হিজ হাউস- যাদের কোনো রাষ্ট্র নেই

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়নি; কিন্তু পৃথিবীতে যুদ্ধ থেমে থাকে নাই। সেসব যুদ্ধ বড় আকারে না হলেও ছোট ছোট আকারে বিদ্যমান থেকে গেছে। এসব যুদ্ধের একটা নাম গৃহযুদ্ধ। যেসব যুদ্ধের সময়কালের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।

গৃহযুদ্ধ শেষ হবার পর, শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠিত হবার পরেও, এসব যুদ্ধ প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে চলতে থেকেছে। এটা যেন এক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো চিরস্থায়ী শত্রু ব্যবস্থা। যে শত্রুতা বংশপরস্পর চলতেই থাকে। কোনো থামাথামি নেই। এসব চিরস্থায়ী গৃহযুদ্ধের পেছনে অন্যান্য কারণের মধ্যে অন্যতম একটা কারণ উপনিবেশবাদ, যা পরবর্তীতে সাম্রাজ্যবাদের  মাধ্যমে সম্প্রসারিত হয়।

গত শতাব্দীর আঠারো এবং ঊনিশ শতকের দিকে পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার যখন প্রসার ঘটতে থাকে, তখন পুঁজির নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্টের কারণে পুঁজি সম্প্রসারণের প্রয়োজন দেখা দিতে শুরু করে। কারণ পুঁজির সম্প্রসারণ ছাড়া পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না। পুঁজির বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করার জন্য প্রয়োজন পড়ে নতুন নতুন ভূখণ্ড বা স্থান। পুঁজিতান্ত্রিক দেশগুলো তখন নতুন নতুন ভূখণ্ডের অনুসন্ধানে বের হয়। পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা দিক হলো, প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা ছাড়া এই ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না। যে কারণে উল্লিখিত সময়টাতে পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনৈতিক দেশগুলো যেমন, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, স্পেন ইত্যাদি দেশগুলোতে একদিকে যেমন পুঁজি বিনিয়োগের সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে অন্যদিকে তেমনি পারস্পরিক প্রতিযোগিতাও চলতে থাকে। এই প্রতিযোগিতার ফলে পুঁজিতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে নতুন নতুন ভূখণ্ড দখলদারিত্ব চলতে থাকে। এসব ভূখণ্ড দখলের কুফল গিয়ে পড়ে পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থায় পিছিয়ে থাকা আফ্রিকা, এশিয়াসহ পৃথিবীর নানা দেশের ওপর। এর পরিণতিতে একদিকে পুঁজিতান্ত্রিক দেশগুলো অপুঁজিতান্ত্রিক দেশগুলোতে উপনিবেশ স্থাপনকরে নিজেদের ধনী থেকে ধনীতর করতে শুরু করে এবং অন্যদিকে উপনিবেশিত দেশগুলো ক্রমেই পিছিয়ে পড়তে থাকে।

দক্ষিণ আমেরিকার গুয়ানা রাষ্ট্রের ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক কর্মী এবং একাডেমিক ওয়াল্টার অ্যান্থনি রডলি (১৯৪২-১৯৮০) ১৯৭২ সালে ‘How Europe Underdeveloped Africa’ নামে একটা বই প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি যা বলতে চেয়েছেন সেটা হলো, আফ্রিকা মহাদেশ ইউরোপের যতখানি উন্নয়ন ঘটিয়েছে ঠিক একই পরিমাণে ইউরোপ আফ্রিকাকে অনুন্নত করেছে বলে দাবি করেন। বইটা ভীষণভাবে সমালোচিত হলেও আফ্রিকার ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বই। আফ্রিকাকে অনুন্নত করে রাখার এই কৌশল শুরু হয় ১৮৪০ এর দশকে যখন ইউরোপীয় বাণিজ্য বিপুলভাবে সম্প্রসারিত হতে থাকে। যেহেতু সমুদ্র পথ ছিল একমাত্র বাণিজ্য পথ কাজেই প্রথম দিকে তারা সমুদ্র তীরবর্তী এলকায় বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। ঠিক আমাদের এখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যের নাম করে যেভাবে বসতি স্থাপন করেছিল। ১৮৭০ এর দিকে ইউরোপীয়রা আফ্রিকার ১০% সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। ১৮৮১-১৯১৪ এই সময়কাল ইতিহাসে ‘Scramble for Africa or Age of Imperialism and the expansion of the European empires’ নামে পরিচিত। যাকে আমরা আফ্রিকা মহাদেশের চূর্ণবিচূর্ণ অবস্থা অথবা নয়া সাম্রাজ্যবাদ বা উপনিবেশবাদের সম্প্রসারণ বলতে পারি।

১৮৮৪ র ‘বার্লিন কনফারেন্স’ যা কঙ্গো কনফারেন্স নামেও পারিচিত, এই কনফারেন্সের  মাধ্যমে ব্রিটেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল, জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, স্পেন ইত্যাদি দেশগুলো আফ্রিকার কোন অংশ কার দখলে থাকবে তার একটা রূপরেখা তৈরি করে। ১৮৮১ থেকে ১৯১৪ সালের প্রথম মহাযুদ্ধের মধ্যে আফ্রিকার প্রায় সবকটি দেশ তাদের দখলে চলে যায়। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি কুফল ছাড়াও, এসব দখলের সব থেকে যে বিরূপ প্রভাব পড়ে সেটা হলো শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক অসম প্রতিযোগিতা। একটা শক্তিশালী দেশ যখন কোনো দুর্বল দেশ দখল করে খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই শক্তিশালী দেশ দুর্বল দেশটির ওপর অনায়াসে ছড়ি ঘোরায়। উঁচু-নিচুর ভেদ শুরু হয়ে যায়। ঔপনিবেশিকতার সব চেয়ে বড় যে খারাপ দিক সেটা হলো, উপনিবেশিত জনগণের মধ্যে চিরস্থায়ী বিভেদ সৃষ্টি করে রাখা।

বেলজিয়ানরা যখন রুয়ান্ডায় উপনিবেশ স্থাপন করে (১৯২৩) তখন রুয়ান্ডার দুই উপজাতি হুতু (সংখ্যাগুরু) এবং তুতসিদের (সংখ্যা লঘু) মধ্যে তুতসিদের হাতে প্রশাসনের ভার তুলে দেয়। অর্থাৎ তুতসিরা ঔপনিবেশিক শাসক গোষ্ঠীর সহযোগী হিসাবে হুতুদের শাসকে পরিণত হয়; কিন্তু ১৯৬২ সালে রুয়ান্ডার স্বাধীনতার সময় তারা প্রশাসনিক ভার হুতুদের হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। খুব স্বাভাবিকভাবেই তুতসিদের এতদিনের নিপীড়নের প্রতিশোধ নিতে হুতুরা তৎপর হয়ে ওঠে। যা রুয়ান্ডায় গণহত্যা সংঘটিত করে। ‘হোটেল রুয়ান্ডা’ সিনেমার আলোচনায় বিস্তারিত বর্ণনা করেছি। ঠিক একইভাবে ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি ব্রিটিশরা যখন সুদান ছেড়ে চলে যায়, তখন অধিকাংশ ক্ষমতা উত্তর সুদানের হাতে দিয়ে যায়, দক্ষিণ সুদানে শুরু হয় এর প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া। যার পরিণতিতে পরবর্তিতে উত্তর এবং দক্ষিণ সুদান বিভক্ত হয়ে যায়। একই চিত্র আমরা ভারত ভাগের সময় হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদের মধ্যে দেখতে পাই, যার ফলাফল এখনো আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি।

আমাদের আজকের সিনেমা ‘হিজ হাউস’ এর আলোচনা এই দক্ষিণ সুদানের নৃশংস গৃহযুদ্ধ  এবং তার ফলাফলকে কেন্দ্র করে। যে গৃহযুদ্ধ দুই পর্যায়ে ঘটেছিল - এক. ১৯৫৫ থেকে ১৯৭২ ও দুই. ১৯৮৩ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত এবং যার পরিণতিতে ২০১১ সালে রেফারেন্ডানের মাধ্যমে দক্ষিণ সুদান বিভক্ত ও স্বাধীন হয়ে গেলেও আজও সেই যুদ্ধপরোক্ষভাবে অব্যাহত আছে। আমরা জানি আফ্রিকা মহাদেশে নানা আদিবাসি, উপজাতি, জাতিভেদে বহুধাবিভক্ত। ইজিপ্টের নীল উপত্যকার তীরে যে নিলোটিক আদিবাসী বাস করত তাদের দুই ভাষাভাষি ডিংকা এবং নুয়ের ভাষাভাষি উপজাতিদের কোন্দল এবং তার ফলাফলকে ঘিরে হিজ হাউস নির্মিত। অন্যান্য কোন্দলসহ এই দুই উপজাতির কোন্দলের কারণে অনেক দক্ষিণ সুদানিরা বিদেশের মাটিতে অভিবাসী হতে বাধ্য হয়। হিজ হাউসের প্রধান দুই চরিত্র বোল এবং রিয়ালকে কেন্দ্র করে সিনেমার গল্প আবর্তিত। ফ্ল্যাশব্যাক এবং ফ্ল্যাশইনের মধ্যে দিয়ে আফ্রিকান জনগণের ভূত, প্রেত, যাদু ইত্যাদি গভীর বিশ্বাসগুলোকে অসাধারণ দার্শনিক জায়গা থেকে পরিচালক রেমি উইকস উপস্থাপন করেছেন। কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে ইউরোপকে ঠিক যেভাবে কমিউনিজমের ভূত তাড়া করেছিল, হিজ হাউসে ঠিক সেভাবে বোল এবং রিয়ালের পেছনে শেকড়ের ভূত তাড়া করে বেড়ায়।

ছবির শুরুতেই আমরা দেখি, দক্ষিণ সুদানের একটা গ্রামে বেশকিছু মানুষ ট্রাকে উঠে কোথাও যাচ্ছে। চারদিকে ভীষণ এক অস্থিরতা। রিয়ালের সঙ্গে আট-নয় বছরের একটা শিশু, যাকে সে শক্ত করে ধরে রাখে এবং বলে, ভয় করোনা, আমি তোমাকে রক্ষা করব। ঠিক তারপরেই প্রচুর মানুষসহ সমুদ্রে নৌকাডুবি হতে দেখা যায় এবং সেই চিৎকার চেঁচামেচির মধ্যেই রিয়ালের স্বামী বোল ঘুম থেকে চমকে জেগে ওঠে। একটা শরণার্থী ক্যাম্পের ছোট্ট ঘরে বোল শুয়ে আছে, পাশে বসা রিয়াল তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘কি স্বপ্ন দেখছিলে?’ বোল ছোট্ট করে  উত্তর দেয় ‘আমাদের  বিয়ের স্বপ্ন।’ তারপরেই তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং আমরা জানতে পারি, তাদের ডিটেনশন থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়েছে; কিন্তু সম্পূর্ণ মুক্ত না। শুধু জামিনে মুক্ত এবং অনেকগুলো শর্তসাপেক্ষে কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত একটা বাসা ঠিক করা হয়েছে, যেখানে তাদের সাপ্তাহিক পঁচাত্তর পাউন্ড করে দেয়া হবে এবং প্রতি সপ্তাহে হাজিরা দেয়ার মধ্যে তারা এই খরচের হিসাব কর্তৃপক্ষকে জানাবে। তাদের চলাফেরার কোনো স্বাধীনতা থাকবে না (যেহেতু তারা তখনো ইংল্যান্ডের নাগরিক না), তারা কোন চাকরি করতে পারবে না, কারোর সঙ্গে মেলামেশা করতে পারবে না, ভদ্রভাবে থাকাসহ  আরও অনেক শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।

ছবির মূল গল্প শুরু হয়, বোল আর রিয়াল যখন পুরনো জীর্ণ বাসায় যেয়ে ওঠে। বোল রিয়ালকে বলে, ‘আমরা এখানে নতুন’, উত্তরে রিয়াল বলে, ‘আমাদের পুনর্জন্ম হয়েছে’; কিন্তু মানুষের জন্ম যে একবারই হয় এবং যেখানে হয়, সেখানেই তাদের শরীর ও আত্মা চিরস্থায়ীভাবে থেকে যায়,  একটু পরেই সেটা আমরা বুঝতে পারি। নৌকাডুবির সময় রিয়াল এবং বোলের শিশুকন্যা নিয়াগাক নৌকাডুবিতে মারা যায়। নিয়াগাক তাদের প্রকৃত মেয়ে না। দেশ থেকে পালাবার সময় একটা বাসে শুধু শিশু আর বাবা-মাকে নিয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু রিয়াল আর বোলের কোনো সন্তান ছিল না। তাই তাদের বাসে উঠতে দিচ্ছিল না। বোল তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিয়াগাককে, যার মা তখনো সেখানে পৌঁছে নাই, তাকেনিজেদের মেয়ে সাজিয়ে তাড়াহুড়া করে রিয়ালকে নিয়ে বাসে উঠে পড়ে। বাস ছেড়ে দেয়, বাসের বাইরে নিয়াগাকের মা চিৎকার করতে করতে তাদের পেছন পেছন আসে; কিন্তু বাস ততক্ষণে অনেক দূর চলে গেছে। নিজেদের স্বার্থের কথাটাই তখন বোলের মাথায় কাজ করছিল। নিয়াগাককে তখন এভাবে মিথ্যা মেয়ে সাজিয়ে নিয়ে না এলে, মেয়েটা হয়তো বেঁচে যেতো। তাই নিয়াগাককে হারানোর শোক তারা ভুলতে পারে না। প্রতিরাতে নিয়াগাকের আত্মা ভয়ানকভাবে বোল এবং রিয়ালের কাছে এসে হাজির হয়। নিয়াগাককে প্রতারণার মাধ্যমে নিয়ে আসা এবং পরবর্তীতে তাকে রক্ষা করতে না পারার কারণে একদিন রাতে রিয়াল তার মায়ের কাছে শোনা একটা গল্প বোলকে শোনায়। ভীষণ প্রতীকী গল্প। গল্পটা এনরকম-একটা গ্রামে একজন শ্রদ্ধেয় কিন্তু গরিব লোক থাকত। সে নিজের জন্য একটা বাড়ি করতে চেয়েছিল; কিন্তু গরিব বলে তার টাকা ছিল না। সে তখন চুরি করতে শুরু করলো। এভাবে চুরি করতে করতে একজন বৃদ্ধের টাকাও একদিন সে চুরি করে। তারপর বাড়ি বানায়; কিন্তু লোকটা জানতো না যে বৃদ্ধের টাকা সে চুরি করেছিল, আসলে সে ছিল ডিংকা ভাষায় বলে ‘অ্যাপেথ’ অর্থাৎ রাতের জাদুকর। লোকটা জানতোনা সেই জাদুকরও তার সঙ্গে থাকবে।

রিয়ালের কথা হচ্ছে, যে সমুদ্রে নিয়াগাক ডুবে গেছে সেই সমুদ্র থেকে নিয়াগাকের আত্মা অ্যাপেথরূপে প্রতি রাতে উঠে আসে এবং তাদের আতঙ্কিত করে। বোল রিয়ালকে জিজ্ঞেস করে, সেই অ্যাপেথ তাকে কি বলে, রিয়াল উত্তরে বলে, এখান থেকে চলে যেতে। এখান থেকে চলেগেলেই নিয়াগাকের আত্মার শান্তি হবে বলে রিয়ালের ধারণা। প্রতীকী প্রেতাত্মার মধ্যে দিয়ে শেকড় ছেড়ার যন্ত্রণা বুঝিয়ে দেয়া হয়। পৃথিবীর নানা দেশে অভিবাসীর সংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে। এর পেছনে গৃহযুদ্ধ, স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা, একনায়কতন্ত্র ইত্যাদি অনেক ধরনের কারণ আছে; কিন্তু নিজের মাটি ছেড়ে গেলেই মানুষ সহজে মাটিচ্যুত হতে পারে না। সে যেখানেই যাক, মাটি তাকে তাড়া করে বেড়ায়। মাটির এই ধাওয়া করার বিষয়টি পরিচালক রেমি উইকস যাদু, প্রেতাত্মা ইত্যাদির মাধ্যমে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন। সাধারণভাবে ছবিটাকে ভৌতিক ছবি মনে হলেও, এই ভৌতিক পরিস্থিতির পেছনের কারণ আরও গভীরে। আফ্রিকান জনগণের ভূত, জাদু ইত্যাদি বিশ্বাসকে রেমি উইকস শেকড় ছেঁড়ার ভয়, ত্রাস, হতাশা, দুঃখ, যন্ত্রণা ইত্যাদির সঙ্গে মিশেল ঘটিয়েছেন। আফ্রিকান সংস্কৃতিকে ধারণ করে সেই সংস্কৃতি থেকেই তিনি মাটি ছেঁড়ার অসহায়ত্বকে তুলে এনেছেন। 

এত কষ্টসহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে রিয়াল সিদ্ধান্ত নেয় সে আবার দেশে ফিরে যাবে; কিন্তু ফিরে যাবারও উপায় নেই। কারণ সেখানে তাদের জন্য কোনো ভূমি নেই। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার সময় রিয়াল তাকে জানায়, যেখানে তারা থাকত সেখানে দুই উপজাতির (ডিংকো ও নুয়ের) মধ্যে কোন্দল লেগে থাকত। যারা একে অপরকে হত্যা করতো। যেহেতু সে দুই উপজাতির মধ্যে দুটোকেই সমর্থন দিতো তাই বেঁচে গেছে। না হলে যেকোনো উপজাতির হাতে তার মারা যাবার সম্ভাবনা ছিল; কিন্তু এভাবে কিছুদিন বেঁচে থাকা সম্ভব হলেও দীর্ঘ দিন বাঁচা যায় না। কাজেই পালিয়ে আসা ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না।

অন্যদিকে ডাক্তারের চেম্বারে  রিয়াল যাবার সময় চেম্বারের ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে, রাস্তার কিছু ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে, তারা হাসিঠাট্টা শুরু করে এবং রিয়ালকে বলে, ‘Go back to Africa. Only English around here’। আমরা বুঝতে পারি, রিয়াল এবং বোলের জন্য কোনো রাষ্ট্র নেই। তারা রাষ্ট্রহীন। তবু শেষ চেষ্টা করে রিয়াল দেশে ফিরে যাবার জন্য। এই চেষ্টা স্বপ্নের মতো পর্দায় এসে হাজির হয়। আমরা দেখি বোলকে একটা ঘরে আটকে রেখে রিয়াল পালায়। ঘরের বাইরে আসতেই পাখির ডাক শোনা যায়। একটা সুদানি মেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। রিয়াল তাকে দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে জড়িয়ে ধরে। মেয়েটি তাকে একটা ঘরে নিয়ে যায়। যেখানে নানান বয়সী বেশকিছু সুদানি নারী বসে আছে। যাদের সঙ্গে রিয়ালের একসময় ভীষণ সখ্য ছিল। শুধু আনন্দ আর খুশিতে তাদের দিন কেটে যেতো। আসলে আজ তারা সবাই মৃত অথবা দেশের মাটিতে আতঙ্ক আর ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। একটু পরেই বোলের সঙ্গে রিয়ালকে দেখা যায়। এভাবেই সারাছবি শেকড় ছেঁড়ার দুঃখ আর বেদনার সঙ্গে যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত তারা জিতে যায়। ছবির শেষে তাদের উপর যে অফিসারের দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল, সে বোলকে জিজ্ঞেস করে, ‘এখানো কি সেই জাদুকর আছে?’ বোল উত্তরে বলে, রিয়াল তাকে মেরে ফেলেছে। অফিসার তাকে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আর তোমার মেয়ে?’ বোল তখন সুন্দর একটা উত্তর দেয়, ‘নাগিয়াকের কথা বলছো?

জেনে রেখো, তোমার ভূত তোমাকে সব সময় অনুসরণ করে যাবে। তারা কখনো ছেড়ে যায় না। তারা আমাদের ভেতরে বাস করে, যখন আমি তাকে থাকতে দেই। আমি এখন নিজের মুখোমুখি দাঁড়াতে শিখে গিয়েছি।’ এভাবেই মানুষকে নিজের মুখোমুখি অর্থাৎ বাস্তব অবস্থা বুঝে এবং সেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। সে যেখানেই তার বাসা বাঁধুক, নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে হলেও তাকে নিজের মুখোমুখি হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। বিশেষ করে শিকড় ছিঁড়ে অন্য জায়গায় বসতি স্থাপন করা মানুষদের। বিভিন্ন দেশ থেকে চলে যাওয়া শরণার্থীদের বেঁচে থাকার সংগ্রামের এক অনবদ্য ছবি হিজ হাউস।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //