আদিবাসী শিশুদের গণকবর

প্রশ্নবিদ্ধ কানাডার বর্ণবাদী ইতিহাস

বিভিন্ন স্থানে বাচ্চাদের জুতা রেখে এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোক পালন করেছে কানাডার মানুষ। ছবি : রয়টার্স

বিভিন্ন স্থানে বাচ্চাদের জুতা রেখে এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোক পালন করেছে কানাডার মানুষ। ছবি : রয়টার্স

কানাডায় গত মে মাস থেকে কমপক্ষে তিনটি গণকবরের সন্ধান মিলেছে, যেগুলো সেখানকার আদিবাসী শিশুদের কবর বলে শনাক্ত হয়েছে। এই ঘটনায় পুরো কানাডাজুড়ে আলোচনার বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এই কবরগুলো ছিল আবাসিক স্কুলে পড়া আদিবাসী শিক্ষার্থীদের। এখন পর্যন্ত কানাডার সরকারি অর্থায়নের বোর্ডিং স্কুলগুলোর আশপাশে কমপক্ষে ১১শ’ কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। 

‘বিবিসি’ জানাচ্ছে, এই বোর্ডিং স্কুলগুলোর উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসীদের কানাডার ইউরোপীয় সংস্কৃতিকে মেনে নিতে বাধ্য করা এবং আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষাকে ধ্বংস করা। তবে এই গণকবর আবিষ্কার কানাডায় নতুন কিছু নয়। দেশটার ইতিহাসজুড়েই রয়েছে এই কলঙ্কময় কর্মকাণ্ড, যা এখন বিশ্ব মিডিয়াতে নতুন করে আসছে। 

মে মাসে কানাডার পশ্চিমের ব্রিটিশ কলম্বিয়া রাজ্যের কামলুপস শহরের কাছে প্রথম গণকবরটা পাওয়া যায়। রাডার ব্যবহার করে ২১৫টা কবর আবিষ্কার করা হয়। কামলুপসের স্কুলটাতে এক সঙ্গে প্রায় ৫০০ আদিবাসী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতো। ১৮৯০ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত চালু ছিল এই স্কুল। এরপর জুন মাসে সাসকাচুয়ান প্রদেশে আরও একটা গণকবরে এখন পর্যন্ত ৭৫১টি মরদেহ পাওয়া গিয়েছে। ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় আরেকটা স্কুলে গণকবরে পাওয়া গিয়েছে ১৮২টি মরদেহ। এই স্কুলটা ১৯১২ সাল থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত চালু ছিল। দেশটার আদিবাসীদের নেতা চিফ রোজ্যান কাসিমির বলেন, আবিষ্কার করা কবরগুলোর মাঝে কারও কারও বয়স হয়তো তিন বছরেরও কম ছিল। এই বোর্ডিং স্কুলগুলোতে মৃতুবরণ করা হাজারো শিশুর মৃতদেহ তাদের স্বজনদের কাছে পাঠানো হয়নি। কমপক্ষে ১৩০টি আবাসিক স্কুলে ১৮৭৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সরকারি অর্থায়নে চালিত কর্মকাণ্ডে প্রায় দেড় লাখ আদিবাসী ‘মেটিস’ এবং ‘ইনুইট’ শিশুদেরকে তাদের পরিবার থেকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ১৯২০ এর দশকে আদিবাসী শিশুদের জন্যে বোর্ডিং স্কুলে পড়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এই আদেশ অমান্য করলে কারাদণ্ডাদেশের ব্যবস্থা ছিল। শিশুদের নিজস্ব ভাষা ত্যাগ করে ইংরেজি অথবা ফরাসি ভাষা শিখতে হয়েছিল এবং খিস্টধর্মে দীক্ষিত হতে হয়েছিল। 

২০০৯ সালে তৈরি হওয়া কানাডার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’এর ২০১৫ সালের এক প্রতিবেদনে সরকারের এই কর্মকাণ্ডকে ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। সরকার, চার্চ এবং স্কুলের ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞার কারণেই কমপক্ষে ছয় হাজার শিশুর মৃত্যু হয় বলে সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শিশুদেরকে অত্যন্ত খারাপ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা হতো, অত্যন্ত কঠিন শাস্তি দেওয়া হতো, এবং তাদের কোন মেডিক্যাল সুবিধাও দেওয়া হতো না। শিশুদের ওপর এই পরিবেশের অতি খারাপ প্রভাব সরকারের সব নেতৃত্বের কাছে জানা ছিল। প্রতিবেদনে এও উল্লেখ করা হয় যে, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে কিছু শিশু বোর্ডিং স্কুল থেকে পালিয়েছিল। বাকিরা বিভিন্ন রোগ, দুর্ঘটনা ও অবহেলায় মৃত্যুবরণ করে। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত আদিবাসী বোর্ডিং স্কুলে শিশু মৃত্যুর হার অন্যান্য বোর্ডিং স্কুলের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি ছিল। বোর্ডিং স্কুল থেকে বেঁচে যাওয়ারা বলে, তারা বিভিন্ন সময়ে হঠাৎ করেই লক্ষ্য করত যে, তাদের একজন বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোন কোন ক্ষেত্রে চার্চের পাদ্রীদের অবৈধ সম্পর্কের জেরে জন্ম নেওয়া সন্তানদেরকে তাদের মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চুল্লির মাঝে ফেলে দেয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। 

জাস্টিন ট্রুডোর সরকার নতুন করে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ঘোষণা করলেও আদিবাসী নেতারা তাতে খুশি হতে পারেননি। তারা চাইছেন প্রথমে সত্যটা পুরোপুরিভাবে জানানো দরকার। সে কারণে আদিবাসী নেতা মারে সিনক্লেয়ার ও চিফ বেলেগার্ড বলেছেন, পুরো ১৩০টা স্কুলেই গণকবর খোঁজা দরকার। 

‘বিবিসি’ বলছে যে, ১৯৮০-এর এবং ১৯৯০-এর দশকে ‘ইউনাইটেড’, ‘এংলিকান’ এবং ‘প্রেবিসটেরিয়ান’ চার্চের প্রতিনিধিরা এসব কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ক্ষমা চেয়ে হাত ঝেড়ে ফেললেও, ক্যাথোলিক চার্চের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পোপের কাছ থেকে কোনো বিবৃতি আসেনি। ট্রুডো ২০১৭ সালে পোপ ফ্রান্সিসকে ক্ষমা চাইবার আহ্বান করলেও, ভ্যাটিকান তা করতে অস্বীকৃতি জানায়।

তবে কানাডার এই গণকবরের ঘটনা কি শুধুই চার্চের ব্যাপার? ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকা জানাচ্ছে যে, গণকবরের ঘটনার জের ধরে কানাডায় ব্রিটিশ রানি এলিজাবেথ এবং রানি ভিক্টোরিয়ার মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়েছে। পহেলা জুলাই ‘কানাডা দিবস’এ ম্যানিটোবা রাজ্যে রানি ভিক্টোরিয়ার মূর্তির ওপর কাপড় দিয়ে ঢেকে লাল রঙ মেখে সেটাকে টেনে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। এই মূর্তিগুলো আদিবাসীদের কাছে কানাডার উপনিবেশিক ইতিহাসের উদাহরণ। অটোয়া শহরে ‘পার্লামেন্ট হিল’ এলাকায় ‘কানাডা দিবস বাতিল কর’ শীর্ষক জনসমাবেশে হাজারো মানুষ ‘কানাডার জন্য লজ্জা’ এবং ‘তাদেরকে ফিরিয়া আনো’ বলে স্লোগান দেয়। কিছুদিন আগে কানাডার বোর্ডিং স্কুল ব্যবস্থার স্থপতি বলে পরিচিত এগারটন রায়ারসনের মূর্তিও ভেঙে ফেলা হয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে এক বার্তায় বলা হয় যে, ব্রিটিশ সরকার ব্রিটিশ রানির মূর্তি ধ্বংস করার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তবে বিবৃতিতে এও বলা হয় যে, ব্রিটিশ সরকার কানাডার আদিবাসীদের আবেগের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh