ইরান কি ইরাকের ওপর প্রভাব ধরে রাখতে পারবে?

গত ৭ নভেম্বর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মুস্তফা আল কাধিমির প্রাণনাশের প্রচেষ্টার পর থেকে দেশটার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং সেখানে প্রতিবেশী ইরানের প্রভাবের ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী বলছে, তিনটি ড্রোন ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে হামলা করা হয়; যেখানে দুটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করলেও একটা হামলা করতে সক্ষম হয়। হামলায় প্রধানমন্ত্রীর কিছু না হলেও তার ছয় জন দেহরক্ষী আহত হন। কেউ হামলার দায় স্বীকার না করলেও ইরাকের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলেছেন, হামলার জন্য ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারাই দায়ী। হামলার প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকা ছাড়াও ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াগুলোর ঘোষণা দেওয়া সহিংসতাকেও উল্লেখ করছেন তারা। গত অক্টোবরের নির্বাচনে ভরাডুবি হলে মিলিশিয়ারা কারচুপির অভিযোগ করে নির্বাচনের ফলাফল বয়কট করে। 

‘আলজাজিরা’র এক প্রতিবেদনে ইরাকের মিলিশিয়াদের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর ওপর আক্রমণের পরপরই অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানও ঘটনার নিন্দা জানায়। একইসঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানের প্রভাবশালী ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর’ বা ‘আইআরজিসি’র আন্তর্জাতিক উইং ‘কুদস ফোর্স’-এর প্রধান ইসমাইল ঘানিকে বাগদাদে পাঠায় ইরান। এটা বলা যাচ্ছে না যে, ঘটনার ব্যাপারে ইরান আগে থেকে অবগত ছিল কি-না।

তবে প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ঘটনার পর তেহরানের অবস্থান দেখে অনেকেই মনে করছেন, এই হামলা ইরানের পুরোপুরি সম্মতি ছাড়াই ঘটেছে। ইরাকি বিশ্লেষকরা বলেছেন যে, এই মুহূর্তে ইরান চাইবে ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে এনে শিয়াদের মাঝে দ্বন্দ্ব বন্ধ করা, যা না করতে পারলে ইরাকে ইরানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন কঠিন হবে। 

হামলার আগে মিলিশিয়া গ্রুপগুলো যথেষ্ট ক্ষেপে ছিল। নির্বাচনে বিজয়ী শিয়া নেতা মুকতাদা আল সদর ইরান সমর্থিত ‘আল ফাতাহ’ গ্রুপকে বাইপাস করে বিভিন্ন আলোচনা করেছেন; ফলে পরবর্তী সরকারে ইরান সমর্থিত গ্রুপগুলো স্থান পাবে না। আল সদর পার্লামেন্টের ৩২৯টি আসনের মাঝে ৭৩টি পেয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। মোহাম্মদ আল হালবুসির ‘প্রগ্রেস পার্টি’ ৩৭টি এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নূরি আল মালিকির ‘স্টেট অব ল’ পেয়েছে ৩৪টি আসন। সেই তুলনায় নির্বাচনে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের মাঝে ‘বদর অর্গানাইজেন’এর প্রধান হাদি আল আমেরির নেতৃত্বে ‘ফাতাহ এলায়েন্স’ কোয়ালিশন পেয়েছে সর্বোচ্চ ১৭টি আসন। 

২০২০ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন ড্রোন হামলায় ‘কুদস ফোর্স’-এর প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানি এবং ইরাকের ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের প্রভাবশালী নেতা আবু মাহদি আল মুহান্দিস নিহত হন। ‘রয়টার্স’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এর পর থেকেই মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় রয়েছে ইরান। নতুন ব্যবস্থা হিসেবে ইরান ‘কাতাইব হিযবুল্লাহ’, ‘আসাঈব আহল আল হাক্ব’ বা ‘এএএইচ’ এবং ‘বদর অর্গানাইজেন’-এর মতো বড় মিলিশিয়াগুলোকে বাইপাস করে গোপনে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে ছোট গ্রুপ গঠন করছে। ইরাকি মিলিশিয়ারা বলছে, তারা এই গ্রুপের সদস্য এবং নেতা কাউকেই চেনে না। ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীও এদের ওপর নজর রাখছে। 

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট’-এর এসোসিয়েট ফেলো হামদি মালিক এক লেখায় বলছেন যে, মিলিশিয়াগুলো ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এবং পরবর্তীতে আইসিসের আবির্ভাবের পর সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে; কিন্তু আইসিসের পতন এবং ইরাক থেকে সর্বশেষ মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহারের কথায় মিলিশিয়াগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এমতাবস্থায় মিলিশিয়াগুলো সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই নিজেদের জাহির করতে চাইছে। তারা বরং তেহরানের কাছ থেকে সামরিক মিশন বৃদ্ধি করার নির্দেশ পেতেই বেশি আগ্রহী। একসময় তাদের নেতারা নিজেদের অবস্থানকে গোপন রেখে কাজ করলেও, এখন তারা টেলিভিশনে এসে যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিচ্ছে। ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া ‘এএএইচ’- এর প্রধান কাইস আল খাজালি ইরাকের ‘আল এতিজাহ’ টেলিভিশনের সঙ্গে এক সাক্ষাতে বলেন, উত্তর ইরাকে তুর্কি সেনারা হামলা করলে ইরাকের জনগণের মাঝে মিলিশিয়াদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করা সহজ হবে; মিলিশিয়ারা চ্যালেঞ্জ পছন্দ করে। 

ইরাকের রাজনৈতিক সমস্যাগুলো নতুন নয়। ব্রিটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে, ইরান যদি ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মিলিশিয়াদের ব্যবহার করে হস্তক্ষেপ করতে চায়, তাহলে সে দেশের পরিস্থিতি আরও বেসামাল হয়ে যেতে পারে। অপরদিকে যদি মিলিশিয়াগুলোকে নতুন করে সংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে সেটা হবে কঠিন এবং বিপজ্জনক।

প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, ইরাকের অভ্যন্তরে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াগুলোর কর্মকাণ্ড জনগণ অপছন্দ করায় ইরাকের মাটিতে যুদ্ধ শেষ হবার পরেও ইরানের জন্য মিলিশিয়া নির্ভর নীতি অনুসরণ করে যাওয়াটা হিতে বিপরীত হতে পারে। এখানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হবে ইরাকের জনগণ দেশের রাজনীতিতে মিলিশিয়াদের ভূমিকাকে কীভাবে দেখবে। 

মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দি আটলান্টিক কাউন্সিল’- এর এক লেখায় ‘ইউনিভার্সিটি অব তেহরান’- এর এসিসট্যান্ট প্রফেসর হাসান আহমাদিয়ান বলেছেন, ইরাকের যুক্তরাষ্ট্র প্রবর্তিত রাজনৈতিক কাঠামোতে ইরানের আস্থা নেই। এ কারণেই ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের ব্যাপারে ইরানের খুব একটা বক্তব্য ছিল না। বরং ইরাকি মিলিশিয়াদের ওপরেই ইরানের আস্থা বেশি। তবে ইরান চায় তার প্রতিবেশী দেশের পরিস্থিতি যেন ইরানের জন্য হুমকি না হয়। সে কারণেই ইরাকের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আহমাদিয়ানের কথাগুলো ইরাকের ব্যাপারে ইরানের প্রধান লক্ষ্যকে নির্দেশ করলেও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থানকেও এ ক্ষেত্রে হিসেবে আনতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী আল কাধিমি ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকেও পাশে চাইছেন ইরানের প্রভাবকে ব্যালেন্স করতে। তিনি গত এপ্রিলে সৌদি আরব ঘুরে এসেছেন এবং বলেছেন যে, তিনি তার দেশকে সৌদি আরবের ওপর হামলায় ব্যবহৃত হতে দেবেন না।

গত আগস্টে ইরাকের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জুমা ইনাদ ঘোষণা দেন যে, তার দেশ তুরস্ক থেকে ড্রোন, এটাক হেলিকপ্টার এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার অস্ত্র কিনতে চাইছে। এই ঘটনাগুলো ঘটছে যখন ইরাকের জনগণের কাছে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে ঠেকছে এবং মুকতাদা আল সদরের মতো ইরান বিরোধী নেতারা জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী ইরাকের রাজনীতিতে পূর্বের মতো প্রভাব ধরে রাখাটা ইরানের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে, যা তাদের জন্য নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের জন্ম দেবে। 

বিষয় : ইরান ইরাক

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //