মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত ছিল। সরকারের উচিত হবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করে কর ব্যবস্থার সংস্কার করা। নির্ধারণ করা রাজস্ব আদায়ও এনবিআরের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- হামিদ সরকার।

প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে কী কী চ্যালেঞ্জ মনে করছেন?

এবারের বাজেট মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় অনেক ছোট হয়ে গেছে। এটা ১৩ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যান্য বছর এটা সাধারণত প্রায় ১৮ শতাংশ থাকে। আর চলতি ২০২১-২২ অর্থবছর এটা ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। সে হিসেবে প্রস্তাবিত বাজেট সবচেয়ে ছোট বাজেট। তবে এ ছোট বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রাজস্ব ঘাটতি মেটানো কঠিন হবে। কারণ চলতি বছরের ঘাটতি সামনের বছরে যুক্ত হবে। এই অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি আছে। যদিও সরকার এটা মানতে নারাজ। ফলে রাজস্ব ঘাটতি মেটানো কঠিন হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার বলছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে প্রত্যক্ষ কর বাবদ তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে; কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে বরাবরের মতো এবারও রাজস্ব ঘাটতি হবে। সেটি প্রতিবছরই হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। এ ছাড়া প্রণোদনার অর্থ মেটানোও বেশ কঠিন হতে পারে। এই খাতে আগামী বাজেটে ৮২ হাজার কোটি টাকা লাগবে, যা পদ্মা সেতুর নির্মাণের আড়াই গুণ পরিমাণ। বর্তমানে আমরা মূল্যস্ফীতি সংক্রান্ত যে সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, আগামীতে বিশ্ব পরিস্থিতি এবং বিশ্ববাজারে দ্রব্যের মূল্য কেমন হবে সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে। তাই বিশাল পরিমাণ প্রণোদনার অর্থ জোগাড় করা সরকারের জন্য দুরূহ ব্যাপার হবে। 

বাজেটে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ আছে। প্রথমত হচ্ছে, রাজস্ব কম আহরণ। যেটা প্রতিবছরই হয়, সামনের দিনেও হবে। এ ব্যাপারে বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা আমার চোখে পড়েনি। এ ছাড়া মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেই। রাজস্ব বোর্ডের কোনো সংস্কারের কথাও বলা হয়নি। বাজেটের ঘাটতি দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু বর্তমানে এখানে দুটি জিনিস করা হয়েছে। 

এই বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বিদেশ থেকে ১০-১২ বিলিয়ন ডলার অর্থের প্রয়োজন হবে। কীভাবে এটা সংস্থান হবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো উল্লেখ নেই বাজেটে। ওই অর্থ বিদেশ থেকে বিনিয়োগ, না ঋণ হিসেবে নেওয়া হবে সেটাও স্পষ্ট নয়। আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু বর্তমানে দেশের মুদ্রাবাজার অস্থির অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আগামীতে অবস্থা কেমন হয় সেটার উপর নির্ভর করছে অভ্যন্তরীণ এই বাজার থেকে কতটা অর্থ নেওয়া যাবে। বাজেট বাস্তবায়ন এসব বিবেচনায় বলা যায় চ্যালেঞ্জও বড়।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিশাল ঘাটতি পূরণ সরকারের পক্ষে কতটা সম্ভব হবে বলে মনে করেন? 

ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে আনবে, সেটা ভালো কথা; কিন্তু এই টাকার পরিমাণ ১১ বিলিয়ন ডলার। দুই বছর আগে যার পরিমাণ ছিল ছয় বিলিয়ন ডলার। ঘাটতি পূরণে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যে অর্থ সংগ্রহ করার কথা বলা হয়েছে, সে জায়গায় ব্যাংকিং খাত প্রস্তুত কি-না? ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে তারল্য সংকট আছে। তাহলে কী করে সরকার ব্যাংক থেকে টাকা নেবে- এটাই আমার কাছে বড় প্রশ্ন। 

বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন? 

অভ্যন্তরীণ খাত বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণনির্ভরতা নেতিবাচক। এভাবে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ক্রমবর্ধমান পরিমাণে ঋণ নেওয়া দুটি দিক থেকে বিপজ্জনক। প্রথমত সরকারকে ঋণ দিলে ব্যাংকগুলো ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারবে। কারণ এই ঋণ খেলাপি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রভিশনও করতে হবে না। 

বর্তমানে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে বেসরকারি খাতে ঋণ দিয়ে থাকে। এখন ব্যাংকগুলো ৮ শতাংশ কিংবা সাড়ে ৭ শতাংশ সুদেও যদি সরকারকে ঋণ দেয়, তাহলেও তারাই লাভবান হবে। কারণ সরকারকে ঋণ দিলে ঝুঁকি নেই। আর সরকারের ঋণ চাহিদা থাকায় বেসরকারি খাতে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ মিলবে না। এতে ঋণে সুদের হার বেড়ে যেতে পারে। অনেক ব্যাংকই এই সুযোগ নিতে পারে। বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে চাইবে না। তখন বেসরকারি খাত বিপদে পড়ে যাবে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাবে এবং বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।  

বিদেশে পাচারকৃত টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার সুযাগ দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত ও নৈতিক?

৭ থেকে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে বিদেশে পাচার করা অর্থ বিনা প্রশ্নে দেশে আনার সুযোগ দেওয়াটাই অনৈতিক। এ ধরনের সুযোগ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পাশাপাশি এই সুযোগ কেউ কাজে লাগাবে বলেও আমার মনে হয় না। মানুষ এত বোকা না যে টাকা পাচার করে সেই টাকা আবার দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সম্ভব? 

রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকলে সেটি অর্জন করা সম্ভব হবে না। সরকার বলছে, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ শতাংশ করা হয়েছিল, সেখান থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। আমি মনে করি, সাড়ে ৭ অর্জন করা সম্ভব হবে না। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে চার লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার কারণে এসব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।  

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ যথেষ্ট কিনা? ভর্র্তুকি কতটা যৌক্তিক? মূল্যস্ফীতি ধরে রাখা কতটা সম্ভব হবে? 

বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ আরও অনেক বাড়ানো উচিত ছিল। প্রতিবন্ধী ভাতা একশ টাকা বাড়ানো হয়েছে এটা ভালো। পাশাপাশি বয়স্ক ভাতা ৫শ টাকা থেকে ৭শ টাকা করা হলে ভালো হতো। তবে এখানে এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেই হতো। কারণ ৫শ টাকায় একজন মানুষের বর্তমানে কিছুই হয় না। রেমিট্যান্স খাতে নগদ আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। গত কয়েক মাস ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। রেমিট্যান্স খাতে সরকারের সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি লাগছে। এই টাকা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হলে বেশি কাজে লাগত। 

ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। অনিশ্চয়তা অনেক জায়গাতেই আছে। যেমন- সাবসিডিতে অনিশ্চয়তা আছে। এর জন্য বাজেটে ৮২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বাবদ রাখার কথা বলা হয়েছে, যা আড়াইটা পদ্মা সেতুর পরিমাণ অর্থ আমরা সাবসিডিতে দিচ্ছি। তারপরও এটা বেড়ে যেতে পারে। সারে ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেশি দেওয়া হয়েছে। একশ টাকা কেজি দরে সার কিনে ১৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করাটা যৌক্তিক হতে পারে না। সারে ভর্তুকির পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে আনা যেতে পারত। কারণ বর্তমানে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। এখন প্রতি মণ ধানের দাম ১২শ থেকে ১৩শ টাকা।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাটা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ সম্ভব হবে না। বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পরিষ্কার কিছু বলা নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এখানে মুদ্রানীতি কীভাবে ব্যবহার করবে সরকার, এটাও বাজেটে বলা হয়নি। সরকার এক্সচেঞ্জ রেটকে কীভাবে সাপোর্ট দিবে, মূলস্ফীতি কীভাবে কমিয়ে আনবে, সেগুলো একেবারেই সুস্পষ্ট করা হয়নি। এ কারণে এই বাজেটের ম্যাক্রো অবজেক্টিভগুলো নিয়ে আমাদের অনেক সন্দেহ আছে।

করপোরেট কর হার কমানো কতটা যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করছেন? ব্যক্তি করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো উচিত ছিল কিনা? 

ডলারের দাম দ্রুত বাড়ছে। এই অবস্থায় বিলাসবহুল পণ্যের চাহিদা আমাদের কিছুটা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। আবার দেশীয় শিল্প সম্প্রসারণ ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে করপোরেট কর কমানো হয়েছে। এতে করে দেশীয় শিল্প উপকৃত হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। ফলে সরবরাহ বাড়বে। এই জায়গাগুলোতে বাজেট ভালো হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে করপোরেট করহার কমানো সঠিক সিদ্ধান্ত। সব ধরনের কোম্পানির কর আড়াই শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। 

আর ব্যক্তি আয়কর সীমা বাড়ানোর প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক গড় আয়ের তুলনায় এখনো করমুক্ত ব্যক্তি আয়সীমা বেশি আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বার্ষিক মাথাপিছু আয়ের তুলনায় তাদের করমুক্ত আয়সীমা বাংলাদেশের চেয়ে কম।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //