গাজায় কি নির্বাচন হওয়া সম্ভব

১৭ বছর আগের কথা। সময় ছিল তখন ফিলিস্তিনি গ্রুপ হামাসের অনুকূলে। প্রতিপক্ষ ফাতাহকে হটিয়ে তারা গাজা উপত্যকার দায়িত্ব নিয়েছিল। ভূখণ্ডটির সব সরকারি স্থাপনার দায়িত্ব তারা বুঝে নিয়েছিল। যদিও ইসরায়েল আরোপিত অবরোধের মধ্যে তারা ছিল; তারপরও বহির্বিশ্বের সঙ্গে খুব নিয়ন্ত্রিত একটি যোগাযোগ তাদের ছিল। ইসরায়েলের অনুমোদনক্রমে কাতারের আর্থিক সহায়তা তারা পেত। 

এর এক দশক আগে (১৯৯৬ সালে) ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) সফলভাবে একটি সাধারণ পরিষদ নির্বাচন করেছিল। ১৯৯৩ সালে নরওয়ের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত শান্তিচুক্তি দীর্ঘদিনের নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য এ পরিবর্তনটুকু এনেছিল। যদিও স্বাধীন দেশ গঠিত হয়নি; কিন্তু অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহারের পর ফিলিস্তিনিরা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। যদিও তাদের সেই চলার পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি স্বশাসিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি স্ট্যাটাস কিউ বজায় ছিল।

গাজার দৃশ্যপট সেদিনের সম্পূর্ণ বিপরীত। অন্যসব ভবনের মতো স্থানীয় আইনসভা ভবনটি এখন বিধ্বস্ত। যুদ্ধবিরতির জন্য অনেক বার চেষ্টা করা হলেও কিছু হয়নি। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এতে বরাবরের মতো ভেটো দেয়নি, আবার পক্ষেও ভোট দেয়নি। যা-ই হোক যুদ্ধ এক সময় শেষ হবেই। প্রশ্ন হলো গাজার দায়িত্বে তখনো কি হামাস থাকবে। পিএ বলেছে, গাজার দায়িত্বভার যারাই গ্রহণ করুক ফিলিস্তিনি জনগণের সম্মতি নিয়েই সেটা হতে হবে। গাজা ভূখণ্ড বলতে গেলে এক ধ্বংসস্তূপ, মৃত্যুপুরী। সেখানে কোনো ধরনের নির্বাচন করা কি 

আদৌ সম্ভব?

বিষয়টি মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন পিএর জন্য একটি উভয় সঙ্কট। তারা একদিকে দুর্নীতি ও ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীলতার জন্য ফিলিস্তিনি জনগণের আস্থা হারিয়েছে, অন্যদিকে গাজার বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়। যদিও হামাসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই, তাই পিএকে বাদ দিয়ে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। ইসরায়েলের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে সেখানে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে একটি উগ্র ডানপন্থি জোট দীর্ঘদিন ক্ষমতায়। একটি ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের অধীনে ফিলিস্তিনের পরিবর্তে দ্বিধা বিভক্ত ফিলিস্তিন যে তাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফিলিস্তিনিদের বিভক্ত রাখতে পারলে দুই রাষ্ট্র সমাধানের যে কথা যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ বলে থাকে তার বাস্তবায়ন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। 

গাজায় নিহতের সংখ্যা ৩২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ফিলিস্তিনিদের রক্ত এখনো ঝরে চলেছে। এই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের জন্য ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনি জনতার কোনো বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নির্বাচন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশানল ফেডারেশন ফর ইলেক্টোরাল সিস্টেমের (আইএফইএস) ফিলিস্তিন শাখার সাবেক পরিচালক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ভ্লাদিমির প্রান বলেন, ‘ফিলিস্তিনে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কীভাবে আমরা শুরু করতে পারি তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। নির্বাচনের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে যা যা করণীয় তার কোনোকিছুই এখন সেখানে নেই।’ পিএর কর্তৃত্ব পশ্চিম তীরের মতো গাজায়ও প্রসারিত হোক সেটা ইসরায়েলসহ পশ্চিমা দেশগুলো চায়। কিন্তু পিএ নির্বাচিত হলেও এমন কোনো নজির তারা তৈরি করতে পারেনি যে পুরো ফিলিস্তিনি জনগণের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তাদের আছে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //