতার পাশাপাশি সাহসী ও সৃষ্টিশীল মানুষের সংখ্যা সীমিত হয়ে আসছে। নানারকম সহজ, চাকচিক্য আর ভোগজৌলুসের হাতছানি আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। পরিশ্রমবিমুখতাও একটা বড় কারণ। বিপরীতে আছে সহজপ্রাপ্যতা, আর খ্যাতি-অমরত্বসুলভ বাসনা আমাদের গ্রাস করে ফেলেছে। প্রবন্ধ তো যুক্তি ও জ্ঞানের সৃষ্টিধর্মী রচনা। সেটি সচল ও প্রগতিশীল সমাজে না হলে জমে না। লিখছেন অনেকেই কিন্তু জমাটবদ্ধ ক্রিয়াশীল তীরবিদ্ধ ক্ষরিত গদ্য এখন কোথায়? তেমন পাই না। তবে বন্ধ্যত্ব চিরকাল থাকে না। মানুষ মুক্তি পাবেই। বাংলা ভাষায় বড় কিছু নিশ্চয়ই লেখা হবে। 

‘শিক্ষায়তনী’ এবং ‘অশিক্ষায়তনী’ এ দুই ধরনের মধ্যে প্রবন্ধ সাহিত্য বাস্তবিকভাবে কতটাই-বা নান্দনিকতা এবং মৌলিকত্ব নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছে?

আসলে কোনো কাজই খণ্ডিত নয়, সামগ্রিকতারই অংশ। আমাদের দুর্বলতা কবিতার প্রতি; কিন্তু কবিতা এখন কই! উপন্যাস-গল্প তেমন কিন্তু দৃষ্টিকাড়া নয়। সত্তর-আশির লেখকরাই তো এখনো লিখছেন। ব্যতিক্রম তো আছেই। সেটাই এখনকার প্রাণশক্তি। আর মৌলিক প্রবন্ধ যে নেই তা বলা যাবে না। তবে মনে রাখতে হবে চিন্তা সংকুচিত হলে প্রবন্ধ তিরোহিত হবেই। আমাদের প্রবন্ধচর্চায় এখন পর্যন্ত তেমন খুশির খবর নেই। দৈনিক পত্রিকার নিবন্ধ আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতির জন্য লেখা গবেষণামূলক প্রবন্ধ তো মৌলিক বা সৃষ্টিশীল কিছু নয়। সেখানটায় আমাদের এখনো বড় খামতি। যদি মোতাহের হোসেন চৌধুরীর কথা বলি- সেই মাপের প্রাবন্ধিক কোথায়? দেখি না তো!

এদেশে ছোটকাগজ বলতে যা আমরা আদর্শ মনে করি তার সব ক’টিই সাহিত্য পত্রিকা। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে- সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত ‘সুন্দরম’। পরবর্তীকালে আশির দশকে দেখা যায় ‘গাণ্ডিব’, ‘অনিন্দ্য’, ‘সংবেদ’, ‘ছাঁট কাগজের মলাট’-সহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছোটকাগজ। সম্প্রতি প্রকৃত সাহিত্য পত্রিকার তো প্রকাশনা নেই, সঙ্গে সঙ্গে ছোটকাগজও হারিয়েছে। নতুন সাহিত্য আন্দোলনে ছোটকাগজ যে ভূমিকা পালন করে, তা একদমই নেই এ মুহূর্তে বাংলা ভাষায়। এ ধরনের সংকটকে আপনি কীভাবে বিচার করবেন?

দেখুন, সংকট তো থাকবেই। সংকট উজিয়েই পত্রিকা বা কাগজ চলে। এখন অনেককিছুই ব্যবসা ও প্রাপ্তিসাপেক্ষ। এই চেতনা থেকে না বেরুলে ভালো কাজ অসম্ভব। তবে কাগজ করাটা একটা নেশা, ঘোরের ব্যাপার। সেটি সমাজ যেমন গড়ে দেয়, তেমনি ব্যক্তিও তা শুষে নেয়। এখনকার সমাজটা তেমন নয়। তবে ভালো কিছুর জন্য আশা তো করতেই হবে। 

প্রিন্ট মাধ্যমের তুলনায় এখন অনলাইনের দিকে অধিকাংশ লেখকই ঝুঁকছেন বেশি। ফলে প্রিন্ট মাধ্যমের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র ছোট কাগজের চাহিদা কমেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যখন থেকে এদেশে সহজ ব্যবহার হয়ে উঠেছে- তখন থেকেই যেন ছোট কাগজ তার কদর হারিয়েছে। ই-মাধ্যমে এখন সবই হচ্ছে। প্রত্যেক লেখক তাঁর লেখা নিজে প্রকাশ করছে। ফলে কেউ কারও তোয়াক্কা করছে না। ফেসবুক থেকে শুরু করে নিজেরাই এখন ব্লগ বানিয়ে তাতে নিজের এবং গোত্রবন্ধুর লেখা প্রকাশ করছে। একে অন্যকে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে পারছে। একে আমি ‘ই-সাহিত্য’ বা ‘তড়িৎ সাহিত্য’ বলে থাকি। কারণ হলো- পূর্বে দেখা যেত একজন লেখক বা কবি একটা লেখা তৈরির পর তা নিয়ে বারংবার পাঠ করা, সম্পাদনা এবং পুনঃর্সম্পাদনার কাজ করা একটি জরুরি বিষয় ছিল। ইন্টারনেট দুনিয়ার চটজলদি প্রকাশ হওয়া সাহিত্য মাধ্যম আসার কারণে সেটা এখন বন্ধ। এ জন্য লেখার মান নিম্ন পর্যায়ে, চর্চাও যেন আহ্লাদে পরিণত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের এই দুর্দশাকে অনেকে বলছেন চমৎকার হচ্ছে, কেউ কারও মুখাপেক্ষী নন এখন। এটা কী সাহিত্যের জন্য চমৎকৃত হওয়ার বলে মনে করেন আপনি?

না, নতুনকে তো নিতেই হবে। তার প্রসারও ঘটবে। আবার সময়ের লড়াইয়ে টিকতে না পারলে ধসেও পড়বে। আমি এটা স্বাভাবিক বলেই নিতে চাই। তবে মনুষ্যপদবাচ্য- অনেককিছুই তড়িঘড়ি, চটজলদি করে কিছু করতে পারে না। কোনো কাজই মেশিনারিজ ধরনের কিছু নয়। জ্ঞান-সৃষ্টিশীলতা রপ্ত করা, গ্রহণ করা, চিন্তা করা, তুলনা করা, ইতিহাসের অন্ধিতে যুক্ত করা ইত্যাদি নিয়ে যে ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়, তাই কাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। সেটি যে ধরনের কাজই হোক বা যে মাধ্যমেই হোক। এর বিকল্প নেই। ফলে, সেভাবেই চলাটা ভালো। তাতে মনে হয় অনেককিছু অতিক্রম করা সম্ভব হতে পারে। প্রমথ চৌধুরীর মতে, সাহিত্য তো গুরুর হাতের বেতও নয়, ছেলের হাতের খেলনাও নয়- কথাটা বুঝে নিতে হবে। সেটা যে রকম প্রযুক্তির দুনিয়াই হোক। না বুঝলে কিন্তু কিছুই থাকবে না। সাহিত্য তো হবেই না।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //