হিন্দু নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় দরকার সামাজিক পরিবর্তন

‘খাটবে, খাবে, ঘুমাবে- এত কথা কিসের!’ ভারতীয় টিভি চ্যানেলের বিজ্ঞাপনী এ সংলাপটি যেন হিন্দু নারীর জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে হাজার হাজার বছর ধরে। 

মা-বাবার সংসারে স্নেহ-মমতায় লালিত-পালিত হলেও পৈতৃক সম্পত্তিতে তার নেই কোনো অধিকার। বিয়ের পর শুরু হয় নতুন জীবন। দু’আত্মা মিলে এক আত্মা, স্বামীর ধর্মই তার ধর্ম- হিন্দু ধর্মে বিয়ের মূল মন্ত্র এমনই। স্বামীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে নারীর কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকতে নেই। 

অথচ স্বামীর সম্পত্তিতেও বিধবার নেই কোনো অধিকার। স্বামীর চিতায় সহমরণের নিষ্ঠুর রীতি আজ না থাকলেও বৈষম্য, বঞ্চনার বেড়াজাল থেকে হিন্দু নারীর মুক্তি মেলেনি। শুধু হিন্দু নারী কেন? অন্য ধর্মের অনুসারী নারীও কত শত বৈষম্য, বঞ্চনার মর্মজ্বালা নিয়ে বেঁচে আছে। হিন্দু বিধবার পুনরায় বিবাহ এক সময় বারণ ছিল। বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নের পর আইনি নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও সামাজিক বিধি-নিষেধ এখনো আছে স্বমহিমায়। স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবাকে সাদা কাপড় পরে নিরামিষ ভোজী হয়ে আমৃত্যু বাঁচতে হবে; পূজা-পার্বণ, উৎসব-আনন্দে অপাঙক্তেয় তিনি। 

এসব সামাজিক রীতি হিন্দু নারীকে ঠকিয়ে যাচ্ছে হাজার বছর ধরে। সম্পত্তিতে অধিকার প্রশ্নে হিন্দু নারীরা এখনো শিরদাঁড়া খাঁড়া করে দাঁড়াতে পারছেন না অন্য ধর্মানুসারী নারীদের মতো। পৈতৃক সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার ভারতে আইনিভাবে স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশের হিন্দু নারীরা এ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। ১৯৩৭ সালের হিন্দু নারীর সম্পত্তিতে অধিকার আইন ঘোষণার মাধ্যমে হিন্দু বিধবাদের স্বামীর অকৃষি-কৃষি জমির অধিকার দেয়া হয়; কিন্তু বাংলাদেশে কৃষি জমিতে হিন্দু বিধবা নারীর কোনো অধিকার ছিল না। 

প্রায় সাড়ে আট দশক পর সম্প্রতি স্বামীর কৃষি জমিতে হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার ঘোষণা করলেন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একক বেঞ্চ। গত ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর এক বেঞ্চ স্বামীর কৃষি সম্পত্তিতেও হিন্দু বিধবা নারীর অংশ পাওয়ার অধিকার আছে মর্মে রায় প্রদান করেন। 

হিন্দু আইন দুটি ধারায় বিভক্ত- দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় দায়ভাগ ধারার অনুসারী। দায়ভাগ মতবাদ অনুসারে, হিন্দু নারীরা পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে কোনো স্বত্বাধিকার পায় না। দায়ভাগ মতবাদ অনুসারে, পাঁচ শ্রেণির নারী সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। তারা হলেন- অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্ত্রী, কন্যা, মাতা, পিতামহি, প্রপিতামহি; কিন্তু এ অধিকার মালিকানা বা স্বত্বের অধিকার নয়। জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার, অর্থাৎ জীবন স্বত্ব। শর্ত সাপেক্ষে বিধবা নারী স্বামীর সম্পত্তি হস্তান্তরের অধিকারী- নাবালক সন্তান-সন্ততির ভরণ-পোষণ, লেখাপড়া, কল্যাণ সাধন ইত্যাদি কারণে তিনি সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবেন আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে। 

দেশভাগের পর ভারতে হিন্দু আইনের অনেক পরিবর্তন ঘটে। ১৯৫৫ সালে ভারতে নতুন বিবাহ আইন প্রচলিত হয়। ১৯৫৬ সালে অপর এক আইনে দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা উভয় ধারার চর্চা পরিবর্তিত হয় ও ভারতের সব হিন্দুর জন্য একই আইন কার্যকর হয়। কিন্তু পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় আমলেই আমাদের এখানে দায়ভাগ পদ্ধতি কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে ১৯৩৭ সালের হিন্দু নারীর সম্পত্তি অধিকার আইন গ্রহণ করলেও এ আইনের প্রয়োগ আমাদের চোখে পড়েনি। বর্তমান রায়টি হিন্দু নারীদের জন্য এক বিরাট বিজয়। নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে এ রায় অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে। 

এ রায়ের প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হয়েছে এভাবে- খুলনার রাজবিহারি মন্ডলের দুই ছেলে জ্যোতিন্দ্র নাথ মন্ডল ও অভিমন্যু মন্ডল। অভিমন্যু ১৯৫৮ সালে মারা যায়। তার স্ত্রী গোরিদাসী তার মৃত স্বামীর কৃষি জমিতে কোনো অংশ উত্তরাধিকারী হিসেবে পাবেন না- দাবি করে তার স্বামীর ভাই জ্যোতিন্দ্র খুলনার নিম্ন আদালতে ১৯৮৩ সালে একটি মামলা করেন। ১৯৯৬ সালে আদালত পক্ষ দোষে মামলাটি খারিজ করে দেন ও গৌরিদাসী কৃষি জমির অংশ পাবেন না বলে পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে খুলনার যুগ্ম জেলা জজ ২০০৪ সালে কৃষি ও মৃত স্বামীর বসত ভিটা, উভয় সম্পত্তিতে গৌরিদাসীর অধিকার আছে বলে রায় প্রদান করেন। জ্যোতিন্দ্র আপিল আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন করেন। উক্ত সিভিল রিভিশনের রায়ে হাইকোর্ট পরলোকগত স্বামীর কৃষি-অকৃষি উভয় সম্পত্তিতে বিধবা স্ত্রীর অংশ পাওয়ার অধিকার আছে মর্মে ঘোষণা করেন। 

এই যুগান্তরকারী রায় সম্পর্কে সমাজের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ‘হিন্দু বিধবা নারীদের জন্য এমন বড় কোনো অর্জন নহে। পরলোকগত স্বামীর সম্পত্তিতে হিন্দু বিধবার অধিকার আগেও ছিল। হিন্দু বিধবারা স্বামীর সৎকার, পারলৌকিক মঙ্গল, ছেলে-মেয়ের ভরণ-পোষণ, লেখাপড়া ইত্যাদি কারণে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর করার অধিকারী। এ রায়ের মাধ্যমে কৃষি-অকৃষি, সম্পত্তির প্রশ্নে দীর্ঘ দিনের একটি বিরোধের মীমাংসা হয়েছে। ১৯৩৭ সালেই হিন্দু বিধবাদের মৃত স্বামীর কৃষি-অকৃষি সম্পত্তিতে অধিকার আছে মর্মে বলা আছে।’ 

তিনি বলেন, ‘বর্তমান রায় শুধু উক্ত আইনেরই ব্যাখ্যা মাত্র; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- মাতা-পিতার সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার যতদিন আইনি ও সামাজিক স্বীকৃতি না পাবে ততদিন বাংলাদেশের হিন্দু নারীরা পিছিয়ে থাকবে। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় তাদের এ অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। ভারতে ১৯৫৬ সালের একটি আইনে পিতা বা মাতার মৃত্যুর পর তাদের সম্পত্তিতে পুত্র-কন্যা উভয়ের সমান অংশ ও স্ত্রী বা স্বামীর এক-তৃতীয়াংশ স্বীকৃত হয়। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশ পিতা-মাতার সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকারের স্বীকৃতির জন্য বিভিন্ন সভা-সমাবেশের মাধ্যমে দাবি-দাওয়া জানাচ্ছে; আবার আরেকটি অংশ পিতা-মাতার সম্পত্তিতে কন্যা সন্তানের অধিকারের বিরোধিতাও করছে। রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে হিন্দু নারীদের এ অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া অপরিহার্য বলে আমি মনে করি; ভারত ৬৪ বছর আগেই যে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে।’

আইনজীবী ও সমাজকর্মী রেবেকা পলিনা গোমেজ বলেন, ‘খ্রিস্টান ধর্মে পিতা-মাতার সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়েরা সমান সমান অংশ পায়, স্বামী-স্ত্রী উভয় উভয়ের সম্পত্তিতে অংশ পায়। মুসলিম নারীরাও পিতা-মাতার সম্পত্তিতে এবং স্বামীর সম্পত্তিতে অংশ পায়। হিন্দু নারীরা এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। এ মামলার রায়ে হিন্দু নারীরা কিছুটা হলেও এগিয়ে গেল। এ রায় হিন্দু নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশাল অর্জন বলে আমি মনে করি।’

আইনজীবী আমেনা আক্তার দেওয়ান বলেন, ‘হিন্দু নারী, মুসলিম নারী- এ রকম ভেদাভেদ আমি করতে চাই না। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে নারীর অধিকার সম্পর্কে যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেটির বাস্তবায়ন হলে নারীদের আর কারও দয়া-দাক্ষিণ্য চাইতে হতো না। নারী অধিকারের সপক্ষে, মর্যাদা পূর্ণ জীবনযাপনের পক্ষে আদালতের বহু উল্লেখযোগ্য রায় রয়েছে। বাস্তবচিত্র ভিন্ন। নারী ধর্মের দিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সমাজের কাছ থেকে প্রতারিত হচ্ছে। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও ঠকছে। সামাজিক পরিবর্তন না হলে আদালতের রায় দিয়ে, সংবিধানের ধারা দিয়ে নারীর মুক্তি আসবে না।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh