পূর্ববর্তী কবিরা বেশি কাব্য সচেতন ছিলেন : শামীম রফিক

কবি শামীম রফিক পেশায় একজন ব্যাংকার। তিনি সঙ্গবিমুখ, কর্মমুখর, সৃষ্টিশীল এবং উদ্যমী মানুষ। যিনি একাধারে কবি, গবেষক এবং ছোটকাগজ সম্পাদক। তিনি দীর্ঘদিন যাবত লিখছেন কবিতা, প্রবন্ধ ও ছোটগল্প। এছাড়া তিনি সাহিত্যের নানা বিষয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধও লেখেন। সম্পাদনা করেন ছোটকাগজ ‘অরণ্য’। শামীম রফিক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতক,  স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন। তিনি পিএইচ ডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন সিকদার আমিনুল হকের কবিতা নিয়ে। তার রচিত গ্রন্থ প্রায় ত্রিশটি। সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন তার লেখালেখি ও সমকালিন সাহিত্যচিন্তা নিয়ে-যার মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে সাহিত্যের দলাদলি, অলেখকী মনোভাব, দশকী সিন্ডিকেটসহ নানামুখি সাহিত্যিকদের দীনতা। তিনি সাহিত্যে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২০ সালে ‘বগুড়া লেখক চক্র’ পুরস্কারে ভূষিত হন। কবি ও গবেষক শামীম রফিকের সঙ্গে এ আড্ডায় ছিলেন সাম্প্রতিক দেশকালের সাহিত্য সম্পাদক এহসান হায়দার।

প্রশ্ন : আপনি তো কবি, আপনার নিকট কবিতার একাল-সেকাল বিষয়ে জানতে চাই?

উত্তর : সমকালের কবিরা কেমন এবং সেকালের কবিরা কেমন ছিলেন এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচ্য বিষয়। সব কালের কবিরাই কবিতা লিখেছেন। যেখানে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে তাদের কাল ও যাপিত জীবন। সব কালের কবিদের-ই কবিতা  লিখতে পারার চেয়েও জরুরী হলো কবিতা বুঝতে পারা। সব কবিরাই কবিতা লেখেন; কিন্তু অধিকাংশ কবিই কবিতা বুঝেন না। কবিতা বুঝতে হলে সর্বাগ্রে বুঝতে হবে, কবিতা কি, কবিতায় কি থাকতে হয়, কবিতার বিষয়বস্তুই বা কি। কবিতা তো সুন্দরীতম সুন্দরী নারীর থেকেও সুন্দরী ও রূপবতী। কবিতা কীভাবে সুন্দরী ও রূপবতী অথবা মানবিক হয়ে ওঠে- সেটা শিখে নিতে হবে। সে কবিতা নির্মাণে কবিকে সৌন্দর্য্যবোধ অন্তরে ধারণ করতে হয়, লালন করতে হয় এবং অর্জন করতে হয়। সব মিলিয়ে অর্জনটাই হলো আসল কথা। স্বর্ণালঙ্কার যেমন একজন নারীর শোভা বা সৌন্দর্য্য বর্ধন করে। কবিতার অলঙ্কারও তেমনিভাবে কবিতাকে রূপসী ও সৌন্দর্য্যমণ্ডিত করে তোলে। 

সমকালিন কবিদের চেয়ে পূর্ববর্তী কবিরা আরো বেশি কাব্য সচেতন ছিলেন, সাহিত্য তথা কবিতার প্রতি তাদের গভীর মমত্ববোধ ও দায়বোধ ছিল। তারা অনুজদের প্রতি ছিলেন দায়বদ্ধ, অগ্রজদের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। তারা দেশের কথা ভাবতেন, দেশের মানুষের কথা ভাবতেন, তাদের দুঃখ-বেদনার কথা ভাবতেন, নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে হলেও মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তারা দুর্ভিক্ষের কষ্ট দেখে পিছিয়ে আসেননি বা আপোষ করেননি, পরাধীনতার বঞ্চনা থেকে পিছপা হননি। তারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন, ষাটের দশকের নিরব দুর্ভিক্ষে একবেলা দু’মুটো মোটাভাতের জন্য হাহাকার করেছেন; কিন্তু থেমে যাননি। স্বাধীনতার যুদ্ধে দেশ মাতৃকতার কথা ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, জীবন দিতে দ্বিধা করেননি। আজকাল কবিদের মধ্যে সেই ডেডিকেশন দেখা যায় না। আজকালকার কবিরা অন্যভাবে অধিকতর দক্ষ। তারা অন্যভাবে দলবদ্ধ, গোষ্ঠীস্বার্থে অন্ধ। তারা নির্বিদ্বায় কবিতা ছেড়ে দিতে পারেন, অর্থের বিনিময়ে কবিতা বিক্রি করতেও দ্বিধা করেন না। এখনকার কবিরা সম্পদমুখী, অর্থলোভী, কর্পোরেট হাউসের তাবেদার হয়ে পুঁজিপতি হতে চান। কত জনকেই তো দেখেছি ক্ষমতার তাবেদার হয়ে কবিত্বকে বাড়িয়েছেন, সব রকমের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন, ভালো চাকুরি নিয়েছেন, বাড়ী-গাড়ি করেছেন, আরও অনেকরকম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে কোনো এক দশককেই শুধু নিয়ন্ত্রণ করছেন না, টোটাল সাহিত্যাঙ্গনের উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। তাদের দল আছে, গোষ্ঠী আছে, পোষা সাহিত্যিক আছে, অর্থ লগ্নীকারী সাহিত্যমোদী আছে, সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় প্রতিনিধি বসিয়ে তারা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তারা নিয়মিত পুরস্কার পান, তাদের হাতে বা গ্রুপে পুরস্কার আছে, সেই পুরস্কার দিয়ে আবার নতুন লেখক তৈরি করেন। অর্থ উপার্জন তাদের হয়, তারা যাদেরকে সমর্থন করেন। অপর গ্রুপরা তাদেরকে সুবিধা দেন এবং তারাও আবার অপর গ্রুপকে সুবিধা দেন। তাদের বাইরে যেন আর কেউ নেই, কারো কোনো যোগ্যতা নেই। গ্রুপের বাইরের হলে পুরস্কার পাওয়া যায় না, সুবিধাভোগী হওয়া যায় না। তাদের দল বর্হিভূত অন্যরা নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত। কবিতার সেকাল-একাল এভাবেই সময়স্রোতে প্রবাহিত হচ্ছে। যারা সত্যিকার অর্থে কাজ করছেন দলবাজি না করে, তাদের প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা অনেক কষ্টসাধ্য।

সাহিত্যেরকাল একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কালের সাথে কবিতারও পরিবর্তন ঘটে। যুদ্ধের কাল, দুর্ভিক্ষের কাল, পরাধীনতার কাল, বিদ্রোহের কাল, স্বাধীন দেশেও পরাধীনতার কাল আর আজকের কাল তো এককাল বা একরকম কাল নয়। তখনকার যাপিতজীবন আর আজকের যাপিতজীবনও এক নয়। কবিতা যেহেতু যাপিতজীবনের প্রতীক সুতরাং যাপিতজীবনের পরিবর্তনের সাথে সাথে কবিতার কনটেন্টও পরিবর্তিত হয়। কবিতার অবয়ব, ভাষা ও গল্পের যত পরিবর্তনই হোক-গাঁথুনি বা নির্মাণশৈলি অথবা অলঙ্করণ এক রকমই থাকে। 

যাপিত জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী কবিমনকে আলোড়িত করে, ফলতঃ কবি মনে যে ভাবের সঞ্চার হয়, তা থেকেই কবিতার জন্ম হয়। যেহেতু পৃথিবীর সকল কাল এক রকম নয় এবং ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীও এক রকম নয়। তাই কবিতার ধরনেরও পরিবর্তন হয়। আমার মনে হয়, সেকালে যতটা কবিতার চর্চা হতো এবং কবিরা কবিতার প্রতি যতটা সিরিয়াস ছিলেন, আজকাল কবিরা কবিতার প্রতি ততটা সিরিয়াস নন।    

প্রশ্ন : কবিতা এবং গবেষণা দুটি বিষয়ে সিদ্ধহস্ত আপনি; কিন্তু কোনটিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

উত্তর: স্বাচ্ছন্দ্যবোধের জায়গা অবশ্যই কবিতা। কবিতা ভালোলাগা, ভালোবাসা ও স্বস্তির জায়গা। কবিতাবিহীন জীবনের মূল্য শূন্য।কবিতা ও গবেষণা দুটোই খুব কষ্টসাধ্য কাজ; কিন্তু তদুপরি কবিতা অনেকটা আনন্দের কষ্ট। গবেষণা হলো-To find a Black Cat in a Dark Room. গবেষণার কষ্টে কবিতার মতো ভালোলাগা ও ভালোবাসা থাকে না। গবেষণার কাজগুলো যতটা না ভালোবেসে করেছি, তারচেয়ে বেশি বাধ্য হয়ে করেছি। অবশ্য পুরোপুরি সে কথাও বলা যায় না। আমার প্রথম গবেষণার বই, ‘জীবনানন্দের কাব্যে নারী অন্বেষণ’ যখন লিখেছি তখনও পিএইচডি গবেষণা শুরু করিনি; কিন্তু গবেষণাটা রক্তের মাঝে ছিল। নিজে গবেষণা করতে গিয়ে যেসব সমস্যার সন্মুখীন হয়েছি, সেখান থেকেই গবেষণার আগ্রহটা অধিকতর বেড়েছে বা প্রয়োজন মনে করেছি। কবিতা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে প্রথমেই আমার মধ্যে কবিতাটাই এলোমেলো হয়ে যায়। কবিতার রূপ বৈচিত্র্য কি বা কবিতার অলঙ্কার কি বা কবিতার প্রকরণ কি বা কবিতার শৈলী কি বা কবিতায় প্রকরণের প্রয়োজনীয়তা কি-এসব প্রশ্ন এসেছে এবং বুঝতে শিখেছি। শুধু কবিতা লিখলেই হয় না। কবিতা শুধুমাত্র আবেগের বিষয় নয়। আগেই বলেছি কবিতা লেখার চেয়ে বুঝতে পারার বিষয়টাই বেশি জরুরী। কবিতায় মাধুর্য্য যেমন থাকতে হয়, তেমনি কবিতায় বিচিত্রতা থাকতে হয়, গঠনগত বৈচিত্র্য থাকতে হয়, বিষয়গত বৈচিত্র্য থাকতে হয়, শৈলী থাকতে হয়, সৌন্দর্য্যবোধ থাকতে হয়, অর্থ থাকতে হয়। কবিতা হৃদয়কে যেভাবে এবং যতভাবে প্রভাবিত করে, অন্য কোনো শিল্প বা সাহিত্য সেভাবে প্রভাবিত করে না। কবিতা হলো পরিপূর্ণ হৃদয় উৎসারিত ভাবপ্রকাশ। অনেকে শুধু প্রেম প্রেম বা হৃদয়তান্দ্রিক ঘটনাবলিকেই কবিতা মনে করেন। আর এ বিষয়টা মানুষের হৃদয়কে বেশি স্পর্শ করে; কিন্তু কবিতা হলো পৃথিবীর সকল বিষয়কেন্দ্রিক একটি সাহিত্য মাধ্যম। সেখানে প্রেম একটি বিষয়মাত্র। পৃথিবীতে এমন কোনো বিষয় নেই যা কবিতার অন্তর্ভূক্ত বিষয় নয়। তাই একজন কবিকে পৃথিবীর সকল বিষয়ে কমবেশি জ্ঞান রাখতে হয়। এটা যেমন কষ্টের, তেমনি চ্যালেঞ্জিং।

প্রশ্ন. সাহিত্যাঙ্গনে অত্যন্ত চমৎকার একটি সৌহার্দ্যপূর্ন পরিবেশ থাকবার কথা; কিন্তু মাঝে মাঝে লক্ষ্য করা যায় এ অঙ্গন অতোটা স্বচ্ছ নয়, অস্বচ্ছ এবং বিষবাষ্পেপূর্ণ। এখানে অসততা, কুটিলতা, হীনমন্যতা, দলাদলি এবং ফাঁপাবুলিতে পরিপূর্ণ থাকতে দেখি। এছাড়া রয়েছে অলেখকদের এক ধরনের সুবিধার মধ্য দিয়ে বিভিন্নরকম অবস্থান তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা বা পূণর্বাসন-কেন এরকম হয়, আপনি কীভাবে দেখেন বিষয়গুলিকে?

উত্তর: সাহিত্যাঙ্গনে অত্যন্ত চমৎকার একটি সৌহার্দ্যপূর্ন পরিবেশ থাকবার কথা; কিন্তু বাস্তবে তা নেই। এটা অতীতেও ছিল না, এখনো নেই। এখন দলাদলি, রেষারেষি ও লোভ-লালসাটা আগের তুলনায় বেড়েছে। কেননা, এখানে লেখকদের থেকে অলেখকদের সংখ্যা বেশি, অর্থ ও ক্ষমতালোভী লেখকদের সংখ্যা বেশি, বিবেকহীন মানুষদের সংখ্যা বেশি। আমরা তাদেরকেই লেখক বলতে চাই, যারা মন-মানাসিকতায় লেখক, কর্মে লেখক, আদর্শে লেখক, সাধনায় লেখক, বিবেকে লেখক, মননে সৎ ও নির্লোভ। যারা কবিতা চায়, কবিতার সুরভি চায়, কমনীয়তা চায়, মনের মনিকোঠায় স্থায়ী আবাসন চায়। যারা কবিতার স্বপ্ন দেখতে চায়, তারা সত্যিকারের কবি। তারা মানবিক, তারা মানুষের জন্য কবিতা লিখেন এবং লিখতে চান। আবার কিছু কিছু লেখক আছেন যারা লেখক হয়েও অলেখক মানসিকতাসম্পন্ন, যারা লোভী, ক্ষমতার লোভে তাবেদারী করেন ও আদর্শকে বিসর্জন দেন। তারা আর যা-ই সৃষ্টি করুন কালজয়ী কোনো কবিতা সৃষ্টি করতে পারেন না। কবিতার রূপ-বৈচিত্র্য বুঝতে পারেন না। এ অঙ্গনে অনেক সৃষ্টিশীল লেখক রয়েছেন, তারা সুবিধাবাদী ও সামন্তবাদী লেখকদের ক্ষমতার কাছে হেরে যান। এ তো বললাম লেখকদের কথা। কিন্ত যারা অলেখক, তারা তো নানান দলাদলি, গ্রুপিং, লবিং-এ ব্যস্ত, তাদের দুর্বলতাকে ঢাকার জন্য নানান রকম তাবেদারীতে ও আপোষে ব্যস্ত। অনেক সময়, অনেক ভালো লেখকও এইসব ভ্রান্তিতে পা দিয়ে ফেলেন। এইসব লেখকদের চিহ্নিত করার সময় এসেছে। তাদের মুখোশ খোলার সময় এসেছে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য কথা হলো, অলেখকরা যতই ক্ষমতাশালী, প্রভাবশালী এবং সম্পদশালীই হোক না কেন, তারা লেখক হিসেবে যেমন প্রতিষ্ঠা পান না, তেমনি সময়ের নিষ্ঠুর বিচারে একসময় লেখক হিসাবে টিকে থাকতেই পারেন না। 

প্রশ্ন. সাহিত্যপাড়ার দশকীবিবেচনা এবং এরসঙ্গে বিভিন্ন দশকের অগ্রজ কবি ও লেখকদের বন্ধুকৃত্য, গোত্রপ্রীতি, দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীকেন্দ্রীক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেরাগ্রন্থ নির্বাচন-এই বিষয়গুলো ভালো সাহিত্য সৃষ্টিতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। বলা চলে অলেখক এবং অকবি তৈরিতে এগুলো বিরাট ভূমিকা রাখে। এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের আশির দশক, নব্বই দশক, শূন্যদশক একটা বন্ধ্যাত্ব এবং অন্ধকারের দিকে যাত্রা করেছে, এটির শেষ কোথায়?

উত্তর : যত প্রীতিই করা হোক না কেন, এই প্রীতিটুকু তাদেরকে কত দূর নিয়ে যেতে পারবে? বুদ্ধিহীন চর্চায় লেখকদের বন্ধুকৃত্য, গোত্রপ্রীতি, দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকীকেন্দ্রীক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেরাগ্রন্থ নির্বাচনে বিশাল ভূমিকা রাখে। তাদের টাকা আছে, প্রতিপত্তি আছে, ক্ষমতা আছে, সেজন্য সাময়িকভাবে তারা জিতেও যায়। এরা বিশৃঙ্খলাই সৃষ্টি করতে পারে। আল্টিমেটলি এরা বেশিদিন টিকে না। সেরাগ্রন্থ নির্বাচনে ঐ গোষ্ঠিগুলো যত ভূমিকাই রাখুক, তারা সাময়িকভাবে জিতে যায়। কার্যত এ জয়ই শেষ নয়। তাবেদারি করে সেরা গ্রন্থের পুরস্কার পেয়ে কতজন সেরা হয়ে থাকতে পেরেছেন? সত্যিকারের লেখক বা কবি না হয়ে কেউ সময়ের বিচারে টিকে থাকতে পারেন না, অতীতেও পারেননি। 

তিরিশের দশক, চল্লিশের দশক, পঞ্চাশের দশক, ষাটের দশকের সাথে তুলনামূলক বিচারে আশির দশক, নব্বইয়ের দশক ও শূন্যদশক অনেকটাই বন্ধ্যাত্ব ও অন্ধকার দশক। তবে এই দশকগুলোতেও অনেক কাজ হয়েছে; কিন্তু সে কাজগুলো তেমন কোয়ালিটিফুল নয়। আবার যেসব লেখার বা বইয়ের গুরুত্ব পাওয়া উচিত, সেগুলো সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। প্রকৃত কবি ও লেখকদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না, তাদের লেখার মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। অধিকন্ত, গ্রুপ বা দলে থাকা লেখকদের লেখার মূল্যায়ন করা হচ্ছে, পুরস্কৃত করা হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে প্রদত্ত পুরস্কারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানান বিতর্ক। সেখানে বিতর্কিত কর্তৃপক্ষ ও বিতর্কিত নির্বাচকমণ্ডলী দিয়ে বিতর্কিত কাজ করানো হয়। এমনকি সরকার নিয়ন্ত্রিত একাডেমিগুলোর পত্রিকাতে, দৈনিক পত্রিকার সাময়িকী ও সাহিত্য পাতা এবং লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে পর্যন্ত চলছে স্বজনপ্রীতি, গ্রুপপ্রীতি। সেখানে ভালো লিখেও গ্রুপে না থাকার কারণে অনেকের লেখা ছাপা হচ্ছে না। লেখার গুরুত্বের চেয়ে গ্রুপের গুরুত্বটা অনেক বেশি প্রধান্য পাচ্ছে। সাহিত্য রিলেটেড বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদায়নের ক্ষেত্রেও দল বা গ্রুপগুলোই মূল্যায়িত হচ্ছে।

আজকাল অনেক লিটল ম্যাগাজিন বের হয় যাদের জন্মের লক্ষ্যই উপার্জন। তারা নানা রকমের বাণিজ্য ও সুবিধার সাথে জড়িত রয়েছেন। লিটল ম্যাগাজিন আজকাল উপার্জনের হাতিয়ার ও উপরে ওঠার সিঁড়ি। লিটল ম্যাগাজিন ব্যবহার করে গ্রুপ তৈরি করে, ঘরানা তৈরি করে, দল তৈরি করে। আর তা ঘিরেই আবর্তিত হয় সকল সুবিধা। আর তারা সেসব নিয়েই ব্যস্ত। দলের বাইরের লেখাও খুব একটা ছাপা হয় না। সরকারী উচ্চ পদস্থ চাকুরী, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকতাসহ বিশেষ পেশার লোকদের সুবিধা ও তোষামোদী তো রয়েছেই। তারা গ্রুপের বাইরে কাউকে ভাবতে চায় না, চিনতে চায় না। তারা অন্যদের লেখার কোনো খবরই রাখে না। অনেকক্ষেত্রে পেশাও লেখক হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কে মূল্যায়ন করবে ভালো লেখার? লিটল ম্যাগাজিনের যে উদ্দেশ্য নিয়ে জন্ম, তা আজ সুদূর পরাহত। আজকাল বই বের করার সামর্থ্য নেই এমন লেখক ও প্রকাশকদের গাড়ী হাকিয়ে বেড়াতে দেখি, নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করতে দেখি-এদের উপার্জনের উৎস কি? অনেক লেখক তো বড় ব্যবসায়ী হয়ে যায়, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে যায়, সরকারী কর্মকর্তা হয়ে যায়, বিদেশেও বাড়ী-গাড়ী কিনে। আজকাল কিছু লিটল ম্যাগাজিন দেখা যায়, যেগুলো কোনো একজন লেখককে নিয়ে তোষামোদ করে বিশেষ সংখ্যা বের করে। এগুলো বের করা হয় শুধু বিশেষ কারো চাটুকারিতা করে স্বার্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে। আবার কিছুক্ষেত্রে, কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে এ জাতীয় সংখ্যা বের করা হয়। এসব ম্যাগাজিন ভালো লেখক বা কবি হলেই বের হবে এমনটা নয়। টাকাওয়ালা অকবি বা অলেখকদেরকে নিয়েও এ জাতীয় সংখ্যা বের হতে পারে এবং বের হয়। বই বিক্রির ক্ষেত্রেও, ভালো বই হলেই বেশি বিক্রি হয় এমন নয়। বেশি প্রচারণার ফলে, পদস্থ কর্মকর্তা হলে তাদের অধীনস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বাধ্যগত বা তোষামোদ করার ফলে, শিক্ষক হলে তাদের ছাত্রদের ক্রেতা হওয়ার  ফলে বই বেশি বিক্রি হয়। এর মানে এই নয় যে, ঐ বইগুলোর মান খুব ভালো। এভাবে বাজারে ভালো বইয়ের চেয়ে কম ভালো বই বেশি বিক্রি হয়ে যায়। 

দশক বিবেচনাকে আমি খুব ভিন্ন নজরে দেখি না। দশকে, দশকের কবিদের চেনা-জানা যায়। ঐ দশক ভিন্ন, অন্য দশককে কি তারা চিনবে না। অবশ্যই চিনবে। তারা যেমন নিজের দশক ছাড়িয়ে অন্য দশকে চলে যাবেন আর তখনও তাদের লেখা বন্ধ হয়ে যাবে না, ঠিক তেমনি অন্য দশকের বেলায়ও প্রযোজ্য। একজন লেখক নিজের দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী যতগুলো দশক জীবিত থাকবেন, ততগুলো দশক হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে যাবেন। এক দশকের বলে অন্য দশকে তিনি যেতে পারবেন না এমন তো কথা নয়। এটা অতীতেও ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। একজন ভালো বা প্রতিশ্রুতিবন্ধ লেখক যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন লিখবেন, সে যে দশকেরই হোক।

আশি, নব্বই এবং শুন্য দশক শুধুই বন্ধ্যাত্ব ও অন্ধকার জগতের দিকে যাত্রা শুরু করেছে বলে আমি মনে করি না। এই দশকে সবার অলক্ষ্যেই অনেক কাজ হচ্ছে। যেমন,  আমি নিজের কথাই বলতে চাই। আমার একক ও বিশাল সনেট সংকলন ‘কান্নাটা ভায়োলিনের’ বেরিয়েছে। বইটির অনেকগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন ঃ ০১. সম্ভবতঃ বইটি এখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে সর্ববৃহৎ একক ও মৌলিক গ্রন্থ। ০২. প্রতিটি সনেটের গাঠনিক বিশ্লেষণ ও ছন্দ বিশ্লেষণ রয়েছে। ০৩. বইটিতে সনেটের গঠন নিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর রয়েছে ০৪. আটপৌরে শব্দ, প্রবাদ-প্রবচন, মিথের ব্যবহার, সমান্তরতার ব্যবহারসহ অগণিত গাঠনিক ভাংচুর রয়েছে। বইটির শুরুতে সনেট নিয়ে একটি বিশাল প্রবন্ধ রয়েছে। যারা সনেট সম্পর্কে একেবারেই জানেন না, তারা এই প্রবন্ধটি পড়লে সনেট সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারবেন।

এছাড়া ভিলানেলের একমাত্র ও একক সংকলন ‘বিষণ্ন সময়ের গান’ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্য তো দূরের কথা অন্য কোনো ভাষার সাহিত্যেও ভিলানেলের এককগ্রন্থ প্রকাশিত হবার খবর পাওয়া যায়নি। বইটির শুরুতে ভিলানেল বিষয়ে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। যারা ভিলানেল সম্পর্কে একেবারেই জানেন না, তারা এই প্রবন্ধটি পড়লে ভিলানেল সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারবেন। দীর্ঘ কবিতা রয়েছে, রয়েছে দীর্ঘ টানা গদ্য কবিতা যেমনঃ ‘ছোঁব না সমান্তরাল’, ‘নির্ঘুম ঘোড়া’, ‘গন্তব্যের নেশা’। দীর্ঘ টানা গদ্য কবিতার একক গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি নেই। মৌলিক হাইকু-র একক গ্রন্থ ‘জল ও সমতল’ বেরিয়েছে। হাইকু’র বেশির ভাগ বই-ই তো অনুবাদ কাব্য কিন্তু আমারটা মৌলিক হাইকু। এ রকম বইও চোখে পড়ে না। বিষয়ভিত্তিক বই-বৃষ্টি বিষয়ক একক গ্রন্থ ‘বৃষ্টি ও ধূসর’ বেরিয়েছে। কুয়াশা বিষয়ক গ্রন্থ ‘কুয়াশা’ বেরিয়েছে। পূর্বে বিষয় নির্ধারণ করে প্রকাশিত বই ‘মাতালের উপকরণগুলো ঝুলিয়ে দিন’ একটি অসাধারণ বই। গত বইমেলায় এসেছে ‘পাথর পথিক ও নদীর গল্প’। আরও অনেক বই বেরিয়েছে। এই দশকগুলিতে কাজ একবারেই হচ্ছে না একথার সাথে আমি একমত নই। এই দশকের যে বইগুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারতো সেসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। অলেখক ও স্বার্থান্বেষী কবিতে আর তাদের দলাদলিতে ভরে গেছে চারিদিক। যে কারণে তারা এই বইগুলির প্রচার বা প্রকাশ হতে দিচ্ছে না। বন্ধ্যাত্বের বদনাম ঘোচানোর জন্য হলেও এসব লেখার প্রচার হওয়া উচিত। তাতে এই দশক-বদনাম কিছুটা হলেও কমবে। ‘৯০-এর কবিরা আসুন দেখি তুলনা করে ভালো বই, বিশেষত আপনাদের অনেকের চেয়ে ভালো বই বাজারে আছে কিনা তা যাচাই করে দেখি এবং সে সবের প্রচার করি। বন্ধ্যাত্বের বদনাম দূর করি। সেগুলো নিয়ে আলোচনা কেন হচ্ছে না?

প্রশ্ন : এবারের মেলায় আসা নতুন বই নিয়ে বলুন...

উত্তর: আমি মূলতঃ কবিতার বই নিয়ে কথা বলতে চাই। এবারের বই মেলায় প্রকাশিত তেমন কোনো লক্ষ্যণীয় কবিতার বই আমার হাতে আসেনি। যে কয়টা বই হাতে এসেছে সেগুলো অকবিদের বই। এরা সিজনাল লেখক বা কবি। তাই আমার কোনো আশাব্যঞ্জক বলার কিছু নেই। যারা লিখবে বা লেখার প্রতি দায়বদ্ধ এমন কোনো কবি বা কবিতার বই আমার চোখে পড়েনি। 

প্রশ্ন : একজন কবি নিজের নামটির প্রতি সুবিচার করার চেষ্টা করে থাকেন। আপনি বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দেন ?

উত্তর : একজন কবি নিজের নামটির প্রতি অবশ্যই সুবিচার করার চেষ্টা করেন; কিন্তু সকল কবি তো আর কবি নয়। সকলে কি করে সে চেষ্টা করবে বা সফল হবে? কবির নামের সুবিচার হলো কবিতার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে ভালো কবিতা লেখা। আগেই বলেছি ভালো কবিতার বৈশিষ্ট্য বা উপকরণগুলো জেনে একজন কবিকে কবিতা লেখা উচিত। সব কবিতাই কবিতা নয়। কবিত্ব অলৌকিক হলেও কবিতা তৈরি করার জন্য একজন কবিকে অনেককিছু পঠন-পাঠন করতে হয়। এক কথায়, অত্যধিক পঠন-পাঠনের কোনো বিকল্প নেই। এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন. আপনার কবিতা ভাবনা বা শিল্প ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই...

উত্তর: এই সাক্ষাৎকারের শুরু থেকে অনেক কথাই বলা হয়ে গেছে। আমি তো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি, তাই ইচ্ছেমতো বলা সম্ভব হচ্ছে না। প্রশ্ন-গণ্ডির মধ্য থেকেই জবাবগুলো আসছে। কবিতা সম্পর্কে ভাবনা থেকেই আমার আরও একটি গবেষণাধর্মী (প্রবন্ধ) বই বের হতে যাচ্ছে। বইটির নাম ‘কবিতার রূপ ও বৈচিত্র্য’। খুব শীঘ্রই বইটি বাজারে আসবে। আমি বিষয়ভিত্তিক আরো কিছু বই লিখতে চাই। কবিতার প্রকরণ ও শৈলী (অলঙ্কার) বোঝা অত্যন্ত জরুরী। কবিতাকে কত রকম সম্পদে পরিপূর্ণ করতে হয় এটা কবিতা লেখার আগে প্রতিজন কবিকে বোঝা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি কবিতা লিখতে চাই এবং কবিতা কীভাবে লিখতে হয় ও কেন লিখতে হয় সেকথা বুঝতে ও  বোঝাতে চাই। কবিতার বিচিত্রতায় এবং বৈচিত্র্যে আমার সাহিত্যভূবন তথা বাংলা সাহিত্যকে বৈচিত্র্যময় করে তুলতে চাই। 

প্রশ্ন : আপনার গবেষণা ছিল সিকদার আমিনুল হকের কবিতা, অন্য অনেক কবি থাকতে সিকদার কেন গুরুত্ব পেলো?

উত্তর: সিকদার আমিনুল হককে নির্বাচন করার পেছনে বেশ কিছু যুক্তি ছিল। প্রথমতঃ সিকদার আমিনুল হকের একটা বদনাম ছিল, তার কবিতা দুর্বোধ্য, যা অনেকেই পছন্দ করতেন না অর্থাৎ বুঝতে পারতেন না। আমি কবিতা খুব ভালো বুঝি। আমার ইচ্ছে ছিল এই দুর্বোধ্যতাকে সহজ করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেবো। তাই এটা ছিল আমার প্রথম চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়তঃ সিকদার আমিনুল হককে নিয়ে আর কোনো কাজ হয়নি। আমিই প্রথম, আমিই পাইওনিয়ার। তাই এ গবেষণায় কোনো রকমের পূর্ববর্তী আলোচনা, গবেষণা, সহযোগিতা বা গাইড লাইন পাবো না, যা আমার কাজের মৌলিকত্ব বাড়াবে। আমাকে কষ্ট করেই এই কাজটি করতে হবে। এটা ছিল দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়তঃ উনি ইউরোপীয় ঘরানার কবি ছিলেন, অর্থাৎ উনার লেখায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য প্রভাব বেশি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বিষয়ক পড়াশোনা আমারও যথেষ্ট বেশি। এটা ছিল তৃতীয় চ্যালেঞ্জ। আজ আমার অহংকার সিকদার আমিনুল হককে নিয়ে আর যত কাজই হোক, আমাকে বাদ দিয়ে করতে পারবে না। সিকদার আমিনুল হকের উপর পিএইচডি গবেষণাগ্রন্থটি ছাড়াও আমার আরও ছয়টি বই বেরিয়েছে। কাজটা আমি শুধুমাত্র ডিগ্রী অর্জনের জন্য করিনি, অসম্ভব ভালোলাগা থেকে করেছি। এই কাজটা ছিল আমার সাধনা, আমার ভালোবাসা। অমানবিক পরিশ্রম করেছি কাজটি সম্পন্ন করতে। সন্তোষজনক রেজাল্টও পেয়েছি। অন্য কোনো কবিকে নিয়ে কাজ করলেও আপনার এরকম প্রশ্নটি আসতে পারতো। আমার সকলের কাছে অনুরোধ থাকবে আমার গবেষণা কর্মটি সুযোগ পেলে একবার পড়ে দেখবেন।

প্রশ্ন : কবি ও গবেষক হিসেবে সমাজ, বাস্তবতা এবং আমাদের মানুষের জীবনাচার সম্পর্কে আপনার সার্বিক মূল্যায়ন কি?

উত্তর: যিনি যে কাজ করতে চান, প্রথমে তাকে সে কাজটির প্রেমে পড়তে হবে। ভালোবাসতে হবে। কবিতা লেখা উচিত, কবিতা বুঝে। কবিতা বুঝতে হলে, কবিতার উপর লেখা প্রবন্ধগুলো পড়া উচিত। কবিত্ব থাকলেই স্বার্থক কবিতা লেখা যায় না। কবিতা বুঝে কবিতা লেখা উচিত। আর কবিতার বিষয় কি হবে এটা অত্যন্ত দুরূহ একটি নির্বাচন। পৃথিবীর প্রতিটা বিষয়ই কবিতার বিষয় বা উপাদান। তাই একজন কবিকে সকল বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হবে। কবিতা জীবনের কথা বলে। তাই একজন কবিকে মানবতাবাদী, জীবনবাদী, সমাজবাদী এবং বিবেকবান হতে হয়। এসব অর্জনের বিষয়, অলৌকিকতার বিষয় নয়। কবি ও গবেষক হিসেবে আমার অনেক দায়বদ্ধতা আমি টের পাই। সে লক্ষ্যেই আমি কাজ করি এবং করবো। আমার অনেক পরিকল্পনা আছে। অনেক কাজ এখনো বাকী। আমৃত্যু মানুষ, সমাজ আর ক্ষুধা নিয়ে কাজ করে যেতে চাই।

প্রশ্ন : লেখার জন্য পড়ালেখা কিংবা জ্ঞান চর্চার যে একটা বিশেষ অভ্যাস তৈরি হয় একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে আপনি এ বিষয়ে বলবেন কী?

উত্তর: কবিত্ব অলৌকিক কিন্তু কবিতা অর্জন করতে হয়। পড়ে পড়ে জ্ঞান অর্জন করতে হয়, পুড়ে পুড়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। চারিপাশ এবং পরিপাশের সবকিছু বুঝতে হয়। তারপর কবিতা লেখার মতো একটা বিশাল ও কঠিন কাজে মনোনিবেশ করতে হয়। ভালো লেখার জন্য প্রচুর পড়ালেখা এবং জ্ঞানার্জনের কোনো বিকল্প নেই। একজন কবিকে সব বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হয়। এমনকি সমাজে সবার চেয়ে বেশি জ্ঞান অর্জন না করলে কবি হওয়া যায় না। একজন কবিকে দিক নির্দেশনা দিতে হয়, বঞ্চনা বোঝাতে হয় এবং মানব মুক্তির বার্তা প্রচার করতে হয়। একজন মূর্খ কি করে সেসব বুঝবে এবং বোঝাবে? একজন কবিকে সৃষ্টিশীলতার প্রধান ভূমিকা নিতে হয়। একজন কবিই প্রথম বঞ্চনার কথা বুঝতে পারেন এবং তা সমাজের কাছে তুলে ধরেন। 

প্রশ্ন : ‘লেখক সমাজ, বুদ্ধিজীবী সমাজ, সিভিল সোসাইটি’ এই যে শব্দবন্ধগুলি আপনি দেখছেন, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এঁরা কারা, সমাজের প্রতি এঁদের দায়কে কীভাবে দেখেন-বিশেষত যে সমাজ থেকে এঁরা সমস্ত সুবিধা নেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত আপনার মতামত জানাবেন ...

উত্তর: প্রশ্নে উল্লেখিত সমাজ স্তরের তিনটিই সচেতন সমাজ। এই সমাজব্যবস্থাগুলো একসাথে বা আলাদা আলাদাভাবে কাজ করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এরা কেউ একসাথে মিলে কাজ করেন না। বুদ্ধিজীবী সমাজ সব বুঝলেও আপোষ করেন, নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। রাষ্ট্রের প্রতি যে দায়-দায়িত্ব পালন করেন তা তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন মিটিয়ে নিতান্ত দায়িত্ববোধ মাত্র। আজকের সিভিল সোসাইটির অনেক চাহিদা। তারা সব বুঝলেও ঘুমিয়ে থাকেন। চাকুরির দোহাই দিয়ে তারা পিছিয়ে থাকেন। ক্ষমতার দাপটে তারা দলবাজি করেন, দল তৈরি করেন, পছন্দের লোকদের নানা জায়গায় নানা পদে পদায়ন করেন। তারা নানান অনর্থ সৃষ্টি করেন। তাদের কাছ থেকে সমাজ খুব কম পায়। প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থাই সমাজ থেকে সুযোগ সুবিধা গ্রহন করে। লেখক সমাজ ছিল সব কিছুর উর্ধ্বে কিন্তু আজকালকার লেখক সমাজের অনেকেই সে আদর্শচ্যুত। লেখক যদি আদর্শ লেখক হয়, বুদ্ধিজীবী সমাজ যদি আদর্শ হয় এবং সিভিল সোসাইটি যদি লোভী, চাটুকার বা তাবেদার না হয় তাহলে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার অনেক সমস্যাই সমাধান হয়ে যায় ও যাবে। এই তিনটি সোসাইটি তো সমাজের সবচেয়ে উঁচু স্তরের বুদ্ধিমান। তাই এই তিন স্তরের উচিত তাদের সঠিক দায়িত্বটা পালন করা। এর ফলে সমাজের অনেক সমস্যাই সমাধান হতে বাধ্য।

প্রশ্ন : চলচ্চিত্র-আর্ট, চিত্রকলা-আর্ট, মঞ্চ নাটক-আর্ট, সঙ্গীত-আর্ট, কবিতা-আর্ট, এমন অনেক কিছুই রয়েছে সৃষ্টিশীল, যার সবই আর্ট বা শিল্প বলে জানি আমরা; কিন্তু এর মধ্যে আমরা বিভাজন করি কীভাবে, আর নিজের ভেতরকার সৃষ্টিশীলতার এই ক্ষেত্রকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন বিশেষত আপনি যখন একজন কবি?

উত্তর: প্রশ্নে বর্ণিত সবগুলো ফর্মই আর্ট; কিন্তু সবগুলোর মধ্যেই কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। চিত্রকলা আর্ট আর কবিতা আর্ট হলো সবচেয়ে আদি ও মৌলিক আর্ট। কবিতা হলো সৃষ্টিশীল আর্ট। এই আর্ট ইচ্ছে করলেই সৃষ্টি করা যায় না। এটাই সবচেয়ে কঠিন আর্ট। আমি তো কবি তাই কবিতাকেই ফোকাস করবো। কবিতা যতটা সত্য ও বিস্তারিত বলতে পারে, বাকীগুলো অতটা পারে না। কবিদের শক্তির উৎসই হলো কবিতা। কবিতায় অনেক বড় বিষয়কে ছোট গণ্ডির মধ্যে প্রকাশ করা যায়। কবিতা অনেক সময় সরাসরি কোনো কথা বলে না। আর এই কারণেই কবিতা সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাই কবিতাকে সেই কাঠামো নিতে হয়, যা সমাজের বা গণ-মানুষের মনের ভাষা হয়ে ওঠে, নিপীড়িতের চীৎকার হয়ে ওঠে, বঞ্চিতের প্রতিবাদ হয়ে ওঠে। একজন কবিকে দার্শনিক, বুদ্ধিমান, আদর্শ, দায়িত্বশীল ও প্রজ্ঞাবান হতে হয়। তাকে সমাজের পাশে এবং সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। জন-সাধারনের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে আদর্শ ভূমিকা রাখতে হয়। 

প্রশ্ন : নতুন কী কাজ করছেন? আপনার কবিতা এবং কবিতার শিল্প-নন্দন বিষয়ক গবেষণা, এই দুই সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে সমাজ, মানুষের মধ্যেকার প্রেম, দায়িত্বশীলতা এবং নতুনত্ব বিষয়গুলো নিয়ে বলবেন?

উত্তর: কবিতা তো লিখছিই। ওটা তো প্রাণ, ওটা বন্ধ হলে হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে। মৌলিক কবিতার বইয়ের কাজ চলছে, ‘কবিতা সংগ্রহ’-র কাজ চলছে। এছাড়াও ‘কবিতার রূপ ও বৈচিত্র্য’ নামে একটি গবেষণার বইয়ের কাজ চলছে। আশা করি বইমেলা-২০২৫-এর আগেইবইগুলো প্রকাশিত হবে। আমার কবিতা আর গবেষণা মিলে একাকার। কবিতার জন্যই গবেষণাগুলো করতে হয়। একটা বাদ দিলে অন্যটা ম্লাণ হয়ে পড়ে, অর্থহীন হয়ে যাবে। যেহেতু আমি কবি, তাই ফোকাসটা কবিতার উপরই থাকে। আমি ছন্দে কবিতা লিখেছি, ছন্দহীন কবিতা লিখেছি, লিরিক কবিতা লিখেছি, দীর্ঘ কবিতা লিখেছি, টানা দীর্ঘ গদ্য কবিতা লিখেছি, বিষয়ভিত্তিক কবিতা লিখেছি, সনেট লিখেছি, ভিলানেল লিখেছি, হাইকু লিখেছি, বিষয় নির্ধারণ করে কবিতা লিখেছি, বিষয়ভিত্তিক কবিতা লিখেছি। আবার কবিতায় গ্রামীণ শব্দ লিখেছি, শহুরে শব্দ লিখেছি, ইংরেজি শব্দ লিখেছি, বিদেশী শব্দ লিখেছি আটপৌঢ়ে শব্দ লিখেছি, মিথের ব্যবহার করেছি, প্রবাদ-প্রবচন ব্যবহার করেছি, ইংরেজী ও বাংলা কোটেশন ব্যবহার করেছি, দ্বিরুক্ত শব্দের ব্যবহার করেছি, যৌণতা বিষয়ক শব্দের ব্যবহার করেছি, সমান্তরতার ব্যবহার করেছি, চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছি, প্রতীকের ব্যবহার করেছি, রূপকের প্রচুর ব্যবহার করেছি, সমাসোক্তির ব্যবহার করেছি, দৃশ্যপটের উপস্থিতি রয়েছে ইত্যাদি। আমার কাব্যভূবন বহুবর্ণে বর্ণিল। কবিতায় প্রচুর দার্শনিকতা রয়েছে। শুধু মানব মানবীর প্রেম নয়, নানা ব্যস্ততা ও বাস্তবতায় পরিপূর্ণ। যাপিত জীবনের পাশাপাশি বঞ্চনা, নিপীড়ন, নির্যাতন, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, দায়বোধ, সমাজচেতনাবোধ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা, সময় ও মৃত্যুর মতো জটিল বিষয়াবর্তে পরিপূর্ণ। কবিতায় মর্বিডিটি চেতনা রয়েছে, স্টাইলিস্টিক রয়েছে, রয়েছে অবক্ষয়বাদ। ভাষায় ও ঐতিহ্যে এবং শব্দের ব্যবহারে প্রতিটি কবিতা পেয়েছে ভিন্নতর মাত্রা। কবিতা আমার উপার্জনের উৎস নয়, প্রেম। একমাত্র ভালোবাসা। যা লিখছি, সব মানুষের জন্য। পুরস্কার বা প্রমোশনের জন্য আমি সাহিত্য সাধনা করছি না। মানুষের ভালোবাসা ছাড়া আমার আর কোন প্রত্যাশা নেই।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //