সেকালে পাকা জুয়াড়ি হিসেবে চারদিকে আমার নাম ছড়িয়ে পড়ে : হেলাল হাফিজ

একজীবনে কত বর্ণিল ও তীব্র বিষাদই না তাঁকে বিদ্ধ করল, পোড়াল। না পুড়লে নাকি সোনা খাঁটি হয় না। সন্ন্যাস, আত্মপীড়ন, নির্লিপ্তির পথে দীর্ঘকাল হাঁটলেন। সে এক নিঃসঙ্গ, কষ্টদ্রাবী শিল্পযাত্রা। কত নারী এলো জীবনে, তারপরও তৃষ্ণার শেষ নেই, নেই। তাও বুঝি শিল্পচূড়া থেকে গেল অনেকটাই অধরা! কবিতার জন্য সব ছেড়ে বিবাগী জীবন। জুয়ার টেবিল, স্কুল মাস্টারি, সাংবাদিকতা, সরকারি চাকরি প্রত্যাখ্যান, হোটেলবাস, অকৃতদার থাকা, নির্মোহ বৈরাগ্য, আলো-আঁধারি রহস্যকুয়াশা- কিছু কম নেই তাঁকে ঘিরে। 

তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, ‘হেলাল হাফিজ অল্প লিখে গল্প হয়েছেন।’ মোক্ষম ও যথার্থ মূল্যায়নই বটে। পাঠক সাধারণের অপার কৌতূহল এবং আগ্রহ এই মানুষটির জীবনযাপনের ধারা-প্রকৃতি, নানা বিষয়ে তাঁর চিন্তা-ভাবনা, পর্যবেক্ষণ, অনুভূতি সম্পর্কে। একখানি মাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ গভীর মমতা-ভালোবাসায় স্পর্শ করেছে অজস্র মানুষের হৃদয়। দোলায়িত, শিহরিত, মুগ্ধ-আপ্লুত করেছে পাঠক-মনন। সে এক আশ্চর্য নান্দনিক টান, সম্মোহনও। ৭ অক্টোবর ১৯৪৮ কবি হেলাল হাফিজের জন্মদিন। বয়স ৭৩ পেরিয়েছে। শরীর দুর্বল। শাহবাগের একটি হোটেলে বসবাস করেন এখন। শারীরিক অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। জীবনভর প্রিয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রেস ক্লাবে যাতায়াত, ইদানীং বলতে গেলে বন্ধই একপ্রকার। গত বছর ২০২১ সালে ঢাকা সিএমএইচে চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর অসুস্থতার খবর পেয়ে সিএমএইচে চিকিৎসার বন্দোবস্ত করেছিলেন। সেই সময়ের কিছু আগে নেওয়া কবির সাক্ষাৎকার এখানে প্রকাশিত হলো।

প্রথম বই যে ‘জলে আগুন জ্বলে’র পর তো দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বের হলো আপনার। যার নাম ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। সেটি ঢাকা ও কলকাতা থেকে একযোগে প্রকাশিত হয়েছে। আপনার অন্য বইগুলো সম্পর্কে বলুন।

দ্বিভাষিক তো দুটো বই বের হয়েছে এর মধ্যে। বাংলা ও ইংরেজি ভাষ্যে। একটির নাম ‘কবিতা ৭১’। অপরটির নাম ‘এক জীবনের জন্মজখম’। ইংরেজি ভাষান্তর করেছেন যুবক অনার্য নামের এক তরুণ।

দুই দেশ থেকে একযোগে একই বই প্রকাশের ঘটনা তো সাধারণ বা মামুলি কোনো ঘটনা নয়। বিরলই বলতে হয়। এ ব্যাপারে আপনার কেমন অনুভূতি?

হ্যাঁ, আনন্দ লাগছে। তবে আমি একটু আতঙ্কিতও বটে। কারণ, প্রথম বইয়ের যে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও কদর, সেটির ধারবাহিকতা যদি কোনোক্রমে ক্ষুণ্ণ হয়, তবে সেটা খুবই কষ্টের হবে। এই ভয়টা আমার মধ্যে সর্বক্ষণ কাজ করে। এই আশঙ্কা প্রবল হয়ে তাড়িয়ে ফেরে আমাকে। এর থেকে মুক্তি পাওয়া ভীষণ কঠিন ব্যাপার। হয়তো সম্ভবও নয়। 

নতুন কাব্যগ্রন্থটিতে অণুকাব্যই বেশি। আমার ধারণা, পুরো বইয়ের মধ্যে অন্তত ১৫টি কবিতা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করবে। মানুষের মুখে মুখে ফিরবে। এমনটাই আশা করছি।

দীর্ঘকাল আপনি বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কিছু সারাৎসার কী পাঠকের সঙ্গে একটুখানি শেয়ার করবেন?

সাংবাদিকতা পেশায় আমি যোগ দিই ১৯৭২ সালে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই। দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায়। আমি তখনও ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে পড়ি। ইকবাল হলে (পরে নাম রাখা হয় সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) থাকি। পূর্বদেশের সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করতেন আ ন ম গোলাম মোস্তফা। শিফট ইনচার্জ ছিলেন ডেস্কের। একাত্তরে তিনি শহীদ হন। ডাকসাইটে ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব একদিন আমাকে বললেন, দেশ তো স্বাধীন হলো। কবি, তুই কি নিবি বল? আমি উনাকে বললাম, আমি সাংবাদিকতা করতে চাই। তিনি বললেন, আচ্ছা আমি বলে দেব। আমার কবিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও পছন্দ করতেন। দুই বার রব ভাই আমাকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।

তো, আ স ম আবদুর রব ভাই পূর্বদেশ-এ আমার কথা বলে দিলেন। দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার তখন সম্পাদক ছিলেন এহতেশাম হায়দার চৌধুরী। দেখা করার পর উনি বললেন, ওকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার করে দিই। আমার ব্যাপারে কী করা যায়, তা নিয়ে জরুরি একটা মিটিং হলো। সেই মিটিংয়ে কিন্তু আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম। এমনটা কিন্তু সচরাচর ঘটে না। সেরকম নিয়মও নেই। সভায় প্রখ্যাত কবি, অবজারভার ভবনের প্রভাবশালী কর্মকর্তা আবদুল গনি হাজারী বললেন, যে ছেলে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়র মতো কবিতা লিখেছে, সে ছাত্র কিনা সেটা বিবেচনা করার দরকার নেই। হায়দার, এখুনি ওকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়ে দাও। আমাকে সাহিত্য পাতার দায়িত্ব দেয়া হলো। চার বছর সেখানে কাজ করলাম।

তারপর এলো ১৯৭৫ সাল। বাকশাল হলো। চারটি বাদে সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হলো। আমাদের পূর্বদেশও বন্ধ হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন বেকার হয়ে যাওয়া সব সাংবাদিককে চাকরি দিয়েছিলেন। আমাকেও সরকারি চাকরি অফার করা হয়েছিল। সেই চাকরি নিতে আমি রাজি হইনি। কোনো কাজকর্ম ছিল না। দেড় বছর বসে বসে বেতন পেয়েছি। একদিন এহতেশাম হায়দার চৌধুরী বললেন, তোমার তো বেতন আর হবে না। এখন কোনো চাকরিতে না গেলেই নয়। আমি উত্তরে জানালাম, সরকারি চাকরি করব না। বেতন বন্ধ হলে হোক। তাই হলো। ব্যস, পূর্ণ বেকার হয়ে গেলাম আমি। ওই তখন থেকেই আমি জাতীয় প্রেস ক্লাবের কার্ড রুমে ঢুকলাম। বেকার মানুষ। কিছু না কিছু তো করা লাগে। না হলে চলবে কেমন করে। কার্ড রুমে সেজন্য বাধ্য হয়েই ঢোকা। গত্যন্তর ছিল না কোনো। শুরু হলো আমার জুয়াড়ি জীবন। জুয়ায় আমি সব সময় জিততাম। আগে যা বেতন পেতাম, তার দশগুণ বেশি আয় রোজগার হতে লাগল আমার। এটা অনেকে বিশ্বাসই করতে চাইবেন না; কিন্তু ঘটনা সত্য।

এই যে জুয়ায় সব সময় জিততেন, এর গোপন রহস্যটা কী আসলে?

জুয়া খুবই ট্রিকি একটা খেলা। আসলে পরিমিতিবোধের একটা ব্যাপার আছে। কিছু কলাকৌশলও আছে। কোনোক্রমেই টেম্পার লুজ করলে চলবে না। লোভ সংবরণ করতে হয়। সময় মতো খেলার নেশা থেকে বিরতও হতে হয়। জুয়া খেলায় বছরের পর বছর ক্রমাগত জেতার কারণে পাকা জুয়াড়ি হিসেবে চারদিকে আমার নাম ছড়িয়ে পড়ল। 

শ্রদ্ধেয় মিন্টু ভাইয়ের কথা বলতেই হয় এ প্রসঙ্গে। চৌকস, সুপুরুষ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এনায়েতুল্লাহ খান (সাপ্তাহিক হলিডের সম্পাদক, প্রেস ক্লাবের সভাপতি, পরে মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত) তো হাসতে হাসতে মজা করে বলতেন, গ্যাম্বলিংও যে শিল্প হতে পারে, আমাদের কবি সেটা প্রমাণ করতে পেরেছে। এটা কম কথা নয়।

তারপর- আবার কবে কখন সাংবাদিকতা পেশায় ফিরে এলেন?

১৯৭৮ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত হলো দৈনিক দেশ নামের নতুন একটা দৈনিক পত্রিকা। সেই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী। দীর্ঘকাল দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক বাংলায় সাংবাদিকতা করেছেন। তিনি ফটোগ্রাফার মানু মুন্সীকে দিয়ে আমাকে খবর পাঠালেন উনার সঙ্গে দেখা করার জন্য।’৭৯ সালে আমি দৈনিক দেশ পত্রিকায় যোগদান করলাম। ১০/১১ বছর সেখানে ছিলাম। 

১৯৯০ সালে সে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। আমি যখন চাকরি করতাম, তখন জুয়াও খেলতাম। দুটোই চালিয়ে গেছি একসঙ্গে। সেই সময়ে বিখ্যাত ব্যক্তিরা কার্ডরুমের মেম্বার ছিলেন। যেমন- এবিএম মূসা, আবুল হাশেম, বিখ্যাত সংগীত পরিচালক সমর দাস, প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল আওয়াল খান, বিখ্যাত সাঁতারু ব্রজেন দাস। মতিঝিলের বেশ ক’জন নামি ব্যবসায়ীও কার্ডরুমের সদস্য ছিলেন। মোট কথা হলো, সমাজের এলিট ক্লাসের অনেকে সে সময় আসতেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের কার্ডরুমে। সে এক দারুণ জমজমাট, আকর্ষণীয় পরিবেশ ছিল সেই কালে।

জুয়া খেলায় জয়লাভের আর কোনো গোপন কথা আছে কি, আসল ট্রিক্সটা কী- ফাঁস করা যায়?

চিকন কারণ আরো একটা আছে। সবাই কার্ড খেলাকে নেয় খেলা হিসাবে। আমি নিয়েছিলাম জীবিকা হিসেবে। অবশ্য আমার সামনে অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। গ্রাসাচ্ছাদন তো করা লাগবে। উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করায় আমার সমস্ত মনোযোগ, দিবারাত্রির চিন্তাভাবনা, ধ্যান ধারণা ছিল ওই একটা বিষয়েই। তা হলো, কীভাবে জেতা যায়! এই সব মিলিয়ে ব্যাপারটা দুর্দান্তভাবে ক্লিক করে গেল।

দুই দফা বেকারত্বের পর আবার কবে ফিরলেন সাংবাদিকতা পেশায়?

সাংবাদিক হিসেবে আমি সাহিত্য পাতা সম্পাদনার কাজেই নিয়োজিত ছিলাম। সংবাদপত্রে ওই পদ একটাই। একাধিক নেই। আমি যদি ডেস্কে বা রিপোর্টিংয়ে থাকতাম, তাহলে কাজ পাওয়ার স্কোপ বেশি থাকত। সে কারণে অনেকদিন বেকার থাকতে হলো। একরকম বাধ্য হয়েই। কেউ আমাকে ডাকে না। আমার অবশ্য চাকরি করবার কোনো দরকারও নাই। জুয়া খেলে প্রচুর ইনকাম হয় আমার। রাজকীয় জীবন যাপন করতে পারি।

কবি হেলাল হাফিজের সঙ্গে লেখক হাসান হাফিজ

ও, এর মধ্যে ১৯৯৮ সালে আমি একটা আমন্ত্রণ পেলাম আমেরিকা সফরের। ছয় মাসের মতো ছিলাম আমেরিকায়। মূল অনুষ্ঠান ছিল মাত্র দিন তিনেকের। তবে আমি বেশ কিছুদিন থেকে গেলাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এখানে ওখানে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ালাম। আমেরিকা থেকে ফেরার পর একটা ঘটনা ঘটে গেল। প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম মূসা যোগ দিলেন দৈনিক যুগান্তরে। সম্পাদক হিসেবে তিনি ওই পত্রিকার দায়িত্ব নিলেন। যুগান্তরে জয়েন করেই তিনি আমাকে ডেকে বললেন, কালই আমার অফিসে চলে আসিস। এ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর হিসেবে আমাকে মূসা ভাই নিয়োগ দিলেন যুগান্তরে। কিছুদিন আমি ফিচার সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছি সেখানে। ৭/৮ বছর পর যুগান্তর ছেড়ে দিলাম। তারপর কেউ আর ডাকেনি।

দীর্ঘদিন কোনো চাকরি বাকরি নেই। এখন তাহলে কীভাবে চলে আপনার? হোটেল ভাড়া, দৈনন্দিন ব্যয় মেটান কেমন করে?

জানো বোধহয়, মিরপুরের সাংবাদিক কলোনিতে আমার এক খণ্ড জমি ছিল। সেটা ধরে রাখতে পারিনি। বেচে দিয়েছি। এ ছাড়া পৈতৃক বাড়ির সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ টাকা, চাকরির কিছু টাকা দিয়ে যেসব সঞ্চয়পত্র কিনেছি, তা থেকে পাওয়া টাকায় কোনোমতে টেনেটুনে চলে। আমি নির্জলা একা একটা মানুষ। ঘর সংসার, দায় দায়িত্ব বলতে কিছু নাই। হোটেল ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া সব মিলে হাজার বিশেক টাকায় চলে যায়। ওষুধপত্র, জামা-কাপড়ের খরচপত্রও আছে। তবে শান্তির কথা হলো এই, মোটামুটি চলে যায় আমার। কোনো ধার দেনা করতে হয় না।

দৈনিক পত্রিকায় সাহিত্য পাতা সম্পাদনায় আপনার অর্জিত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আরো কিছু জানতে চাচ্ছিলাম

কর্মজীবনে সব সময়ে আমার একমাত্র আইডল ছিলেন কবি আহসান হাবীব। দৈনিক পাকিস্তান ও পরে দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক। আদর্শ সাহিত্য সম্পাদক বলতে পারি তাঁকে। হুবহু তাঁকে অনুসরণের চেষ্টা করেছি আমি। সব সময়। হোক না দূর মফস্বলের বাসিন্দা, নবীন যার লেখায়ই একটু সম্ভাবনার আভাস পেতেন হাবীব ভাই, তাকে গভীর আন্তরিকতায় শুশ্রূষা পরামর্শ দিয়ে পরিচর্যা করতেন। প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিতেন। সে এক বিরল গুণ নিঃসন্দেহে। আজকাল কেউ এটা করে না। 

আমিও আমার সম্পাদিত পাতায় নতুন লেখকদের লেখাই বেশি পরিমাণে ছেপেছি। সেই যুগে তো মোবাইল ফোনের মতো আধুনিক ও ত্বড়িৎ সুযোগ-সুবিধা বলতে কিছু ছিল না। ল্যান্ড ফোনের চৌহদ্দি, পরিধি, ব্যবহারও ছিল অতি সীমিত। চিঠি ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে পাঁচটি চিঠির জবাব দিতাম আমি। সেসব চিঠি পেয়ে যে কত আনন্দ পেত প্রাপকরা, তা বলবার মতো নয়। এমন ধারার কাজ একমাত্র হাবীব ভাই-ই করতেন।

মনে পড়ে, অনেক বিশেষ সংখ্যায় বিখ্যাত কবির লেখার পাশাপাশি তরুণের লেখাও আমি ছেপেছি। নিজে দায়িত্ব নিয়ে-অথরিটি নিয়ে ছেপেছি। কবি জসীম উদ্দীনের মতো গুণী লেখকের আত্মজৈবনিক লেখা আমি পূর্বদেশ-এর সাহিত্য পাতায় ধারাবাহিকভাবে ছেপেছি। লেখা আনার জন্য তোমাকেও আমি কমলাপুরে কবির বাসায় পাঠিয়েছিলাম। তুমি তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলে, মনে পড়ে কি? সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে আমার যা অর্জন, তা নিতান্ত ফ্যালনা নয় হে। দেশের অনেক বিশিষ্ট লেখকের সঙ্গে আমার হৃদ্যতা, সখ্য, নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে এর ফলে। তাদের মধ্যে আছেন সিকান্দার আবু জাফর, ফয়েজ আহমদ, হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, ওয়াহিদুল হক, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ফজল শাহাবুদ্দীন, মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্, সানাউল্লাহ নূরী প্রমুখ। খুব সহজে স্বাচ্ছন্দ্যে আমি তাঁদের সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছি। অনায়াসে তাঁদের প্রীতিধন্য হতে পেরেছি। এই সংযুক্ততার সুযোগ সৃষ্টি সম্ভবপর হয়েছে কিন্তু সাহিত্য পাতা সম্পাদনার সুবাদেই।

প্রেমে পড়, ব্যর্থ হও। তারপর কবিতা লেখো- কবি হওয়ার জন্য এইমত দাওয়াই বাৎলে দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এই ফর্মূলা সম্পর্কে আপনার কী অভিমত?

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কেউ কেউ কবি হতে পারে। আবার কবিতায় ব্যর্থ হয়েও কেউ কেউ প্রেমিক হতে পারেন। আমি দুই পর্যায়েই সফল। আমার নারীভাগ্য বেশ ভালো। অনেক মানুষের ভালোবাসা আমি পেয়েছি। সুতরাং ব্যর্থতাকে কোনোভাবেই ব্যর্থতা বলতে চাই না। ভালোবাসা সব সময়েই দ্বিপক্ষীয় একটা ব্যাপার। প্রকৃত যে কবি, সে ব্যর্থতাকে শিল্পে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। এটাই হলো চূড়ান্ত কথা।

প্রথম ঢাকা এসেছিলেন কবে? সেসব স্মৃতি কী মনে পড়ে?

প্রথম ঢাকায় আসি ১৯৬৫ সালে। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে বেড়াতে আসা। আমার বড় ভাই দুলাল হাফিজ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পড়তেন। থাকতেন ঢাকা হলে, এখন যেটার নাম ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল। আট দশ দিন ছিলাম তখন। সেই সময়ে ক্যারোলিন শার্ট চালু হয়েছিল। খুবই দামী কাপড়। সেটাই তখন চলতি ফ্যাশন। বড়ভাই আমাকে ক্যারোলিনের শার্ট কিনে দিয়েছিলেন। সেই শার্ট পেয়ে যে কী আনন্দ আমার হয়েছিল, বলে বোঝাতে পারব না।

পরে আবার কখন এলেন ঢাকায়?

নেত্রকোনা থেকে আইএসসি পাস করে চলে এলাম ঢাকায়। ডাক্তারি পড়বার ইচ্ছা ছিল। সে কারণেই সায়েন্স পড়া। যদিও তেমন ভালো ছাত্র আমি ছিলাম না। পরে সিদ্ধান্ত পাল্টাই। মনে হলো, মুখস্ত বিদ্যার ওপর ভর করে ডাক্তারি পড়তে হবে। পড়াশোনার চাপ তীব্র। লেখালেখির পোকা মাথায় ঢুকে গেছে এরই মধ্যে। মনে ও মগজে লেখার চিন্তা সব সময়। ডাক্তারি পড়লে তো সময় বিশেষ পাওয়া যাবে না। লেখালেখি করা সম্ভব হবে না, যেমনটা চাই।

তারপর কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স পড়তে এলেন?

বাংলা বিভাগে আবেদন করলাম ভর্তি হওয়ার জন্য। মৌখিক সাক্ষাৎকারে বাঘা বাঘা সব শিক্ষকদের মুখোমুখি হতে হলো। বিভাগীয় প্রধান ছিলেন ডাকসাইটে প্রফেসর ড. মুহম্মদ আবদুল হাই। বোর্ডে আরো ছিলেন মুনীর চৌধুরী (একাত্তরে শহীদ), প্রফেসর ড. আহমদ শরীফ, একাত্তরে শহীদ প্রফেসর মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, প্রফেসর ড. রফিকুল ইসলাম প্রমুখ। মুনীর স্যার বললেন, তুমি তো সায়েন্স থেকে এসেছো। এই বিভাগে তো শেষ পর্যন্ত থাকবে না। আমি জানতাম, মুনীর চৌধুরী স্যার নিজেও ইন্টারে সায়েন্স পড়েছেন। সাহস করে সেই কথা উনাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম। শুনে সবাই হেসে ফেললেন। ব্যস, ভর্তি হয়ে গেল আমার।

বাংলায় অনার্স পড়া তো একটানা এগোয়নি আপনার। মাঝে স্থায়ী একটা ছেদ পড়েছিল, তাই তো?

হ্যাঁ। বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা আনি না। অভাবে অনটনে দিন যায়। ঠিক করলাম, চাকরি করবো। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখলাম, মুন্সীগঞ্জের এক স্কুলে শিক্ষক নেবে। আমার এক আত্মীয় তখন মুন্সীগঞ্জে চাকরি করতেন। তিনি এ ব্যাপারে সহায়তা করলেন আমাকে। ওই স্কুলে যে টিচার চেয়েছিল, তার মধ্যে বলা হয়েছিল স্কাউটিং থাকলে ভালো। আমার স্কাউটিং ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। সেটা বেশ কাজে দেয় তখন। ব্যস, চাকরি হয়ে গেল। মাস্টারি করলাম মুন্সীগঞ্জে। বছর খানেক। এর মধ্যে এক বাড়িতে লজিংও থাকলাম। ছাত্র পড়ানোর বিনিময়ে থাকা-খাওয়া। উইক এন্ডে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকায় চলে আসতাম। মুন্সীগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত লঞ্চে যাতায়াত করতে হতো। সড়ক যোগাযোগ তখন ছিল না। সপ্তাহান্তে ঢাকায় এসে থাকতাম হলে, নিজের রুমে। এইভাবেই চললো। বছর খানেক পর ছেড়ে দিলাম মাস্টারি।

তারপর কী করলেন? পড়াশোনায় আবারও ফিরে এলেন?

পরের বছর আবারও নতুন করে ভর্তি হতে হলো। অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী কিন্তু মনে রেখেছেন আমার কথা। দেখেই চিনলেন। অফিস কর্মকর্তা আবু তালেবকে ডেকে বললেন, দেখেন তো এই ছেলে গত বছর ভর্তি হয়েছিল না? যা হোক, আর ডিসকন্টিনিউ করব না, এই শর্তে আমাকে ফের ভর্তি করে নেওয়া হলো। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে যখন পড়ি, তখন সেই বিখ্যাত কবিতাটি লিখলাম আমি। যার নাম ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’। তারপর তো ইতিহাসের অংশই হয়ে গেলাম বলতে গেলে।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //